বলখ আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০-১৫০০ সালের মধ্যে শহরটির গোড়াপত্তন হয়। শহরটি শুধু আফগানিস্তান নয়, বরং গোটা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন শহর হিসেবে বিবেচিত। শহরটির বয়স চার হাজার বছর। একসময়ের এ সমৃদ্ধ জনপদ ব্যাবিলন, নিনেভে ও একবাতানার মতো প্রাচীন সভ্যতার শহরগুলোর সঙ্গে সমানতালে প্রতিযোগিতা করেছে। এজন্যই শহরটিকে ‘শহরের জননী’ বলে অভিহিত করা হয়।
প্রাচীন যুগে বলখ ছিল বাণিজ্য, ধর্ম ও সংস্কৃতির এক কেন্দ্রবিন্দু। শহরটি জরথুস্ত্র ধর্মের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত, পরবর্তীকালে এটি বৌদ্ধ ধর্মেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। নানা ধর্মবিশ্বাস, দর্শন ও জ্ঞানচর্চার সমন্বয়স্থল হিসেবে বলখ বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। প্রাচীন যুগে শহরটি বাকত্রা নামে পরিচিত ছিল, যা বাকট্রিয়া রাজ্যের রাজধানী ছিল।
শহরটির ভৌগোলিক অবস্থান ছিল এশিয়ার কেন্দ্রে, ফলে এটি প্রাচীন সিল্ক রোডসহ নানা বাণিজ্যপথের সংযোগস্থলে পরিণত হয়। এ অঞ্চল দিয়ে যাতায়াত করতেন যাযাবর, যোদ্ধা, বণিক, ধর্মপ্রচারক ও অভিযাত্রীরা, যারা নিজেদের ছাপ রেখে গেছেন এ মাটিতে। সেসব নিদর্শন ও রহস্য প্রত্নতত্ত্ববিদরা এখনো উন্মোচনের চেষ্টা করে চলেছেন।
শহরটি নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা শুরু হয় ১৯২৩ সালে। এ কাজ শুরু করেন আলফ্রেড ফুশে নামে এক ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক। যিনি আফগানিস্তানে ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক মিশনের প্রতিষ্ঠাতা। আফগানিস্তানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুকূল না থাকলেও গবেষণা আজও অব্যাহত রয়েছে। ফলে নিওলিথিক যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত মানুষের বসবাসের ধারাবাহিকতা নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে।
যেসব নিদর্শন সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে, সেগুলো মূলত আচেমেনীয়, জরথুস্ত্র, বৌদ্ধ, কুষাণ এবং ইসলামের প্রাথমিক শাসনামলের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রাচীন যুগের বিশাল স্থাপত্য কাঠামো এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মূলত নানা সভ্যতা ও শাসনামলের চিত্র তুলে ধরে।
প্রাচীন বলখ শহরটি গড়ে উঠেছিল বালা হিসার নামের এক দুর্গপ্রাচীর ঘেরা এলাকাকে ঘিরে। উপবৃত্তাকৃতি এ দুর্গচত্বরটির ব্যাস ছিল প্রায় এক কিলোমিটার, যার দক্ষিণপূর্ব অংশে অবস্থিত ছিল প্রধান দুর্গ, যা গোটা এলাকার ওপর কর্তৃত্ব করত। বালা হিসারকে কেন্দ্র করে পূর্ব ও পশ্চিম দিকে একটি নতুন প্রাচীর নির্মাণ করা হয়, যা প্রায় আট বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত ছিল। এর দক্ষিণ দিকটি ছিল বিশেষভাবে শক্তিশালী—প্রায় ২৫ মিটার উঁচু, ১০০ মিটার চওড়া ভিত্তি এবং কাঁচামাটির ইট দিয়ে নির্মিত ওপরের অংশে ১৮টি বৃত্তাকার টাওয়ার দিয়ে গঠিত এক সুদৃঢ় প্রাচীর দ্বারা রক্ষিত ছিল। এ প্রাচীর এখনো সংরক্ষিত আছে। তবে শহর সম্প্রসারণ ও কৃষিকাজের ব্যাপকতা বাড়ার ফলে প্রতিরক্ষার অন্যান্য অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ প্রাচীন নগরী ছিল একটি বিস্তীর্ণ মরূদ্যানের কেন্দ্রবিন্দুতে, যার আয়তন ছিল প্রায় ১৬ হাজার বর্গকিলোমিটার। বলখ-আব নদী থেকে পানি টেনে আনা ১৮টি খাল দিয়ে এ মরূদ্যানকে সেচ দেয়া হতো। এটি মধ্য এশিয়ার অন্যতম সুন্দর ও অক্ষতভাবে টিকে থাকা মরূদ্যান হিসেবে বিবেচিত হয়। এ নগরীর ভৌগোলিক অবস্থান, প্রতিরক্ষা ও সেচ ব্যবস্থা সব মিলিয়ে বলখ ছিল শুধু সভ্যতার কেন্দ্র নয়, বরং এক ব্যতিক্রমধর্মী নগর পরিকল্পনার দৃষ্টান্তও।
বলখ শহরের দক্ষিণে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চাশম-এ শাফা ছিল একটি দুর্গবেষ্টিত স্থান, যা মধ্য এশিয়া থেকে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশের প্রাচীন পথ অর্থাৎ ‘ভারতে প্রবেশের প্রাচীন রুট’ নিয়ন্ত্রণ করত। দুর্গটি আচেমেনীয় শাসনামলে নির্মিত হয় এবং তেরো শতকে মোঙ্গল আক্রমণের পর পরিত্যক্ত হয়। ফরাসি প্রত্নতত্ত্ব মিশন এখানে একটি জটিল প্রতিরক্ষা কাঠামো বিশ্লেষণ করে এবং খননের মাধ্যমে একটি আচেমেনীয় অগ্নিবেদি আবিষ্কার করে, যা জরথুস্ত্র ধর্মীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
বলখ শহরের নামকরণ নিয়ে ইতিহাসে দুটি উল্লেখযোগ্য মত প্রচলিত রয়েছে। প্রথম মত অনুযায়ী, শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত একটি নদীর নাম ছিল বলখ নদী। এ নদী একসময় হিন্দুকুশ পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়ে বলখ অঞ্চল অতিক্রম করে দূরে বিস্তৃত হতো। প্রাচীনকালে নদীর পাশঘেঁষে গড়ে ওঠা অনেক শহরের মতো এ শহরেরও নামকরণ হয়েছে সে নদীর নাম অনুসারে। শহরটির নাম হয় বলখ। নদীটি আজ অস্তিত্ব হারিয়ে ফেললেও নানা ঐতিহাসিক রচনায় তার উল্লেখ পাওয়া যায়। নদী ঘেঁষা এ শহর ছিল সভ্যতা, কৃষি ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা সমৃদ্ধ নগর জীবনের স্মৃতিচিহ্ন বর্তমানে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে প্রতিফলিত হয়।
অন্যদিকে দ্বিতীয় মতটি উঠে এসেছে বৌদ্ধ ধর্মের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ থেকে। সে বিবরণে বলা হয়েছে, গৌতম বুদ্ধের প্রথম দুই শিষ্য ছিলেন ত্রাপুষ ও বাহলিকা। তারা ব্যবসায়ী ছিলেন এবং বুদ্ধের বাণী গ্রহণ করে তার প্রথম শিষ্যরূপে স্বীকৃতি পান। পরে তারা তাদের নিজ নিজ অঞ্চলে ফিরে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে নিযুক্ত হন। ধারণা করা হয়, বাহলিকা নামের এ শিষ্য পরে অঞ্চলটিতে এসে ধর্ম প্রচার করেন এবং তার নামানুসারেই এ শহরের নাম রাখা হয় বলখ। কিছু সূত্রে তাকে ‘বাকত্রার বণিক’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়, যা বলখের সঙ্গে তার সম্পর্ককে আরো মজবুত করে।

খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের বলখের গ্রিকো-ব্যাকট্রিয়ান রৌপ্য মুদ্রা ছবি: কয়েন ইন্ডিয়া
বাহলির কারণে বলখ শহর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত ও মর্যাদাপূর্ণ। ত্রাপুষ ও বাহলিকা বলখে ফিরে গিয়ে বুদ্ধের নির্দেশ অনুযায়ী দুটি প্রার্থনার স্থান নির্মাণ করেন। ফলে বাহলিকা ও বলখ শহর উভয়ই বৌদ্ধ ধর্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাংয়ের বিভিন্ন বর্ণনায় শহরটিতে বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন তথ্য উল্লেখ করা হয়।
বলখের নিকটবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ বিহার ছিল ‘নববিহার’, যেখানে গৌতম বুদ্ধের একটি বিশালকায় মূর্তি স্থাপিত ছিল। এটি শুধু ধর্মীয় নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছিল। দূর-দূরান্তের শাসকরা এ বিহারে আসতেন শ্রদ্ধা নিবেদন করতে।
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে পারস্য সাম্রাজ্যের পতনের পর আলেকজান্ডার পূর্বমুখী হয়ে বাকট্রিয়া অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হন। বলখ তখন ব্যাকট্রা নামে পরিচিত ছিল। অঞ্চলটির রাজধানী এবং রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক নগরী ছিল। হিন্দুকুশ পর্বতমালা পেরিয়ে আলেকজান্ডার তার সেনাবাহিনী নিয়ে বলখ অঞ্চলে প্রবেশ করেন এবং স্থানীয় শাসক ও অভিজাতদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। যুদ্ধ শেষে বাকত্রা দখল করেন এবং রাজা ওক্সিয়ার্তেসের কন্যা রক্সানাকে বিয়ে করেন। এ বিয়ের মাধ্যমে তিনি স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন করেন এবং গ্রিক ও বাকত্রিয়ান সংস্কৃতির মধ্যে একটি সেতুবন্ধ গড়ে তোলেন।
আলেকজান্ডার আগমনের পর বলখ শহর গ্রিক ও ইরানি সংস্কৃতির এক মিলনস্থলে পরিণত হয়। পরবর্তী শতাব্দীগুলোয় এ অঞ্চলে হেলেনিস্টিক প্রভাব বিস্তার লাভ করে—স্থাপত্য, মুদ্রা, ভাষা ও দর্শনে গ্রিক চেতনার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার নেতৃত্বে শুধু এক সামরিক বিজয় অর্জিত হয়নি, বরং ইতিহাসের গতিপথও পরিবর্তন হয়েছিল। সার্বিকভাবে বলখে আলেকজান্ডারের অভিযান এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ, যেখানে যুদ্ধ, প্রেম ও রাজনীতি একসূত্রে গাঁথা হয়েছিল। এ ঘটনার মাধ্যমেই বলখ শুধু একটি অঞ্চলিক নগরী নয়, বরং এক বৈশ্বিক সভ্যতার ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রে রূপ নেয়।
এ প্রাচীন শহরটি ইহুদিদেরও বাসস্থান ছিল। সিনাখেরিব ছিলেন (৭০৫-৬৮১ খ্রিস্টপূর্ব) নব্য-আসিরীয় সাম্রাজ্যের শাসক। প্রচলিত রয়েছে তিনি প্রাচীন ইহুদি সাম্রাজ্য থেকে কিছু ইহুদিকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে তাদের বলখ শহরে স্থানান্তর করেন। ঘটনাটি ‘আসিরীয় বন্দিত্ব’ নামে পরিচিত। মিসরীয় ইতিহাসবিদ আল-মাকরিজি তার রচনায় উল্লেখ করেন, সিনাখেরিবের লেভান্ত অঞ্চলে অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে ইহুদিদের বলখে আগমন ও বসতি স্থাপন ঘটে। আরব বিশ্বের কয়েকজন ভূগোলবিদের লেখায় দেখা যায়, বলখে ‘বাব আল-ইয়াহুদ’ অর্থাৎ ‘ইহুদিদের দরজা’ নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ এবং ‘আল-ইয়াহুদিয়্যা’ নামে একটি ইহুদি বসতি ছিল বলে তাদের ধারণা। ইসলামী যুগে বলখে ইহুদি উপস্থিতির আরো একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায় এগারো শতকে গজনভি শাসনামলে।
বলখ শহরকে জরথুস্ত্র ধর্মের একটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইতিহাসবিদদের অনেকেই মনে করেন, এ শহরেই পারস্যের মহান ধর্মগুরু জরথুস্ত্র জন্মগ্রহণ করেন এবং এখান থেকেই তার ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রচার শুরু হয়। জরথুস্ত্র ধর্মগ্রন্থ অবেস্তার অনেক অংশেই যে ভৌগোলিক পটভূমি পাওয়া যায়, তা উত্তর আফগানিস্তানের সঙ্গে মিলে যায়। গ্রিক, পারস্য ও ইসলামী ঐতিহাসিকরাও বলখকে জরথুস্ত্রবাদের অন্যতম সূতিকাগার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আচেমেনীয় যুগে এ শহরে ছিল অগ্নিবেদি বা আগুনের মন্দির, যেখানে পবিত্র অগ্নি প্রজ্বলিত থাকত। এটি ছিল জরথুস্ত্র উপাসনার মূল প্রতীক। বলখ ও এর আশপাশে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে যেসব নিদর্শন পাওয়া গেছে যেমন অগ্নিবেদি, কাঁচা ইটের উপাসনাগৃহ এবং ধর্মীয় চিত্রাবলি তা এ ধর্মের দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়।
বিশেষত চাশম-এ শাফা দুর্গ এলাকায় ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক মিশনের খননে আবিষ্কৃত একটি প্রাচীন আচেমেনীয় অগ্নিবেদি বলখের ধর্মীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
শহরটি দীর্ঘকালে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের শাসনাধীন হয়েছে। পারসিয়ান, গ্রিক-বাকট্রিয়ান, সাসানিয়ান, আরব, সেলজুক ও মোঙ্গল সাম্রাজ্যের আওতায় এসেছে বিভিন্ন সময়। তবে মোঙ্গল বিজয়ের পরে বলখের গুরুত্ব অনেক কমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তেরো শতকে শহরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। শহরটির গোড়াপত্তন ও বিকাশ ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা এশিয়ার প্রাচীন সভ্যতার ধ্রুপদি প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
রুদ্র ইকবাল: সাংবাদিক, বণিক বার্তা









