১৭৬৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি দমদম থেকে আমার এ যাত্রার সূচনা হয়। সহকারী হিসেবে রিচার্ডস আমার সঙ্গে ছিলেন। এ দীর্ঘ যাত্রার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা। আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল গৌরীপুর ব্রিজ থেকে, কারণ ক্যাপ্টেন ক্যামেরন ওই এলাকা পর্যন্ত আগেই জরিপ করেছিলেন। সেখান থেকে শুরু করে আমরা বারাসাত হয়ে এগোতে থাকি। বারাসাত ছাড়ার পর রাস্তাগুলো ছিল অত্যন্ত সরু, অসমতল এবং ঘন ধানখেতের মাঝ দিয়ে আঁকাবাঁকাভাবে চলে যাওয়া। চাষাবাদের সময় সে রাস্তার কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যেত না। তবু প্রতিটি মাইল, পুকুর এবং প্রতিটি বাগানের বিবরণ আমি লিখে রেখেছিলাম, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ পথ ব্যবহার করলে তাদের জন্য আশ্রয় ও পানির সুব্যবস্থা থাকে।
আমাদের যাত্রাপথ ছিল বৈচিত্র্যময় এবং বিপদে পূর্ণ। ঝিকরগাছা, নীলগঞ্জ ও যশোরের বিভিন্ন অঞ্চল পার হওয়ার সময় আমি কপোতাক্ষ, ভৈরব ও নবগঙ্গার নদীগুলো পার হই। অনেক জায়গায় রাস্তাগুলো এতই দুর্গম ছিল যে জঙ্গল কেটে পথ তৈরি করতে হতো। কোথাও বাঘের উপদ্রব থাকা ঘন জঙ্গল, কোথাও আবার বিস্তীর্ণ জলাভূমি বা বিল। শ্রীরামপুর বা শিমুলিয়ার মতো গ্রামগুলোয় ভালো পানির বড় অভাব ছিল, আমাদের ছোট ছোট বিলের ওপর নির্ভর করতে হতো। ১৭ ফেব্রুয়ারি আমি জ্বরে আক্রান্ত হলেও জরিপের কাজ থামাইনি। নহাটা ও মহম্মদপুরের মতো গ্রামগুলো পার হয়ে আমরা বুড়িশ্বর বা বড়াশী নদীর দেখা পাই, যা গঙ্গার গভীর ও নাব্য শাখা। এ দীর্ঘ সফরের প্রতিটি ধাপে আমি রিচার্ডসকে বিভিন্ন শাখা নদীর দায়িত্ব দিয়েছি, যেন আমরা পুরো বাংলার একটি পূর্ণাঙ্গ জলপথের মানচিত্র তৈরি করতে পারি।
এ পুরো অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন্দ্রীয় স্থান ছিল ঢাকা। ৪ মার্চ আমি যখন বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে ঢাকা শহরে পৌঁছি, তখন আমার সামনে এ অঞ্চলের বিশালতা ও গুরুত্ব নতুন করে ধরা দেয়। ঢাকা তখন ছিল প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক তথ্য আদান-প্রদানের মূল প্রাণকেন্দ্র। এখানে ১১ মার্চ পর্যন্ত অবস্থানের সময়টি আমার জরিপের জন্য ছিল অত্যন্ত ফলপ্রসূ। ঢাকা শহরের গুরুত্ব এবং এর আশপাশের পরিবেশ আমাকে প্রভাবিত করেছিল। এ শহরে অবস্থানকালেই আমি গভর্নরের জন্য বাংলার একটি বিস্তারিত মানচিত্র তৈরির কাজ প্রায় শেষ করি। তবে ঢাকা ত্যাগের মুহূর্তে আমি এক অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটে পড়ি। আমার মাঝিরা হঠাৎ পালিয়ে যায়। তাদের ফিরে পাওয়ার আশায় এবং নতুন করে দক্ষ কুলি ও নৌকা সংগ্রহের জন্য আমাকে অতিরিক্ত কয়েক দিন ঢাকায় অবস্থান করতে হয়। ঢাকার এ বিরতি আমাকে মানচিত্রটি আরো নিখুঁতভাবে সংশোধন করার সুযোগ করে দেয়।

কলকাতার ব্যাপ্টিস্ট মিশন প্রেস থেকে ছাপা রেনেলের জার্নালের পাতা, ১৯১০ খ্রি.
ঢাকা ত্যাগের পর আমার পরিকল্পনায় ছিল গঙ্গার একটি বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করা। আমার আগের অভিযানে তৈরি করা সব মানচিত্র ভ্যানসিটার্ট ও তার সঙ্গীরা নিয়ে যাওয়ায় বর্তমানে আমি নতুন করে কাজ শুরু করি। মানচিত্রটি প্রতি ইঞ্চিতে তিন ব্রিটিশ মাইল স্কেলে ইম্পেরিয়াল পেপারের তিনটি বড় শিটে তৈরি করার লক্ষ্য ছিল। এতে জলঙ্গী থেকে সমুদ্র পর্যন্ত গঙ্গার প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি চর এবং প্রতিটি শাখা-প্রশাখার নিখুঁত অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছিল। বিশেষ করে ঢাকা শহরের সঙ্গে মেঘনা নদীর সংযোগস্থল এবং এ শহরের চারপাশের পরিবেশকে আমি আমার মানচিত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখি। ঢাকা ছিল আমার সমগ্র জরিপকার্জের একটি সূচনাবিন্দু ও দিকনির্দেশক। ঢাকার গুরুত্ব এতটাই ছিল যে আমি আমার মানচিত্রে এ শহরের চারপাশের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র খাল ও জলাশয়গুলোকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি।
জরিপের পরবর্তী ধাপে আমি রিচার্ডসকে বারাসিয়া নদী জরিপের জন্য পাঠিয়ে দিই এবং নিজে নবগঙ্গার গতিপথ অনুসরণ করে রাজবাড়ী ও রাজনগরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় কাজ শুরু করি। পথে জয়নগর ও গোপালপুর গ্রামগুলো পার হওয়ার সময় ভূপ্রকৃতির উর্বরতা পর্যবেক্ষণ করি। সেখানকার সর্পিল নদীগুলো এবং নদীর তীরের উঁচু জনবসতি আমাদের মুগ্ধ করেছিল। বড় বড় আম বাগান, নারকেল ও সুপারি গাছের তোপ আর বিশাল সব দিঘি বাংলার এ অঞ্চলের গ্রামগুলোকে এক অনন্য রূপ দিয়েছিল। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমার শারীরিক অবস্থা ক্রমান্বয়ে অবনতি হতে থাকে। ২০ মার্চ নাগাদ আমি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ি যে আমার পক্ষে ঘোড়ায় চড়া বা নৌকায় দাঁড়িয়ে কাজ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। নিরুপায় হয়ে আমি সুজাগঞ্জের কাছ থেকে মিস্টার রিচার্ডসকে সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দিই এবং নিজের চিকিৎসার জন্য পুনরায় ঢাকার পথ ধরি। এ ফেরিযাত্রা ছিল আমার জন্য অত্যন্ত কষ্টের, কিন্তু কর্তব্যবোধ আমাকে সচল রেখেছিল।
অসহ্য জ্বর ও শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যেও আমার পেশাদারত্বে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। ২৩ মার্চ বিকালে যখন আমি পুনরায় ঢাকায় ফিরে আসি, তখন নৌকায় বসে থাকাকালীনও আমি গঙ্গার মানচিত্রের কিছু কাজ এগিয়ে রাখি। একই সঙ্গে আমি গভর্নরের জন্য আমার এ দীর্ঘ অভিযানের একটি সংক্ষিপ্ত সারমর্ম তৈরি করি। ঢাকা শহরকে ঘিরেই এ জরিপ কাজের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র এবং বড় মাপের মানচিত্রটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়।
রুদ্র ইকবাল: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা









