ইসলাম ধর্ম আন্তর্জাতিকভাবে সর্বাধিক বিস্তার লাভ করে দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে (৬৩৪-৪৪ খ্রি.)। এ কারণে ইতিহাসে খলিফা ওমরকে অর্ধ পৃথিবীর শাসক বলা হয়। এ সময় মুসলমানরা বিভিন্ন দেশ, প্রদেশ, অঞ্চল, শহর বিজয় লাভ এবং সেখানে শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্যে রয়েছে পারস্য (ইরান), ইরাক, জাজিরাহ, খুরাসান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিসর, আর্মেনিয়া; বর্তমান আফগানিস্তানের কিছু অংশও ওমরের খেলাফতকালে শাসনভুক্ত করা হয়।

বিভিন্ন দেশ ও শহরে যেখানে ইসলামের আগমন-পরবর্তী প্রচার-প্রসার ঘটেছে; সেখানকার সভ্যতা, সংস্কৃতি, আচার-আচরণেরও ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। কোথাও কোথাও ভৌগোলিক অবস্থানের ওপরও প্রভাব পড়েছে। ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে মধ্য এশিয়ায় মুসলিম সেনাবাহিনীর আগমন এবং পরবর্তী সময় প্রধান নগর কেন্দ্র এবং এর আশপাশে আরবদের বসতি স্থাপনের ফলে এ অঞ্চলের নগর ও ভূপ্রকৃতির ওপর গভীর এবং স্থায়ী প্রভাব পড়ে। আফগানিস্তানের ঐতিহ্যবাহী শহর বলখের বেলায়ও তাই হয়েছে।

মুসলমানরা সর্বপ্রথম অক্সাস নদী অতিক্রম করে বিজয় অর্জন করে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলের (৬৪২-৪৩ খ্রিস্টাব্দে) শেষ দিকে। উল্লেখ্য, অক্সাস মধ্য এশিয়ার একটি প্রাচীন নদী, যা ‘আমু-দরিয়া’ নামেও পরিচিত। নদীটি তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত।

আরেজু আজাদ ও ইদমান্দ হারজিগ সম্পাদিত ‘ফাদা-ইল-আই বলখ’ গ্রন্থে উল্লেখ, অক্সাস বা বলখ বিজয়ের নেতৃত্ব দেন আল-আহনাফ বিনতে কায়েস। প্রখ্যাত সুন্নি মুসলিম পণ্ডিত ও ঐতিহাসিক আল তাবারি বর্ণনা করেন, আল-আহনাফ পরে তার ভাতিজাকে শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। (৬৫২-৫৩ খ্রি.) ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত ওসমান (রা.)-এর চতুর্থ পুত্র সাঈদকে বলখ শহর শাসনের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়। এ সময় মধ্য এশিয়া একাধিকবার বিজয়ের ঘটনা ঘটে।

এ তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন আব্বাসীয় শাসনামলে ভূগোলবিদ ও ঐতিহাসিক আল ইয়াকুবি (মৃত্যু ৮৯৭ খ্রি.)। তিনি বর্ণনা করেন, হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনামলে আবদুর রহমান বিন সামুরা বলখ শহর দখল করেন। নবম শতাব্দীর পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাসবিদ আল-বালাদুরি এ ঘটনার কৃতিত্ব দেন খোরাসানের বিজেতা ও শাসক কায়েস বিনতে আল-হাতেম আ-সুলেমানিকে; যিনি বলখের প্রখ্যাত বৌদ্ধধর্মীয় স্থাপনা ‘নব বিহার’ ধ্বংস করেন।

erg

বলখে তৈরি উমাইয়া দিরহাম। ছবি: জিরো ফাইভ জেরোম (বামে)

বলখে তৈরি হওয়া আব্বাসীয় দিরহাম। ছবি: ইন্টারফেস (ডানে)

আল ইয়াকুবি বর্ণনা করেন, ইসলাম বিজয়ের সময় বলখ ছিল খোরাসানের সবচেয়ে বড় শহর। খোরাসানের রাজা (মালিক) তারখান সেখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন। অবশ্য আরব বিজেতারা বলেন যে তারা কুফা শহর থেকে এসেছেন এবং বলখ হলো কুফার বিজয়েরই পরবর্তী ধাপ।

যা-ই হোক, ৬৭১ খ্রিস্টাব্দে আল-রাবি বিন জিয়াদ আল-হিরতি শান্তিপূর্ণভাবে বলখ দখল করেন। এটিকে বলখে ইসলামের মূল বিজয় বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এ সময় বলখের বাসিন্দারা মুসলিম শাসন প্রত্যাখ্যান করে বসেছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে একটি চুক্তি করা হয়।

তখনো অবশ্য বলখে মুসলিম শাসন পূর্ণাঙ্গ হয়েছিল, এমনটি শক্তভাবে বলা যায় না। কারণ (৭০৮-০৯ খ্রি.) এবং পুনরায় (৭০৯-১০ খ্রি.) শহরে একজন ইস্পাহাবাদের (প্রাক-ইসলাম যুগের সেনাপ্রধান) উপস্থিতি ছিল; যা ইঙ্গিত দেয় যে শহরে তখনো ইরানি অমুসলিম সামরিক কর্মকর্তার অবস্থান ছিল এবং তারা ছিলেন যথেষ্ট ক্ষমতার অধিকারী। ৭০৫ খ্রিস্টাব্দে কুতায়বা বিন মুসলিম (মৃত্যু ৭১৫ খ্রি.) বলখের ইস্পাহাবাদ এবং কিছু স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করেন এবং (৭০৮-০৯ খ্রি.) বলখের ইস্পাহাবাদ স্থানীয় শাসকদের একজন ছিলেন বলে জানা যায়। তারা কুতায়বা বিন মুসলিমের অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে তুখারিস্তানের স্থানীয় অভিজাতদের একত্রিত করার চেষ্টা করেন। বারমাক (‘নব বিহার’ এর রক্ষক) এ বিদ্রোহেরও একজন নেতা ছিলেন বলে মনে হয়। এ বিদ্রোহ প্রতিরোধে কুতায়বা বলখের কাছে আল-বারুকানে শীতকালীন ২০ হাজার সৈন্যের একটি বহর প্রেরণ করেছিলেন।

আল-তাবারির মতে, পরের বছর খোরাসানের নতুন গভর্নর, আসাদ বিন আব্দুল্লাহ আল-কাসরি (৭২৪-২৭ ও ৭৩৫-৩৮ খ্রি.) আরব বসতি স্থাপনকারীদের বারুকান থেকে বলখের মদিনা (শহর) এ স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেন এবং বলখ শহরটির পুনর্নির্মাণ শুরু করেন। এখানে মদিনা বলতে বালা হিসারকে বোঝানো হয়েছে। বালা হিসার কাবুলের কাছে একটি দুর্গ। আসাদ (৭২৬-২৭ খ্রি.) তার সামরিক অভিযানের ঘাঁটি হিসেবে এটি ব্যবহার করেছিলেন এবং বলা হয় তিনি বলখের মিম্বার থেকে প্রচার করেছিলেন, যা প্রমাণ করে সে সময় শহরে ‘মসজিদ আল-জামি’ নামে একটি মসজিদ ছিল। ফাযায়েল বলখে (৭৩৬-৩৭ খ্রি.) আরব বসতি স্থাপনকারীদের শহরে স্থানান্তরের কথা উল্লেখ করা হয় এবং আসাদকে একই বছরে একটি মসজিদ (জামাতে নামাজ আদায় করা মতো) নির্মাণের কৃতিত্ব দেয়া হয়। এ মসজিদের সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করা কঠিন। তবে মসজিদটি বালা হিসারের মধ্যবর্তী স্থানের হয়ে থাকতে পারে।

৭৩৬ খ্রিস্টাব্দে গভর্নর আসাদ সমগ্র খোরাসানের প্রশাসনিক রাজধানী মেরাভ থেকে বলখে স্থানান্তর করেন। সেখানে বিভিন্ন স্থাপত্য নির্মাণ করেন। উমাইয়া শাসনামলে এখানে ‘কালাআ’ নামে একটি দুর্গ এবং দাস ক্রয়-বিক্রয়ের বাজার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ‘ফাদা-ইল-আই-বলখে’ অবশ্য দুর্গটির নাম ‘কাসার’ বলা হয়েছে।

আরো জানা যায়, ৭৩৬ খ্রি. বালখের জনগণের মধ্যে থেকে দুই হাজার সৈন্য সংগ্রহ করা হয়। এ সেনারা যদি মুসলমান হয়ে থাকে তাহলে এ সময়ের মধ্যে শহরে কমপক্ষে ১০ হাজার মুসলিম জনসংখ্যা ছিল।

বলখ পরে সুফিবাদ চর্চার জন্য বিখ্যাত স্থান হিসেবে পরিচিতি অর্জন করে। এখানে বিখ্যাত সুফি সাধক ও পণ্ডিতরা বসবাস করেন। এদের মধ্যে নবম শতাব্দীর আবু বকর আল বলখি অন্যতম। তিনি সুফি মরমিবাদ ও সুফি ঐতিহ্যে অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন। এর পরবর্তী সময়েও বলখ ইসলামী সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। বলখের ইসলামী ঐতিহ্য (বিশেষত সুফিবাদ ও সুন্নি ইসলাম) দীর্ঘ সময় ধরে পারসিয়ান, তুর্কি ও আরবদের মাঝে প্রভাব রাখে।

বলখে ইসলামের আগমনের ইতিহাস জানার অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মধ্য এশিয়ার অন্যান্য প্রধান শহর যেমন মারভ, সমরখন্দ ও বুখারার তুলনায় বলখ সম্পর্কে অনেক কম জানা যায়। এর প্রধান কারণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর ওপর অনুসন্ধানী গবেষণার অভাব।

সহায়ক তথ্যসূত্র:

১. Arezou Azad and Hugh Kennedy- এর The Coming of Islam to Balkh শীর্ষক নিবন্ধ।

২. ড. গোলাম কিবরিয়া ভূঁইয়া, আফগানিস্তান: অতীত ও বর্তমান, ঢাকা, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, ২০১২।

৩. https://www.themuslimculture.com/history-of-islam-in-balkh-afghanistan/

বাশার খান: লেখক