পৃথিবীর অগ্নিজন্ম থেকেই প্রথম কম্পনের সৃষ্টি হয়। আজ থেকে প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৪৫০ কোটি বছর আগে মহাবিশ্বের ধুলো, গ্যাস, ছোট ছোট গ্রহাণু–টুকরো একত্র হয়ে তৈরি হয় পৃথিবী। প্রথম দিকে পৃথিবী ছিল এক প্রজ্বলিত আগ্নেয় গোলক। তাপের তরঙ্গ। লাভার সাগর। অগ্নিময় ধাতু এবং অবিরাম বিস্ফোরণ।
যখন পৃথিবীর বয়স একেবারেই কম, তখন সে যেন আগুনে মোড়া এক নবজাত শিশুর মতো ছিল। পৃথিবীর প্রথম নিশ্বাসই ছিল কম্পনের একটা দীর্ঘশ্বাস।
লেখক জেলে জাইলিঙ্গা ডে বোয়ার ও ডোনাল্ড স্যান্ডার্স তাদের বই আর্থকোয়াকস ইন হিউম্যান হিস্ট্রিতে পৃথিবীর এ আদিম দৃশ্যকে এমনভাবে এঁকেছেন, যেন আমরা চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই গলিত শিলার ঢেউ, বাষ্পের ঘূর্ণি আর কোথাও কোথাও ঠাণ্ডা হয়ে জন্ম নেয়া ছোট ছোট পাথরের দ্বীপ। বইটির প্রথম অধ্যায়ে বলা হয়, জীবনের কলকাকলিতে পৃথিবী ভরে ওঠার আগেই অস্থির ছিল। অস্থিরতা ছিল। যে পৃথিবীকে আমরা আজ স্থির ভাবি, সে পৃথিবী কোটি বছরের জন্মযন্ত্রণার স্মৃতি এখনো বহন করে।
মানুষের ভাষায় বলতে গেলে পৃথিবী তখন বেড়ে ওঠা এক শিশু, আর শিশু যেমন হাঁটতে শিখতে গিয়ে পড়ে যায়, তেমনি পৃথিবীও জন্ম দিতে দিতে, ঠাণ্ডা হতে হতে, নিজেদের গুছিয়ে নিতে নিতে বারবার ভেঙে পড়ছিল, কাঁপছিল। ভূমিকম্প তখনই শুরু, যখন কেউ ছিল না এ কাঁপুনির সাক্ষী হতে।
এ পৃথিবী ধীরে ধীরে স্থির হতে লাগল, কিন্তু পুরোপুরি নয়। জাইলিঙ্গা ডে বোয়ার বলেন, যখন প্রথম সত্যিকারের ভূত্বক তৈরি হলো, তখনই জন্ম নিল প্লেট টেকটোনিকস। এ পৃথিবীর ভূত্বক বড় বড় প্লেটে ভাগ হয়ে গেল, আর সে প্লেটগুলো শুরু করল নিজস্ব যাত্রা—কারো গতি ধীর, কারো দ্রুত। কেউ কারো সঙ্গে ধাক্কা লাগাল, কেউ আবার দূরে সরে গেল, কেউ নিচে স্লাইড করল আর কেউ ওপরে উঠল। এ প্লেটগুলোর সংঘর্ষ তৈরি করল পৃথিবীর প্রথম পর্বত শ্রেণী, প্রথম মহাদেশ, প্রথম মহাসাগরীয় খাঁজ। পৃথিবী যেন নিজের শরীরের হাড়গোড় সাজাচ্ছে—মেরুদণ্ড, বক্ষ, কাঁধ, হাঁটু সবই যেন তৈরি হচ্ছিল ভূকম্পনের ছন্দে।
এ প্লেটগুলোর প্রতিটি নড়াচড়াই একেকটি কম্পনের সম্ভাবনা। লাখ লাখ বছর আগে যখন দুই বিশাল প্লেট ধাক্কা খেল, তখন সৃষ্টি হলো পাথরের পর্বত শ্রেণী, যা আমরা আজ হিমালয় নামে চিনি। এ ঘটনাও ছিল বিশাল এক ভূমিকম্পের বংশধর। মানুষ তখনো জন্মায়নি, কিন্তু ভূমিকম্প ছিল। পৃথিবীর শারীরিক ব্যথা, আত্মরক্ষা, জন্মযন্ত্রণা আর পরিবর্তনের ভাষা ছিল ভূমিকম্প।
আজ থেকে আনুমানিক ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন বা ৩৩০ কোটি বছর পুরনো শিলাস্তরে বিজ্ঞানীরা যে তরঙ্গ–আকৃতি দেখেছেন, তা হলো পৃথিবীর প্রাচীনতম ভূমিকম্পের অক্ষর। এ ভাঁজগুলোর সৃষ্টি হয়েছিল সমুদ্র–তলদেশ কেঁপে ওঠার ফলে। এ হলো পৃথিবীর নিজের লেখা প্রথম দিনলিপি।
কোনো মানুষ ছিল না তা পড়ার; কিন্তু পৃথিবী লিখে রেখেছিল। প্রাচীন এ কাঁপুনির ফলে কিছু জায়গায় গলিত শিলা দ্রুত ওপরে উঠে পর্বতের বীজ তৈরি করেছিল। কোথাও গভীর খাদ তৈরি হয়েছিল। কোথাও বিশাল হ্রদ জন্ম নিয়েছিল। মানুষ তখনো ছিল না, গল্প তখনো হয়নি, তবে পৃথিবী তখনই তার চরিত্র গড়ে তুলছিল, এক অস্থির, পরিবর্তনশীল, আগুনে ভরা চরিত্র।
মানুষ পৃথিবীতে আসে মাত্র তিন লাখ বছর আগে। সময়টা পৃথিবীর ইতিহাসে একটি পলক মাত্র। মানুষ প্রথম যখন ভূমিকম্প অনুভব করে, সে দৃশ্য যেন আগুনের আলোয় ছায়ার মতো এক দল মানুষ গুহায় বসে আছে। রাতে ঝড় নেই, পশুর ডাক নেই। হঠাৎ মাটি কেঁপে ওঠে।
গুহার দেয়ালে আগুনের আলো তরঙ্গের মতো দুলে যায়। ঝুলে থাকা অস্ত্র কাঁপতে থাকে।
পাথর পড়ে। পশুরা চিৎকার করে দৌড় দেয়। মানুষ বোঝে না কী হচ্ছে।
তাদের চোখে এটি অদৃশ্য দৈত্য। দেবতার রোষ। অশুভ শক্তির আগমন। আকাশ-পৃথিবীর টানাপড়েন। এ ছিল মানুষের প্রথম ভূমিকম্প–বর্ণনা। আরবি শব্দের মতোই, ‘জিলজাল’ ভূকম্পনের ঝড়। জাইলিঙ্গা ডে বোয়ার নিজের বইয়ে লিখেছেন, ভূমিকম্প আদিম মানুষের স্থিতিশীল পৃথিবীর ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে বলেই তাকে ভীত করেছে।
মানুষের জন্ম হলো অনেক পরে। প্রথম জীব, তারপর প্রাচীন প্রাণী, ডাইনোসর, স্তন্যপায়ী, আদিম মানুষ। মানুষ যখন প্রথম পৃথিবীর ধুলায় পা রাখল, তখন তারা বিশ্বাস করতে লাগল এ কম্পন নিশ্চয়ই দেবতাদের গর্জন, অশুভ শক্তির তাণ্ডব বা পৃথিবীর নিচে ঘুমন্ত দানবের নড়াচড়া। তখন মানুষের কাছে বিজ্ঞান ছিল না, ভূতপ্রেত, রাক্ষস–গন্ধর্ব, দেবদেবীরাই ছিল ব্যাখ্যার উপায়।
জাপানে বিশ্বাস করা হলো পৃথিবীর নিচে আছে এক বিশাল ক্যাটফিশ—নামাজু। সে শান্ত থাকলে পৃথিবী শান্ত, সে লেজ ঝাঁকালে শহর ভেঙে পড়ে। চীনাদের কাছে ভূমিকম্প ছিল ড্রাগনের শ্বাস। দক্ষিণ আমেরিকার কিছু প্রাচীন জনগোষ্ঠী মনে করত পৃথিবী বাস করছে একটি বিশাল কচ্ছপের পিঠে; কচ্ছপ নড়লেই পৃথিবী নড়ে। মানুষের অজ্ঞতা ছিল অন্ধকার, কিন্তু সে অন্ধকারই জন্ম দিয়েছিল রঙিন কল্পনা।
প্রাচীন গ্রিকরা ভূমিকম্পকে দেখত সমুদ্র–দেবতা পোসেইডনের রোষ হিসেবে। এ দেবতার অন্যতম নাম ছিল আর্থ-শেকার বা পৃথিবী কাঁপানো (দেবতা)।
অ্যারিস্টটল আরো ভূকম্পন নিয়ে এক তত্ত্ব দিয়েছিলেন যে পৃথিবীর নিচে বাতাস আটকে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়। এটি বিজ্ঞানসম্মত না হলেও তখনকার দুনিয়ার জন্য এ ছিল এক বিপ্লবী ব্যাখ্যা।
মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে বিশেষ করে ডেড সি, জেরুজালেম, গ্যালিলি ইতিহাসে বারবার ভূমিকম্প হয়েছে। সে সময়ে মানুষ বিশ্বাস করত এ পৃথিবী ঈশ্বরের সৃষ্টি, তাই তার কাঁপুনি মানেই ঈশ্বরের রোষ বা সতর্কতা। মন্দিরে গিয়ে মানুষ প্রার্থনা করত, উপবাস করত, বলত ‘হে প্রভু, আমাদের রক্ষা করুন।’ ভূমিকম্প তখন ধর্মীয় ভয় আর অলৌকিকতার প্রতীক। মানুষ তখনো জানত না, মাটির নিচে কিন্তু চলছে টান, চাপ, সরে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। ভূমিকম্প ঘটছে প্রকৃতির নিয়মে, কোনো দেবতার রাগে নয়।
মানুষের কল্পনার শক্তিও কম নয়। দর্শন জন্ম নিল। গ্রিক দার্শনিকেরা বলতে লাগলেন ‘না, ভূমিকম্প দেবতার রাগ নয়, নিশ্চয়ই এর ভৌত কারণ আছে।’ কেউ বললেন মাটির নিচে বায়ু আটকে থেকে বিস্ফোরণ ঘটায়। কেউ বললেন মাটির নিচে আগুন সরে যায়। তারা ভুল ছিলেন, কিন্তু ভুলের মধ্যেও ছিল অনুসন্ধান। এটাই ছিল মানুষের অজ্ঞতা থেকে বিজ্ঞান জন্ম নেয়ার ভোর।
ধীরে ধীরে মানুষ বুঝল পৃথিবীর ভেতরে নড়াচড়া আছে, সে নড়াচড়ার কারণে ভূমিকম্প হয়। তবে এ উপলব্ধি একদিনে আসেনি; আসতে লেগেছে হাজার বছর।
স্পার্টার পতন, সাম্রাজ্যের কাঁপুনি এবং ভূমিকম্পের রাজনীতি নিয়ে নানা কথা রয়েছে ইতিহাসে।
পৃথিবী শুধু পাহাড়-পর্বত, নদী-মহাসাগরই বদলায়নি—ভূমিকম্প মানুষের ইতিহাসও বদলে দিয়েছে।
প্রাচীন গ্রিসের স্পার্টা—যোদ্ধাদের দেশ। তারা ছিল কঠোর, শৃঙ্খলাবদ্ধ, যুদ্ধের জন্য জন্মানো এক সমাজ। তারা বিশ্বাস করত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র তারাই। কিন্তু শক্তি কখনই অমর নয় এবং পৃথিবী তা প্রমাণ করেছিল এমন এক কম্পনে, যার কথা আজও ইতিহাসের বইয়ে চিহ্ন এঁকে দাঁড়িয়ে আছে।
স্পার্টার মাটিতে ঘটে গেল একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প। লেখকরা বলেন, এটি শুধু একটি ভূমিকম্প ছিল না, বরং এটি ছিল এমন একটি ধাক্কা, যা স্পার্টার সমাজ–রাজনীতি, সামরিক শক্তি এবং তাদের অহংকার একসঙ্গে ভেঙে দিয়েছিল। বাড়িঘর ধসে পড়ল, মন্দির ভেঙে গেল, যোদ্ধারা মারা গেল, আর শহরের নিয়ম-শৃঙ্খলা এক মুহূর্তে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপদ এসেছিল অন্যদিক থেকে। স্পার্টার নিপীড়িত জনগোষ্ঠী হেলটরা বুঝে গেল এটাই তাদের সুযোগ। তারা বিদ্রোহ করে বসল, আর স্পার্টা প্রথমবার বুঝল তারা অজেয় নয়।
একটি ভূমিকম্প শুধু পাথর ভাঙেনি, ভেঙেছে এক সাম্রাজ্যের অহংকার। হেলটরা দাস ছিল, কিন্তু তারা সংখ্যায় ছিল বিশাল। স্পার্টানরা ছিল শক্তিশালী, কিন্তু তারা ছিল অল্প। ভূমিকম্পের পরে স্পার্টার শক্তি অর্ধেকে নেমে গেল, আর হেলটরা উঠে দাঁড়াল। এ বিদ্রোহ দমন করতে স্পার্টানদের বছরের পর বছর লেগে গেল। ফলে স্পার্টা দুর্বল হয়ে পড়ে গ্রিসের অন্য রাষ্ট্রগুলোর আক্রমণের সামনে।
ভূমধ্যসাগরের তীর বরাবর—এজিয়ান সাগরের দ্বীপগুলোয় ছিল মিনোয়ান সভ্যতা, বিশ্বের অন্যতম প্রাচীনতম, গ্রিসের আগের এক উজ্জ্বল যুগ। কিন্তু এ সভ্যতাও ভূমিকম্পকে এড়াতে পারেনি। মিনোয়ান সভ্যতার পতনের অন্যতম কারণ ছিল আগ্নেয়গিরির ভয়ানক বিস্ফোরণ—থেরা (বর্তমান স্যান্টোরিনি)। এ বিস্ফোরণ শুধু আগুনের পাহাড় ছিল না, বরং এটি ছিল এমন এক বিস্ফোরণ, যা ইতিহাস বদলে দিয়েছে। থেরা বিস্ফোরণে তৈরি হয় বিশাল সুনামি, যা কনোসসসহ পুরো অঞ্চলে আছড়ে পড়ে। মিনোয়ান সভ্যতা সে ধাক্কা আর সামলে উঠতে পারেনি। স্পার্টা, মিনোয়ান উভয়েরই গল্প এক। একটি ভূমিকম্প, একটি বিস্ফোরণই পারে শক্তিশালী সমাজকে দুর্বল করে দিতে।
এবার এগোই মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে। বইটিতে যাকে বলা হয়েছে, ‘দোলনার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সভ্যতা।’ তুরস্ক, সিরিয়া, লেবানন, ইসরায়েল, জর্ডান এ অঞ্চল পৃথিবীর সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকম্প বেল্টগুলোর একটি। এ অঞ্চলের ইতিহাসে বারবার ভূমিকম্প এসেছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয় ডেড সি ট্রান্সফর্ম ফাল্টের কথা। এ এক বিশাল ভূতাত্ত্বিক রেখা, যেটি দক্ষিণে আফ্রিকান প্লেট আর উত্তরে আরবীয় প্লেটকে আলাদা করে রাখে। জায়গাটা শুধু সুন্দরই নয়। এটা পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় উদাহরণগুলোর একটি, যেখানে ভূমিকম্প ও মানবসভ্যতা পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। কিছু গবেষক বলেন, জেরুজালেমের অনেক বিধ্বংসী ঘটনা, যেমন মন্দির ধ্বংস, জনপদ পতন সবই এ ফাল্টলাইনের নড়াচড়ার সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ মানুষ ঘৃণা, যুদ্ধ, রাজনীতি দিয়ে ধ্বংস করে; আর প্রকৃতি আপন নিয়মে ধ্বংস করে।
এবার গল্প এগোচ্ছে আরো পশ্চিমে। রোমান সাম্রাজ্যে, যেখানে ভূমিকম্প ছিল রাজনীতির নীরব শত্রু। রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস পড়ে মনে হয় যুদ্ধ আর দখলের মাঝেও প্রকৃতির শক্তিই বেশি ভয়ংকর ছিল। দক্ষিণ ইতালির কাম্পানিয়া অঞ্চল, যেখানে পম্পেই শহর অবস্থিত, সেখানে ভূমিকম্প ছিল নিয়মিত ঘটনা। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক থেকেই সেখানে ছোট-বড় কম্পন হতো। মানুষ প্রথমে ভাবত এটা স্বাভাবিক। তারা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তারপর এল সে ঘটনা—৭৯ খ্রিস্টাব্দ, ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ। পম্পেই শহর একদিনের মধ্যে চাপা পড়ে গেল ছাইয়ের নিচে। শুধু একটি শহর নয়, একটি যুগই চাপা পড়ল। রোমের সেনেটররা এ ঘটনার পরে বলেছিলেন, ‘পৃথিবী কাঁপে আগে, তারপর আসে শত্রু।’
রোমের পর গল্প পৌঁছায় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে, যারা নিজেরাই ছিল ভূমিকম্প অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে। মধ্যযুগজুড়েই কনস্টান্টিনোপলে ভূমিকম্প হয়েছে; কখনো অল্প, কখনো ভয়ংকর। বহু সম্রাট তাদের শাসনামল শেষ করেছেন ভূমিকম্পের ধ্বংসে, আবার কেউ কেউ ভূমিকম্পের পরে পুনর্গঠনের মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। বাইজেন্টাইনরা বুঝেছিল ভূমিকম্প মানেই শুধু ধ্বংস নয়, এটি পুনর্গঠনের সুযোগও।
ভূমিকম্প মানুষের চরিত্রও বদলে দিতে পারে। কেউ ভয় পেয়ে ধর্মে ডুবে যায়, কেউ বিজ্ঞানের দিকে ঝোঁকে, কেউ আবার রাজনৈতিক সুযোগ নেয়। মানুষ ভূমিকম্পকে শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখেনি; এটি ছিল পরিবার, শহর, রাষ্ট্র, সাম্রাজ্যের গল্প।
মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয় ইতিহাসে ভূমিকম্প জুড়ে গেছে মানুষের বিশ্বাসের মূল ভিতের সঙ্গে। রোমান ও বাইজেন্টাইন রাষ্ট্রনীতি সরাসরি বদলেছে ভূমিকম্পের পর। পৃথিবী কেঁপে উঠলেই মানুষ বুঝত অদৃশ্য শক্তি আছে, এবং সে শক্তি মানুষকে ভুলিয়ে দেয় তার ক্ষমতার সীমা কোথায়।
মধ্যযুগের ঈশ্বর–ভয়, লিসবনের প্রলয় দৃশ্য আর আধুনিক ভূমিকম্প বিজ্ঞানের জন্মের উৎস হয়ে উঠেছে। মধ্যযুগে মানুষ পৃথিবীকে দেখত সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখে। আজ আমরা বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করি যে পৃথিবী প্লেট টেকটোনিকসের জন্য নড়ে, কিন্তু সে সময় মানুষের ব্যাখ্যা ছিল পৃথিবীর কাঁপুনি মানে ঈশ্বর রুষ্ট হয়েছেন। ইউরোপজুড়ে ধর্ম ছিল জীবন–নিয়ন্ত্রণের মূল শক্তি। মানুষের মনে ভয়, আশা, নৈতিকতা, জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সবই গির্জা ও পাদ্রিদের কথায় নির্ধারণ হতো। ভূমিকম্প সেখানে ছিল এক ভয়ংকর সতর্কবার্তা—‘ঈশ্বর তোমাদের কাজকর্মে খুশি নন।’
ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন যেসব দেশে ভূমিকম্প তুলনামূলক কম হতো, সেখানেও ছোট্ট একটি কম্পন ঘটলেই মানুষ ভাবত এ যেন স্বর্গ থেকে পাঠানো চিঠি। আর চিঠিটা খুব স্পষ্ট ‘সাবধান হও।’ চার্চে তখন বিশেষ উপাসনা, প্রার্থনা, উপবাস শুরু করা হতো। পাদ্রিরা বলতেন ‘এটি পাপের পরিণতি।’ সাধারণ মানুষ ভয় পেয়ে নিজেদের ভুল খুঁজে বের করার চেষ্টা করত; কেউ পাপ স্বীকার করত, কেউ দান করত, কেউ নিজেদের জীবন বদলানোর প্রতিশ্রুতি দিত।
কিন্তু নিজেই ইতিহাসের অন্ধকারময় মধ্যযুগ পেরিয়ে যখন ইউরোপের ঘুম ভাঙল, তখন ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি সামনে এসে দাঁড়াল। ১৭৫৫ সালের গ্রেট লিসবন ভূমিকম্প। এ ঘটনা এতই ভয়ংকর, এতই যুগান্তকারী, এতই হৃদয়বিদারক ছিল যে এটি শুধু শহর ভাঙেনি, ভেঙেছে মানুষের অন্ধ–বিশ্বাস, বৈজ্ঞানিক চিন্তা, রাজনৈতিক কাঠামো, এমনকি পুরো ইউরোপের দার্শনিক ভিত্তি।
১৭৫৫ সালের ১ নভেম্বর। অল সেন্টস ডে—খ্রিস্টান বিশ্বের অন্যতম পবিত্র দিন। লিসবনের হাজার হাজার গির্জায় জ্বলছিল মোমবাতি; মানুষ প্রার্থনা করতে এসেছে, শিশুরা ফুল সাজাচ্ছে, সবার মুখে শান্ত উৎসবের উজ্জ্বলতা। ঠিক সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে পৃথিবী হঠাৎ গুঞ্জন তুলল। প্রথমে মনে হলো কোনো বিশাল রথ যাচ্ছে বা দূরে বজ্রগর্জন হচ্ছে। তারপর যেন এক অদৃশ্য হাত শহরটাকে দুলিয়ে দিল। এমনভাবে বাড়িঘর ফাটল ধরল, যেন মাটি ভেতর থেকে উঠে আসে।
প্রথম কম্পন শেষ হতেই ভেঙে পড়ল বিশাল শিলাস্তম্ভ, গির্জার ছাদ, বাণিজ্যিক ভবন। মানুষ রাস্তায় দৌড়ায়, কেউ আবার মূর্তি আঁকড়ে ধরে কান্না করে। কিন্তু পৃথিবীর রোষ এখানেই থামল না। শহরের মোমবাতিগুলো পড়ে গিয়ে চারদিকে আগুন লাগল। বিশাল অগ্নিকাণ্ডে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লিসবনের অর্ধেক আগুনে গ্রাস হলো।
তারপর এল আরো ভয়াবহ আঘাত সুনামি। সমুদ্র প্রথমে অস্বাভাবিকভাবে পিছিয়ে গেল, তারপর পাহাড়সম উচ্চতার ঢেউ শহরের ওপর ধেয়ে এল। বন্দরের জাহাজগুলো বাড়িঘরের ওপর আছড়ে পড়ল। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যা হাজার থেকে লাখে পৌঁছে গেল। লিসবনের জনসংখ্যার প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ মানুষ আক্ষরিক অর্থেই মাটিচাপা, আগুনে পোড়া বা পানিতে তলিয়ে মারা গেল।
কিন্তু এ বিপর্যয় শুধু শারীরিক ধ্বংস নয়; এটি ছিল একটি বুদ্ধিবিপ্লব। ইউরোপের দার্শনিক মহলে তখন আলোড়ন। ভলতেয়ার তার বিখ্যাত কবিতা ‘পোয়েম স্যুর ল্য দেজাস্ত্র দ্য লিজবোন’ বা লিসবনের বিপর্যয় নিয়ে কবিতায় লিখলেন—এমন দুর্ভোগ যদি ঈশ্বরের ইচ্ছা হয়, তবে সে ঈশ্বরকে বুঝতে মানুষের বুদ্ধি ব্যর্থ। তিনি স্পষ্ট বললেন—‘এ বিপর্যয় নৈতিকতার বিচার নয়; এটি প্রকৃতির নিয়ম।’ এ একটি মন্তব্য ইউরোপের মনোভাব বদলে দিল। খ্রিস্ট ধর্মের ভয় কমতে শুরু করল; বিজ্ঞান মাথা তুলে দাঁড়াল।
লিসবনের এ ঘটনার পর প্রথমবার বিজ্ঞানীরা ভূমিকম্পের কারণ খুঁজতে মাঠে নামলেন। তারা ঘরবাড়ির দিক দেখে আন্দাজ করলেন কম্পন কোন দিক থেকে এসেছে। জমিতে ফাটলের দৈর্ঘ্য মাপলেন, সুনামির উচ্চতা লিখে রাখলেন, পাথর সরিয়ে ভেতরের কাঠামো পরীক্ষা করলেন। এভাবেই জন্ম নিল আধুনিক ভূকম্পন–বিজ্ঞান বা সিসমোলজি।
মানুষ বুঝতে পারল—ভূমিকম্প কোনো রহস্য নয়; এটি পৃথিবীর ভেতরের ভৌত শক্তির ফল। প্রকৃতির আলাপ, মানুষের শত্রু নয়। ফলে বিজ্ঞান জন্ম নিল—টেকটোনিক প্লেট, চাপ, স্লিপিং ফল্ট, সিসমিক তরঙ্গ—এগুলো সবই পরে স্বীকৃত হলো, কিন্তু শুরু হয়েছিল লিসবন ট্র্যাজেডির পরে।
আধুনিক যুগ বলে, এটি শুধু পৃথিবীর মেরামতির কাজ। ভূমিকম্প শুধু ভৌত ঘটনা নয়; এটি মানুষের ভয়, সভ্যতা, দর্শন, রাজনীতি ও বিজ্ঞানের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পৃথিবী নড়াচড়া মানে পৃথিবী বেঁচে আছে। আর মানুষ সে নড়াচড়ার ভেতর দিয়ে এগিয়েছে—ভয় থেকে জ্ঞান, পুরাণ থেকে বিজ্ঞান, অন্ধকার থেকে আলোর দিকে।
সৈয়দ মূসা রেজা: সাংবাদিক ও লেখক









