পর্দার আড়ালে অন্তঃপুরবাসিনী বঙ্গীয় নারীদের বিনোদনের ব্যবস্থা কেমন ছিল, সে প্রশ্ন যখন উঠতে শুরু করেছে, ততদিনে গঙ্গায় বহু জল বয়ে গেছে। আর প্রশ্ন ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো বিতর্ক। তখন ঔপনিবেশিক শাসনামল। বাংলার যুবকরা তখন ইংল্যান্ডে পড়তে যাচ্ছেন। পরিচিত হচ্ছেন নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে। তাদের মনেই সম্ভবত প্রথমবারের মতো প্রশ্নটি উঁকি মারে। অভিজাত এসব বাঙালি যুবকের অন্যতম ছিলেন জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের সন্তান সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ১৮৬২ সালে প্রবেশনারি ট্রেনিংয়ের জন্য ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। তার স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী ঠাকুর। প্রবাস থেকে নিয়মিত জ্ঞানদাকে চিঠি লিখতেন সত্যেন্দ্রনাথ। তেমনই একটি চিঠির ভাষা ছিল এমন ‘আমি এখন সত্য সত্য মনে করিয়া পাই না, আমাদের স্ত্রীলোকদের সময় কাটাইবার কী আছে। এখানকার কত লোকে আমাকে ইহা জিজ্ঞাসা করিয়াছে, কিন্তু তাহারা ভালরূপ উত্তরই দিতে পারি না।’

ইউরোপীয়দের এসব জিজ্ঞাসার কারণে শিক্ষিত বাঙালিদের মনে অন্তঃপুরবাসিনীদের বিনোদন প্রসঙ্গে সচেতনতা তৈরি হয়। তারা ভাবতে থাকেন, এতকাল ধরে নারীরা কীভাবে পর্দার আড়ালে সীমিত পরিসরে কোনো ধরনের বৈচিত্র্য ছাড়াই তাদের দিন গুজরান করেছে! তখন এ নিয়ে নানা মুনি নানা মত দেয়া শুরু করেন। কারো মতে, পর্দার আড়ালে থাকা নারীদের বিনোদনের কোনো বন্দোবস্ত ছিল না। কেউ আবার তার প্রতিবাদ করে জানান যে অন্তঃপুরের নারীদের বিনোদনের কোনো অভাবই ছিল না। পরের ধারণাটি যারা পোষণ করতেন, তাদের একজন ছিলেন জনৈক কিশোরীলাল রায়। ১৮৭৬ সালে ‘জ্ঞানাঙ্কুর’ পত্রিকার জুলাই সংখ্যায় তার মতটি এভাবে ধরা পড়ে ‘কেহ কেহ বলেন, স্ত্রীলোকেরা অন্তঃপুরে বদ্ধ থাকাতে প্রায় দর্শনীয় কিছুই দেখিতে পান না। ইহা অত্যুক্তি পরিপূর্ণ। তাঁহার অনেক দেখিতে পান। ভাল প্রকারের যাত্রাদি, বাজিকরের বাজি, সাপুড়িয়ার সর্প প্রদর্শন, ভদ্র ভদ্র অনেক লোকসকলই তাঁহারা দেখিতে পান। বগী, কোচ, হস্তী, ঘোড়া প্রভৃতি ও প্রকৃতির মনোহর দৃশ্যও এককালীন তাঁহাদিগের দৃষ্টির অগোচর থাকে না। তবে তাঁহারা বিচারালয়ে উপস্থিত হইয়া বিচারপতি প্রমুখ সমবেত অমাত্যবর্গ ও বিদ্যালয়ে উপস্থিত হইয়া শিক্ষক প্রমুখ সমবেত ছাত্রবর্গ এবং পথিমধ্যে গমনকারী লোকদিগকে প্রকৃষ্টরূপে দেখিতে পান না সত্য বটে, কিন্তু শিক্ষিত লোকের স্ত্রীরা অনেক বিচারের যুক্তি এবং সদুপদেশপূর্ণ অনেক প্রকারের কথা, ধর্ম ও রাজনীতি প্রভৃতি অনেক বিষয়েরই প্রসঙ্গ শুনিতে পান। ভদ্র স্ত্রীলোকমণ্ডলী অনেক সময়ে সমবেত হইয়া সামাজিক সুখও উপভোগ করেন। তবে তাঁহারা পথিমধ্যে ভ্রমণকারী ইতর লোকদিগের কুৎসিত কথোপকথন, অনেক অভদ্র আচরণ, বিশিষ্ট ভদ্রলোকদিগের অসভ্যোচিত হাস্যপরিহাস, চপলতা এবং কুভাবব্যঞ্জক কটাক্ষাদি হইতে দূরে থাকেন এ কথা স্বীকার্য্য বটে, কিন্তু এই সকল হইতে দূরে থাকা কাহারও যে রুচিবিরুদ্ধও হইতে পারে, ইহাই বিস্ময়ের বিষয়।’ কিশোরীলাল রায়ের এ লেখা অনুসারে, অন্তঃপুরের নারীদের সুস্থ বিনোদনের কোনো ঘাটতি ছিল না। যা কিছু অশালীন বা সভ্যতা বিবর্জিত, তারা কেবল সেগুলোকেই সযতনে এড়িয়ে চলত। 

বিনোদন প্রক্রিয়ায় পর্দানশিন নারীদের অংশগ্রহণ কেমন ছিল তার একটি চিত্র উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মস্মৃতি ‘ছেলেবেলা’য়। স্মৃতিচারণের এক পর্যায়ে তিনি লেখেন, ‘বৈঠকখানায় ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় চলছে নাচগান; গুড়গুড়ি টানছেন বড়োর দল; মেয়েরা লুকানো থাকতেন ঝরোখার ওপারে চাপা আলোয় পানের বাটা নিয়ে—সেখানে বাইরের মেয়েরা এসে জমতেন, ফিসফিস করে চলত গেরস্তালির খবর।’

ওপরের আলোচনা থেকে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে কিংবা যুক্তিসংগত যোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে উনিশ শতকে বাংলার অন্তঃপুরবাসী নারীদের বিনোদন ব্যবস্থার একটি সাধারণ চিত্র পাঠক কল্পনা করে নিতে পারেন। কিন্তু পর্দানশিন নারীদের বিনোদন নিয়ে এ মাথাব্যথা শুরু হওয়ার আগে প্রকৃত বাস্তবতা কেমন ছিল, সেদিকে একটু আলোকপাত করা যাক।

উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীদের বিনোদনের অন্যতম উৎস ছিল সাজগোজ। সুন্দর সাজসজ্জা করে স্বামীর কাছে যাওয়ার রেওয়াজ ছিল। তাদের সাজানোর দায়িত্ব ছিল নাপতিনিদের কাঁধে। দুপুরে তারা আসত। বাড়ির মেয়ে-বউদের পায়ে আলতা লাগিয়ে দিত। চুল বেঁধে দিত। গোসলের আগেই এসব সাজসজ্জা সেরে নিত তারা। তারপর গোসল করে নাপতিনিদের ছোঁয়া শরীর থেকে মুছে ফেলত।

বাড়ির পরিচারিকাদের সঙ্গে জমিয়ে আলাপ ছিল অন্তঃপুরবাসী নারীদের বিনোদনের আরেকটি মাধ্যম। পরিচারিকারা সারা পাড়া চরে খায়। বাইরের জগৎ সম্পর্কে তাদের বিস্তর জানাশোনা। তাই তাদের ঝুলিতে বিচিত্র গল্পের সমাহার। এসব গল্প শোনার লোভে তাদের ঘিরে আসর বসাত বাড়ির বউ-ঝিরা। পরিচারিকারাও খানিক সত্য আর খানিক কল্পনা মিশিয়ে তাদের গল্প শোনাত। পরিচারিকাদের গল্পের সংগ্রহ যেন অফুরন্ত! এ পরিচারিকাদের প্রসঙ্গে স্মৃতি মিত্র তার আত্মজীবনী ‘বড়ো বাড়ির ছোট স্মৃতি’ বইয়ে লিখেছেন, ‘এরা এসে রসিয়ে রসিয়ে বাহির জগতের নানা সত্যি মিথ্যা গালগল্প পরিবেশন করতেন। আমার বাড়ির মহিলাকুল অসীম আগ্রহে সেই সব গল্প বা গুজব শুনে মুগ্ধ হতেন ও সরল মনে বিশ্বাস করতেন।’

অন্তঃপুরবাসী নারীদের বিনোদন নিশ্চিত করতে বৈষ্ণবী ও মালিনীরাও পিছিয়ে ছিলেন না। বনেদি বাড়ির অন্দরমহলে বৈষ্ণবীদের যাতায়াত ছিল। অন্তঃপুরের নারীদের লেখাপড়া শেখানো ছিল তাদের দায়িত্ব। ভোরেই তারা হাতে একটি ‘শিশুবোধক’ নিয়ে হাজির হতো। পড়ানো শেষ হলে তাকে ঘিরে জমত আড্ডা। মালিনীরা আসত বিকালে। সঙ্গে থাকত বকুল ফুলের মালা। সে ফুল খোঁপায় গুঁজত শৌখিন নারীরা। মালিনীরা আরেকটি কাজ করত। তারা মাঝেমধ্যে বই নিয়ে আসত। বই নিয়ে অন্তঃপুরের নারীদের ব্যাপক আগ্রহ ছিল। মালিনীরা যেদিন বই নিয়ে আসত, সেদিন রীতিমতো উৎসব লেগে যেত। বাড়ির বউ-ঝিরা বিভিন্ন প্রকারের বই তাদের কাছ থেকে কিনে নিত। 

আর ছিল ছড়া। ছিল গান। অন্দরমহলে গান জানা সুরেলা গলার মেয়েদের দারুণ খাতির। পালা-পার্বণে অন্তঃপুরে তাদের উপস্থিতি যেন অনিবার্য। বনেদি হিন্দু পরিবারে নিম্নবর্গীয় মেয়েরা গান গাইত। সারা রাত ধরে চলত গানের আসর। তবে বনেদি পরিবারের বউ-ঝিরা ছিল সাধারণত শ্রোতা। গান গাওয়াটা তাদের জন্য নিষেধ ছিল। এমনকি আপন মনে গুনগুন করার অধিকারও তাদের ছিল না। কোনো কোনো মুসলিম পরিবারের অন্দরমহলেও বসত এমন গানের আসর। সেসব পরিবারে গান জানা পরিচারিকাদের আলাদা সমাদর ছিল। সৈয়দা মনোয়ারা খাতুন তার ‘স্মৃতির পাতা’য় তাদের পরিবারে গানের আসরের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মা গান পছন্দ করতেন। জোহরের নামাজের পর অন্দরমহলের বারান্দায় বসত গানের আসর। গানের বিষয়বস্তুও ছিল বিচিত্র। রূপকথার গান, হলুদ কোটার গান, হলুদ মাখানোর গান, কনে সাজানোর গান, বর আসার গান, কনে বিদায়ের গান ইত্যাদি। কখনো ভাবের গান, মারফতি গানও হতো। রূপকথার গান প্রসঙ্গে সৈয়দা মনোয়ারা খাতুন লেখেন, ‘শুধু গানের ভেতর দিয়ে যে কত সুন্দর কাহিনী হত আর সে গানের ভেতর দিয়ে কত যে মনের ব্যথার প্রকাশ, শুনতে শুনতে অনেকে কেঁদে ফেলত। খুব সুন্দর করুণ সুরের গানের ভেতর দিয়ে একটা কাহিনী বলত আমাদের একজন চাকরানি।’

‘কুশণ্ডিকা’ নামে একটি অনুষ্ঠান প্রচলিত বাংলার হিন্দুদের মাঝে। এটি ‘বাসি বিয়ে’ নামেও পরিচিত। সে অনুষ্ঠানে গানের আসর অবধারিত। বর-কনে আসরের মধ্যমণি। বরের সামনে মুখ দেখানো চলবে না। তাই গায়িকা ও আসরে উপস্থিত মেয়েরা বুক পর্যন্ত ঘোমটা টেনে বরের দিকে পেছন ফিরে বসত। গানের আসরে পর্দা মেনে চলা প্রসঙ্গে মনোদা দেবী তার আত্মকথা ‘সেকালের গৃহবধূর ডায়েরি’তে লিখেছেন, ‘এর মধ্যে একটি খুব মজার বিষয় ছিল এই যে, প্রতি দুইজন করিয়া জোড় বাঁধা থাকিত, প্রথম এক জোড় গাহিয়া যাইত, পরে অপর জোড় গান ধরিত। এক হাত লম্বা ঘোমটার মধ্য হইতে নানা কাহিনীযুক্ত গান গাহিত। গানের জুড়ি দুইটি, কিন্তু তাদের সুদীর্ঘ ঘোমটা দুইটিকেও মুখোমুখি করিয়া জুড়িয়া লইয়া গান করিত; কিছুতেই তাহাদের মুখ দেখা যাইত না। গানের সুর তাদের গ্রামান্তরে যত চলিয়া যাউক না কেন—তাহাদের তেল, সিন্দুরলিপ্ত মুখগুলি সকলের অদৃশ্যেই থাকিয়া যাইত!’

অন্দরমহলের বিনোদনের আরেকটি চমৎকার উৎস ছিল নাচ। এসব নাচের মধ্যে ‘বউ নাচ’, ‘ধামাইল নাচ’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। অন্তঃপুরের এসব নাচের আসরে পুরুষদের প্রবেশাধিকার নেই। বউ নাচে কেবল একজন পুরুষ উপস্থিত থাকতে পারত। সে ছিল ঢুলি। বউ নাচ প্রসঙ্গে নলিনীকান্ত সরকার ‘আসা যাওয়ার মাঝখানে’ বইয়ে লিখেছেন, ‘নৃত্যপরা মহিলাটি দুটি পায়ের পাতা একত্র করে একটি বিশেষ ভঙ্গিতে দাঁড়াতেন। দুটি হাত থাকত কোমরের দুই দিকে। তারপর নিচের দিকে ঝুঁকে একটা অভিনব ভঙ্গিতে নাচ শুরু করতেন। একজন ঢুলি ঢোলে নাচের বোল বাজাত আর সে বাজনার তালে তালে মহিলারা নাচতেন। জোড়া পা দুটির অগ্রভাগ জোড়া অবস্থায় রেখে গোড়ালি দুটি ডাইনে-বাঁয়ে সরিয়ে দিতেন, আবার দুটি পায়ের গোড়ালি জোড়া অবস্থায় রেখে পায়ের পাতার অগ্রভাগ দুটি ডাইনে-বাঁয়ে সরিয়ে দিতেন। স্বচক্ষে না দেখলে পুরস্ত্রীদের এই নৃত্যকলার মাধুর্য আস্বাদন করা সম্ভব নয়। মহিলাদের এই নৃত্যানুষ্ঠানে পুরুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। একমাত্র পুরুষ ওই ঢুলি।’ বউ নাচের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে পরিচারিকা বা নিম্নবর্গীয় নারীরা নয়, বরং বাড়ির বউরাই নাচত। দল বেঁধে নয়, একা একা। তবে ধামাইল নাচ দল বেঁধে নাচা হতো। এ নাচেও এক বা একাধিক ঢুলি থাকত। ঢোলের তালে তালে এক বিশেষ ভঙ্গিতে পা ফেলে নারীরা গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে নাচত। তাদের মাথায় থাকত ঘোমটা।

ওপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট, অন্তঃপুরবাসী নারীদের জীবনে বিনোদন যে ছিল না, এ কথা সত্য নয়। বিনোদনের প্রকৃতি নিয়ে তর্ক হতে পারে, কিন্তু এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে পর্দার ঘেরাটোপে আবৃত অন্দরমহলে নারীরা নিজেদের মতো করে বিনোদনের বন্দোবস্ত করে নিয়েছিল। 

মোহাম্মদ রবিউল হোসাইন: লেখক