ইতিহাসের পাতায় বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ‘ভূমিকম্প’ অন্যতম ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক। ভূপৃষ্ঠের আকস্মিক কম্পনের মাধ্যমে মুহূর্তেই নগর, জনপদ, অবকাঠামো ও লাখো মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অনেক ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে কিছু ভূমিকম্প বৃহত্তম। আবার কম্পনের মাত্রার দিক থেকেও অনেক বড় বড় ভূমিকম্প হয়েছে। প্রকৃতির শক্তির এ অপ্রত্যাশিত আঘাত মানবিক প্রস্তুতি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। ১৯৬০-২০২৫ সাল পর্যন্ত সংঘটিত বিশ্বের সবচেয়ে বড়, ভয়াবহ ও শক্তিশালী কিছু ভূমিকম্পের দিকে ফিরে দেখাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।
প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে বড় ভূমিকম্প
২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর। বিশ্বের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ইতিহাসে এক ভয়াবহ দিন। ওইদিন স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৫৯ মিনিটে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের উপকূলের কাছে সমুদ্রের তলদেশে ৯ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এটি বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয় হিসেবে স্মরণীয়। সর্বাধিক ধ্বংস আসে ভূমিকম্পের পর পরই সৃষ্ট সুনামি থেকে। গভীর সাগরে ভূপৃষ্ঠের আকস্মিক উত্থান বিশাল জলস্তম্ভ সৃষ্টি করে, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা, ভারত, থাইল্যান্ডসহ অনেক দেশের উপকূলে আছড়ে পড়ে। পরবর্তী ৭ ঘণ্টা ধরে চলা উদ্দীপিত বিশাল ঢেউ ভারত মহাসাগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। কিছু স্থানে ঢেউয়ের উচ্চতা হয়েছিল ৩০ ফুটেরও বেশি।
বৃহৎ এ প্রাকৃতিক দুর্যোগে ১৫টি দেশে আনুমানিক ২ লাখ ২৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা, ভারত, মালদ্বীপ ও থাইল্যান্ড সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইন্দোনেশিয়ার সংশ্লিষ্ট বিভাগ উত্তর সুমাত্রার আছেহ প্রদেশে মৃত্যুর সংখ্যা দুই লাখেরও বেশি বলে অনুমান করেছে। শ্রীলংকা ও ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জেও প্রচুর মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হয়। দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপে শতাধিক প্রাণহানি ও বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। বেড়াতে আসা এশিয়ার বাইরের কয়েক হাজার পর্যটকও প্রাণ হারান।
এ ভূমিকম্প ও সুনামির ধ্বংসাত্মক প্রভাব আক্রান্ত দেশগুলোকে আরো উন্নত সুনামি সতর্কতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গঠনে প্রভাবিত করে। ২০০৫ সালে ইউনেস্কোর আন্তঃসরকারি মহাসাগর বিজ্ঞান কমিশনের (আইওসি) অধীনে ইন্ডিয়ান ওশান সুনামি ওয়ার্নিং ও মিটিগেশন সিস্টেম (আইওটিডব্লিউএমএস) প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সুনামি প্রস্তুতি বৃদ্ধি, ঝুঁকি মূল্যায়ন, সতর্কতা সক্ষমতা ও জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ।
২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি হাইতির রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সের কাছে একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। এর মাত্রা ছিল ৭। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা ‘ডিজাস্টার ইমারজেন্সি কমিটি’র হিসাব অনুযায়ী এ ভূমিকম্পে আনুমানিক ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ নিহত হয়। প্রায় পৌনে দুই লাখ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়। চার হাজার স্কুল ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশটির অবকাঠামো এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণ প্রথমদিকে খুব কঠিন হয়ে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে জরুরি ত্রাণ পৌঁছানো ও মৃতদেহ অপসারণও সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।
২০০৮ সালের ১২ মে চীনের সিচুয়ান প্রদেশে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। এর মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৯। আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এ প্রাকৃতিক দুর্যোগ চীনের সিচুয়ান প্রদেশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। ইউনিসেফ চীনা দপ্তরের তথ্যমতে, এতে প্রায় ৮৮ হাজার মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হয়।
২০০৫ সালের ৮ অক্টোবর কাশ্মীরে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত। এর উৎপত্তিস্থল পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের রাজধানী মুজাফফরাবাদ শহর থেকে প্রায় ১২ মাইল উত্তর-পূর্বে। ফলে রাজধানীসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। শুধু কাশ্মীরেই অন্তত ৭৯ হাজার মানুষ মারা যায়। ৩২ হাজারেরও বেশি ভবন ধসে পড়ে। পাশাপাশি ভারত ও আফগানিস্তানেও প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়। ভূমিকম্পের প্রভাব এত প্রবল ছিল যে তা চীন পর্যন্ত অনুভূত হয়। মূল ভূমিকম্পের পর ১৪০টির বেশি আফটারশক আঘাত হানে। ফলে জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
আধুনিক কম্পন পরিমাপের মাত্রায়
বিশ্বের ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম চিলি। চিলির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয় ১৯৬০ সালে। এটি ভালদিভিয়া ভূমিকম্প নামে পরিচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সারভি বিভাগের তথ্যমতে, সে বছরের ২২ মে সন্ধ্যা ৭টা ১১ মিনিটে ভূমিকম্পটি হয়। রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৫। ভূমিকম্পের আধুনিক পরিমাপ অনুযায়ী এটি পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত। প্রচণ্ড এ কম্পনে দক্ষিণ চিলির বিশাল ভূখণ্ড কয়েক মিনিট ধরে কেঁপে ওঠে, ঘরবাড়ি ধসে পড়ে, সেতু ভেঙে যায় ও মাটির বিশাল অংশ দেবে যায়।
ভালদিভিয়া ভূমিকম্পে আনুমানিক ১ হাজার ৬৫৫ জন নিহত হয়েছিল। প্রায় ২০ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। কমপক্ষে তিন হাজার মানুষ আহত হয়। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৫৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ভালদিভিয়া ভূমিকম্পটি প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে ধাবমান এক বিশাল সুনামি সৃষ্টি করে। এ ঢেউ নিউজিল্যান্ড, জাপান ও ফিলিপাইন পর্যন্ত দূরবর্তী উপকূলীয় এলাকাগুলোয়ও তাণ্ডব চালায়। এটি ভূমিকম্প শুধু দক্ষিণ আমেরিকার ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রই বদলে দেয়নি, সমকালে বিশ্বব্যাপী ভূমিকম্প ও সুনামি গবেষণার নতুন অধ্যায় তৈরি করে।
১৯৬৪ সালের ২৭ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা ভূমিকম্প গ্রেট আলাস্কা ভূমিকম্প নামে পরিচিত। এটি একটি মেগাথ্রাস্ট ধরনের ভূমিকম্প। ওইদিন সন্ধ্যা ৫টা ৩৬ মিনিটে ভূমিকম্পটি শুরু হয়। মাত্রা ছিল ৯ দশমিক ২, যা ইতিহাসে রেকর্ড হওয়া দ্বিতীয় বৃহত্তম ভূমিকম্প। এটি প্রায় ৩ মিনিটব্যাপী স্থায়ী হয়। আলাস্কা রাজ্যের সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, এ প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভূমির ফাটল ও ব্যাপক ভূমিধস হয়। বহু বাড়ি, ভবন ও অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়। অনেক মানুষ নিহত হয়।
ভূমিকম্পের পরবর্তী তিন সপ্তাহ ধরে অনেক পরাঘাত (আফটারশক) অনুভূত হয়। প্রথম দিনই ৬ দশমিক ২ বা তার বেশি মাত্রার ১১টি বড় পরাঘাত হয়। পরবর্তী তিন সপ্তাহে আরো নয়টি বড় পরাঘাত রেকর্ড করা হয়। এ পরাঘাতগুলো দীর্ঘমেয়াদি ছিল। এক বছরের বেশি সময় পর পরাঘাত অনুভূত হওয়া বন্ধ হয়। এর অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল শত শত মিলিয়ন ডলার। এটি যুক্তরাষ্ট্রকে ভূমিকম্প প্রস্তুতি ও গবেষণায় আরো উন্নত ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করে।
২০১১ সালের ১১ মার্চ জাপানের তোহোকুতে বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানে। প্রায় ৯ মাত্রার এ ভূমিকম্প জাপান সাগরের তলদেশে প্যাসিফিক প্লেটের সাবডাকশন জোনে সৃষ্টি হয়েছিল। জাপান ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হলেও এ ভূমিকম্পের প্রভাব ছিল অস্বাভাবিকভাবে ধ্বংসাত্মক। ভূমিকম্পের কয়েক মিনিটের মধ্যেই উপকূলে বিশাল সুনামি এসে আঘাত করে। উপকূলীয় শহরগুলোর ভূমি পানির ঢেউয়ে ভেসে যায়, হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে এবং সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে রিঅ্যাক্টর বিস্ফোরণ, যা একটি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংকটে রূপ নেয়। পৃথিবীর উন্নত নির্মাণশৈলী ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সত্ত্বেও এ ঘটনা দেখিয়েছে, প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষ এখনো কতটা দুর্বল।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই আঘাত হানা রাশিয়ার ক্যামচাটকা উপদ্বীপে ৮ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প উল্লেখযোগ্য। ভূমিকম্পটি ২০১১ সালে জাপানের উপকূলে আঘাত হানা ভূমিকম্পের পর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এটি কাছাকাছি ও দূরবর্তী উপকূলীয় অঞ্চলে বিপজ্জনক সুনামি তৈরি করে। দেড় দিনের মধ্যে সুনামিটি পুরো প্রশান্ত মহাসাগর অতিক্রম করে। এ সময় মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো এবং কয়েকটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রকে সতর্ক করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক সুনামি ওয়ার্নিং সেন্টার (পিটিডব্লিউসি) হাওয়াই প্রদেশের জন্য সুনামি সতর্কতা জারি করে। এতে মাঝারি ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত এসব ভয়াবহ ভূমিকম্প শুধু মানুষের প্রাণহানি বা অবকাঠামো ধ্বংসের ইতিহাস নয়, এগুলো মানবসভ্যতার দুর্বলতা, প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা ও বৈশ্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। ১৯৬০ সালের ভালদিভিয়া থেকে ২০২৫ সালের ক্যামচাটকা পর্যন্ত প্রতিটি ভূমিকম্পই সতর্কতামূলক ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করার গুরুত্ব বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে এ বাস্তবতাও সামনে এনেছে যে প্রযুক্তির অগ্রগতি ও উন্নত নির্মাণ ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রকৃতির বিপুল শক্তির সামনে মানবজীবন এখনো ঝুঁকিপূর্ণ ও অসহায়।
নীরব হাসান: লেখক ও সাংবাদিক









