কোনো স্থান বা সময়ের ইতিহাস লেখা থাকে বইয়ে। তা লিখিত ইতিহাস। এর বাইরেও ইতিহাসের আছে রকমফের। নির্দিষ্ট স্থান বা সময়ের ইতিহাস থাকে এর সঙ্গে যুক্ত স্থাপনা ও মানুষের মধ্যেও। মানুষ হারিয়ে যায় কিন্তু স্থাপনা টিকে থাকে। স্থাপনায় লেখা না থাকলেও তা বহনও করে সময় ও স্থানের সাক্ষ্য। রাজপ্রাসাদ, জমিদারবাড়ি ইত্যাদি এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি বা জনপ্রিয় ধারায় বরিশাল নিয়ে মাতামাতি না হলেও একটা সময় এ অঞ্চল নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাকলা, চন্দ্রদ্বীপ নানা নামেই এটি পরিচিত ছিল একেক সময়। একাডেমিক ইতিহাস ও লোককথা থেকে জানা যায়, দনুজমর্দন দেব নামে এক রাজা চন্দ্রদ্বীপের স্থপতি। বর্তমানে বরিশাল একটি বিভাগ, যা ছয়টি জেলা নিয়ে গঠিত। ছয় বিভাগ মিলিয়ে মোট ২৮টি জমিদারবাড়ি রয়েছে বরিশালে। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় নয়টি, পটুয়াখালীতে ছয়টি, ভোলায় তিনটি, পিরোজপুরে চারটি, বরগুনায় একটি ও ঝালকাঠি জেলায় পাঁচটি।

বরিশালের জমিদারবাড়ির তালিকার শুরুতেই থাকবে লাকুটিয়া জমিদারবাড়ি। এটি বরিশাল সদরের কাশিপুর ইউনিয়নের লাকুটিয়া গ্রামে অবস্থিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে লাকুটিয়ায় জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন রূপচন্দ্র রায়। কিন্তু বর্তমান জমিদারবাড়িটি তার নির্মিত নয়। উনিশ শতকে রূপচন্দ্রের পুত্র রায়চন্দ্র রায় লাকুটিয়ায় জমিদারবাড়ি স্থাপন করেন। এটি নির্মাণ করা হয়েছিল ইট ও সুরকি দিয়ে। বর্তমানে বাড়িটি বেহাল দশায় আছে। বাড়ির বাইরের দিকের সিঁড়িটি ভঙ্গুর। তবে এককালে বেশ জৌলুস ছিল তা বোঝা যায়। জমিদারবাড়ির মূল ভবনের সামনে একটি বড় মাঠ আছে। দোতলা একটি প্রাসাদও আছে। বাড়ির দক্ষিণে আছে বউরানীর দিঘি। আটচালা কয়েকটি মন্দির আছে। এছাড়া শিখর ধারায় নির্মিত মঠও আছে এ বাড়িতে। লাকুটিয়া জমিদার বাড়ি এখন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের অধীনে আছে।

এরপর আসে বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ জমিদারবাড়ির নাম। বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা গ্রামের বরিশাল-বানারীপাড়া সড়কের পাশে জমিদারবাড়ির অবস্থান। রাজবাড়ি নাম হলেও এটি মূলত জমিদারবাড়ি। এটি স্থাপন করেন দনুজমর্দন দেব। ৩০ একর জমির ওপর নির্মিত হয়েছে বাড়িটি। তবে এখন দেখা যায় বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। বাড়িসংলগ্ন জায়গা থেকে ‘রাজা কন্দর্প নারায়ণ’ নাম অঙ্কিত একটি পাঁচহাতি কামান পাওয়া গেছে। রাজবাড়ি থেকে খানিকটা দূরে আছে রাজা উদয় নারায়ণের সমাধি মন্দির। এটি অষ্টাদশ শতাব্দীতে নির্মিত।

বরিশালের সবচেয়ে বিখ্যাত ও চর্চিত জমিদারবাড়ি হলো মাধবপাশার জমিদারবাড়ি। বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ রাজবাড়ি থেকে এর দূরত্ব ৩০০ মিটার। চতুর্দশ শতাব্দীতে মাধবাপাশায় ছিল দনুজমর্দনের রাজত্ব। পরে তার উত্তরপুরুষ মোগল বাহিনীর কাছে হার মানলে এটি জমিদারিতে পরিণত হয়। কোম্পানি আমলে মাধবপাশার জমিদারির অনেকাংশ বিক্রি হয়ে যায়। তবে জমিদারবাড়ি এখনো আছে। দেখা যায় সেখানে একটি ছয় কক্ষবিশিষ্ট ভবন এবং একটি দোতলা দুর্গা মন্দির রয়েছে। এ বংশের স্মৃতিচিহ্ন হলো দুর্গাসাগর দিঘি।

গৌরনদী উপজেলার আশোকাঠিতে আছে একটি জমিদারবাড়ি। স্থানীয়দের কাছে এটি মোহন লাল সাহার বাড়ি নামেও পরিচিত। আনুমানিক ১৫০ বছর আগে জমিদার মোহন লাল সাহা এ বাড়ি নির্মাণ করেন। প্রসন্ন ভবন নামে বাড়িটি পরিচিত ছিল। বাড়ির মূল দরজায় সিংহমূর্তি খচিত একটি দুর্গা মন্দির রয়েছে। মন্দিরটির বয়স ১৭০ বছরের বেশি। ৯২ ফুট বাই ৫৯ ফুটের মন্দিরটির অবস্থা এখন খুব একটা ভালো নয়। তার পরও মন্দিরে প্রতি বছর দুর্গা পূজা হয়।

বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠিতে আছে একটি জমিদারবাড়ি। এ জায়গায় জমিদারি পত্তন করেন জানকীবল্লভ রায় চৌধুরী। কিন্তু জমিদারবাড়ি তৈরি করেন বিশ্বেশ্বর রায় চৌধুরী। বাড়িটি অন্য জমিদারবাড়ির তুলনায় বড়। বাড়ির ভেতরেও আছে অন্দরমহলের প্রশস্ত রাস্তা। মূল বাড়িটি দোতলা। প্রবেশপথে আছে কিছু মন্দির। মূল বাড়ির পাশে আছে আরেকটি জরাজীর্ণ বাড়ি এবং তার সঙ্গে একটি মন্দির। মন্দিরটিতে প্রতি বছর নিয়ম করে জগদ্ধাত্রী পূজা হয়। কলসকাঠির জমিদার বংশ ও জমিদারবাড়ির সঙ্গে এ অঞ্চলের ইতিহাস যুক্ত। বড় বড় আন্দোলনে তাদের অংশগ্রহণ ছিল। ১৯০৮ সালে সেখানে বান্ধব সমিতি গঠন হয়। ১৯৩০ সালে কলসকাঠির প্রজারা লবণ আইন অমান্য করেন। কলসকাঠির জমিদারদের হাত ধরেই ১৮৮২ সালে কলসকাঠি বিএম একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

বাকেরগঞ্চের রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের শ্যামপুরের জমিদারবাড়িটি নাটু বাবুর বাড়ি নামে পরিচিত। জমিদার প্রসন্ন কুমার রায় চৌধুরী অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাড়িটি নির্মাণ করেন। ১৫ একরের বেশি জায়গাজুড়ে এটি অবস্থিত। এখন পরিসর কমে ৬ দশমিক ৬৯ একরে এসে দাঁড়িয়েছে। নদীভাঙনই এর কারণ। এ বংশের জমিদার কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরী নাটু বাবু নামে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তার সরাসরি যোগসূত্র ছিল। শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি তৈরি করেছিলেন।

উলানিয়া জমিদার বাড়ির অবস্থান মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায়। স্থানীয়দের কাছে এটি চৌধুরী বাড়ি নামে পরিচিত। এ বাড়ির জমিদাররা মুসলমান। উলানিয়া জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা মোহম্মদ হানিফ। তার পঞ্চম পূর্বপুরুষ শেখ আসাদ আলী পারস্য থেকে ভারতে এসেছিলেন। তার উত্তরপুরুষদের হাতে সপ্তদশ শতাব্দীতে উলানিয়ার জমিদারবাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রাচীরঘেরা দুর্গের আদলে বাড়িটি নির্মাণ করা হয়। মূল ফটকের পাশে নির্মিত হয়েছিল একটি মসজিদ। এ বাড়িতে কেরোসিনের ল্যাম্পপোস্ট ছিল। এছাড়া বাড়ির প্রতিরক্ষার জন্য কামানও ছিল সেখানে।

মেহেন্দিগঞ্জেরই আরেকটি জমিদারবাড়ি কালা মিয়ার বাড়ি। ২০০ বছর আগে ৫০ একর জমির ওপর বাড়িটি নির্মাণ করেন জালাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী (কালা মিয়া)। বানারীপাড়ার চাখারে আছে একটি জমিদারবাড়ি। তবে এটি কবে কে নির্মাণ করেন তা জানা যায় না। একই এলাকার সাতআনি জমিদারবাড়ি কে নির্মাণ করেছেন তাও জানা যায় না।

পটুয়াখালীর দুমকিতে আছে শ্রীরামপুর জমিদারবাড়ি। স্থানীয়দের কাছে এটি মিয়া বাড়ি নামে পরিচিত। জমিদারবাড়িতে আছে এক গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ। বাউফল জমিদারবাড়ি নির্মিত হয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে। প্রায় ১২ একর জমির ওপর অবস্থিত বাড়িটি। দেড় ফুটের দেয়াল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বাড়িটি। উচ্চতায় প্রায় ৪০ ফুট। এ জমিদারবাড়িতে নিয়মিত দুর্গা পূজা হতো।

কাছিপাড়া জমিদারবাড়ি কে নির্মাণ করেন তা জানা যায়নি। তবে মদনপুরার জমিদারবাড়ি নির্মাণ করেন জমিদার লালু সিকদার। স্থানীদের কাছে এটি আন্ধার কোঠা ও সিকদার বাড়ি নামে পরিচিত। বাড়িতে একটি ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠ আছে। সেখানে খাজনা দিতে না পারা প্রজাদের আটকে রাখা হতো বলে প্রচলিত। কেশবপুরের জমিদার বাড়িটিও সিকদার বাড়ি নামে পরিচিত। গওহর আলী সিকদার ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে বাড়িটি নির্মাণ করেন। এ বাড়ির নিচতলা পরিত্যক্ত হলেও দোতলায় লোকজন বাস করে।

ভোলার বোরহানউদ্দিনে আছে বোরহানউদ্দিন জমিদার বাড়ি। প্রাচীরঘেরা বাড়িটির সঙ্গে আছে মসজিদ, মুসাফিরখানা ইত্যাদি। হায়দার মহল নামের জমিদারবাড়িটি মানিকা ইউনিয়নে অবস্থিত। ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে হায়দার আলি এ জমিদারি পত্তন করেন। জমিদারবাড়িটি তিনতলা। মূল ভবন ছাড়াও আছে তিনটি ভবন। ভবনের বিম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে শালকাঠ। বাড়ির কাছাকাছি আছে একটি বড় দিঘি।

প্রায় একই রকম নির্মাণশৈলী দেখা যায় বরিশাল অঞ্চলের জমিদারবাড়িগুলোয়। প্রায় প্রতিটি জমিদারবাড়ির সঙ্গে আছে একটি করে দিঘি। বরিশালে পুকুর, নদী ও দিঘি প্রায় সব জায়গায়ই দেখা যায়। এর বাইরে হিন্দু জমিদারদের বাড়ির সদর দরজা বা ফটকের কাছেই আছে মন্দির। অন্যদিকে মুসলিম জমিদারদের বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে আছে মসজিদ।

বরিশালের দিকে দেখা যায় সমুদ্রের যত কাছে যাওয়া যায়, জমিদারবাড়ির সংখ্যা কমছে। এর অন্যতম কারণ সমুদ্রের কাছে জমিদাররা যেতে চাননি। স্থলের দিকেই তারা থাকতে চেয়েছেন। এছাড়া মাট লবণাক্ত হওয়ায় বাড়ি নির্মাণ ছিল কঠিন। টিকত না বেশিদিন। বরগুনায় জমিদারবাড়ি মাত্র একটি। ভোলার তিনটি জমিদারবাড়িই বোরহানউদ্দিনে। দক্ষিণের দিকে জমিদারবাড়ি নেই। পটুয়াখালীর জমিদারবাড়িগুলোও উত্তরে।

পিরোজপুরের চারচি জমিদারবাড়ি যথাক্রমে রায়েরকাঠি, কুলু, সাপলেজা ও গড়েরহাট জমিদারবাড়ি। এগুলো সপ্তদশ, অষ্টাদশ খ্রিস্টাব্দের দিকে নির্মিত। বরগুনার কাকচিড়া জমিদারবাড়ি সিকদার বাড়ি নামেও পরিচিত। এদিকে ঝালকাঠির ঘোষাল বাড়ি ২৫০ বছর আগে, কীর্তিপাশার জমিদারবাড়ি ঊনবিংশ শতাব্দীতে, সিদ্ধকাঠি জমিদারবাড়ি ১৯২৫ সালে নির্মিত হয়। সাতুরিয়ার জমিদারবাড়িতে জন্ম শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের। নৈকাঠির জমিদারবাড়িটি এখন ধ্বংসের দোরগোড়ায়।

বরিশালের আশপাশে অর্থাৎ খুলনা বিভাগ, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর জেলায়ও জমিদারবাড়ি রয়েছে এবং এ জমিদারবাড়িগুলোর গঠন, গড়ন ইত্যাদিতে মিল পাওয়া যায়।

আসরার আবেদিন: লেখক ও প্রাবন্ধিক