মদিনা-তুজ-জাহরা। ব্যুৎপত্তিগতভাবে শব্দদ্বয় আরবি। মদিনা অর্থ শহর আর আজ-জাহরা অর্থ জ্যোতির্ময়, উজ্জ্বল বা প্রভাময়। মদিনা-তুজ-জাহরা অর্থ জ্যোতির্ময় শহর। ৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে মদিনা-তুজ-জাহরা নগরী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমান। তিনি এটিকে উমাইয়া খিলাফতের শক্তি, সমৃদ্ধি, জ্ঞানবিজ্ঞানের তীর্থস্থান এবং সাংস্কৃতিক মহিমার প্রতীক হিসেবে তৈরি করেছিলেন। উমাইয়ারা তাদের পূর্বপুরুষ ও ইতিহাস থেকে শিখেছিলেন যে জ্ঞানবিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প ও সাহিত্য সমাজের ঐক্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। উমাইয়া খলিফাদের প্রত্যাশা ছিল যে তারা বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষত ধর্মশাস্ত্রে উচ্চমানের শিক্ষিত হবেন। ফলে খলিফাদের সন্তান ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে এ শহর প্রতিষ্ঠিত হয়। জ্ঞানচর্চার মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হতো কুরআন শিক্ষা, কুরআনচর্চা, আরবি ব্যাকরণ, কবিতা ও ইসলামিক আইন, চিকিৎসাশাস্ত্র জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর। কুরআন থেকে শরিয়ত, রুহানিয়্যাত ও বিজ্ঞান খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা ছিল। খলিফা উপলব্ধি করলেন শিক্ষা হলো মর্যাদা ও প্রতিপত্তির একটি চিহ্ন। জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি উমাইয়াদের আগ্রহের বিষয়টি পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় প্রচার হয়ে যায়। তাই তাদের শাসনকেন্দ্র পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে পণ্ডিত, কবি ও সংগীতজ্ঞদের আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। এর মাধ্যমে তাদের রাজধানীর খ্যাতি প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে যেত।

বিভিন্ন অঞ্চলের পণ্ডিত, কবি, সাহিত্যিক, জ্যোতির্বিদ, চিকিৎসক ও দার্শনিক মদিনা-তুজ-জাহরায় আসার মাধ্যমে শহরটি একটি উচ্চমানের বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। রাজদরবারে জ্ঞানচর্চার জাগরণ ঘটে এবং সামগ্রিকভাবে আল-আন্দালুসজুড়ে শিক্ষার প্রতি ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এ শহরের কবিরা মহাকাব্য রচনা করতেন, যা রাজদরবারের আনন্দের জন্য পরিবেশিত হতো। শহরের প্রাসাদের উঠোনে জ্যোতির্বিদরা মহাকাশের বস্তুগুলোর গতি অধ্যয়ন করতেন এবং জ্যোতিষীরা তাদের পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে খলিফাকে রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। চিকিৎসকরা বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে চিকিৎসা পদ্ধতি প্রণয়ন করতেন এবং প্রকৌশলীরা উন্নত জলসেচ ব্যবস্থা তৈরি করেন, যা মাঠ সেচ ও প্রাসাদের বাগানের জন্য পানির জোগান নিশ্চিত করত।

জ্ঞানবিজ্ঞানের বইয়ের একটি বড় অংশ কর্ডোবার খলিফা দ্বিতীয় হাকামের বিশাল গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত ছিল। এ বিশাল বইয়ের সংগ্রহটি দক্ষ গ্রন্থাগারিকদের তত্ত্বাবধানে ছিল, যারা গ্রিক ও লাতিন পণ্ডিতদের লেখা সংগ্রহ করে সেগুলো আরবিতে অনুবাদ করতেন। এর মাধ্যমে প্রাচীনদের জ্ঞান"ও চিন্তা মধ্যযুগীয় লেখকদের রচনাগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা হতো। এ প্রাসাদ গ্রন্থাগার ব্যক্তিগত বইয়ের সংগ্রহ এবং পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার ধারণাকে অনুপ্রাণিত করে, যা পুরো আল-আন্দালুসজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি অনেক শহরের বাজারেও বইয়ের দোকান চালু হয়। খলিফারা জনগণের জন্য কুরআনের পাঠ বিনামূল্যে শেখানোর ব্যবস্থা করেন, যাতে এ জ্ঞান আন্দালুসের সাধারণ জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

মদিনা-তুজ-জাহরার আঙিনা ছিল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। যেখানে ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞান সমান্তরালে বিকশিত হয়েছিল। আবার একসঙ্গে বিকশিত হয়েছিল বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক অনুসন্ধান। ঘড়ির আঙিনা সূর্য ঘড়িরূপে কাজ করে নামাজের সময় জানান দিত। ঘড়ির আঙিনায় পাওয়া সূর্যঘড়িগুলো জ্যোতির্বিজ্ঞানের ব্যবহারিক প্রয়োগের প্রমাণ, যা প্রতিদিনের নামাজের সঠিক সময় নির্ণয়ে ব্যবহার হতো। এ ঘড়ির আঙিনার আরেকটি দিক ছিল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ। আঙিনাটি জ্যোতির্বিদদের জন্য আকাশের নক্ষত্র ও গ্রহের গতি অধ্যয়নের স্থান হিসেবে ব্যবহার হতো। এ জ্ঞান ইসলামিক ক্যালেন্ডার উন্নত করা, কিবলার দিক নির্ধারণ এবং কৃষিকাজ ও মৌসুম পরিকল্পনার জন্য ব্যবহার হতো। রোমান শিল্পের পুনর্ব্যবহার (স্পোলিয়া) এ শিল্পের মধ্যে দেখা যায়। আঙিনায় রোমান কফিন ও মূর্তির ব্যবহার দেখা যায়। এর মাধ্যমে জানা যায় শহরের জ্ঞানপিপাসুরা প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক জ্ঞান ও শিল্পকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে পুনর্ব্যবহার করে সমসাময়িক জ্ঞান ও শিল্পের সঙ্গে খাপ খাওয়াতেন। এখানে গ্রিক ও রোমান দর্শনের গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করে ইসলামী চিন্তাধারার সঙ্গে তুলনা ও সমন্বয় করা হতো। আকাশের গতিবিধি বোঝার তাত্ত্বিক কাঠামো এ আঙিনায় বিকশিত হতো। এ জ্ঞান ব্যবহারিক প্রয়োগ ছাড়াও মহাজাগতিক ও ধর্মীয় অধ্যয়নে ব্যবহার হতো। ঘড়ির আঙিনা সম্ভবত একটি অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার স্থান হিসেবে কাজ করত, যেখানে পণ্ডিত ও শিক্ষার্থীরা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতেন। এ তাত্ত্বিক জ্ঞান জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রকৌশলের মতো ক্ষেত্রগুলোয় অগ্রগতি ঘটায়।

অ্যাস্ট্রোল্যাব ছিল এ শহরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ। এ যন্ত্র আকাশের মডেল হিসেবে এবং সময় পরিমাপে ব্যবহার হতো। এতে তিনটি প্রধান অংশ ছিল। মেটার: এটি অ্যাস্ট্রোল্যাবের মূল কাঠামো, যার চারপাশে ঘণ্টার হিসাব খোদাই করা থাকে, যা লিম্ব নামে পরিচিত। আরেকটি অংশ হলো প্লেট: এটি একটি বৃত্তাকার চাকতি, যা মেটারের ভেতরে স্থাপন করা হয়। এটি আকাশের ত্রিমাত্রিক গঠনকে দ্বিমাত্রিক আকারে উপস্থাপন করে। তৃতীয় অংশ হলো রিট: এটি প্লেটের ওপরে থাকা ধাতব ফ্রেম, যা নির্দিষ্ট তারকার অবস্থান ও সূর্যের বার্ষিক গতিপথ চিহ্নিত করে। এ পিতলের অ্যাস্ট্রোল্যাবে রিটে ৩৩টি তারার অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ছয়টি তারার অবস্থান পাখির ঠোঁটের মতো চিহ্ন দিয়ে নির্দেশ করা হয়েছে। অ্যাস্ট্রোল্যাবটি বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী হামিদ ইবনে আল-খিজর আল-খুজান্দি কর্তৃক বুয়িদ শাসক ফখর আল-দাওলার (৯৭৭-৯৯৭ খ্রিস্টাব্দ/৩৬৬-৩৮৭ হিজরি) দরবারে দক্ষিণ ইরান ও ইরাকে তৈরি করা হয়েছিল, এসব তথ্য যন্ত্রটির পেছনে খোদাই করা লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। এটি আল-আন্দালুসে প্রচলন হওয়ার পর দশম শতকে অ্যাস্ট্রোল্যাব দ্রুত পশ্চিম ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা মধ্যযুগীয় পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সময় পরিমাপক যন্ত্রে পরিণত হয়। অ্যাস্ট্রোল্যাব প্রাথমিক জ্যোতির্বিজ্ঞান শেখানোর জন্য এবং চিকিৎসা জ্যোতিষশাস্ত্রে ব্যবহার হতো, কারণ সে সময় ধারণা করা হতো যে আকাশীয় পিণ্ডগুলোর অবস্থান মানুষের শরীর ও মনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

মদিনা-তুজ-জাহরায় পবিত্র কুরআনের গবেষণা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ। শহরটি সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল, যেখানে কুরআনের পাঠ, ব্যাখ্যা ও সংরক্ষণ করা হতো। কুরআন সংরক্ষণ, ভিন্ন ভাষায় অনুবাদ, গবেষণা, তাফসিরের কেন্দ্র ছিল। এ শহরে কুরআনের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হতো এবং তা অন্যান্য শহরে বিতরণ করা হতো। খলিফারা কুরআনের সংরক্ষণ ও এসব উচ্চমানের অনুবাদের জন্য উৎসাহিত করতেন। এসব পাণ্ডুলিপি সুন্দরভাবে খোদাই ও সজ্জিত করা হতো। কুরআনের তাফসির বা ব্যাখ্যা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক কর্মকাণ্ড। এখানে পণ্ডিতরা কুরআনের আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা লিখতেন, যেখানে আয়াতগুলোর বিশ্লেষণ করা হতো, তাদের অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট, আরবি ভাষার জটিলতা ও ইসলামিক আইন (ফিকহ) অনুসারে। মদিনা-তুজ-জাহরার দরবারে প্রায়ই পণ্ডিতরা কুরআনের আয়াত নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক করতেন। তারা ইসলামী আইন, দার্শনিকতা ও ধর্মীয় বিষয়াবলি সম্পর্কিত কুরআনের ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করতেন।

যদিও কুরআন তার মূল আরবি ভাষায় ছিল। মদিনা-তুজ-জাহরার পণ্ডিতরা অন্যান্য ভাষায় কুরআন ও অন্যান্য ইসলামী গ্রন্থের অনুবাদ করেছিলেন, যা বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষকদের কাছে সহজতর ছিল এবং এর মাধ্যমে জ্ঞান বিনিময় ঘটত। খলিফারা এসব কাজে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। আল-হাকাম (দ্বিতীয়) ছিলেন একজন প্রখ্যাত পৃষ্ঠপোষক, যিনি শিক্ষা ও গবেষণাকে উৎসাহিত করেছিলেন। তিনি মদিনা-তুজ-জাহরায় একটি বৃহৎ গ্রন্থাগার স্থাপন করেছিলেন, যেখানে কুরআনের পাণ্ডুলিপি এবং ধর্মীয়, আইনগত ও বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ রাখা হতো। খলিফা পণ্ডিতদের কুরআন ও অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থের ওপর গবেষণা করার জন্য সম্পদ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা করতেন। মদিনা-তুজ-জাহরা ছিল একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যেখানে কুরআন যথাযথভাবে গবেষণা, ব্যাখ্যা এবং সংরক্ষণ করা হতো এবং উমাইয়া খলিফাদের পৃষ্ঠপোষকতায় একে এক বিশাল ধর্মীয় ও বৌদ্ধিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল।

কিতাব আল-তাসরিফ ছিল এ শহরের চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ একটি বই। চিকিৎসাবিদ্যায় বইয়ের গুরুত্ব ছিল অনন্য। আবু আল-কাসিম খলফ ইবনে আল-আব্বাস আল-জাহরাওয়ি ছিলেন মদিনা-তুল-জাহরার একজন বিশিষ্ট চিকিৎসক, যিনি কিতাব আল-তাসরিফ (চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞানবিন্যাস) নামে একটি বিশ্বকোষীয় চিকিৎসা গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থটি ৩০টি অধ্যায়ে বিভক্ত, যেখানে বিভিন্ন বিষয় যেমন অ্যানাটমি, চোখের চিকিৎসা, দন্ত্য চিকিৎসা, ফার্মাকোলজি এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এ গ্রন্থের সবচেয়ে বিখ্যাত অধ্যায়টি হলো সার্জারি বা শল্যচিকিৎসা সম্পর্কিত তার গবেষণা। এতে শুধু শল্যচিকিৎসা পদ্ধতির বিস্তারিত বর্ণনা নয়, বরং তিনি যে চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার করতেন তার চমৎকার অঙ্কিত চিত্রও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এ পাণ্ডুলিপির একটি অংশে চোখ ও নাকের সার্জারি এবং দাঁতের চিকিৎসায় ব্যবহৃত সরঞ্জামের চিত্র দেখা যায়। কিতাব আল-তাসরিফ ও অন্যান্য আরবি চিকিৎসা গ্রন্থ পরবর্তী সময়ে লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়। এ অনুবাদগুলো ইউরোপীয় খ্রিস্টীয় রাজ্যগুলোর চিকিৎসা পদ্ধতিতে গভীর প্রভাব ফেলে এবং সেখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

রুদ্র ইকবাল: লেখক ও সাংবাদিক, বণিক বার্তা