ইংরেজি ১৯১৪ সালে যখন আমি প্রথম স্কুলে পড়তে যাই, তখন থ্রি’তে ভর্তি হলাম। অতবড় স্কুল, কত রাশি রাশি মেয়ে। তার মধ্যে মুসলমান মেয়ের সংখ্যা দু’চারটির বেশি নয়; তাও নীচু ক্লাশে। আবদুর রহমান দোভাষের দু’মেয়ে স্কুলে পড়ত কিছু দিন। তাদের দুজনের নামে ছিল দোভাষের দু’খানা জাহাজ—‘আমেনা’ আর ‘জামেনা’। ভারী মজা লাগত শুনে। আর পড়ত স্কুলের বুড়ী দাইয়ের নাতনী, জয়নাব। আজ ভাবি, যে যুগে শিক্ষিত অবস্থাপন্ন পরিবারের মেয়েদের জন্যে স্কুলের চৌকাঠ ডিঙানো ছিল নিষেধ, সে যুগে বুড়ী দাই কোন্ সাহসে আর কোন্ দুরাকাঙ্ক্ষার মোহে ছোট্ট নাতনীটিকে স্কুলে ভর্তি করাতে পেরেছিল। আর যারা পড়ত আমার সঙ্গে, তাদের মধ্যে ছিল বিপ্লবী কল্পনা দত্তের বড় বোন অমিয়মাখা। পরে যখন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন সম্পর্কে কল্পনার নাম দেশময় ছড়িয়ে পড়ে, তখন জানতে পেরেছিলাম কল্পনা অমিয়মাখার ছোট বোন। দেশ প্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের বোনেরাও ঐ স্কুলে পড়তেন আমাদের সময়ে।
...আমরা স্কুলে যেতাম মোটর বাসে। স্কুলের দু‘খানা বাস ছিল—নাম ‘শাহজাহান’ আর ‘নূরজাহান’। চট্টগ্রাম রাজপথে মোটরের আনাগোনা শুরু হয়নি তখনো। এক ঝাঁক মেয়ে নিয়ে আমাদের মোটর বাস উঁচু-নীচু রাস্তা ধরে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে স্কুলের দিকে ছুটে চলত। সঙ্গে সঙ্গে পথচারীদের চমক লাগিয়ে দিত বেশ একটু।
এই সেদিন আবার চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম প্রায় পঁচিশ বছর পরে। বিস্তর অদল-বদল হ’লেও স্কুলের অনেক জায়গায় কোন চাপ পড়েনি পরিবর্তনের। সেই খেলার মাঠ—যেখানে আমরা রোজ হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট, বুদ্ধি মন্তর খেলতাম—আজো তেমনি আছে। যেখানে আমরা কোন অতিথির অভ্যর্থনার জন্যে সমবেত হতাম—আবৃত্তি, অভিনয় ইত্যাদি আয়োজন নিয়ে সেই লাইবেরি হলে মেয়েরা আজ জড় হ’লো ঠিক তেমনি। মস্ত বড় একটা পরিবর্তন কিন্তু চোখে পড়ল সেদিন আর আজকের দিনে। ছাত্রীদের মধ্যে রাশি রাশি মুসলমান মেয়ে—শুধু তাই নয়, টিচাররাও অনেকেই মুসলমান। আরো ভালো লাগল এই জন্যে যে, কলকাতা লেডী ব্রেবোর্ন কলেজে আমার ছাত্রী ছিলেন এওই হেডমিস্ট্রেস এবং অন্য টিচারদের কয়েকজন।
স্কুলের ক্লাশ সিক্সে পড়তে পড়তেই তাগিদ শুরু হয়েছিল পর্দার। আমার বয়স তখন ন‘বছর। ক্লাশ সেভেনের চৌকাঠ পার হবার সঙ্গে সঙ্গেই স্কুল ছাড়তে হ’লো। ক্লাশে সবচেয়ে ছোট ছিলাম বলে টিচাররা আমায় স্নেহ করতেন সবাই। জিজ্ঞেস করলেন, স্কুল ছাড়ছি কেন। বললাম, ‘বড় হয়ে গেছি, তাই।’ ঐ বয়সে কি করে বড় হয়ে গেলাম, তাঁরা ভেবে পেলেন না।
প্রাইভেট পড়ে ম্যাট্রিক দেবার জন্যে তৈরী হলাম ১৯২৬ সালে। বাড়ীতে পড়াতেন যে বুড়ো মাষ্টার—পড়বার সময়ে তাঁর আর আমার মাঝখানে ঝুলত এক বিরাট পর্দা-চার হাত চওড়া আর আট হাত লম্বা। তার তলা দিয়ে শিক্ষক তার ছাত্রীর বইপত্র আদান-প্রদান চলত ঠিকই; কিন্তু পর্দার এপার থেকে ওপারে পড়া বোঝানো আর এলজেবরা, জিওমেট্টি কষানো চলত কি ক’রে তা সত্যি ভাববার বিষয়।
পরীক্ষার ফল যখন বেরুল—তখন কলেজে পড়বার জন্যে চলল আমার হাঙ্গার স্ট্রাইক। তার ফল ফলতে কয়েক মাস লেগে গিয়েছিল। বড়দিনের ছুটির পর এলাম কলকাতা ডায়োসিসন কলেজে পড়তে। অবরোধের নিদর্শন বোরখা কিন্তু তখনো আমার সঙ্গ ছাড়েনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হলে তার আবক্ষ ভাস্কর্য
এদিকে আর এক মুস্কিল। প্রথম বার্ষিক পরীক্ষার মোটে দুই মাস বাকি; কলেজের প্রিন্সিপাল সিষ্টার কেরোলাইন এলিজাবেথ বললেন, ‘তার চেয়ে সামনের বারে এসো।’ বললাম, ‘সিষ্টার, সে সুযোগ হয় তো আমার জীবনে আর কোন দিনই আসবে না।’ দয়া হল প্রিন্সিপালের মনে। বাধার আর একটা প্রাচীর ডিঙিয়ে গেলাম। সেকালে ডায়োসিসন কলেজের সুনাম ছিল যথেষ্ট। ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কলেজ বলে পরিচিত ছিল ডায়োসিসন। কলেজে বাঙালি মেয়ে ছাড়া ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের মেয়েরাও সংখ্যায় নেহাৎ কম ছিল না। যাদের সাহচর্যে কলেজ জীবন আনন্দমুখর হয়ে উঠত তাদের বেশির ভাগ আজ জনতার মধ্যে হারিয়ে গেছে। যারা জনতার ঊর্ধ্বে মাথা উঁচু ক’রে দাঁড়াতে পেরেছিলেন তাঁরাও আজ বহু দূরে, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রটুকু আর খুঁজে পাওয়া যায় না। স্কুলে যেমন, কলেজেও তেমনি, মুসলমান মেয়ে দু’চারটির বেশি দেখা পাইনি। আসামের প্রাক্তন মন্ত্রী আবদুল মজিদের কন্যা মাফিদা আমাদের সঙ্গে পড়তেন। ভারতের প্রাক্তন পুনর্বসতি সচিব মোহনলাল শাকসেনার পত্নী ছিলেন ছাত্রীজীবনে ডায়োসিসনে আমাদের সহপাঠিনী। এ ছাড়া আমাদের দলের বাঙালি মেয়েদের মধ্যে কর্মজীবনে কেউ কেউ শিক্ষাবিদ হিসাবে পরিচিত হয়েছেন, কেউ সমাজ-সেবায় খ্যাতি অর্জন করেছেন আর কেউ বা আইন পরিষদের সদস্যপদ লাভ করেছেন। পরবর্তীকালে সামাজিক ক্ষেত্রে কলেজের এই সতীর্থদের কয়েকজনকে পেয়েছিলাম সহকর্মী হিসাবে। প্রথম কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট ডব্লিউ সি ব্যানার্জির পৌত্রীরা কয়েক বোন আমাদের সময়ে ডায়োসিসনের ছাত্রী ছিলেন। বীণা দাস নামে যে মেয়েটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে বাংলার গভর্নর স্যার স্ট্যান্সি জ্যাকসনকে গুলি করবার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড লাভ করেছিলেন, ডায়োসিসন কলেজে তিনি ছিলেন আমাদেরই সমসাময়িক। এখন তিনি পশ্চিমবঙ্গ আইন-পরিষদের সদস্যা। সুবিখ্যাত মারাঠী শিক্ষাবিদ স্যার ভাণ্ডারকরের পৌত্রী সুমতি ভাণ্ডারকর ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিহ্নিত ছাত্রী। সে আমাদের সঙ্গে একই ক্লাশে পড়ত। সুশ্রী, শান্ত মেয়েটি-পড়াশোনায় তার সঙ্গে এঁটে ওঠা দায় ছিল। আইএ পরীক্ষায় সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পঞ্চম স্থান অধিকার করে। উঁচু ক্লাশের লীলা রায়কে আমরা বেশ একটু সম্ভ্রমের চোখে দেখতাম, কারণ তিনি ইতিপূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন। কলেজে গান-বাজনা ও অভিনয়ের দিকটা জমিয়ে রাখতেন রবীন্দ্রনাথের পরিবারের দু’তিনটি মেয়ে। নৃত্যশিল্পী হিসাবে কলেজের বাইরে রেবা রায়ের খুব নাম হয়েছিল শুনতে পেতাম। সে যুগে স্কুল-কলেজের নাট্যমঞ্চ তখনো পর্যন্ত নৃত্যমুখর হয়ে ওঠেনি। কলেজে রেবাকে নাচতে দেখিনি কখনো। কুমারী জীবনে বেগম লিয়াকত আলী খান যখন বি টি পড়বার জন্যে কলকাতা ডায়োসিসন কলেজে আসেন তখন আমিও ডায়োসিসনের ছাত্রী।
১৯৪২ সালে যখন এমএ পরীক্ষা দিই তখন আমি একাধারে অধ্যাপক ও ছাত্র দু-ই। দুনিয়াজোড়া যুদ্ধের ডামাডোল, দেশময় দুর্ভিক্ষের ধ্বংসলীলা, নানাবিধ সামাজিক ও শিক্ষা বিষয়ক কাজে এবং নিজের সংসারে নিবিড়ভাবে জড়িত হয়ে পড়েছি। পারিবারিক শোক ও বিপদ পর পর হেনেছে কঠিন আঘাত। তারি মধ্যে পাস করবার ঠিক দশ বছর পর আমাকে ছাত্রীর ভূমিকা গ্রহণ করতে হল বিএ আবার। জাপানি বিমানাক্রমণের আতঙ্ক তখন কলকাতা শহরকে পেয়ে বসেছে। যখন-তখন তীক্ষ্ণ সাইরেন ধ্বনিতে সচকিত হ’য়ে উঠেছে কলকাতার আকাশ-বাতাস। যে যেদিকে পারছে কলকাতা ছেড়ে পালাবার ধূম! ঠিক পরীক্ষার মাঝখানে শুরু হ’ল কংগ্রেসের ১৯৪২ সালের আইন অমান্য আন্দোলন। পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখি ইউনিভারসিটি প্রাঙ্গণে ছেয়ে আছে বিক্ষুব্ধ আন্দোলকারীর দল। দোতলার হলে বসে লিখছি; নীচে পুলিশের সঙ্গে চলেছে তাদের সংঘর্ষ। তাদের উত্তেজিত শ্লোগান ও কোলাহলে ইউনিভার্সিটি কেঁপে উঠেছে বারবার। তারই মধ্যে এমএ পরীক্ষা শেষ করলাম; সঙ্গে সঙ্গে আমার ছাত্রী জীবনেও হ’ল যবনিকাপাত।
[১৯৬৪ সালে ‘কাকলি’ পত্রিকায় প্রকাশিত]
রচিত গ্রন্থমালা
পুণ্যময়ী, ১৯২৫
ফুলবাগিচা, ১৯৩৬
বেগম মহল
রোকেয়া-জীবনী, ১৯৩৭
শিশুর শিক্ষা, ১৯৩৯
আমার দেখা তুরস্ক, ১৯৫৫
নজরুলকে যেমন দেখেছি, ১৯৫৮
নার্স (অনুবাদ)
পাঠ্যপুস্তক
সবুজ-পাঠ, ১৯৩৯
কিশোর-সাথী, ১৯৩৮
বিচিত্র পাঠ
তাজমহল পাঠ
সম্পাদিত পত্রিকা
বুলবুল পত্রিকা (ভ্রাতা হবীবুল্লাহ্ বাহারের সঙ্গে যুগ্ম সম্পাদক)
নওরোজ: মহিলা বিভাগের সম্পাদক
আত্মশক্তি: মহিলা বিভাগের সম্পাদক










