লিওন প্রেগার (১৭৪৬—১৭৯৩) ছিলেন একজন প্রখ্যাত ইহুদি বণিক। তিনি আঠারো শতকের শেষদিকে বাংলায় বিশেষ করে কলকাতা ও বেনারসে হীরা, মুক্তা ও অন্যান্য অভিজাত পণ্যের ব্যবসা করেন। পাশাপাশি মাদক (নীল) ব্যবসা এবং এ খাতের পরিদর্শক হিসেবেও কাজ করেছেন। ১৭৮৬ সালে লন্ডনের ইহুদি ব্যবসায়ী ফার্ম ‘ইসরায়েল লেভিন সলোমনস’র প্রতিনিধি হিসেবে প্রেগার কলকাতায় আসেন। প্রেগারের বড় বোনের স্বামী সলোমনস ছিলেন অ্যাশকেনাজি ইহুদি এবং ভারতে তার ব্যবসার বেশকিছু শাখা ছিল। এর মধ্যে হীরা, মুক্তা ও ওষুধ অন্যতম। উল্লেখ্য যে প্রেগার নিজেও অ্যাশকেনাজি ইহুদি। প্রেগার যখন ভারতে আসেন, তখন ভারতীয় হীরার ব্যবসায় ইউরোপীয় প্রভাব কমে গিয়েছিল। তখনকার বেনারসে শুধু হীরা চকচকে ও বাজারজাতের উপযোগী করার শিল্পটাই টিকে ছিল। বেনারস বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অমিতাভ ভট্টাচার্যের মতে, ওই সময় বেনারস ছিল হীরা কাটার সর্বশ্রেষ্ঠ কেন্দ্র। হীরা কাটার প্রক্রিয়া অত্যন্ত দক্ষ কারিগরি কাজ এবং এটি একটি শিল্প। সতেরো শতকে কিছু হীরা কাটার পরিবার গুজরাট থেকে বেনারসে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে হীরা কাটার ব্যবসা গড়ে তুলেছিল। লি

লিওন প্রেগার ১৭৪৬ সালে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা বিশিষ্ট ইহুদি ব্যবসায়ী জ্যাকব লেভিন সলোমনস। অনেক বছর ধরে তিনি তার বাবার ব্যবসায় নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামের ওস্টেন্ড সিটিতে কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে লন্ডনে তার বোনের স্বামী ইসরায়েল লেভিন সলোমনসের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। বিভিন্ন বাণিজ্যিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও কার্যক্ষমতার দ্বারা তিনি লন্ডনে নিজেকে দক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। পরে মামা ইসরায়েল লেভিন সলোমনস বাংলা অঞ্চলে হীরার ব্যবসা করার জন্য কোম্পানির একজন প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রেগারকে কলকাতায় পাঠান। তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা এবং মুষ্টিমেয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ছাড়া সব ইউরোপীয় বণিকের জন্য বাংলায় ব্যবসা বন্ধ ছিল।

লিওন প্রেগারের ব্যবসাসংক্রান্ত তথ্যের উপাদান ও উৎস

ওয়াল্টার জোসেফ ফিশেল তার The Activities of a Jewish Merchant House in Bengal (1786- 1798). A Contribution to the Economic History of London Jews in India গবেষণায় লিওন প্রেগার সম্পর্কে বিস্তৃত তথ্য ‍উপস্থাপন করেছেন। এ নিবন্ধে প্রধানত ওয়াল্টার জোসেফ ফিশেল ‍বর্ণিত তথ্যই ব্যবহার করা হয়েছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সংরক্ষিত দলিল এবং বিভিন্ন ফাইল হলো মূল উপাদান। দিল্লির ন্যাশনাল আর্কাইভ, কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম, লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস (কমনওয়েলথ রিলেশনস অফিস) লাইব্রেরি এবং অন্যান্য আর্কাইভে সংরক্ষিত নথি—এসব দলিলপত্রে লিওন প্রেগারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্পর্কিত খুঁটিনাটি, অত্যন্ত গুরুত্বপূ্র্ণ তথ্যভাণ্ডার পাওয়া যায়। সরকারিভাবে সংরক্ষিত দলিলগুলোর পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো লন্ডনের পাবলিক রেকর্ড অফিসে সংরক্ষিত ইসরায়েল লেভিন সলোমনস ও প্রেগার পরিবারের ব্যক্তিগত নথিপত্র। এখানে একটি বিশাল ও সমৃদ্ধ আর্কাইভস রয়েছে। এর মধ্যে শত শত বান্ডেল নথি, হাজার হাজার বিল, চালান, হিসাব বই, ডায়েরি, ব্যবসায়িক ও বৈধ দলিল—এগুলো ইসরায়েল লেভিন সলোমনস কোম্পানি ও প্রেগারের কার্যকলাপ সম্পর্কিত। তাছাড়া রয়েছে প্রেগারের ব্যক্তিগত চিঠি, যা তিনি বেনারস ও কলকাতা থেকে লন্ডনের বাড়ি, ইসরায়েল লেভিন সলোমনস, পরিবারের স্বজন এবং ফার্মের অন্য সদস্যদের উদ্দেশে লেখেন। এ চিঠিগুলো শুধু ইংরেজিতেই নয়, ডাচ ও আরো কয়েকটি ভাষায় লেখা হয়েছিল। ওয়াল্টার জোসেফ ফিশেল তার গবেষণায় উপরিউক্ত সব উপাদানই ব্যবহার করেছেন।

a1

লিওন প্রেগারের সমাধি, কাশিমবাজার, কলকাতা। সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইন

বাংলায় লিওন প্রেগারের হীরা বাণিজ্য

ব্যবসায়ী ফার্ম ইসরায়েল লেভিন সলোমনসের লন্ডনের পরিচালকরা সিদ্ধান্ত নেন যে লিওন প্রেগারকে কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে ভারতে পাঠানো হবে। এ অভিপ্রায় ১৭৮৬ সালের ৮ মার্চ বাংলায় নিযুক্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এবং কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের কাউন্সিলকে নিয়ম মেনে জানানো হয়। এ নিয়ে তখন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ১৭৮৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঘোষিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গেজেটে বলা হয়, ‘কোম্পানির লন্ডনের পরিচালনা বোর্ড লিওন প্রেগারকে বেনারসে গিয়ে মুক্তা, হীরা এবং অন্যান্য মূল্যবান রত্ন ব্যবসার সুযোগ প্রদান এবং কোম্পানির শুল্ক নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সেখানে বসবাসের অনুমতি দিয়েছেন।’ একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয় যে ইউরোপীয় বাজারে এ পণ্য নিয়ে অন্য কেউ ব্যবসা করতে চাইলে প্রেগারের সঙ্গে করা চুক্তি ও শর্তাবলি মানতে হবে।

যা-ই হোক, গ্রেগার ভারতে এসে বেনারসের হীরার বাজারের অবস্থা সম্পর্কে দ্রুতই ধারণা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। বুঝতে পারেন যে কালো (রাফ) হীরা ব্যবসার পতনটি মূলত কলকাতায় প্রথম নিয়োজিত ব্যক্তিদের অদক্ষতা এবং আইনবিরুদ্ধ বাণিজ্যের কারণে হয়েছে। এটি কোম্পানি ও ভালো ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রেগার সরকারকে প্রতিশ্রুতি দেন, তার এজেন্টরা নিশ্চিত করবেন যে সব হীরা তারা ইউরোপীয় বাজারের জন্য কিনবেন, তা প্রথমে কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে জাহাজের পণ্য তালিকায় নিবন্ধন করানো হবে। এ সময় লিওন প্রেগার আরো মতামত দেন যে কোম্পানির সাম্প্রতিক বছরের যে ক্ষতি হয়েছে, এর কারণ কালো হীরা নিবন্ধন ছাড়াই পাঠানো হচ্ছিল, ফলে শুল্কও ফাঁকি দেয়া হয়েছে। তিনি নিজের কৌশল ও পদ্ধতিতে বাণিজ্য করে কালো হীরার আয় বছরে ২০ হাজার পাউন্ডেরও বেশি বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন।

লিওন প্রেগার ব্যবসা পরিচালনাকালে বেনারস থেকে কলকাতায় হীরা প্রেরণের সময় নিরাপত্তা ও ঝুঁকি নিয়ে সমস্যায় পড়েন। এ কথা গভর্নর জেনারেলকে অবহিত করা হয়। লন্ডনে নিজের কোম্পানি এবং ফোর্ট উইলিয়ামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সর্বোচ্চ লাভ নিশ্চিত করতে তিনি গভর্নর জেনারেলের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেন। সেখানে উল্লেখিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে অন্যতম ছিল যে হীরার ব্যবসা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, গভর্নর জেনারেল ও ফোর্ট উইলিয়ামের কাউন্সিল যদি তাদের সর্বাত্মক সুরক্ষা ও সহায়তা প্রদান করেন তাহলে তিনি অবশ্যই সফলতা দেখাতে পারবেন। ১৭৮৬ সালের ৪ অক্টোবর সরকারের পক্ষ থেকে প্রেগারকে জানানো হয়, বাণিজ্যকালে তার কাছে দুই লাখ রুপির হীরা থাকলে, তারা ব্যবসা পরিচালনাকারী নৌকায় একজন প্রহরী—স্থানীয় ‘রেসিডেন্ট অব বেনারস’—দ্বারা সহায়তা দেবেন। প্রহরার মাধ্যমে হীরা বিভিন্ন স্থানে আনা-নেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

a2

ওয়ারেন হেস্টিংস, গভর্নর জেনারেল (১৭৭৪-৮৫) শিল্পী: জোহান জোসেফ। সূত্র: ইয়েল সেন্টার ফর ব্রিটিশ আর্ট

কিছুদিনের মধ্যেই লিওন প্রেগার হীরা ব্যবসায় সাফল্য দেখাতে শুরু করেন। এ সাফল্য লন্ডনে ইসরায়েল লেভিন সলোমনস কোম্পানির জন্য আয়ের বড় উৎসে পরিণত হয়। ব্যবসায়িক সম্পর্কিত লেনদেনের প্রতিবেদন তখন গভর্নর জেনারেলের কাছেও পাঠানো হতো। সে সময় হীরা ব্যবসার পরিধি, আয়তন ও গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায় প্রেগারের পাঠানো বার্ষিক প্রতিবেদন ও হিসাব থেকে। প্রতি বছরের মার্চের শুরুতে গ্রেগার এই বার্ষিক হিসাব জমা দিতেন। এ হিসাবের নথি ১৭৮৭ সাল থেকেই সংরক্ষিত আছে। নিয়মিতভাবে বেনারস ও কলকাতা থেকে লন্ডনে প্রেগারের পাঠানো চিঠিগুলোয়ও এ সম্পর্কিত তথ্য আছে। এসব চিঠিতে হীরা, মুক্তা ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের সব লেনদেন—পরিমাণ, মূল্যসহ চালান, চালান জারির দলিল, প্যাকেজিংয়ের সঠিক চিহ্ন ইত্যাদি লেখা হয়। চিঠিগুলোয় তিনি বেনারসে ব্যবসায়ীদের কমিউনিটিতে নিজেকে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত ও সম্মানিত করেছেন, তাও উল্লেখ করেন। যেমন তার একটি চিঠিতে উল্লেখ করেন, ‘...ভারতে ব্যবসা পরিচালনায় আমার কৃতিত্বের মূল কারণ হলো মাঝারি শোধের না হলে আমি কখনই অন্যদের কাছ থেকে কোনো টাকা ধার করি না।’ হীরার বাজার পতনের সময়ে তিনি লিখেছেন, ‘...হে ঈশ্বর, ভবিষ্যতে হীরা ব্যবসায় যদি বড় লাভ না পাই, আমি এখানে থাকব না অথবা আমাকে অন্য কোনো পথে যেতে হবে।’ ব্যবসা করার সময় কখনো কখনো প্রতিযোগিতা বা হতাশার প্রভাবও প্রেগারের ওপর পড়েছিল। এমনই এক পরিস্থিতিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘আমাকে হীরা ব্যবসা ত্যাগ করতেই হবে।’

বাংলায় হীরা ব্যবসায় কখনো হতাশা ও অসুবিধা থাকলেও লিওন প্রেগার যথেষ্ট সাফল্য পেয়েছিলেন। ১৭৮৯ সালের ১৬ মে গভর্নর জেনারেলকে পাঠানো এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘আমি আপনাদের জানাতে চাই যে মহামান্য পরিচালকদের উদ্দেশ্য আমি অনেকাংশে পূরণ করতে পেরেছি। বাংলায় হীরার বাণিজ্যকে স্থায়ী ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছি।’ লিওন প্রেগার আঠারো শতকে বাংলা অঞ্চলে যে নীতিতে ব্যবসা পরিচালনা করেছিলেন তা ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের পথনির্দেশ করেছিল। প্রেগারের ব্যবসায়িক ধরন তখনকার অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পরিদর্শক ও নীল ক্রেতা

বাংলায় লিওন প্রেগার অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে কাজ করতেন। একপর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন, বাংলায় অবস্থানকালে প্রাপ্ত অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাগুলো সর্বাধিক কাজে লাগানো দরকার। তাহলে ব্যবসার পরিধি অনেক সমৃদ্ধ ও প্রসারিত করা যাবে। সেজন্য তিনি সরকারি দায়িত্ব পেতে আগ্রহী হন এবং বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দাপ্তরিক দায়িত্ব পাওয়ার জন্য আবেদন করেন। বিশেষ করে ব্যবসায়িক পরিদর্শক ও ইউরোপের বাজারে নীল বিক্রেতা হিসেবে।

এ পরিকল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রেগার লন্ডনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কোর্ট অব ডিরেক্টরসের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন জমা দেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ‘বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নীল আমদানি করে উল্লেখযোগ্য লোকসান করছে। আপনি আমাকে আপনার Inspector and Purchaser of drugs নিযুক্ত করলে আমি একটি নাজুক ও লোকসানজনক ব্যবসাকে লাভজনক ও স্থায়ী করব। আমি এ ব্যবসায় প্রায় ২০ বছর ধরে নিয়োজিত আছি। এ ব্যাপারে যেকোনোভাবে আপনার বোর্ডকে সাহায্য করতে পারলে আমি আনন্দিত হব।’ লন্ডনের কোর্ট অব ডিরেক্টরস প্রেগারের দক্ষতা ও গভীরতার দ্বারা মুগ্ধ হয়ে এবং নীল ব্যবসায় চলমান বার্ষিক লোকসান থেকে লাভের প্রত্যাশায়, তার প্রস্তাবকে গ্রহণযোগ্য মনে করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে লিওন প্রেগারকে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৭৮৬ সালের ৬ অক্টোবর ফোর্ট উইলিয়ামে তৎকালীন গভর্নর জেনারেলকে চিঠি দেন। অন্যদিকে লিওন প্রেগার তার দায়িত্ব যথাযথ পালনের প্রতিশ্রুতি দেন। তার পরও কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম অফিসের পরিচালনা বোর্ড প্রেগারের নিয়োগ কার্যকর করতে দেরি ও জটিলতা তৈরি করে।

ফোর্ট উইলিয়ামের বোর্ডের সঙ্গে লিওন প্রেগারের দ্বন্দ্ব

লিওন প্রেগারকে ব্যবসায়িক পরিদর্শক ও নীলের ক্রেতা হিসেবে (কলকাতায় ক্রেতা এবং ইউরোপীয় বাজারে বিক্রেতা) নিয়োগ দেয়ার ‘সরকারি স্বীকৃতি’ বা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফোর্ট উইলিয়ামে বোর্ড অব ট্রেড দ্বারা অনুমোদিত হতে হ‌য়। নিয়ম অনুযায়ী তার নতুন দায়িত্ব পালনের সব নিয়ন্ত্র‌ণও ওই বোর্ডের অধীনে। লন্ডনের কোর্ট অব ডিরেক্টর পক্ষ থেকে প্রেগারের নিয়োগকে গুরুত্ব দিলেও ফোর্ট উইলিয়ামের বোর্ড তাতে তেমন উৎসাহ দেখায়নি। কারণ নীলের ক্রেতা ও পরিদর্শক হিসেবে একসঙ্গে তার একাধিক পদে নিয়োগ নিয়ে তারা সন্দেহ করে। লন্ডনের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এ ব্যাপারে আপত্তি জানায়। নিয়োগ ঝুলিয়ে রাখার কারণে ১৭৮৭ সালের ২৯ জানুয়ারি লিওন প্রেগার কলকাতার ব্যবসায়ী বোর্ডকে লেখেন যে আমাকে নিয়োগ করার ক্ষেত্রে মাননীয় বোর্ডের যদি ইচ্ছা থাকে, তাহলে দ্রুত তা সম্পন্ন করার অনুরোধ করা হলো।’

বিষয়টি দ্রুত সমাধান করার জন্য প্রেগার লন্ডনের তার পারিবারিক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ইসরায়েল লেভিন সলোমনসকে মধ্যস্থতা করতে বলেছিলেন। লেভিন সলোমনস কোম্পানি ১৭৮৭ সালের ১৮ এপ্রিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে অনুরোধ করে লেখেন যে ‘বাংলায় কোম্পানির পরিদর্শক এবং নীলের ক্রেতা হিসেবে মিস্টার লিওন প্রেগারের নিয়োগ কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম প্রণয়ন করা যেতে পারে।’"সলোমনস কোম্পানি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি অনেক চেষ্টা করেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলকাতার ব্যবসাসংক্রান্ত বোর্ডের ওপর শেষ পর্যন্ত কোনো প্রভাব রাখতে পারেননি। ফলে প্রেগারের নিয়োগসংক্রান্ত সমস্যা ঝুলন্তই থেকে যায়।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য বোর্ড প্রধানত যে আপত্তি তোলে তা হলো

১. লিওন প্রেগারের হাতে নীল ব্যবসার যথেষ্ট বড় একটি অংশের ক্রয়ের দায়িত্ব তুলে দেয়া এবং সেই একই ব্যক্তিকে তাদের কাজের ব্যবস্থাপনা দেখার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া—এ বিষয়ে বোর্ড উদ্বিগ্ন। ২. বোর্ড মন্তব্য করেছিল যে ‘আমরা লক্ষ করছি যে একজন কর্মকর্তা হিসেবে না থাকার পরও যে পরিমাণ কনফিডেন্স এবং প্রভাব তাকে দেয়া হচ্ছে, তা অত্যধিক মাত্রার। একজন যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়মিতভাবে নীল নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে নিয়োগ করা যেতে পারে। তবে নিয়ন্ত্রণ ও ক্রয়ের ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে এক ব্যক্তির হাতে দেয়া ঠিক নয়। এছাড়া সংশ্লিষ্ট আরো কিছু কারণে বোর্ড প্রেগারের নিয়োগ প্রত্যাখ্যান করেছিল।’

পদত্যাগ

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেঙ্গল বাণিজ্য বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে লিওন প্রেগারের নীলের ক্রেতা এবং পরিদর্শক হিসেবে নিয়োগ শুরু থেকেই জটিল ছিল। সন্দেহ, মতামতের বিরোধিতা এবং আপত্তির কারণে লিওন প্রেগার ১৭৮৮ সালের ২৯ জানুয়ারি নীল পরিদর্শক এবং ক্রেতার পদ থেকে পদত্যাগপত্র জমা দেন। যদিও বাণিজ্য বোর্ড তাকে কমপক্ষে কোম্পানির নীল ব্যবসার পরিদর্শক হিসেবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য রাজি করায়। ফলে লিয়ন প্রেগার আবার তার চাকরিতে যোগদান করেন। অবশেষে এক বছর পরে [ডিসেম্বর, ১৭৮৯] তিনি হাল ছেড়ে দেন। তিনি চিঠিতে লেখেন যে ‘...আমি অনুরোধ করছি যে বর্তমান শর্তে ব্যবসা অব্যাহত রাখার ফলে কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই আমাকে পদত্যাগ করার অনুমতি দিন।’ এ ঘটনার মাধ্যমে বেঙ্গল বাণিজ্য বোর্ডের সঙ্গে লিওন প্রেগারের নীল পরিদর্শক এবং ক্রেতা হিসেবে দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটে। তবে তিনি বহু বছর ধরে হীরা, ওষুধ এবং অন্যান্য পণ্যের ব্যবসায়ী হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে কাজ করে গেছেন। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও লন্ডনে তার ফার্মে পাঠানো চিঠি থেকে জানা যায়, তার হীরার ব্যবসার কার্যক্রমের পাশাপাশি নীল বাণিজ্যেও খুবই সফল হয়েছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ডে পাঠানো রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

আঠারো শতকে বাংলায় লিওন প্রেগারের বাণিজ্য সম্পর্কে লিখতে হলে বা তাকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কাশিমবাজারের সমাধিস্থলে উৎকীর্ণ শিলালিপির তথ্য গুরুত্বপূর্ণ এবং উল্লেখযোগ্য। লিওন প্রেগারের সমাধিস্থল কলকাতার বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলার কাশিমবাজারের পুরনো ইংরেজ সমাধিতে। তার সমাধিতে উৎকীর্ণ শিলালিপিতে লেখা আছে, ‘এখানে সমাহিত আছে মিস্টার লিওন প্রেগারের দেহাবশেষ। তিনি ছিলেন খ্যাতিমান হীরার ব্যবসায়ী এবং সম্মানিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীল ও ওষুধ ব্যবসার পরিদর্শক। তিনি ১৭৯৩ সালে কাশিমবাজারের ফ্যাক্টরি ভবনে মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৪৭ বছর। কলকাতা থেকে পালকিতে করে বেনারস ভ্রমণকালে জলবায়ুর বিরূপ প্রতিক্রিয়া—তীব্র গরমে আক্রান্ত হয়ে মারা যান প্রেগার। প্রেগার অত্যন্ত নম্র, হাস্যোজ্জ্বল ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলেন। নিরপেক্ষ ও সৎ ব্যবসায়িক নীতির কারণে নিজ দেশের ব্যবসায়ী, সহকর্মী, উদ্যোক্তা এবং সংশ্লিষ্ট ভারতীয়দের মধ্যেও তার ভালো গ্রহণযোগ্যতা ছিল।’

তথ্যসূত্র

১. ওয়াল্টার জোসেফ ফিশেলের ‘দি অ্যাক্টিভিটিজ অব আ জুয়িস মার্চেন্ট হাউজ ইন বেঙ্গল (১৭৮৬-১৭৯৮ খ্রি.)—আ কন্ট্রিবিউশন টু দি ইকোনমিক হিস্ট্রি অব লন্ডন জুয়িস ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক গবেষণা

২. মৌমিতা চৌধুরীর প্রতিবেদন, ‘ডায়মন্ডস অ্যান্ড ডাস্টস: দ্য ব্যাক স্টোরি গ্রেইভ ইন মুর্শিদাবাদ’ শীর্ষক প্রতিবেদন, দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইন, ২ অক্টোবর ২০২২

বাশার খান: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা