সাগরনাল ফরেস্ট অফিসের চাং-বাংলোয় ভালোয় ভালোয় ফিরে আসতে পেরে অনিকেত এহতেশামের ধড়ে জান ফিরে আসে। তরুণটিকে বিভ্রান্ত দেখায়। সে নার্ভাসভাবে খুঁটির ওপর দাঁড় করানো চাং-বাংলোটির সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় ওঠে। তারপর ওখানে দাঁড়িয়ে খানিক দূরে টিলা-টক্করের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকায় যে বুঝিবা নিশ্চিত হতে চাচ্ছে, কোনো আততায়ী তাকে অনুসরণ করে এদিকে ছুটে আসছে কিনা। আউরি লেগে নতুন কোনো জায়গায় পথ হারানো অনিকেতের জন্য নতুন কিছু না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসীমউদ্দীন হল ছেড়ে গতকাল সে বন বিভাগের এই বিড অফিসে এসে পৌঁছেছে। এখানে তার পরিচিত প্রিয় মানুষ মুরাদ ভাই বিড অফিসার হিসেবে কাজ করছেন। মানুষটি বনানীর প্রান্তিকে এ চাং-বাংলোটিতে একাকী বিচ্ছিন্ন হালতে বাস করছেন। এদিকে সংবাদপত্র এসে পৌঁছে না। চাং-বাংলোটির বারান্দাসংলগ্ন একটি কামরায় তার অফিস। পেছন দিকের দুটি কামরা নিয়ে তার কোয়ার্টার। অনিকেত এসে ঢোকে গেস্ট কামরায়। অপরাহ্ন ঘনিয়ে আসছে। মুরাদ ভাই ফরেস্ট গার্ডদের নিয়ে জঙ্গল ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছেন। রান্নাঘরে কামকাজের ঝি-বেটি রাতের রান্নাবান্না গুছিয়ে হয়তো পাড়া বেড়াতে গেছে। একা কামরাটিতে বসে অনিকেতের গা ছমছম করে ওঠে।

মুরাদ ভাই পড়তে ভালোবাসেন। তাই গতকাল সগরনালে আসার পথে অনিকেত কুলাউড়া রেলওয়ে জংশনের বুকস্টল থেকে তার জন্য বিচিত্রা, সচিত্র সন্ধানী, রোববার ইত্যাদি পত্রপত্রিকা নিয়ে এসেছে। একটু আগে যা ঘটে গেছে, তা থেকে মনকে সরানোর জন্য অনিকেত ম্যাগাজিনগুলো নাড়েচাড়ে, কিন্তু পড়তে ইচ্ছা হয় না। মুরাদ ভাই সদালাপি আড্ডাবাজ মানুষ, নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য মাঝেমধ্যে এক-আধটু পানও করেন। তাই অনিকেত তার ট্রাভেল ব্যাগে করে নিয়ে এসেছে কেরু কোম্পানির রামের একটি পাঁইট। এ ট্রিপের আগে সে তার বড় ভাইয়ের বেতনের চেকটি ক্যাশ করেছে। বড় ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসার। তিনি কমনওয়েলথের বৃত্তি পেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ছুটিতে বিলাত গেছেন সাসেক্স ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করতে। ছোট ভাই অনিকেতকে স্যালারি উইথড্র করার জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়ে গেছেন। এতে বছর দু-তিনেকের জন্য তার অর্থ উপার্জনের দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে তার মাস্টার্স করার কথা। তবে অনিকেত লেখাপড়ার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়েছে অনেক দিন হলো। পরীক্ষার প্রস্তুতি সে নেয়নি, মাস আটেক হতে চলল সে বাংলা বিভাগের ধারকাছ দিয়েও যায়নি। তার সাহিত্যচর্চার ধাত আছে। অনিকেতের আসল নাম এহতেশাম আহমেদ। এ ধরনের নাম সেকেলে, লেখকদের কেউ কেউ হালফিল আরবি-ফার্সি নাম পাল্টে বাংলা নাম নিয়েছেন। এতে তাদের প্রকাশনায় কিঞ্চিত সফলতাও এসেছে। তো সে তার নামটি বদলে তাতে অনিকেত শব্দটি জুড়ে দিয়ে কয়েকটি ছোটগল্প লিটল ম্যাগাজিনে ছাপিয়েছে। বিশেষ কেউ তা পড়েছে বলে মনে হয় না। কারো কাছ থেকে এ বাবদ সে কোনো তারিফও শোনেনি।

পেশাদার সাহিত্যিক সে হতে চায় কিনা এ ব্যাপারে অনিকেত নিশ্চিত না। বিকল্প কোনো পেশা যেমন বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরিতে ঢোকা, ছোটখাটো ব্যবসা ফাঁদা বা বিদেশে গিয়ে শ্রমজীবী হওয়া—কিছুই তার মনঃপূত হয়নি। বড়ভাই বিদেশে যাওয়ায় তার লেখাপড়া আগাচ্ছে কিনা, এ বাবদ নজরদারি করার কেউ নেই। স্যালারির চেক ক্যাশ করে কিছু টাকা গ্রামের বাড়িতে মায়ের নামে মানিঅর্ডার করা ছাড়া তার জগত-সংসারে আর কোনো দায়িত্ব নেই। একাডেমিক লেখাপড়ায় আগ্রহ হারানোর পর ঢাকা শহরে মাসের পর মাস বসবাস করতে তার বিবমিষা ধরে গেছে। তাই চেক ক্যাশ করার পর হাতে টাকা এলেই সপ্তাহ খানেকের জন্য মফস্বলের কোথাও ঘুরে বেড়ানোর প্রবণতা তার মধ্যে দেখা দিয়েছে। তো মাস কয়েক আগে সে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে বেড়াতে গিয়েছিল। ওখানে তার স্কুলজীবনের এক ক্লাসমেট কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছে। অতিথি হয়ে কৃষি কর্মকর্তার বাসায় সপ্তাহ খানেক তার সুন্দর কাটে। ওই সময় গারোপল্লীতে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয়। ঢাকা ফিরে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সংস্কৃতিকে পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে সে লিখেছিল একটি ছোটগল্প। গল্পটি সাবমিট করামাত্র ছেপে যায় চমত্কার সার্কুলেশনের একটি দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। সাহিত্য সম্পাদক নিজে গরজ করে তাকে এ রকম মফস্বলের প্রেক্ষাপটে আরেকটি গল্প তৈরি করে দিতে বলেছেন। বিষয়টা মুরাদ ভাইকে চিঠিতে জানালে তিনি তাকে সাগরনালে আসতে দাওয়াত করেন। এ এলাকা একসময় আগর করবারের জন্য বিখ্যাত ছিল। জঙ্গল কেটে ফেলার ফলে বনানীতে আগর গাছের সংখ্যা কমে এসেছে। তবে কিছু আগর কারবারি এখনো জীবিত আছেন। তার প্রস্তাব হচ্ছে, আগর ব্যবসাকে বিষয়বস্তু করে একটি গল্প সে চাইলে দাঁড় করাতে পারে।

তো আজ একটু আগে দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর কাঁধঝোলায় নোটপ্যাড ও ডটপেন নিয়ে সে ঘুরতে বেরিয়েছিল। নিজের চোখে ভরদুপুর বেলা যে বিষয়টি সে পর্যবেক্ষণ করেছে, তার বাস্তব কোনো ভিত্তি আছে কিনা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। মুরাদ ভাই একটু পর ফিরবেন। তাকে এ বিষয় বললে তিনি না আবার গাঁজাখুরি বলে ঠাট্টা করেন। অনিকেত ঘটনাটি ভুলে যাওয়ার আগে নোটপ্যাডে লিখে ফেলতে চায়। গতকাল কুলাউড়া জংশনে ট্রেন থেকে নেমে বাস ধরে সে সাগরনালে আসছিল। মুড়ির টিনের আকৃতির বাসটি এতই পুরনো যে জার্কিংয়ের তীব্র তাড়নে আন্দাজ করছিল, বেডফোর্ড বাহনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন ফৌজরা সমরাস্ত্র বহনের ট্রাক হিসেবে ব্যবহার করত। তারপর যুদ্ধ তামাদি হলে অকশনে বজরা গোছের ট্রাকগুলো বিক্রি করে সৈনিকরা ফিরে যায় নিজ দেশে। নিলামে কেনা ট্রাকটিকে কোনো বাঙালি গাড়ি ব্যবসায়ী কাঠমিস্ত্রি দিয়ে চেসিস-বডি ইত্যাদি তৈরি করিয়ে সড়কে নামায়। এ থিমের ভিত্তিতে সে মনে মনে একটি ছোটগল্পের ছক কাটছিল। কিন্তু ঝাঁকুনি খানিকটা প্রশমিত হলে তার ঘুম পায়।

ঠিক কতক্ষণ অনিকেত ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ঢুলছিল, বলা মুশকিল। হঠাৎ করে কন্ডাক্টর টিনের বডিতে চাপড় দিলে আওয়াজে ধড়ফড় করে জেগে ওঠে। চোখ কচলাতে কচলাতে বুঝতে পারে, মুড়ির টিনটি ফের স্টার্ট নিয়ে মৃদুমন্দ গতিতে আগুয়ান হচ্ছে। অনিকেত একশলা গোল্ডলিফ ধরিয়ে ধুলাবালি ও রোদের জন্য বন্ধ করে দেয়া জানালাটি নামায়। দেখে, বাসটি সড়কের দুই পাশে সমান করে ছাঁটা চা ঝোপের ভেতর দিয়ে হেলেদুলে চলছে। উল্টা দিক থেকে কিছু একটা এদিকে এলে, হর্ন বাজিয়ে বাসটি কায়ক্লেশে এক পাশে হেলে গিয়ে পাস দেয়।

ওপাশ থেকে একটি ঘোড়ার গাড়িকে চা ঝোপের কিনারার ঘাস ধামসিয়ে আসতে দেখে সে ভারি তাজ্জব হয়! আজকাল ঘোড়ার গাড়ির চলাচল উঠে গেছে না? কষ্টেসৃষ্টে দুজন বসার মতো সিটওয়ালা এ কিসিমের ঘোড়ার গাড়িকে টমটম বলে না এক্কা বলে, তা খোদাতাআলাই জানেন। কোচওয়ান হিসেবে চাবুক হাতে একটি চকোলেট রঙের ঘোড়ার পেছনে দাঁড়িয়ে গাড়িটি হাঁকাচ্ছেন বয়স্ক পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এক গোরা সাহেব। রোদে পুড়ে সাহেবটির মুখমণ্ডল তামাটে হয়ে আছে। পাঞ্জাবির ওপর ঝোলানো ক্রুশ প্রতীকটি ছড়াচ্ছে রুপালি আভা। পেছনের সিটে কনে-বউয়ের মতো লাজরক্তিম হয়ে বসে আছে বেজায় কালো গাত্রবর্ণের এক চা শ্রমিক যুবতী। ঘোড়ার গাড়ির দোলনে তার দেহ থেকে ছলকে ওঠে ভরভরতি যৌবন।

রাত্রিবেলা মুরাদ ভাই চাং-বাংলোয় ফিরলে তারা রামের বোতলটি খুলে বারান্দায় বসে। অনিকেত ঘোড়ার গাড়ির উল্লেখ করে। তিনি তার দিকে অবাক হওয়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে তুড়ি মেরে বিষয়টি নাকচ করে মন্তব্য করেন, ‘তুমি চিলিমে দম দিয়া বাসে উঠছিলা নাকি? ঘোড়ার গাড়ি আইব কই থাইক্কা? আজকাল তো চা-বাগনে ইংরেজ সাহেব-সুবার দেখাই পাওয়া যায় না। হক্কল কিছু আমাদের মতো কালো চামড়ার বাঙালি ম্যানেজাররা চালায়। আর এরা হাঁকায় হয় কাওয়াসাকি মোটরবাইক, না হয় উইলিস জিপ।’ মুরাদ ভাই আইসোলেটেড হয়ে একটি জঙ্গা জায়গায় দিনযাপন করছেন। ট্রানজিস্টার রেডিও সব সংবাদ কাভার করে না। তাই তিনি ঢাকার বিষয়-আশয় জানতে চান। অনিকেতকে সাম্প্রতিক সামরিক অভ্যুত্থানর সম্পর্কে সরাসরি প্রশ্ন করলে আলাপ অন্য খাতে বয়। ঘোড়ার গাড়ি বাবদ আর কোনো বাতচিত হয় না।

ঘটনার কোনো কূল-কিনার করতে না পেরে নার্ভাস হাতে আজ দুপুরে যা দেখেছে, তা বিস্তারিত লিখতে বসে অনিকেত। ঘুরতে বেরিয়ে চাং-বাংলো থেকে বেরিয়ে খানিক সামনে যেতেই সে দেখে, টিলা পেঁচিয়ে উপরে উঠে গেছে সিমেন্টে বাঁধানো সিঁড়ি। কী যেন ভেবে অনিকেত উঠে যায় উপরে। গেটে ‘নরওয়েজিয়ান খ্রিস্টান মিশনারি’ ফলকটি দেখে তার কৌতূহল চাগিয়ে ওঠে। একটি পুরনো ধাঁচের বড়সড় বাংলো ঘিরে সমান করে ছাঁটা কাঁটামেহেদির বেড়া। সে বেড়ার পাশে আসতেই শুনতে পায় মেয়েলি কণ্ঠে খিলখিল হাসির শব্দ। অনিকেত ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও অটোমেটিক্যালি উঁকি দেয়, দেখে, রেইন ট্রির ছায়ায় বেতের চেয়ারে লুঙ্গি পরে বসে ঘোড়ার গাড়ি হাঁকানো সাহেবটি। সামনের টিপটে চায়ের সরঞ্জাম। খানিক দূরে চকোলেট রঙের ঘোড়াটি ঘাস খাচ্ছে। তার পাশে গাছ থেকে ঝোলানো দোলনায় বসে দুলছে কালো গাত্রবর্ণের চা শ্রমিক মেয়েটি। দুলুনিতে তার বুক থেকে খসে পড়ে আঁচল।

উঁকিঝুঁকি দেয়া অনধিকারচর্চা ভেবে সে অতঃপর নেমে আসে নিচে। কিন্তু কিছুতেই খুঁজে পায় না চাং-বাংলোটি। তো সে ফিরে যায় মিশনারি বাংলোর টিলাটির কাছে। ভারি অবাক হয় ওখানে সিমেন্টের সিঁড়িটি দেখতে না পেয়ে! শুধু কি তাই, মিশনারি বাংলোর টিলাটিও যেন উবে গেছে জাদুবলে! তার পরিবর্তে দেখে, দাঁড়িয়ে আছে মাটি খুঁড়ে গাতা-গর্তে ভর্তি একটি ন্যাড়া আধভাঙা টিলা। এবার সে রীতিমতো ভয় পেয়ে যায়। আবার চাং-বাংলোয় ফিরতে গেলে বারবার একই সড়কে ঘুরপাক খায়। অবশেষে একটি রাখাল বালক তাকে দেখিয়ে দেয় ফরেস্টের চাং-বাংলোটির নিশানা।

এ পর্যন্ত লিখে ফেলার পর এক অজানা আতঙ্কময় অনুভূতি মেঘে ঘেরা চাঁদের মতো তাকে বিষণ্ন করে তোলে। তার অবচেতনের গহিন গোপন থেকে কে যেন কী বলতে চায়। দারুণ অস্বস্তি হয় অনিকেতের। ছোট্ট গেস্ট কামরাটিতে অস্থিরভাবে পায়চারি করে সে। তারপর চাং-বাংলোর নির্জনতার সুযোগে ট্রাভেল ব্যাগ থেকে বের করে খেলনাটি। মাস কয়েক আগে তার বড় ভাই বিলাত থেকে এ শিশুতোষ টয়টি পাঠিয়েছেন তাদের ছোট্টমোট্ট ভাগ্নি রিমঝিমের জন্য। টয়টি আদতে একটি ছোটখাটো স্লাইড প্রজেক্টর। তাতে পোরা আছে বিচিত্র ছবিওয়ালা কিছু স্লাইড। মাঝে মাঝে এতে চোখ রাখলে তার টেনশন কমে, মন হয়ে ওঠে কল্পনাপ্রবণ। তাই খেলনাটি সে রিমঝিমকে না পাঠিয়ে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। এজন্য গ্লানিবোধ হয় হামেশা। আর জসীমউদ্দীন হলের সতীর্থ সমাবেশে সে নিরিবিলিতে খেলনাটি হাতে নেয়ার সুযোগও পায় না। তবে মফস্বলে বেড়াতে এলে অতিথি হিসেবে নিজস্ব কামরায় নির্জনতায় সে ইচ্ছামতো টয় স্লাইড প্রজেক্টর নিয়ে খেলাটেলা করার স্বাধীনতা পায়। অনিকেত বোতাম টিপে একটি স্লাইড সরিয়ে সামনে নিয়ে আসে অন্য একটি পিকচার স্লাইড। চিত্রটির নাম ‘এনচানটেড ফরেস্ট’ বা জাদুময় বনানী। সে ধুন ধরে তাকিয়ে থাকে কাণ্ডে গাতা-গর্ত ও কাঠঠোকরার খোদলের কারণে তৈরি হওয়া মুখের আকৃতির দিকে। ধীরে ধীরে আকৃতি দুটো পরিষ্কার শেপ নেয়। শিউরে ওঠে অনিকেত! সে দেখে, একটি গাছের কাণ্ড থেকে হাসি হাসি চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে ঘোড়ার গাড়িতে বসে থাকা কালোকুলো কামিন কন্যাটি। অন্য বৃক্ষটির কাণ্ডে ফুটে উঠেছে গোরা সাহেবের রোদে পোড়া মুখমণ্ডল। তিনিও তাকে অবলোকন করছেন দারুণ আগ্রহে। বাইরে মোটরবাইকের আওয়াজ শোনা গেলে সে স্লাইড প্রজেক্টরের মতো খেলনাটি চটজলদি ঢুকিয়ে ফেলে ট্রাভেল ব্যাগে।

হোন্ডা হাঁকিয়ে মুরাদ ভাই চাং-বাংলোয় ফেরেন। জঙ্গলে বনদস্যুদের তাড়া করে ঘাম-গরমে কাহিল হয়ে ফিরেছেন তিনি। ঝি-বেটি ফ্লাস্কে গরম চা রেখে গেছে। পেয়ালায় ঢেলে চা পান করতে করতে অনিকেতের নিয়ে আসা দৈনিক বাংলা পত্রিকার অনেকগুলো পুরনো সংখ্যা দেখতে শুরু করেন। অনিকেত মিনমিন করে আলাপ জমাতে চায়, ‘এদিকে মিশনারিদের একটা বাংলো আছে না?’ পত্রিকা থেকে চোখ তুলে বাইফোকাল চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে মুরাদ ভাই জবাব দেন, ‘এখানে না, সাগরনাল থেকে ৩৫-৩৫ মাইল দূরে লক্ষ্মীপুর চা বাগানের কাছে আছে একটি মিশন।’ তিনি আর কিছু না বলে পত্রিকায় নজর দেন। চট্টগ্রামের সার্কিস হাউজে জেনারেল জিয়ার নিহত হওয়ার সময়কার প্রতিটি সংবাদ তিনি খুঁটিয়ে পড়ছেন। তাই অনিকেত তাকে আর কোনো প্রশ্ন করে বিরক্ত করতে চায় না।

বেশ খানিকক্ষণ ধরে পত্রিকা ঘেঁটে চশমা মুছে উঠে দাঁড়িয়ে মুরাদ ভাই বলেন, ‘তুমি না আগর করার সম্পর্কে জানতে চাইছিলা, উঠো, বাজারের দিকে মেলা দিই, আজকের হাটবার, বারইবুড়াকে বাজারে ধরা যাবে। আগর লাইনের লোক ওই বুড়া।’ কাঁচা সড়কে ধুলা উড়িয়ে হোন্ডায় গ্রামের বাজারে এসে পৌঁছতে তাদের মিনিট বিশেক লাগে। হাটবার বলে বাজারটি মানুষজনে রমরম করছে। চেনা ফার্মেসির সামনে বাইকটি দাঁড় করিয়ে মুরাদ ভাই বারইবুড়ার তালাশে পা বাড়ান। পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে অনিকেত দেখে, পথের পাশে বিক্রি হচ্ছে ছুতারের হাতে তৈরি কুটি-চৌকি, লাঙল-জোয়াল, পিঁড়ি ও আঁটি বাঁধা জ্বালানির লাকড়ি। খুঁজতে খুঁজতে তারা এসে ঢোকে আনাজপত্রের গলিতে। তাজা শাকসবজির ওপর ছড়ানো জল শিশিরের মতো টলমল করছে। পাশেই মাছ-হাটা, অনেক দিন পর চাঙারিতে রাখা অতি ক্ষুদ্র রুপালি কেঁচকি মাছ ও নড়েচড়ে ওঠা জিয়ল মাছ দেখতে অনিকেতের বেশ ভালোই লাগে। চাউল-হাটার পাশেই মুড়ি, মুড়কি, মোয়া ও গুড়ের দোকাপাট। কাছেই একটি ছাপড়া চায়ের দোকানে পাওয়া যায় বারইবুড়াকে।

খোলা চুলায় ডোবা তেলে ভাজা হচ্ছে ডালের বড়া। কুঁচি করে কাটা পেঁয়াজ, ধনেপাতা ও কাঁচামরিচের গন্ধের সাথে কেতলিতে বলকানো চা-পাতার সৌরভ মিশে টি-স্টলটির বাতাস ভারি হয়ে আছে। কাটা বাঁশে তৈরি বেঞ্চে বসে মুরাদ ভাই অনিকেতকে বারইবুড়ার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তাঁর আসল নাম আব্দুল বারী। রীতিমতো বৃদ্ধ তিনি, বয়স ৮০ কিংবা ৮৫—নজর করে বলা মুশকিল। ধবধবে সাদা দাড়ি নেমে এসেছে বুক পর্যন্ত। চোখে হাই পাওয়ারের চশমা, তার আধভাঙা ফ্রেমটি সুতলি দিয়ে কানের সাথে আটকানো। আধময়লা একটি পিরান গায়ে, হাতে এক বান্ডিল নাসির বিড়ি নিয়ে তিনি ফোকলা দাঁতে হেসে অন্যান্য চা-খানেওয়ালার সাথে চুটিয়ে গল্প করছেন।

তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে মুরাদ ভাই জিয়ল মাছ কেনার জন্য মাছ-হাটার দিকে যান। অনিকেত বারইবুড়ার জন্য গুড়ের চায়ের সাথে ডালের বড়ার অর্ডার করে। পেয়ালায় চুমুক দিয়ে অনিকেতের কৌতূহলের জবাবে তিনি আগর গাছ সম্পর্কে কিছু কথা বলেন। সব গাছে কিন্তু সৌরভের সারাৎসার পাওয়া যায় না। তবে খেয়াল করে গাছের কাণ্ডে পিঁপড়ার তত্পরতা নজর করলে বোঝা যায়, কোন বৃক্ষে আছে সৌরভের আকর। বারইবুড়া জোয়ানকি বয়সে আগরের চালান নিয়ে রেলগাড়িতে চড়ে যেতেন চাঁদপুর, ওখান থেকে স্টিমারে কলকাতা, তারপর তিন দিন তিন রাত ট্রেনে কাটিয়ে গিয়ে পৌঁছতেন বুম্বাই নগরীতে। ওমান থেকে আসা কারবারিদের কাছে চালান বিক্রি করে মাস-দিন পর তিনি ফিরতেন দেশে।

পেয়ালায় শেষ চুমুক দিতেই অনিকেত বুঝতে পারে, আগর বিষয়ে তার আগ্রহ তলানিতে এসে পৌঁছেছে। বারইবুড়া তার কাছে একটি তূণওয়ালা সিগ্রেট চাইলে সে একশলা গোল্ডফ্লেক বাড়িয়ে দিয়ে প্রশ্ন করে, ‘সাগরনালের মিশন সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন কি?’ বৃদ্ধ গোল্ডফ্লেকে আয়েশ করে টান দিতে দিতে যা বলেন, সে তা নোটবুকে টোকে। হ্যাঁ, মিশন একটা ছিল বটে, কিন্তু পাকিস্তান ও হিন্দুস্থান হওয়ার পাঁচ-সাত বছর আগে এটি উঠে যায়। তারপর টিলায় মিশনের বাংলোটি পড়ো হালতে পড়ে ছিল অনেক বছর। এখন মাটি কারবারিরা টিলা কাটিয়ে তাবৎ কিছু খুঁড়েফুঁড়ে এমন হালত করেছে যে তাকিয়ে ওখানে এক জামানায় পাদ্রি সাহেবের সুন্দর একটি বাংলো ছিল, তা বোঝার কোনো কুদরতই নেই। পাদ্রি সাহেব তোতাপাখির মতো বাংলা বলতেন। পাজামা-পাঞ্জাবি পরে হাট-বাজারে আসতেন, গরম লাগলে গামছা দিয়ে মুখ মুছে ডাবের পানি খেতেন। মানুষটি ভালোই ছিলেন, তবে চা বাগানের কুলি-কন্যা যমুনার সাথে তার আশনাই হলে ভেজাল বাধে। গোরা পাদ্রি সমাজ-সংসার কারো তোয়াক্কা তেমন করতেন না। একবার এক ঘোড়ায় টানা এক্কা গাড়িতে যমুনাকে বসিয়ে হাওয়া খেতে বেরিয়েছিলেন। চাশ্রমিকরা খেপে গিয়ে তার বাংলো ঘেরাও করেছিলেন। তবে সাহেব পিস্তলের ফাঁকা আওয়াজ করে তাদের হটিয়ে দিয়েছিলেন।

বারইবুড়া থেমে শেষ বড়াটি চিবিয়ে কাঠি দিয়ে দাঁত খিলাল করেন। তারপর দাড়িতে আঙুল চালিয়ে কাহিনীর বাকি অংশটুকু বলেন। না, পাদ্রি সাহেবের পরিণতি ভালো হয়নি। যুমনারও রাশিতে মন্দ লেগে ছিল। সে পাদ্রি-বাংলোর পেছন দিকের একটি গাছের ডালে ফাঁসিতে ঝুলেছিল। বিষয়টি জানাজানি হলে মিশনের বিলাতি কর্মকর্তারা পাদ্রিকে গির্জার সমাজ থেকে খারিজ করে। পুলিশ এসে যমুনার ফাঁসির ব্যাপারেও তাকে জেরা-জবর করে। তো সাহেব অতঃপর মনের খফে নিজের মাথায় পিস্তলের গুলি ছুড়ে আত্মহত্যা করেন।

মুরাদ ভাই বাঁশের পাতলা বেতিতে গাঁথা ছয়টি তাজাতনা কৈ মাছ, মুলা ও লালশাকের আঁটি নিয়ে ফেরেন। অনিকেত এবার বুড়ার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠে পড়ে। হোন্ডার পেছনে বসতে বসতে সে ভাবে, আগরের কারবার নিয়ে যথেষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে চাইলে মিশন বাংলোর পাদ্রি সাহেব ও কামিন-কন্যা যমুনাকে নিয়ে একটি ছোটগল্প রচনা করা যায়। হোন্ডার হেডলাইটে ঘুরপাক করছে ধুলার ধূসর কণা। অনিকেত মুখে রুমাল চেপে খানিক আতান্তরে পড়ে। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক তাকে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে বস্তুনিষ্ঠ একটি গল্প তৈরি করে দিতে বলেছেন। মিশন বাংলোর গল্পে অবধারিতভাবে চলে আসবে অতিপ্রাকৃত ব্যাপারস্যাপার। এসব সম্পাদক মশাইয়ের মনঃপূত নাও হতে পারে। খানিক চিন্তায় পড়ে গিয়ে সে ভাবে, তবে কি মুরাদ ভাইকে প্রশ্নাদি করে জেনে নেবে, বনে অবৈধভাবে যারা গাছ কাটে, তাদের দিনযাপনের বিষয়াদি। তাদের ঘটনা দিয়ে চাইলে হয়তো তৈরি করা যেতে পারে একটি বাস্তবভিত্তিক আলেখ্য। অনিকেত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে না।

চাং-বাংলোয় ফিরে গত রাতের আধখাওয়া রামের পাঁইটটি নিয়ে বারান্দায় বসেন মুরাদ ভাই। খানিক দূরের মিশকালো অরণ্যের শিরানাজুড়ে লোহিতে সোনালির মিশেল দেয়া জ্যোত্স্নায় তোড়জোড় করে উঠে আসছে চাঁদ। কিন্তু পানীয়র পাত্র হাতে বারান্দায় বসতে ইচ্ছা হয় না অনিকেতের। অবসেশনের মতো দারুণ এক তৃষিত বাসনা তাকে তাড়া করে। এ মুহূর্তে টয় স্লাইড প্রজেক্টরে চোখ না রাখলে তার চলছে না। তো সে বানোয়াট অজুহাত দিয়ে মুরাদ ভাইকে বলে, তার মাইগ্রেনের ধাত আছে, মাথা ধরা শুরু হয়েছে। এখনই গোটা দুই নাপা গিলে কামরায় চুপচাপ শুয়ে না থাকলে পেইন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

নিরিবিলি গেস্ট কামরায় এসে অনিকেত আধশোয়া হয়ে স্লাইড প্রজেক্টরে চোখ রাখে। জাদুময় বনানী নামের চিত্রটির জোড়া বৃক্ষ পত্রালী দুলিয়ে তাকে আমন্ত্রণ জানায়। সে গাঢ়ভাবে নজর করে, কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে কোঁদা মুখ দুটিতে সে যমুনা বা পাদ্রি সাহেবের মুখমণ্ডলের ছায়ারূপ দেখতে না পেয়ে ভারি হতাশ হয়। তখনই গাতা-গর্তে তৈরি রেখারূপ স্পষ্ট হয়। ভারি তাজ্জব হয়ে দেখে, তার বড় ভাই গ্র্যাজুয়েশনের কালো গাউন ও বাহারে ক্যাপটি পরে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। অন্য গাছটির কাণ্ডে ভাগ্নি রিমঝিমের ঈপ্সিত কোনো দ্রব্য না পেয়ে চোখ-মুখ খাজুল করে তাকিয়ে থাকার ভঙ্গিটিও তার গ্লানিবোধকে বাড়িয়ে দেয় বিগতভাবে।

সে খাট করে খেলনা স্লাইড প্রজেক্টরটি বন্ধ করে বিছানায় সোজা হয়ে বসে। দোলাচলকে অতিক্রম করে এবার তাকে একটি সিদ্ধান্ত নিতেই হয়। অনিকেত ভাবে, কাল ভোরে মুড়ির টিন বাসটি ধরে সাগরনাল থেকে বেরিয়ে যাবে। এবার তার গন্তব্য হবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার বোনের বাসা।