আলবোর্জ গিরিশ্রেণীর পাদমূল হতে আরব সাগরের তটদেশ পর্যন্ত প্রসারিত বিশাল পারস্যভূমি কতকাল পূর্বে সভ্যতার আলোকে উদ্ভাসিত হয়েছিল, ইতিহাস সহস্ৰ চেষ্টা করেও তা নির্ণয় করতে পারেনি। আর্য অধ্যুষিত এই ইরান ভূমিতে যখন বেদ ও পায়ত্রীর সুমধুর শ্লোকমালা গাওয়া হতো, আর্যবধূরা যখন কাঁসর-ঘণ্টা নিনাদিত করে ঘরে ঘরে সন্ধ্যা আরতি প্রদান করত, সেদিনের ইতিহাস যজুর্বেদও ভালোরূপে বলতে পারে না। এই শস্য-শ্যামলা সুবিস্তৃত বঙ্গভূমি যখন বঙ্গোপসাগরের অতল গর্ভে নিদ্রিত ছিল, জনবিরল আর্যাবর্তের ক্ষীণ কোলাহল যখন হিমাদ্রির কাননে কাননে গন্ধর্ব ও কিন্নর— কন্যাগণের ক্রীড়ার কোনো ব্যাঘাত জন্মাত পারত না, তারও বহু পূর্বে পারসিকরা গৃহে গৃহে তাদের উপাস্য ব্রহ্মার যে অনল মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল, আজও নাকি অনেক পুরনো পারসিক বংশে তার নিরবচ্ছিন্ন শিখা নির্বাণ লাভ করেনি ।
যে সময়ে এই বিশাল দেশ ব্যাবিলনের গ্রিক সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গ্রিসিয় সভ্যতা জ্ঞানালোকে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল তখনও এর জাতীয় দেবতার অনল সিংহাসন অক্ষুণ্ণ অবস্থায় জ্বলে জ্বলে পারসিকদের প্রাণের ভিতর কত না আশা ও উন্মাদনার লহরী প্রবাহিত করত। তারপর খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে আরব দেশে যে নবধর্মের অভ্যুত্থান হয় তারই প্রভাবে সপ্তম শতাব্দীতে পারস্যের জাতীয় জীবন সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়ে যায়। অর্ধ শতাব্দীর ভিতর আরবের পূর্ব সীমা হতে কাবুলের প্রান্ত পর্যন্ত সমগ্র ভূ-ভাগ অর্ধচন্দ্রাঙ্কিত পতাকার পত্ পত্ রবে মুখরিত হয়ে উঠে। সেই সময় যারা জাতীয় ধর্ম বিসর্জন দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন তাঁরা জন্মভূমি পরিত্যাগ করে হিন্দুকুশে গিয়ে নব জনপদ প্রতিষ্ঠিত করেন।
৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে, হযরত ওমরের শাসনকালে, ক্যাডিশিয়ার সমরক্ষেত্রে যেদিন পারস্যের স্বাধীনতা-সূর্য অস্তমিত হয়, সেই দিন সেই শোণিত-ক্ষেত্রে পারসিকদের প্রাচীন সাহিত্যেরও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদিত হয়। এই সময়ের পূর্ববর্তী কোনও উল্লেখযোগ্য সাহিত্য প্রাচীন পারস্যে বর্তমান ছিল কিনা, শাশানীয়া বংশের রাজত্বকালে তাঁদেরই নির্দেশে রচিত দুই চারটা কবিতা ছাড়া তার অন্য কোন নিদর্শন আজ আর বিদ্যমান নেই। পারস্যের অভ্যন্তরীণ যে ঘোর অন্তর্বিপ্লব মুসলমানদের এই বিজয় লাভের পথ সুগম করে দিয়েছিল, তাই পারসিকদের প্রাচীন সাহিত্য ধ্বংসেরও কারণ হয়েছিল। পারস্যে আরবিয় শক্তি সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও প্রায় তিন শত বৎসর এই নব শাসক সম্প্রদায় পারস্যের সাহিত্য সমৃদ্ধির দিকে মনোনিবেশ করতে পারেননি। কেননা, এই সময়ে পারস্যের প্রতিনিধি শাসনকর্তারা পারস্যের জনসাধারণের সুখদুঃখকে নিজের বলে বলে গ্রহণ করতে পারেননি। জাতীয় জীবনের অস্থি-মজ্জাকে অসাড় করে তুলবার পক্ষে পরাধীনতার যে প্রভাব, বাগদাদের ন্যায়দর্শী খলিফাদের অধীন থেকেও পারস্য তা থেকে নিষ্কৃতি লাভ করেনি।
খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে বাগদাদের বিশাল সাম্রাজ্য যখন বহুসংখ্যক খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত হইয়া পড়ল, সেই সময় পারস্যে নবীন স্বাধীনতার আলোকে প্রকৃতভাবে নবযুগের সূত্রপাত হয়। এই সময় হতে পারস্যের মুসলমান নরপতিরা তত্রত্য সাহিত্যের উন্নতি বিধানে বিশেষ যত্নবান হন। তাঁদের প্রত্যেকেই বহুসংখ্যক কবিকে আশ্রয় ও বৃত্তি দান করে স্ব-স্ব সভার গৌরব বর্ধন করতেন। পারস্য কবিরা এককালে বিজয়ী আরবদের সন্তোষ্ট করতে প্রভূত পরিমাণে আরবীয় সাহিত্যের চর্চা করতেন এবং স্ব-স্ব রচনায় ভূরি ভূরি আরবীয় শব্দ ও আরবি ভাব প্রবিষ্ট করে সেটা শাসক সম্প্রদায়ের সহজবোধ্য করে তুলতেন। খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে পারস্যের স্বাতন্ত্র্য লাভের সঙ্গে সঙ্গে যে নবসাহিত্যের অভ্যুত্থান হয় একাদশ শতাব্দীতে তিনজন প্রবল-প্রতাপ নরপতির বিদ্যোৎসাহে তা পল্লবিত ও মঞ্জুরিত হয়। পারস্যে মানিক শাহ গজনীতে সুলতান মাহমুদ ও তাঁর উত্তরাধিকারী কাদির-বিন-ইব্রাহিম এবং তুর্কীস্থানে কাদির খান, তারা প্রত্যেকেই স্ব-স্ব রাজধানীকে সাহিত্য, ইতিহাস ও বিজ্ঞানের (চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত ও রসায়ন শাস্ত্রাদির) পাদপীঠে পরিণত করেন । নিজাম-উল-মুকের ন্যায় লেখক ও ওমর খইয়ামের ন্যায় কবি মালিক শা›র রাজধানী খোরাসানকে তীর্থস্থানে পরিণত করেছিলেন। সুলতান মাহমুদের সভাকবি ফেরদৌসীর নামও জগতের ইতিহাসে অপরিচিত নয়। তুর্কিস্তানের মুহম্মদ কাদির খান এমনই সৌখিন ছিলেন যে, তিনি স্বয়ং যেমন বিবিধ মণিমুক্তাদি দ্বারা সর্বাঙ্গ ভূষিত না করে কদাপি সভা-গৃহে পদার্পণ করতেন না, তেমনি তাঁর সভা-কবিরাও তাঁর সমীপে দৈনন্দিন কবিতা পাঠ করেও কোনও দিন রিক্তহস্তে প্রত্যাবর্তন করতেন বলে শোনা যায়নি। সাহিত্যের এমন সংবর্ধনা জগতের ইতিহাসে দুর্লভ। প্রাচীন মুসলমান নরপতিদের ভিতর কার সভায় কতজন কবি বা পণ্ডিত আছেন এটা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলত। এই সকল রাজা নিজ নিজ সভাকবিদের কোন অবস্থাতেই ছাড়তে চাইতেন না । এমন কি সহজে বাধ্য না হলে তাঁদেরকে বলপূর্বক রাজধানীতে আবদ্ধ রাখতেও কুণ্ঠিত হতেন না। কথিত আছে, পারস্য সম্রাট মনুচেহেরের সভাকবি থাকানী যখন সম্রাটের সনির্বন্ধ অনুরোধ সত্ত্বেও ফফিরি গ্রহণ মানসে রাজসভা ত্যাগ করতে উদ্যত হন, মনুচেহের তখন তাঁকে কারারুদ্ধ করে তাঁর গমনে বাধা প্রদান করেছিলেন। পরে যখন খাকানী কিছুতেই তাঁর সংকল্প ত্যাগ করলেন না, তখন মনুচেহের অগত্যা তাঁকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন। কখনো কখনো ক্ষুব্ধ পলায়ন করা কবিকে ফিরিয়ে আনবার জন্য অনুতপ্ত রাজা অযাচিত ক্ষমা ও খেলাত সহকারে তাঁর পশ্চাতে দূত প্রেরণ করেছেন, এমনও দেখা গেছে। ফিরদৌসীর সুলতান মামুদের শেষ বারের ব্যবহার এর দৃষ্টান্তস্থল। অন্য একবার সুলতান মাহমুদ সুপ্রসিদ্ধ আরবীয় দার্শনিক আবু সিনার (৯৮০-১০৩৬ খ্রি.) সুখ্যাতি শ্রবণে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে স্বীয় জামাতার রাজধানী খারেজামে আসতে নিমন্ত্রণ করেন। আবু সিনা তা প্রত্যাখান করে জর্জন প্রদেশে প্রস্থান করলে সুলতান এতই বিচলিত হয়েছিলেন যে, তিনি আবু সিনার তসবীর সংগ্রহ করে তারই সাহায্যে তাঁকে খুঁজে বের করার জন্য চতুর্দিকে অসংখ্য অনুচর প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সুলতান মাহমুদের এত আগ্রহ সত্ত্বেও তদীয় বাসনা ফলবতী হয়নি। আবু সিনা কিছুতেই গজনী যেতে রাজী হননি। অনুরোধ উপরোধ ভ্রূকুটি সমস্তই নিষ্ফল হল। পাখি পিঞ্জরে ঢুকল না ।
পারস্য সাহিত্যের সৌন্দর্য ও লালিত্য এতই চিত্তাকর্ষক যে দুর্বৃত্ত তাতারাও তাতে মুগ্ধ না হয়ে থাকতে পারেনি। হিন্দুস্থান-বিজেতা সম্রাট বাবর নিজের মাতৃভাষা পশ্চাতে ফেলে ফারসিকে ভারতের রাজভাষার গৌরবময় আসন প্রদান করেছিলেন।তদীয় পূর্ব-পুরুষ মহাতেজা তৈমুরের প্রলয়ংকর হস্তেও একদিন কবি হাফিযের জন্য আশীর্বাদের খেলাত ও অগণিত মণি-মুক্তা উঠেছিল। ইতিহাস প্রসিদ্ধ তুর্কীবীর দ্বিতীয় মুহম্মদ যখন কনস্টান্টিনোপল জয় করেন, তখন তাঁর সেই বিজয়োন্মত্ততার ভিতরও তিনি মহাকবি জামীর কবিতার আদর করতে বিস্মৃত হননি ।
গোলাবের দেশ পারস্য যে বিধাতার সৃষ্টিকৌশলে কবিতাচর্চার পক্ষে সর্বতোভাবে উপযোগী এ কথা বলাই বাহুল্য। পারস্যের শিরাজ নগরী যত কবির সূতিকাগৃহ অঙ্কে ধারণ করেছে, একমাত্র এথেন্স ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনও নগরী তেমন করে নাই। এ নিমিত্ত পাশ্চাত্য লেখকরা শিরাজকে Athen of Asiss of Asia বলে আখ্যায়িত করেছেন, আর শিরাজের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হাফিযকে তাঁরা Anacreon of Persia বলে থাকেন। হাফিযের রচনাই পারস্যের আদর্শ সাহিত্য বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। তাঁর পূর্বে অর্থাৎ খ্রিস্টীয় দশম হতে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত পারস্য সাহিত্যের রচনায় যে ক্রমোন্নতিশীল পরিবর্তন দেখা যায়, হাফিযের পর হতে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত উক্ত রচনায় তদ্রূপ পরিবর্তন আর দৃষ্ট হয় না। প্রথমত পারস্য-কবিরা যে রাজপক্ষীয়দের মনোরঞ্জনার্থ আররি ভাষার সবিশেষ চর্চা করতে এবং তাঁদের রচনায় প্রভৃত পরিমাণে আরবি শব্দ ও আরবিয় ভাব প্রবিষ্ট করতেন, তারই প্রতিক্রিয়া স্বরূপ খ্রিস্টীয় দশম ও একাদশ শতাব্দীতে কোন কোন শক্তিশালী লেখক চেষ্টা সহকারে আররি শব্দ বর্জন করত বিশুদ্ধ ফারসিতে আপন প্রতিভার পরিচয় দিয়াছেন। মহাকবি ফিরদৌসী এই শ্রেণির লেখকদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর সমগ্র শাহনামা বিশুদ্ধ ফারসিতে বিরচিত। প্রসিদ্ধ কবি থাকানীও তাঁরই আদর্শে অবিমিশ্র ফারসিতে কাব্য রচনা করে অসামান্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।
দ্বাদশ শতাব্দীর প্রসিদ্ধ কবি নিযামী এবং ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীর শেখ সাদী এবং মৌলানা রুমী, তাঁরা প্রত্যেকেই আরবি ও ফারসি সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্য একরূপ উঠিয়ে দিয়েছিলেন বললেই হয়। এই সময়ের মধ্যেই কুরআন, হাদিস এবং বিবিধ ঐতিহাসিক, দার্শনিক ও শাস্ত্রীর গ্রন্থ আরবি হইতে পারস্য ভাষায় অনূদিত হয়। পারস্যের জাতীয় সাহিত্যের এই ক্রমবিকাশ চতুর্দশ শতাব্দীতে হাফিযের সময় পূর্ণতা লাভ করে। তাই হাফিযের পর অনেকদিন পারস্য সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন দেখা যায়নি। মহাকবি জামীর ইউসুফ-জোলায়খা পঞ্চদশ শতাব্দীর রচনা। এর শব্দ-বিন্যাস ও রচনাভঙ্গী হাফিযেরই অনুরূপ। সপ্তদশ শতাব্দী হতে পারস্য সাহিত্যে আর একটা নূতন উপাদান প্রবেশ করতে আরম্ভ করে। তাদের দিগ্বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভাষার শব্দ-সম্পদ ও ভাবরাশি বহুল পরিমাণে পারস্য সাহিত্যে প্রবেশ লাভ করতে থাকে। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে রচিত নাদির শাহের জীবনীতে এই প্রকার তুর্কী-শব্দবহুল অভিনব ফারসী দৃষ্ট হয় ।
ত্রয়োদশ শতক হইতে পার্সী ভাষা ভারতের রাজকীয় দপ্তরে স্থায়ীভাবে স্থান লাভ করায় পারস্য সাহিত্যের পরিসর অত্যধিক পরিমাণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছিল। লাহোরে এর সূত্রপাত হয় একাদশ শতাব্দীতে। ১০২১ খ্রিস্টাব্দে গজনী রাজবংশের শাসন কর্তৃত্ব লাহোরে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবার পর হতেই ফারসি হয় তথাকার রাষ্ট্রভাষা। সম্রাট কুতুব উদ্দীন দিল্লীর মসনদে আরোহণ করার পর হতে সাতশত বৎসরব্যাপী ফারসিই ছিল মুসলিম শাসিত সমগ্র ভারতের রাষ্ট্রভাষা। বিভিন্ন কেন্দ্রে এরই মারফৎ চলেছে- এই দেশের সাহিত্য-সাধনা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার চেষ্টা। মুসলমান আমলে এই দেশের সর্বত্র ফারসি ভাষায় সাহিত্য রচনা বিপুলভাবে প্রসার লাভ করেছিল। নবাগত তুর্কী ও পারস্য দেশীয় পণ্ডিত ছাড়াও এ দেশেরই হাজার হাজার কবি ও গদ্য লেখক এই ভাষায় গ্রন্থ রচনা করে গেছেন।
[লেখাটি মোহম্মদ বরকতুল্লাহ্’র বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পারস্য প্রতিভা’র ভূমিকা থেকে গৃহীত এবং কিছুটা সংক্ষেপিত। এখানে ভাষারীতি সাধু থেকে চলিত করা হয়েছে এবং কিছু বানান আধুনিক বানানে পরির্বতন করা হয়েছে। ১৯২৪ সালে গ্রন্থটির প্রথম খণ্ড এবং ১৯৬৫ সালে দুইখণ্ড একত্রিত করে একখণ্ডে প্রকাশিত হয়। এখানে ২০১৩ সালে হাওলাদার প্রকাশনীর সংস্করণটি ব্যবহার করা হয়েছে।]










