বাংলার নারীজাগরণের ইতিহাসে শামসুন নাহার মাহমুদের অবস্থানকে শুধু একজন শিক্ষিত নারী, সাহিত্যিক কিংবা সমাজকর্মীর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তার জীবন ও কর্মকাণ্ডের দিকে গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, শিক্ষা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, পেশাজীবন, সমাজসেবা ও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার একটি ধারাবাহিক প্রয়াস তার মধ্যে কাজ করেছে। যদিও তিনি আধুনিক অর্থে কোনো নির্দিষ্ট নারীবাদী তত্ত্বের ঘোষিত প্রবক্তা ছিলেন না, পরবর্তী নারীবাদী তত্ত্বের আলোকে তার কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে তার চিন্তার অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শামসুন নাহারের নারীবাদী চেতনার প্রথম এবং সম্ভবত সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষেত্র হলো উদারপন্থী নারীবাদ (লিবারেল ফেমিনিজম)। এ ধারার মূল প্রশ্ন হলো নারী কেন পুরুষের মতো সমান শিক্ষা, সুযোগ, অধিকার ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে না? শামসুন নাহারের জীবন এ প্রশ্নের একটি বাস্তব উত্তর। সামাজিক রক্ষণশীলতা ও পর্দাপ্রথার কারণে বিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে তাকে সরে আসতে হয়েছিল, কিন্তু তিনি শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করেননি। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন এবং পরবর্তী সময়ে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। এখানে তার ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষাকে নারীর আত্মপরিচয় নির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। তিনি দেখিয়েছেন, শিক্ষা নারীকে কেবল ভালো স্ত্রী বা মা হওয়ার জন্য প্রস্তুত করে না; শিক্ষা তাকে নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, পেশাজীবী ও সমাজের সক্রিয় সদস্যে পরিণত করতে পারে।
এ জায়গায় তার ব্যক্তিগত জীবনকে পিতৃতন্ত্রের ধারণার মাধ্যমেও বিশ্লেষণ করা যায়। পিতৃতন্ত্র শুধু পুরুষের ব্যক্তিগত আধিপত্য নয়; বরং এমন একটি সামাজিক কাঠামো, যেখানে পরিবার, শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক রীতি এবং প্রতিষ্ঠানগুলো নারীর আচরণ ও সম্ভাবনার সীমা নির্ধারণ করে। শামসুন নাহারের বিদ্যালয় ত্যাগের অভিজ্ঞতা তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ। কিন্তু তার প্রতিরোধ ছিল কেবল প্রতিবাদের ভাষায় নয়; তিনি সে সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই শিক্ষিত হয়েছেন, শিক্ষক হয়েছেন, লিখেছেন এবং জনপরিসরে প্রবেশ করেছেন। ফলে তার জীবনকে প্রাতিষ্ঠানিক বাধার মধ্যেও আত্মপরিসর নির্মাণের রাজনীতি হিসেবে দেখা যায়। তিনি পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকে একদিনে ভেঙে দেননি, বরং তার ভেতরে নারীর জন্য নতুন স্থান তৈরি করেছেন।
তার কর্মকাণ্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ‘র্যাডিক্যাল নারীবাদ’-এর ধারণার সঙ্গে তুলনাযোগ্য। র্যাডিক্যাল নারীবাদ মনে করে, নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি সামাজিক ক্ষমতার কাঠামো এবং পিতৃতান্ত্রিক সম্পর্ক। শামসুন নাহারের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও জনপরিসরে প্রবেশ ছিল সে নিয়ন্ত্রণকে প্রশ্ন করার একটি উপায়। একজন নারী যখন ঘরের সীমানা অতিক্রম করে শিক্ষকতা, সম্পাদনা, সাহিত্যচর্চা কিংবা রাজনীতিতে যুক্ত হন, তখন তিনি শুধু একটি নতুন পেশা গ্রহণ করেন না, তিনি নারী সম্পর্কে প্রচলিত সামাজিক ধারণাকেও পরিবর্তন করেন। তবে তাকে সরাসরি র্যাডিক্যাল নারীবাদী বলা যাবে না। তার কর্মপদ্ধতি ছিল মূলত সংস্কারবাদী সমাজকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যানের বদলে সমাজের প্রচলিত কাঠামোর মধ্যেই নারীর মর্যাদা ও অংশগ্রহণের পরিসর বাড়ানো।
নারীবাদী ইতিহাসচর্চার (ফেমিনিস্ট হিস্টোরিওগ্রাফি) ক্ষেত্রেও শামসুন্নাহারের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বেগম রোকেয়ার জীবন ও আদর্শ তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং রোকেয়ার মৃত্যুর পর তিনি তার জীবনী রচনা করেন। এ কাজের গুরুত্ব শুধু একজন বিশিষ্ট নারীর জীবন সংরক্ষণে নয়, বরং নারীজাগরণের ইতিহাসকে নারীর অভিজ্ঞতা ও অবদানের মাধ্যমে দৃশ্যমান করার মধ্যেও নিহিত। প্রচলিত ইতিহাসে নারীরা প্রায়ই ইতিহাসের সক্রিয় নির্মাতা না হয়ে ইতিহাসের প্রান্তিক চরিত্রে পরিণত হন। শামসুন নাহার যখন রোকেয়ার জীবনী লিখেছেন, তখন তিনি একই সঙ্গে একটি নারীর ইতিহাসকে সংরক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নারী আন্দোলনের বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার পৌঁছে দেয়ার কাজ করেছেন। অর্থাৎ তিনি শুধু ইতিহাসের বিষয় ছিলেন না, ইতিহাসের লেখক ও সংরক্ষকও ছিলেন।
তার সাংবাদিকতা ও সম্পাদনা কর্মকাণ্ডকে নারীবাদী গণমাধ্যম তত্ত্ব (ফেমিনিস্ট মিডিয়া থিওরি) দিয়েও বিশ্লেষণ করা যায়। নওরোজ, আত্মশক্তি ও বুলবুল-এর মতো পত্রিকার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা তাকে এমন একটি জনপরিসরে নিয়ে আসে, যেখানে মতামত তৈরি, বিতর্ক সৃষ্টি এবং জ্ঞান প্রচারের ক্ষমতা কার্যকর হয়। নারীবাদী গণমাধ্যম তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো কে কথা বলার সুযোগ পায় এবং কার অভিজ্ঞতা সামাজিকভাবে দৃশ্যমান হয়? শামসুন নাহার মাহমুদের সম্পাদনা ও লেখালেখি নারীর কণ্ঠকে সে দৃশ্যমানতার জায়গায় নিয়ে আসে। বিশেষ করে নারী লেখকদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ নারীর মুক্তি শুধু নারীর সম্পর্কে কথা বলার মধ্যে নয়, নারী নিজে কথা বলবে, লিখবে এবং মতামত নির্মাণ করবে এ অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যেও নিহিত।
তার সাহিত্যকর্মকে নারীবাদী সাহিত্যসমালোচনার (ফেমিনিস্ট লিটারেরি ক্রিটিসিজম) আলোকে দেখলে আরেকটি দিক সামনে আসে। পুণ্যময়ী, ফুলবাগিচা, বেগম মহল, রোকেয়া জীবনী, শিশুর শিক্ষা, আমার দেখা তুরস্ক এবং নজরুলকে যেমন দেখেছি প্রভৃতি রচনা তার বহুমাত্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয়ের সাক্ষ্য বহন করে। নারী এখানে শুধু সাহিত্যের চরিত্র বা পাঠক নয়; নারী নিজেই লেখক, পর্যবেক্ষক ও জ্ঞান উৎপাদক। বিশেষত ভ্রমণ ও পর্যবেক্ষণমূলক লেখালেখি নারীর অভিজ্ঞতার পরিসরকে ঘরোয়া জীবনের বাইরে নিয়ে যায়। এর মাধ্যমে নারীকে দেখা হয় এমন একটি বস্তু থেকে যে দেখে ও বিশ্লেষণ করে এমন একটি সক্রিয় সত্তায় রূপান্তর করা সম্ভব হয়।
শামসুন নাহারে মাহমুদের শিক্ষকতা, নারী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং সমাজসেবামূলক কাজকে সমাজতান্ত্রিক নারীবাদের আলোকে পাঠ করা যায়। এ তত্ত্ব মনে করে, নারীর অধীনতা শুধু পারিবারিক সম্পর্কের ফল নয়; শিক্ষা, শ্রম, পেশা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গেও তা সম্পর্কিত। শামসুন নাহার শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন এবং নিজের জ্ঞানকে অন্যদের কাছে পৌঁছে দেন। ফলে তার ক্ষেত্রে শিক্ষিত হওয়া এবং কর্মজীবনে প্রবেশ দুটি বিষয় পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। তিনি নারীর শিক্ষাকে সামাজিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তবে তার কর্মকাণ্ডকে পূর্ণাঙ্গ সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ বলা যাবে না; শ্রেণী, শ্রম শোষণ ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্ন তার কাজের প্রধান কেন্দ্র ছিল এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
অন্যদিকে তার জীবন উত্তর-ঔপনিবেশিক নারীবাদের (পোস্ট-কলোনিয়াল ফেমিনিজম) আলোচনায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ছিলেন ঔপনিবেশিক বাংলার মুসলিম নারী, ফলে তার অভিজ্ঞতাকে কেবল পশ্চিমা নারীবাদের সাধারণ কাঠামোয় ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। পর্দাপ্রথা, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, নারীশিক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং ঔপনিবেশিক আধুনিকতার দ্বৈত প্রভাব সব মিলিয়ে তার সামাজিক বাস্তবতা ছিল জটিল। তিনি পশ্চিমা সমাজের অনুকরণে নারী মুক্তির ধারণা প্রতিষ্ঠার বদলে নিজের সমাজের ভেতর থেকেই পরিবর্তনের পথ অনুসন্ধান করেছেন। এখানেই তার কর্মকাণ্ডের দেশজ বৈশিষ্ট্য। তার কাছে নারী মুক্তি ছিল শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, নৈতিক উন্নতি, সামাজিক দায়িত্ব ও জনজীবনে অংশগ্রহণের সমন্বিত বিষয়।
সবশেষে, তার কর্মকাণ্ডকে ইন্টারসেকশনাল নারীবাদের একটি প্রাথমিক বিশ্লেষণী কাঠামো দিয়েও দেখা যায়। আধুনিক ইন্টারসেকশনালিটি দেখায় যে একজন নারীর অভিজ্ঞতা শুধু নারী পরিচয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; শ্রেণী, ধর্ম, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও ঔপনিবেশিক অবস্থানও তার অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে। শামসুন নাহারের ক্ষেত্রে মুসলিম নারী হিসেবে সামাজিক পরিচয়, শিক্ষার সুযোগ, মধ্যবিত্ত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর এবং ঔপনিবেশিক বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে এটিও মনে রাখতে হবে যে ইন্টারসেকশনালিটি তার সময়ের প্রচলিত তাত্ত্বিক ভাষা ছিল না, এটি তার জীবনকে বোঝার জন্য পরবর্তী কালের একটি বিশ্লেষণী ধারণা।
অতএব, শামসুন নাহার মাহমুদের নারীবাদী চেতনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর জীবনঘনিষ্ঠতা। তিনি নারী মুক্তিকে শুধু তাত্ত্বিক আলোচনায় রাখেননি, নিজের শিক্ষা, পেশা, লেখালেখি, সম্পাদনা, সমাজসেবা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। তার সীমাবদ্ধতাও ছিল তিনি পিতৃতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিলোপের বিপ্লবী কর্মসূচি দেননি এবং শ্রেণীগত বৈষম্য তার চিন্তার প্রধান বিষয় ছিল না। তবু তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব কমে না। বরং তার জীবন দেখায় নারীবাদ সবসময় কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের নাম উচ্চারণ করে শুরু হয় না; অনেক সময় তা শুরু হয় একটি মেয়ের শিক্ষার অধিকার দাবি করার মধ্য দিয়ে, তারপর কলম ধরার সাহসে, নিজের পেশা বেছে নেয়ার অধিকারে এবং শেষ পর্যন্ত সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নিজের কণ্ঠ প্রতিষ্ঠায়। এ অর্থে শামসুন নাহার মাহমুদ বাংলার নারীজাগরণের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশজ নারীবাদী চেতনার প্রতিভূ।
সুরাইয়া ইয়াসমিন সূচনা: প্রভাষক,
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক










