১৭৯৩ সালের ১২ মে ভরদুপুরে মুর্শিদাবাদের ইংরেজ ব্যবসায়ী থমাস ব্রাউনের বাড়ির কাছে একটি পালকি এসে থামল। পালকি থেকে নামলেন ৪৭ বছর বয়সী ইহুদি বণিক লিওন প্রেগার। তার সঙ্গে তরুণও নামল। লিওন একদিকে জাঁদরেল হীরা ব্যবসায়ী, অন্যদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ড্রাগ ইন্সপেক্টর। কলকাতা থেকে তিনি একটা জরুরি ব্যবসায়িক কাজে বেনারসের দিকে যাত্রা করেছিলেন। পথে বৈশাখের প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে অসুস্থ বোধ করায় তিনি ব্যবসায়িক বন্ধু থমাস ব্রাউনের বাড়িতে যাত্রাবিরতি করেছেন। একদিন বিশ্রাম নিয়ে সুস্থ বোধ করলে আবার যাত্রা শুরু করবেন।

লিওন প্রেগারকে অসময়ে তার বাড়িতে দেখে ব্রাউন সাহেব খুব অবাক হয়ে গেলেন। এ ভদ্রলোককে তিনি কয়েক বছর ধরে দেখছেন। কাজের সূত্রে তার সঙ্গে বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। তিনি লন্ডনে তার প্রভাবশালী পরিবারের সব খবরই জানেন। লিওনকে তাড়াতাড়ি ঘরের ভেতরে শুইয়ে দিয়ে তিনি বাড়ির চাকরকে একজন বৈদ্য ডেকে আনতে পাঠালেন।

ভারতবর্ষে আসা ইহুদি বণিকদের মধ্যে লিওন প্রেগার সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি প্রথমে শুধু হীরার বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে সময় গোলকুন্ডা থেকে উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ হীরা ইউরোপে রফতানি হতো। লন্ডনে হীরক সম্রাট ছিলেন ইসরায়েল লেভিন সলোমনস। লিওন তার শ্যালক। লন্ডন থেকে তিনিই তাকে বাংলায় পাঠিয়েছিলেন। ইসরায়েল লেভিন সলোমনস আদিতে আমস্টারডামের বাসিন্দা ছিলেন। তার দুই ভাই জ্যাকব লেভিন সলোমনস ও ডেভিড লেভিন সলোমনসও এ ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। সলোমনস ভ্রাতৃরা অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে লন্ডনে এসে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে বসেন। তারা সবাই ক্ল্যাপটনে ‘দ্য হোয়াইট হাউজ’ নামের একটি বাড়িতে বসবাস করতেন।

ভারতের সঙ্গে ইসরায়েল লেভিন সলোমনসের প্রথম সম্পর্কটা গড়ে দিয়েছিলেন মোজেস দ্য ক্যাস্ত্রো নামের আরেক ইহুদি বণিক। তিনি মাদ্রাজভিত্তিক প্রভাবশালী হীরা ব্যবসায়ী। ১৭৮০-৮১ সালের দিকে মোজেস দ্য ক্যাস্ত্রো আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করলে লেভিন সলোমনস ব্যবসা নিয়ে সমস্যায় পড়েন। তখন লেভিনকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন মাদ্রাজের আরেক প্রবীণ হীরা ব্যবসায়ী জ্যাকব বার্নেট। বার্নেট ১৭৭৭ সাল থেকে দক্ষিণ ভারতে ব্যবসা করছিলেন। ১৭৮০-এর দশকের শুরুতে কলকাতায় চলে আসেন। জ্যাকব বার্নেটের পরামর্শে লিওন প্রেগারকে ভারতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। লিওনকে বেছে নেয়ার পেছনে কারণ ছিল হীরা সম্পর্কে তার প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান। তিনি আমস্টারডামে থাকার সময় হীরা সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন।

কিন্তু লিওনকে ভারতে তার ব্যবসায়িক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে হলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনুমতি লাগবে। লেভিনের সঙ্গে লন্ডনের কোর্ট অব ডিরেক্টরসের ভালো সম্পর্ক ছিল। তার অনুরোধে লন্ডনের কোর্ট অব ডিরেক্টরস ১৭৮৬ সালের মার্চে কলকাতার গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিসের কাছে একটা পত্র পাঠায়। সেখানে বলা হয়:

At the desire of Mr Israel Levin Salomons a very respectable merchant of the city (London), we have permitted Mr Lyon Prager to Proceed Benares and reside there seven years to carry on trade in diamonds and other precious stones and pearls….

এ পত্রের মাধ্যমে সাত বছরের জন্য বাংলাদেশে ব্যবসার অনুমতি পেয়েছিলেন লিওন প্রেগার। এতে কোম্পানির নিজেদের স্বার্থও জড়িত ছিল। ১৭৮০-এর দশকে বাংলার হীরার বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে রফতানি কমে গিয়েছিল ব্যাপক হারে। স্থানীয় সরবরাহকারীরা নিম্নমানের হীরা বিক্রি করত। সেই সঙ্গে অবৈধ পথে হীরা রফতানি হওয়ায় কোম্পানির রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।

লিওন প্রেগার বাংলায় এসে দেখলেন যাদের ওপর হীরা সংগ্রহ করে বাজারে পৌঁছানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে ব্যাপক দুর্নীতি। হীরাগুলোকে যতটা পালিস করে কাটার দরকার ততটা যত্ন নিয়ে কাজ করা হচ্ছে না। এছাড়া খনি থেকে হীরাগুলো কলকাতার বাজারে পৌঁছানোর আগে মাঝে মাঝে চোরাই পথে বিক্রি বা পাচার হয়ে যেত। এদের কারণেই কোম্পানি বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল।

তিনি এসব সমস্যা দূর করার জন্য যে পরিকল্পনা পেশ করলেন তাতে কোনো বিশেষ খরচ ছাড়াই কোম্পানির বার্ষিক রাজস্ব কমপক্ষে ২০ হাজার পাউন্ড বেড়ে যাবে। তার এ পরিকল্পনায় গভর্নর জেনারেল বেশ আশাবাদী হলেন। তবে বেনারস থেকে খনিগুলো বাংলায় আনার পথে নিরাপত্তার সমস্যা ছিল। গোলকুন্ডা খনি থেকে আহরিত হীরাগুলো পলিশ করা হতো বেনারসে। সেখান থেকে রফতানির জন্য আনা হতো বাংলায়। এ আসা-যাওয়ার পথটা বিপজ্জনক ছিল। লিওন কোম্পানির কাছ থেকে মালপত্র পরিবহনের সময় নিরাপত্তার আশ্বাস চাইলেন। কোম্পানি তাকে ২ লাখ রুপি পর্যন্ত পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল। সেখান থেকেই বাংলার হীরক বাণিজ্যে লিওন প্রেগারের রাজত্ব শুরু। ওদিকে লন্ডনে ইসরায়েল লেভিন সলোমনসও বিশ্বস্ত লোকের হাতে কাজ দিয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন।

লিওনের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে পরের বছর কোম্পানি আরেকটা নতুন কাজের দায়িত্ব দিলেন তাকে। ভারত থেকে তখন প্রচুর পরিমাণ ওষুধসামগ্রী ও নীল রফতানি হতো ইউরোপে। সেসব কাজ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য লিওন প্রেগারকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘‌ইন্সপেক্টর অ্যান্ড পারচেজার অব ড্রাগস’ পদে নিয়োগ করার সুপারিশ করে লন্ডনের কোর্ট অব ডিরেক্টরস।

নীলের কারবার নিয়ে ভারতের ব্রিটিশ বণিকরা নানা গোপন ফায়দা লুটত। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের কর্তারাও সেসব ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। তাদের বিপুল বিনিয়োগ ছিল এ খাতে। এটার ওপর খবরদারি করার জন্য অন্য কাউকে মেনে নিতে রাজি ছিল না কেউ। হেডকোয়ার্টার থেকে আদেশ আসার পর তার বিরোধিতা শুরু হয় প্রবলভাবে। প্রেগারের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগল কোম্পানির কর্তারা। এ প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হয়ে লন্ডন থেকে তার নতুন নিয়োগটা বদলে দিয়ে আরেকটা নির্দেশ জারি করা হলো কয়েক মাস পর। ‘পারচেজার’ অর্থাৎ নীল কেনার দায়িত্ব থেকে লিওনকে অব্যাহতি দিয়ে শুধু ইন্সপেক্টর পদে রাখা হলো। এ বিতর্কের জের ধরে লিওন প্রেগার চাকরি থেকে ইস্তফা দেয়ার চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু কোম্পানির কর্তারা তার সঙ্গে আপসরফা করে নিয়ে সেটা ঠেকিয়েছিল। বিশেষ করে গভর্নর লর্ড কর্নওয়ালিস ও জন শোরের অনুরোধে তিনি ইস্তফা দেয়া থেকে বিরত থাকলেন।

এর কিছুদিন পর ১৭৮৮ সালে লন্ডনে ইসরায়েল লেভিন সলোমনসের আকস্মিক মৃত্যু হলে ব্যবসা নিয়ে পারিবারিক টানাপড়েন শুরু হয়। লেভিন সলোমনসের মৃত্যুর পর তার উইল অনুসারে কোম্পানি পরিচালনার দায়িত্ব পান স্ত্রী হেস্তার সলোমনস। উইল অনুসারে স্ত্রীকে ১০ হাজার পাউন্ড এবং পুত্র-কন্যা সবার জন্য ৩ হাজার পাউন্ড করে বরাদ্দ করা হয়। লেভিনের ১০ পুত্র-কন্যার মধ্যে দুই পুত্র বখে গিয়েছিল। তাদের একজন মার্ক প্রেগার। সে এতই বেপরোয়া ও উচ্ছৃঙ্খল ছিল যে শুধু জুয়া খেলে বাপের সম্পত্তির চার ভাগের এক ভাগ (২০ হাজার পাউন্ড) উড়িয়ে দিয়েছিল। মিসেস সলোমনস ঘটনা জানতে পেরে কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার থেকে মার্ক প্রেগারের নামটা কেটে দিয়েছিলেন।

_A_Perspective_View_of_Fort_William__by_Jan_Van_Ryne,_1754

ফোর্ট উইলিয়াম। শিল্পী: জন ভ্যান রাইন, ১৭৫৪ সূত্র: উইকিমিডিয়া

তখন থেকে মার্ক ভারতে গিয়ে বাপের ব্যবসায় হাত দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু চাইলেই সেটা সম্ভব নয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনুমোদন ছাড়া কারো পক্ষে কলকাতায় এসে কাজ করা সম্ভব ছিল না। ১৭৯১ সালে মার্ক প্রেগার ভিন্নপথ অবলম্বন করে কোম্পানির একটা ক্যাডেট জাহাজে করে বোম্বেতে নামল। বোম্বে নেমে বাপের নাম বেচে বেশকিছু আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছিল। খবর পেয়ে মামা লিওন প্রেগার তাকে বোম্বে থেকে কলকাতা নিয়ে আসেন। তখন থেকে সে লিওন প্রেগারের সহযোগী হিসেবে কাজ শুরু করে। পালকি থেকে লিওন গ্রেগারের সঙ্গে নামা তরুণটি হলো মার্ক প্রেগার।

১৭৯৩ সালটা লিওন প্রেগারের ক্যারিয়ারে অনিশ্চয়তা নিয়ে শুরু হয়েছিল। ১৭৮৬ সালে তিনি ভারতে এসেছিলেন সাত বছরের চুক্তিতে। এ বছর সে চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে যাচ্ছে। ফুরিয়ে যাওয়ার পর তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে যাবেন নাকি এখানে আরো কয়েক বছর কাটাবেন সেটা বুঝতে পারছিলেন না। তার ইচ্ছে চুক্তিটা নবায়ন করা। কিন্তু কোম্পানির ভেতর তার বিরুদ্ধপক্ষ তখন সক্রিয়। তাই চুক্তিটা আদৌ নবায়ন হবে কিনা সেটা নিয়ে তিনি অনিশ্চয়তায় ভুগছিলেন। থমাস ব্রাউনের সঙ্গে এ ব্যাপারে একবার আলাপও করেছিলেন।

কিছুদিন আগে ব্রাউন সাহেব শুনেছিলেন তার সব অনিশ্চয়তা দূর করে দিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চুক্তি নবায়ন করেছে। আরো সাত বছরের জন্য তাকে ভারতে ব্যবসা করার অনুমতি দিয়েছেন। মামা-ভাগ্নে নতুন উদ্যমে ব্যবসার কাজ শুরু করলেন। আজকে সে ব্যবসার কাজে বেনারস যাচ্ছিলেন দুজনে। ক’দিন আগে হাসিখুশি দেখা লোকটা এখন তার বাড়িতে জ্বরতপ্ত শরীরে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।

স্থানীয় বৈদ্য এসে দেখে ওষুধপত্র দিয়ে গেল। সেগুলো খাইয়ে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন তিনি।

কিন্তু রাতের বেলা তার জ্বর খুব বেড়ে গেল। রীতিমতো প্রলাপ বকতে শুরু করলেন। মাঝরাতের দিকে তার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল। তার ভাগ্নে মার্ক প্রেগার হতভম্ব হয়ে দেখল চোখের সামনেই মারা যাচ্ছেন ভারতে একমাত্র আশ্রয়দাতা প্রিয় মামা লিওন প্রেগার।

লিওন প্রেগারের সাত বছরের ভারত অধ্যায় এখানেই শেষ। পরদিন সকালে থমাস ব্রাউন ছোটখাটো একটা শেষকৃত্য অনুষ্ঠান করে তাকে মুর্শিদাবাদের ইংরেজদের কবরস্থানে সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা করলেন। কালকাপুরের খ্রিস্টান কবরস্থানে একমাত্র ইহুদি কবরটি লিওন প্রেগারের। তার মৃত্যুর পর সলোমনস ব্রাদার্সের ভারতের ব্যবসা বেশিদিন টেকেনি। লিওনের অবশিষ্ট সম্পদগুলো গুটিয়ে নিয়ে মার্ক প্রেগার দেশে ফিরে গিয়েছিলেন কয়েক মাস পর।

হারুন রশীদ: প্রাচীন সভ্যতা ও ইতিহাস অনুসন্ধানী লেখক