বাংলায় ‘ইসরায়েল লেভিন সলোমনস’ কোম্পানির হীরা, মুক্তা ও অন্যান্য ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে লিওন প্রেগারের দায়িত্ব পালনকালে। ১৭৮৬ সালে কোম্পানি প্রতিনিধি হিসেবে প্রেগার কলকাতায় এসেছিলেন। ব্যবসায় পূর্ব অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার কারণে প্রেগার কোম্পানিকে ব্যাপক সফলতা এনে দেন। পাশাপাশি কিছুদিন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘ইন্সপেক্টর অ্যান্ড পারচেজার অব ড্রাগস’ পদে দায়িত্বপালন করেন। অবশ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফোর্ট উইলিয়াম বোর্ডের সঙ্গে দ্বিমতের কারণে সে পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন লিওন প্রেগার।

১৭৯৩ সালে প্রচণ্ড গরমের প্রভাবে রোগে আক্রান্ত হয়ে লিওন প্রেগারের মৃত্যু হয়। এরপর ছোট ভাই জর্জ প্রেগার কলকাতায় ব্যবসার হাল ধরেন।

১৭৯৮ সালের কথা। তখন বাংলায় একজন সফল ও প্রতিষ্ঠিত মুক্তা ব্যবসায়ী হিসেবে লিওন প্রেগারের ছোট ভাই জর্জ প্রেগার প্রতিষ্ঠিত। ঠিক তখনই ১৭৯৮ সালে হঠাৎ তার অকালমৃত্যু হয়। এর মাধ্যমে বাংলায় ইহুদি বণিকদের বাণিজ্য পর্বের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে। অবশ্য জর্জের মৃত্যুর সঠিক তারিখ, কী পরিস্থিতিতে মারা যান এবং কোথায় তাকে সমাহিত করা হয়েছে তা আজও অজ্ঞাত।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূ্র্ণ যে জর্জ প্রেগারের মৃত্যুর ঘটনা এককভাবে সলোমনস ও প্রেগার বাণিজ্যের পতনের কারণ ছিল না। ওই বছরই অর্থাৎ ১৭৯৮ সালের ১৮ এপ্রিল লন্ডনে মারা যান প্রেগারের বোন মিসেস হেস্তার সলোমনস। তিনি বিধবা এবং এ বিশাল আন্তর্জাতিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ছিলেন।

অত্যন্ত দক্ষ এ নারীর কাঁধে ছিল বড় দায়িত্ব। একদিকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, অন্যদিকে একের পর এক পারিবারিক স্বজনের বিদায়ের শোক সবই সামলাতে হয়েছে তাকে। তার স্বামী ইসরায়েল সলোমনসের মৃত্যু হয় ১৭৮৮ সালে। আবার ১৭৯৩ সালে তার পুত্র সাইমন মারা যান; একই বছর প্রখ্যাত ব্যবসায়ী ভাই লিওন প্রেগারেরও মৃত্যু হয়েছিল। সবশেষে ১৭৯৮ সালে আরেক ভাই জর্জ প্রেগারের মৃত্যু হয়। সুতরাং এক এক করে স্বজনদের মৃত্যুর শোক বহন করা এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিশাল ব্যবসা পরিচালনা করা হেস্তারের জন্য সহজ ছিল না। ব্যবসা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

পাশাপাশি কোম্পানির পতনে পেছনে আরো কিছু বিষয় দায়ী ছিল। যেমন তার কিছু ছেলের অবাধ্য আচরণ, ভাই মেয়ারের দুর্নীতি, বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও প্রতিহিংসা প্রভৃতি। শোকের পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের এ নেতিবাচক দিকগুলোর চাপ সামাল দেয়া হেস্তার সলোমনসের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।

হেস্তারের মৃত্যুর আগেই ১৭৯৫ সালের ২৯ এপ্রিল তিনি একটি ইচ্ছাপত্র (Last Will) তৈরি করে গিয়েছিলেন। ইংরেজিতে লেখা এ বিস্তৃত উইল দীর্ঘ ১৩ পাতার। আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী ১৭৯৮ সালের ১০ আগস্ট লন্ডনের সারোগেট কোর্টে এটি একটি অত্যন্ত বিস্তারিত ও মানবিক আর্থিক দলিল হিসেবে প্রমাণিত হয়। এ উইলে প্রতিফলিত হয় হেস্তার সলোমনসের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, পেশাগত দক্ষতা ও মানবিক গুণাবলি। তিনি তার জীবিত সব সন্তানের জন্য উত্তরাধিকার নির্ধারণ করে যান। এমনকি পারিবারিকভাবে বিতর্কিত চরিত্রের লিওনেল এবং মার্ক জুনিয়রের জন্যও অংশ রাখেন। এছাড়া বন্ধু ও সহকর্মীদের জন্যও তিনি আর্থিক অনুদান রেখে গেছেন। তার উইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহক হিসেবে নিযুক্ত করেন জামাতা বেঞ্জামিন গোল্ডসমিড, তার ভাই আব্রাহাম গোল্ডসমিড এবং উইলিয়াম উইলিসকে; তাদের সঙ্গে পুত্র মার্ককেও যুক্ত করা হয় সম্পত্তি প্রশাসনের কাজে।

হেস্তারের বিপুল পরিমাণ আর্থিক অনুদান ও উইলের ব্যাপ্তি প্রমাণ করে অনেক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত ছিল।

হেস্তার সলোমনসের মৃত্যুতে একটি বিস্ময়কর অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। এ অধ্যায় ঔপনিবেশিক আমলে ভারতে ইংরেজ-ইহুদি সমাজ এবং বাংলার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের ইতিহাস, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর সূচনা হয়েছিল স্বামী ইসরায়েল লেভিন সলোমনসের ভারতে ব্যবসা শুরুর মাধ্যমে। সে ব্যবসা তার ভাই লিওন প্রেগারের দ্বারা সফলভাবে পরিচালিত হয় এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক সফলতা আসে। পরে বাংলায় এ সফলতা এগিয়ে নেন তার আরেক ভাই জর্জ প্রেগার। ভাই জর্জ প্রেগারের মৃত্যু, হেস্তার সলোমনসের সব সম্পদ উইল এবং সবশেষ হেস্তারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলায় ইহুদি বণিক সলোমনস পরিবারের বাণিজ্য যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে।

ওয়াল্টার জো ফিশেল (১৮৯৯-১৯৭৩): প্রখ্যাত ইহুদি-জার্মান ইতিহাসবিদ

ভাষান্তর: নিরব হাসান