আর ভারতের যারা বাসিন্দা তাদের বেশির ভাগই নিজের অঞ্চলের সীমা সম্পর্কেও অজ্ঞ। কিন্তু একটা অঞ্চলের সীমানা, মানচিত্র জানা জরুরি। এদিকে ব্রিটিশরা যেহেতু শাসন করছিল, তাদের জন্য সীমানা জানাটা আরো বেশি প্রয়োজন ছিল। তাই তারাই উদ্যোগ নেয়। মধ্য ও উত্তর ভারতের সীমানা বোঝা তুলনামূলক সহজ কিন্তু বাংলা ও এর দক্ষিণাঞ্চলের সীমানা বোঝা কঠিন, তাই নির্দিষ্ট করা আরো দরকারি ছিল। বাংলার ভূমির মাঝে নদ-নদীর গতিপথ নির্দিষ্ট করার চিন্তা করা হয়। ফোর্ট উইলিয়াম এ নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করেন এবং দায়িত্ব পড়ে জেমস রেনেলের ওপর। সে ঘটনা নিয়েই উপন্যাস লিখেছেন তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়। নাম ‘কম্পাসওয়ালা’। দে’জ পাবলিশিং (ভারত) থেকে বইটি ২০১৯ সালে প্রকাশ হয়।
বস্তুত কম্পাস নিয়েই বাংলায় এসেছিলেন রেনেল। একালে মানচিত্র আঁকার বহু পন্থা ও সাহায্যকারী যন্ত্রপাতি থাকলেও সেকালে ছিল না। আর রেনেলের বয়সও ছিল মাত্র ২২ বছর। ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে এ কাজ দিয়ে রেনেল যখন বাংলায় আসেন, বাংলা তখন ছিল জল-জঙ্গলের দেশ। একদিকে সাপ, অন্যদিকে বাঘ। কুমিরের ভয়ও ছিল। দক্ষিণবঙ্গের প্রায় আদিম অবস্থা। পরিবহন ব্যবস্থা নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে কেবল নৌকা, মাটির রাস্তায় গোশকট। সাহেবদের বিরুদ্ধে সে সময় বাংলার সাধারণ মানুষ বিরক্ত, বিরুদ্ধ। চলছে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ। সারা দেশে তাদের গোপন আস্তানা। এসব বিরুদ্ধ পরিস্থিতিতে কাজ করেছেন রেনেল। এর তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে প্রতিটি বিষয়ই উঠে এসেছে।
ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে উপন্যাস লেখার বিষয়টি প্রচলিত। তবে সেসব ক্ষেত্রে ইতিহাসের প্রধান চরিত্ররাই জায়গা পান। রেনেলের মতো ব্যক্তিরা আড়ালে পড়ে থাকেন। কিন্তু তমাল বন্দ্যোপাধ্যায় রেনেলকে নিয়ে এসেছেন। গল্পের পটভূমি পলাশীর যুদ্ধের কিছু পরের। সে সময় বাংলা ও বিহারে উত্তপ্ত অবস্থা। ইস্ট ইন্ডিয়ার কোম্পানির তরফ থেকে বাংলা প্রদেশের বদ্বীপ অঞ্চল, নদীনালা ইত্যাদির সার্ভে করতে নামেন জেমস রেনেল। তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস জানায়, রেনেলের সম্বল বলতে একটি ভাঙাচোরা দুর্বল বজরা এবং সামান্য কিছু সেপাই-লস্কর ছাড়া কিছুই ছিল না। এ সামান্য সম্বলেই পাহাড়প্রমাণ কাজে শামিল হন রেনেল।
রেনেলের যাত্রা ও কাজ সম্পর্কে একটি নিবন্ধে তমাল বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই লিখেছেন। ‘কাজ তো সেই করতে হবে খোলা আকাশের নীচে, মাটি কামড়ে পড়ে থেকে। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা উপেক্ষা করে দিনের পর দিন, মাইলের পর মাইল জমি-নদী-খালবিল খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ করে বিস্তারিত বিবরণ তৈরি করা, আর ম্যাপ এঁকে চলা। এমন নয় যে রেনেল স্রেফ সাহেবি দুঃসাহসে ভর দিয়ে একটা সাদা পাতায় অজস্র অনুমানের আঁকিবুঁকি কাটছিলেন। ভারতের তৎকালীন শাসকরা আসলে সে সময় বুঝতে চাইছিলেন, যে মুলুকগুলো তারা শাসন করেন, এই বিপুল ভূখণ্ডের ঠিক কোথায় তাদের অবস্থান, তাদের আকার-আয়তনই বা কেমন, সম্ভাব্য বিপদ-বিদ্রোহের মুখে পড়লে তাদের ভৌগোলিক অবস্থান তাদের বাঁচাতে পারবে কিনা—এই সব।’
রেনেলকে নিয়ে লিখতে গিয়ে উপন্যাসের নিয়মানুসারেই বেশকিছু চরিত্র তৈরি করেছেন তমাল। বাস্তবের পাশাপাশি এসেছে কল্পিত চরিত্র। রেনেলের পুরো যাত্রা তুলে ধরেছেন লেখক। যাত্রাপথে প্রচুর চরিত্রের আসা-যাওয়া চলতে থাকে। উপন্যাস নাটকীয় করার জন্য বেশির ভাগ চরিত্র হারিয়ে যায়। কিন্তু ভাগ্যের জোরে রেনেলকে টিকে থাকতে দেখা যায়। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ আঘাত শরীরে নিয়েও ফিরে আসেন আবার। তিনি তার দায়িত্ব পালনে কোনো ছাড় দেন না। কেননা উপন্যাসের নায়ক তিনিই।
সন্ন্যাসী বিদ্রোহের মধ্যে পড়ে আহত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে ‘ম্যাপ সাহেব’ নিবন্ধে তমাল বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন, ‘সার্ভের প্রয়োজনে সাহেব তখন কাজ করছেন ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী এলাকায়, ভুটান সীমান্তের গহন অরণ্যে। হঠাৎ বিদ্রোহী সশস্ত্র সন্ন্যাসীরা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল তাদের দল। সঙ্গীরা সবাই সৈনিক, তাই প্রচণ্ড লড়াই হল। কিন্তু তারা সংখ্যায় অনেক কম। কিছু ক্ষণ প্রতিরোধ করা গেলেও শেষে ঘটে গেল এক ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। সন্ন্যাসীদের তলোয়ারের ঘা এসে পড়ল সাহেবের কাঁধে। হাঁ হয়ে গেল মাংস, কোপ পড়ল ডান ঘাড়ের হাড়ে, কেটে গেল পিঠের দিকের বেশ কয়েকটা পাঁজর। পালকিতে কোনও মতে পালিয়ে প্রাণে বাঁচা গেল ঠিকই, কিন্তু কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছিল সাক্ষাৎ মৃত্যু!’
গল্পের সংক্ষেপ বলতে গেলে কেবল রেনেলেকেই কেন্দ্রে দেখা যাবে। বইজুড়েই রেনেলের সার্ভে করার গতিপথের ধারাবাহিক বিবরণ রয়েছে এবং তারই মাঝে মাঝে রয়েছে আনুষঙ্গিক কিছু ঘটনা। এর সঙ্গে লেখক এনেছেন রেনেলের নিজস্ব ভাবভঙ্গি, এদেশীয়দের প্রতি সহমর্মিতা পোষণ, ব্রিটিশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিরূপ মনোভাব পোষণ করে স্বজাতির সঙ্গে মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগার বিষয়গুলো।
বইটিতে লেখক কিছু জায়গায় রেনেলের মানসিক দ্বন্দ্ব, ভারতীয়দের প্রতি মনোভাবের যে বিষয়গুলো এনেছেন তা অনেক ক্ষেত্রেই কল্পিত ও কিছু ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি করে। রেনেল তার জার্নালে সার্ভের নানা কথা বলে গেলেও ব্যক্তিগত মত ও মনোভাব অনুপস্থিত। সেগুলো তমাল কীভাবে আনলেন বা তমালের রেনেলের ইমোশন কতটা বস্তুনিষ্ঠ সে প্রশ্ন আসতে পারে। তবে কল্পিত অবস্থা ছাড়া তো উপন্যাস হয় না। কিন্তু সেখানেও কথা থাকে। উপন্যাসে রেনেলকে নিপাট ভালো মানুষ দেখা যায়। তার চরিত্র একটা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—ইংরেজরা কি কেবল লুটেরা, আমরা কি সবাই বাজে? লেখক সরাসরি রেনেলের মুখে এ প্রশ্ন তুলেছেন, যা তার লেখাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। কেননা রেনেলের জার্নালেই পাওয়া যায় তিনি ভারতীয়দের প্রতি নানা সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত কঠোর হয়েছেন।
তবে বইটি ঔপনিবেশিক বাংলার আবহ তুলে ধরতে পেরেছে প্রকৃতি ও রাজনীতি দুই ক্ষেত্রেই। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ক্ষেত্রে ইংরেজ ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যও তিনি তুলে এনেছেন। তবে মনে রাখা প্রয়োজন রেনেল ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্ট। ক্লাইভের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। ক্লাইভকে তিনি কাশিমবাজারের ম্যাপ উৎসর্গ করেছিলেন।
বইটিকে অনেকেই অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী ভাবতে পারেন। তবে তা মনে করলে হতাশ হতে হবে। বইয়ের অনেক অংশেই যাত্রাপথের নীরস তথ্য দিয়ে সাজানো। ইতিহাস তথা ভূগোলের ব্যাপারে জানার ক্ষেত্রে উৎসাহী পাঠক এবং যাদের গদ্যের কাব্যময়তা ভালো লাগে তাদের জন্যই বইটি। বইটিতে অলংকরণ ছাড়াও তিনটি ম্যাপও ব্যবহার হয়েছে।
তমাল বন্দ্যোপাধ্যায় ঔপন্যাসিক, ইতিহাসবিদ নন। তাই তার কাজে প্রশ্ন তোলার সুযোগও বেশি নেই। কিন্তু রেনেলের প্রতি তার মুগ্ধতাও দেখা যায়। তবে রেনেলকে নিয়ে এ উপন্যাস রেনেলকে চিনতে সাহায্য করবে। আর রেনেলকে চেনা কেন প্রয়োজন তা নিয়ে আনন্দবাজারে প্রকাশিত নিবন্ধটিতে তমাল লিখেছেন, ‘আঠেরো শতকের বাংলার নিসর্গ বুঝতে গেলে রেনেলের ডায়রি ছাড়া গতি নেই। পড়তে পড়তে চোখে ভেসে ওঠে কত হারিয়ে যাওয়া নদী, জনপদ। মাইলের পর মাইল ধানখেত, পানের বরজ, বাঁশবন, বট-পিপুল, শাল-তাল-নারকেল-সুপারির সারি। ঘনঘোর বর্ষা, রোদেলা শরৎ, কুয়াশা জড়ানো শীতের দিনের ছবি, এমনকী বাঘের আসা যাওয়ার পথও। দেশজ শব্দগুলো তাঁর উচ্চারণে অদ্ভুত শোনায়: বনগাঁ হয়ে যায় বোনগঙ্গ, বারাসত ব্যারাসেট, কৃষ্ণনগর কিসটানাঘুর, কুষ্টিয়া কাস্টি, সুন্দরবন সান্ডারবাউন্ড, ইছামতী নদী রিভার ইসামোট, ব্রহ্মপুত্র বারামপুটরে, খেজুরগাছ কাজিরগাছ। নামে কী এসে যায়, আসল কথা হল দেশের ভূগোলটাকে হাতের তালুর মতো চেনার নিবিড় চেষ্টা। আর সেই চেষ্টার জন্যেই হয়তো, তার জীবনীকার ক্লেমেন্ট মার্কহ্যাম রেনেলকে বলেছিলেন ঊনবিংশ শতকের গ্রেট ব্রিটেনের শ্রেষ্ঠ ভূগোলবিদ।’
মাহমুদুর রহমান: লেখক ও সাংবাদিক









