মলি হাস্কেল

অনুবাদ: শওকত হোসেন

সময়ের বিচারে পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ চলচ্চিত্রে পার্শ্বচরিত্র থেকে শুরু করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে রোমান হলিডে, সাব্রিনা, ওয়ার অ্যান্ড পিস, ফানি ফেস, লাভ ইন দি আফটারনুন, দ্য নান’স স্টোরি, ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফ্যানি’জ, শ্যারেড, মাই ফেয়ার লেডি, টু ফর দ্য রোড, ওয়েইট আনটিল ডার্ক-এ তার বিশাল ভূমিকা এবং সবশেষে (নয় বছরের নিষ্ক্রিয়তার পর) রবিন অ্যান্ড মারিয়ান-এ গৌরবময় অধ্যায় পর্যন্ত অড্রে হেপবার্নের অস্বাভাবিক দীর্ঘ ও উল্লেখযোগ্য ক্যারিয়ার ছিল, যে সময়ে অভিনেত্রীদের ক্যারিয়ার স্টুডিওর অব্যবস্থাপনা বা নিজেদের কারণে শেষ হয়ে যাওয়ায় ভীষণ রকম সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছিল। তাহলে কেন আমরা তার কথা ভাবার সময় ক্যারিয়ারের চেয়ে বরং এক ধরনের অপচ্ছায়া, অসম্ভব কিছু মনে করি? যেন পঞ্চাশের দশকে অর্ধবুনো নিম্ফ এবং অর্ধরাজকুমারীর মতো আকাশ থেকে ঝরে পড়েছেন এবং তারপর কাচের জুতো পায়ে কোনো চিহ্ন না রেখেই সোনার এক্কাগাড়িতে চেপে উধাও হয়ে গেছেন।

কতবার যে তার নায়িকারা রূপকথা এবং বাস্তবতা, নীচতা আর মহত্ত্বের ভেতর সেতুবন্ধের ভিত্তি হয়েছে: এক ড্রাইভারের মেয়ে (সাব্রিনায়, যেখানে তিনি সত্যিই একটা গাছ থেকে খসে পড়েছেন) পরিণত হয়েছেন রাজ্যের অধিষ্ঠাত্রী। রোমান হলিডেতে তিনি সরাসরি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখা নামহীন এক দেশের রাজকন্যা (অদেখা রাজার মেয়ে)। লাভ ইন দি আফটারনুন-এ জাদুমন্ত্রের মতো নিজের অনৈতিক পেশা এবং কুখ্যাত প্রতিদ্বন্দ্বীকে ছেড়ে দেয়া এক প্রাইভেট গোয়েন্দার মেয়ে। ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানি’জ-এ শহুরে ফ্যাশনদুরস্ত মেয়েতে পরিণত অপ্রীতিকর সম্পর্কের অধিকারী দক্ষিণাঞ্চলের দরিদ্র মেয়ে। মাই ফেয়ার লেডিতে ভাষার বিচারে পিগম্যালিয়ন ককনি থেকে ইংরেজ সমাজের সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছেছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে বিনয়ীর ছদ্মবেশী অভিজাত মা-বাবা, জাতীয়তা কিংবা শ্রেণীর নিরিখে শনাক্ত অযোগ্য রহস্যময় অজ্ঞাত মা-বাবার পাল্টে যাওয়া সন্তান; নিজের সংকর সত্তাকে জাদুকরী পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে সামাল দেয়া এক নারী। পারিবারিক রোম্যান্স ফ্যান্টাসির এমনই সব বৈচিত্র্যের ভেতর দিয়ে তার জন্ম হয়েছিল ব্রিটিশ ব্যাংকার ও ওলন্দাজ ব্যারোনেসের সন্তান হয়ে।

মানুষের সামনে বয়সের কঠিন পরীক্ষার মোকাবেলায় তিনি প্রচলিত কোনো চরমপন্থার আশ্রয় নেননি, অর্থাৎ প্রচারণার জন্য লোলুপতা বা নিজেকে জগৎ থেকে পুরোপুরি প্রত্যাহার। মৃত্যুর আগে, দুই দশকে মাত্র হাতে গোনা ছবি করেছেন তিনি, সেগুলোর ভেতর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দি অল লাফড। নিজের আত্মাকে প্রকাশিত করতে বা ট্যাবলয়েডের খোরাক না হতে জীবনকে একান্তে যাপন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। মেল ফেরারের পর একজন মনোবিদকে বিয়ে করে রোমে নিরিবিলি জীবনযাপন সম্পর্কিত গুজব রটেছিল। তালাকেরও। কিন্তু নাক গলাতে যাইনি আমরা, তাকে ঘিরে নীরবতার এক ধরনের মৃদু ষড়যন্ত্র ছিল, যেন তিনি জৈবিক রক্ত-মাংসের অধিকারী, সন্তান জন্মদাত্রী (পর্দা কিংবা বাস্তবে), বাঁধনে জড়ানো সম্পর্কে আত্মসমর্পণ করতে পারেন বলে আমরা কল্পনা করতে পারি না বা করতে চাই না।

তার প্রভাব মোটেই ক্ষণস্থায়ী নয়, বরং এখনো তার ছবিগুলো আরো ভালো ঠেকে। সমসাময়িক কোনো তারকাই বলতে গেলে মাটি স্পর্শ না করে তার মতো জমিনের ওপর হাঁটতে কিংবা তার দৈহিক অঙ্গভঙ্গির মতোই ভিন্ন কিঞ্চিৎ পরিহাসপ্রবণ বাচনভঙ্গি ও কণ্ঠের ছন্দে প্রলুব্ধ করতে পারেন না। তিনি ছিলেন তার অতীন্দ্রিয়তার উপযোগী জুতসই পরিবেশ এবং দূরত্ব তৈরিকারী স্টুডিও ব্যবস্থার তুঙ্গ অবস্থায় পরিচর্যা পাওয়া শেষ তারকাদের একজন, প্রতিভাবান পরিচালক (উইলিয়াম ওয়াইলার, বিলি ওয়াইল্ডার, জর্জ কাকর, জন হাস্টন, কিং ভিদোর, ব্লেক এডওয়ার্ডস ও স্ট্যানিলি ডোনেন), কস্টিউম ডিজাইনার, সিনেমাটোগ্রাফার, চিত্রনাট্য রচয়িতা, আলোকসম্পাতকারীর সম্মিলিত প্রতিভার পক্ষে ধ্রুবতারা।&dquote;&dquote;

হেপবার্ন নিখুঁত ছিলেন না, এক বৈকালিক চাচক্র শেষে হোটেল রুমে জুতার খোঁজে হামাগুড়ি দেয়ার সময় গ্যারি কুপারের কাছে যেমন দাবি করেছিলেন তিনি। ‘আমি বেশি শুকনা’—অননুকরণীয় কণ্ঠে বলেন তিনি, ‘আমার কান বেরিয়ে থাকে, দাঁত এবড়োখেবড়ো, আমার গলা অনেক বেশি লম্বা।’ তার পরও গ্ল্যামার কথাটা নোংরা শব্দে পরিণত হওয়ার আগে গ্ল্যামারাস ও তারকালোকে রীতিমতো অনায়াস ছিলেন তিনি। নিজেদের সিরিয়াস মনোভাবের প্রমাণ দিতে রূপের বিপরীতে অভিনয়কারী এবং বিভিন্ন চলচ্চিত্রে চরিত্রের বদল ঘটানো কিংবা রাতারাতি ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে উত্তুঙ্গ অভিনয় দেখানো অসংখ্য উত্তরসূরির বিপরীতে হেপবার্ন এক ধরনের অবিরাম যাত্রা চালিয়ে গেছেন। আমরা এখন নতুন চোখে তার স্টাইলের দিকে নজর ফেরাতে পারি। তার পোশাক, তার মোহনীয়তা আর বক্তব্যকে সত্তা ও আত্মার মিশেল হিসেবে দেখতে পারি, যেখানে উপরিতল আত্মাকে কেড়ে নেয় না বরং আবেগ প্রায় ভীতিকর প্রাবল্য নিয়ে বিস্ফোরিত না হওয়া পর্যন্ত গভীরভাবে এর কষ্টকে আড়াল করে। 

সম্ভবত তার অহংকার এবং অপার্থিবতা ও আবেগ, স্বাধীনতা ও মমতার মিশেলই কৈশোরে এ দ্যুতিময় কিশোরীসুলভ নারীটি আমার কুিসত হাঁসের ছানার কাছে সুন্দরী রাজহাঁসের অভিনয় করে পর্দায় ভেসে কষ্টকর সংঘাতের সমাধান তুলে ধরার মুহূর্তে আবেদন সৃষ্টি করেছিল।

আমার যথাক্রমে ১৩, ১৪ এবং ১৭ বছর বয়সে মুক্তি পাওয়া রোমান হলিডে (১৯৫৩), সাব্রিনা (১৯৫৪) এবং লাভ ইন দি আফটারনুন (১৯৫৭) ছিল আমার বয়ঃসন্ধিকালের সিনেমাটিক মাইলফলক। তিনি ছিলেন পটু, অভিজাত, ভিন্ন রকম, তার পটভূমি পাশের বাড়ির মিড ওয়েস্ট নয়, বরং প্যারিস ও রোমের মতো বড় শহর এবং সবচেয়ে বড় কথা, তিনি ছিলেন, মানে, ক্ষীণবক্ষা। সেক্সসিম্বলদের জোরালো ঢেউয়ের সময় বিজয়ী টমবয়সুলভ নারী। যেকোনো প্রাথমিক নারীবাদীর চোখে অড্রে হেপবার্ন ছিলেন তখনকার দস্তুর উদ্ভিন্ন যৌবনা তারকাদের বিপরীত মেরুর। সতর্ক অভিযাত্রীর মতো উদ্দীপনায় ভরপুর, এলিজাবেথ টেইলর, সোফিয়া লরেন, কিংবা ভীষণভাবে যৌন আবেদনময়ী জেনিফার জোন্স এবং অতিরিক্ত নাজুক ও অত্যুৎসাহী মনরোর নিস্তেজ বা অবসন্নতার লেশহীন। আমাদের কাছে তাকে বেশি আকর্ষণীয় করে তোলা গুণগুলো সম্ভবত তাকে লাল রক্তের আমেরিকান পুরুষদের কাছে কম কাঙ্ক্ষিত করেছিল। এক বন্ধু আমাকে সেনাছাউনিতে সাব্রিনা দেখার এক মজার গল্প বলেছিল, ওখানে সতীর্থ সেনারা আরো শরীরী মার্থা হাইয়ারকেই বেশি পছন্দ করেছিল। উইলিয়াম হল্ডেনের ধনী করপোরেট মার্জার প্রেমিকা হাইয়ার অড্রে হেপবার্নের বছরখানেক পর প্যারিস থেকে এডিথ হিড লং আইল্যান্ডের রাজহাঁসের মাঝে তার প্রথম আবির্ভাব উপলক্ষে তৈরি রাজহাঁসের মতো পোশাকে সব জাঁক নিয়ে ফেরার মুহূূর্তেই হল্ডেনের সঙ্গে নাচের দৃশ্যে হাজির হন।

বিশেষ কোনো পোশাকের স্মৃতি না থাকায় এ পোশাকের নকশা এবং বিশদ স্পষ্টভাবে মনে থাকায় আমি বিস্মিত হই। এছাড়া কেবল রিয়ার উইন্ডো’র গ্রেস কেলির পোশাক এবং হিচকক যেভাবে তাকে ধারণ করেছিলেন, অন্য কোনো পরিচালক যা পারেননি, মনে গেঁথে আছে। কেলির পোশাকের মতো হেপবার্নের ফোলা ওভারস্কার্টসহ স্ট্র্যাপলেস অরগান্ডি পোশাক তারকার দ্বৈত সত্তাকেই বন্দি করেছে, শূন্যে ভাসমান নারীত্ব নিয়ে ঋজু, ছিপছিপে কিশোরীসুলভ দেহ। কোমরে সাঁটা ডাবল স্কার্ট কিশোরী ও নারীর সহাবস্থানের (দুটোই বিচ্ছিন্ন ও সংযুক্ত) আভাস দিচ্ছে—সামাজিক নারীর ফাঁপা গাউনে বন্দি গেছো শিশু। রোমান হলিডের সূচনায় ক্যামেরা জুতা খোলার দৃশ্য ধারণের জন্য রাজকুমারীর লং স্কার্টের নিচে নজর বোলানোর ইমেজের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়।

দুটি বিশ্বকে এক করার এই ক্ষমতা, একজন নারীর পক্ষে মানসিক জীবনযাপনের পাশাপাশি নিজেকে যে কাঙ্ক্ষিত করে তোলা যায়, সেই আভাস ফানি ফেস-এর মতো ছবিতে তার আবেদনের শিকড়ে রয়ে গেছে। এখানে বুদ্ধিমতী পরিচয় না খুইয়েই ফ্যাশন মডেলে পরিণত হওয়া বইপোকা।

কিন্তু যত সংক্ষিপ্তই হোক হেপবার্ন দুটি জগতের ভেতর সম্মিলন তুলে ধরেছিলেন। বড্ড স্পষ্টভাবে (এবং অশ্লীলভাবে) লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত মনে হওয়া জন্ম ক্ষতিগ্রস্ত এবং যৌন তারকাদের বিপরীতে যা চেয়েছেন, তাই পেয়েছেন তিনি এবং পঞ্চাশের দশকের নারীর জৈবিক ও সাংস্কৃতিক অলঙ্ঘনীয়তার বিকল্প তুলে ধরেছেন। অন্য সব দৃশ্য ছাপিয়ে একটিমাত্র ছবি আমার মনে গেঁথে থেকে থাকলে, সেটা গ্রেগরি পেকের মোটরসাইকেলের পেছনে তাকে আলিঙ্গন করে গোটা রোমে উড়ে বেড়ানো অড্রে হেপবার্ন। ঝোঁকের বশে তাকে ন্যুব্জ করে দেয়া লম্বা চুলের গোছা মাত্র ছেঁটে ফেলেছেন (এবং এ কায়দায় এমন একটা অবয়ব সৃষ্টি হয়েছিল যে, সারা দুনিয়ার মেয়েরা বিউটি পার্লারে ভিড় জমাতে শুরু করেছিল)। হেয়ার কাট পরিবর্তনের একটা আচার, কী করা যাবে আর যাবে না, সেই হুকুম এবং সেসঙ্গে প্রথাগত নারীত্ব থেকে মুক্তি। 

তার সব শালীনতা ও সূক্ষ্মতা সত্ত্বেও এটা যে তাকে দেয়া কোনো ভূমিকা পালনের অপেক্ষায় থাকা কোনো নিষ্ক্রিয় সৌন্দর্য নয়, সেটা আমাদের নজরে আনা হয়েছে। বিলি ওয়াইল্ডারের সাব্রিনায় (তখনকার তুলনায় বরং আজকের দিনেই বেশি জুতসই ঠেকা স্যামুয়েল টেইলরের একটি অপেরা ধরনের নাটক থেকে অভিযোজিত) আমাদের একজন নারীর নিজের জীবনকে আঁকড়ে ধরার সুন্দরতম অভিব্যক্তি দেখানো হয়েছে। প্যারিসে অবস্থানের শেষ পর্যায়ে আপনমনে ভাবছেন যে, তিনি বদলে গেছেন, ডায়েরিতে লিখছেন, ‘কীভাবে বাঁচতে হয়, কেবল এক পাশে দাঁড়িয়ে থেকে, তাকিয়ে না থেকে কিভাবে দুনিয়ায় দুনিয়ার মতো থাকতে হয়, শিখেছি আমি।’

ছবির গোড়ার দিকে লারাবি হাউজের অতিথিদের ওপর নজর রাখতে গিয়ে সোজাসাপ্টা বৈশিষ্ট্যকে আরো বেশি ছলনাময়ী নারীত্বের বিপরীতে খাড়া করেছেন তিনি। ‘সারাক্ষণ হাসাহাসি করে, এমন মেয়েদের সহ্য করতে পারি না’—অচিরেই তার পরাস্ত প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হতে চলা ‘উন্নত’দের দিকে নজর রেখে বলছেন তিনি। অপেক্ষাকৃত শান্ত, কিন্তু পরিণত জীবনের ব্রীড়া ও কপটতার বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত, আপসহীন, বিদ্রোহী জেমস ডিনের প্রতিপক্ষ তিনি। তিনি তার ব্যক্তিত্বে কাজের চেয়ে বেশি সংসারজীবন পালন ও বিস্তার, এমনকি নারীর স্বাভাবিক বৃদ্ধি, উর্বরতা এবং ক্ষয়ের উপশহুরে আদর্শের জোরালো বিদ্রোহ তুলে ধরেছেন।&dquote;&dquote;

এমনকি রবিন অ্যান্ড মারিয়ানে ভবঘুরে রবিনের আজীবন ‘পূর্ণ’ ভালোবাসা হিসেবেও (‘আমি কি বুড়িয়ে গেছি, কুিসত হয়ে গেছি?’ করুণ সিরিয়াস কণ্ঠে শন কনোরিকে জিজ্ঞেস করছেন তিনি) সাব্রিনার ড্রাইভারের মেয়ের মতো তারুণ্যময় বস্ফািরিত চোখের অধিকারী এবং একজন নানের মতোই অপার্থিব ও কুমারীসুলভ—এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই, কারণ রবিনের অনুপস্থিতিতে যাজকে পরিণত হয়ে পার্থিব সময়ের গতি থামিয়ে কার্যত নিজেকে ভবঘুরে প্রেমিকের জন্য ধরে রেখেছেন। শেষে যুদ্ধক্ষেত্রে জরাগ্রস্ত প্রেমিককে হারানো কিংবা দুজনের কাউকেই শয্যাশায়ী নায়কের দৃশ্য সহ্যের অবকাশ না দিয়ে দুজনকেই হত্যা করেন তিনি; অড্রে হেপবার্নের মতো রবিন হুডও আজ একজন কিংবদন্তি।

বিলম্বিত পূর্ণতা ও অবদমননির্ভর প্রেমের রীতিকে হটিয়ে দেয়া নারীবাদ, অনায়াস তালাক এবং যৌন বিপ্লবের ঠিক আগে এক ঐতিহাসিক সময়ে এসেছেন তিনি। তার সত্তায় ধরা দেয়া আবেগের প্রাবল্য এবং নিজেকে তিনি যেসব সম্পর্কে জড়িয়েছেন, সেসবে চাঙা রোমান্টিকতাবাদের বহু চিহ্ন রয়েছে: দরবারি ভালোবাসার ঐতিহ্য, প্রত্যাখ্যান এবং আত্মত্যাগ; ত্রুবোদোর কবিদের স্পর্শকাতরতাকে আদর্শায়িতকরণ; প্রডাকশন কোডে প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত আমেরিকান শুদ্ধবাদের সঙ্গে অপার্থিব করে তোলা অধরা হলিউডি ভালোবাসা। এখানে বিস্ময়ের কিছুু নেই যে রিচার্ড লেস্টারের মধ্যযুগীয় কাহিনীতেই বেশি সাবলীল ঠেকে তাকে, যেখানে যৌনতাকে একদিকে ক্রুসেডের সঙ্গে এবং অন্যদিকে কনভেন্টের সঙ্গে অথবা উঁচু ফ্যাশনের ‘দেখ, কিন্তু ছুঁয়ো না’ বিশ্বে মিলিয়ে ফেলা হয়েছে।

লাভ ইন দি আফটারনুন-এ স্টেশন প্লাটফর্মে ট্রেনের সিঁড়ি দিয়ে ছুটে গ্যারি কুপারের পাশে ট্রেনের সিঁড়িতে কাঁদতে কাঁদতে চিত্কার করে তাকে বলতে দেখুন, তিনি একা থাকবেন না, বুধবারে তার সঙ্গে একজন আলপাইন গার্ড থাকবে, শুক্রবার একজন স্প্যানিশ ম্যাটাডোর আর... শেষমেশ তার ভালোবাসায় বদলে যাওয়া এ প্রবীণ তাকে প্লাটফর্ম থেকে ট্রেনে এবং নিজের জীবনে তুলে নেয়। কিংবা ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানি’জ নিয়ন্ত্রণাতীত হিস্টেরিয়ার দৃশ্যের কথা, যখন হোলি গোলাইটলি তার ভাইয়ের মৃত্যুর কথা জানতে পেরে জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা হারানোর শোকে শোকার্ত হয়ে আরকানস থেকে আসা লুলা মের কাছে আশ্রয় নিচ্ছে। কিংবা আরো বেশি নাজুক, কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম আচ্ছন্ন হামফ্রে বোগার্টের সঙ্গে নৌকার দৃশ্যের কথা, যখন এ নির্মম ব্যাচেলরকে এখনকার চেয়ে আরো ভালো ও চমত্কার কিছু হিসেবে আবার দেখার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি। তিনি এটা বিশ্বাস করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, তাকে নির্মমভাবে ‘বুলা বুলা’ নাবিকের পোশাক এবং ভিক্ট্রোলায় ‘ইয়েস, উই হ্যাভ নো বানানাজ’ বাজিয়ে তার মন জয়ে প্রয়াসী এ ব্যাচেলর বণিকই তার মতো ভালোবাসার কারণে মরতে চাওয়া সেই মানুষ। 

রোমান্টিক কল্পনায় এত শক্তিশালী তিনি, এ মানুষগুলোর অন্তস্থ ভালোত্বের প্রতি তার বিশ্বাস এত প্রবল এবং ভালোবাসার পাত্র হিসেবে তাদের গুরুত্বে এত বিশ্বাসী যে, তাদের ফিরিয়ে এনে ভালো করে তুলেছেন তিনি। এটাই নায়িকার প্রথাগত কাজ ছিল—পুরুষের সংস্কার ভেঙে ফেলা, ভালোবাসায় জেগে উঠে নিজের বিস্মৃত দিকগুলো আবিষ্কারে তাগিদ দেয়া। কিন্তু আদর্শায়িত করার ক্ষেত্রে হেপবার্নের তাড়নায় আচ্ছন্নতার সীমান্তে থাকা পুরুষের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার ব্যাপার রয়েছে।

এমনকি সাবলীল অবয়বও অচিরেই নানা বিরোধপূর্ণ নারীত্বের সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধের কায়দা হতে চলা এক ধরনের রোমান্টিসাইজড অ্যানোরেক্সিয়ার আভাস দেয়। পরিণতদের কপটতা অগ্রাহ্য করে তিনি এবং জেমস ডিন, পরিণত জীবনকে উপেক্ষা করতে গিয়ে খোদ পরিণত জীবন এবং এর অপরিবর্তনীয় সব বাস্তবতাকে—আত্মবিদ্রোহের এক ধরনের উপায়, জরা এবং মৃত্যুকেই উপেক্ষা করেছেন। বস্তুত, খোদ মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষাই বহু ছবিতে অনেক সময় আক্ষরিক অর্থে, অনেক সময় আলঙ্কারিকভাবে অনুপ্রবেশকারী ছায়া: সাব্রিনার সূচনার আত্মহত্যা প্রয়াসে এবং বোগার্টের ‘ভদ্রলোকোচিত’ আচরণ করে ভালোবাসার জন্য প্রায় আত্মহত্যার উপক্রমের ওপর তার জোরদানে; লাভ ইন দি আফটারনুন-এ তার সরলতা ও গ্যারি কুপারের অনৈতিকতার অস্বস্তিকর জুটিতে; ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফ্যানি’জ-এ মৃত ভাইয়ের জন্য ভালোবাসার প্রাবল্যে, রবিন অ্যান্ড মারিয়ান সমাপ্তিতে হত্যা-আত্মহননের দৃশ্যে।

হেপবার্নের ছবিগুলোয় এক ধরনের বিষণ্নতা ও অস্বস্তির সুর জুড়ে দেয়া রোমান্টিকভাবে ছড়ানো অজাচারের ধারণা বাবার—এবং ভাইয়ের—ভীষণ উত্তুঙ্গ ভালোবাসায় বারবার মাথা চাড়া দেয়। জন হাস্টনের কৌতূহলোদ্দীপক দ্য আনফরগিভেন-এ তিনি এবং বার্ট ল্যাংকাস্টার ভাই-বোন হিসেবে বেড়ে ওঠার পর শ্বেতাঙ্গ পরিচয়ে মানুষ করা ইন্ডিয়ান পরিচয় জানতে পারেন, তাই এখন তারা প্রেম ও বিয়ের ক্ষেত্রে স্বাধীন, এভাবে গোটা ছবিতে সূক্ষ্মভাবে অনুভূত এক ধরনের আকর্ষণে পূর্ণতা দিয়েছেন। ব্রেকফাস্ট ইন টিফ্যানি’জ-এ জর্জ পেপার্ডকে—তার পুরুষ প্রতিপক্ষ যার যৌন পরিচয়, তার মতোই নাজুক—তার অদেখা ভাইয়ের নাম জানাচ্ছেন। ঘন ঘন বয়স্ক পুরুষদের সঙ্গে জুটি বাঁধার ব্যাপারটা এমন একটা প্যাটার্ন ছিল, যেটা সাংবাদিকরা খেয়াল করে বিস্মিত হয়েছিলেন। রিচার্ড কর্লিস যেমন উল্লেখ করেছেন, তিনি হলিউডের বেশির ভাগ দীর্ঘস্থায়ী কিন্তু সেভাবে নাজুক নন, এমন প্রবীণ নাগরিকদের (বোগার্ট, গ্র্যান্ট, অ্যাস্টায়ার, ফন্ডা, হ্যারিসন) নজরে পড়ার নিয়তি নিয়ে এসেছেন।’ মানানসই নাজুকতাই ছিল মূল: আবেদনময়ী নারীদের এ তারকাদের সঙ্গে বেমানান ঠেকলেও হেপবার্ন রোমান্টিক কায়দায় ছবিতে এবং পতনশীল তারকা হিসেবেও তাদের উদ্ধার করেছেন। কেবল অ্যাস্টায়ার-হেপবার্ন সম্পর্কই জ্বলে উঠতে ব্যর্থ হয়।

সাধারণ মানুষ এবং সমালোচক, দুই পক্ষের ক্ষেত্রেই অবশ্যই বিলি ওয়াইল্ডারের লাভ ইন দ্য আফাটারনুন সবচেয়ে অস্বস্তিকর ছিল। নানা কারণে সূক্ষ্মভাবে কল্পনানির্ভর ও সুঅভিনীত এ ছবি বাতিল হয়ে গেছে—এর ধীরগতি (আসলে, ওয়াইল্ডারের ছবিটির জটিল ভাব ও মেজাজ ফুটে ওঠার জন্য যেমন অস্বাভাবিক সময় দিয়েছেন, সেটাই এর সবচেয়ে বড় সুখ), ‘একঘেয়েমি’। কিন্তু দর্শকদের আসলে গ্যারি কুপারের ছবি অস্বস্তিতে ফেলেছে, একজন বয়স্ক লোথারিও হিসেবে আপাদমস্তক আমেরিকান নায়ক, তার চোখজোড়া ভীতিকরভাবে শূন্য, চমত্কার চেহারা বয়সের বলিরেখা আর নীতিহীনতার ছাপ। যেন পাশ্চাত্য দুনিয়ার একজন সফল প্লেবয়ের ভূমিকা সফলভাবে পালন করে সহসা বুড়িয়ে যাওয়া খোদ আমেরিকাই ক্লান্ত এবং ডোরিয়ান গ্রের মন্দ দিক উন্মোচন করেছে। ওয়াইল্ডার কুপার অলৌকিকতাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এবং কোনোভাবে এমন একজনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছেন, যার গোটা জীবনই ছিল দাপুটে, এখন কোনো একজন নারী তাকে জীবনে ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত অটোপাইলটে আছেন। যে নারীটি মূলত তার চেয়ে বড় ও বুদ্ধিমতী।

বিলি ওয়াইল্ডার বিকলন এবং রোমান্টিক, বর্ণিলতম সম্পর্কের অভ্যন্তরে নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষার সূক্ষ্ম ভারসাম্য এবং হেপবার্নের অনন্য কণ্ঠ ও অঙ্গভঙ্গির প্রতি সবচেয়ে সংবেদনশীল পরিচালক। কেবল ভ্রুর নাচন কিংবা সংলাপে বিদ্রূপ বা অন্য কিছু জুড়ে দিয়ে যেকোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতিকেও নির্দোষ করে তুলেতে পারেন তিনি, নিষিদ্ধকে পরিণত করতে পারেন কাঙ্ক্ষিতে। তিনি একাধারে বাচিক ও দৃশ্যমান পরিচালক হওয়ায় তার কণ্ঠের শব্দের ইন্দ্রিয়তাকে যুগপৎ শান্ত ও আড়াল করার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছেন।

সাব্রিনায় ড্রাইভার বাবা (জন উইলিয়ামস) ‘নিচতলার’ কর্মীদের ঘেরাওয়ের ভেতর প্যারিস থেকে পাঠানো তার চিঠি পড়ে শোনাচ্ছেন। চিঠিতে কর্ডন ব্লিউ স্কুলে বন্ধুত্ব হওয়া এক বয়স্ক ব্যারনের কাছে দুনিয়ায় চলার সবক নেয়ার কথা বলেছেন তিনি। বুড়ো তার নতুন বন্ধুকে ‘খুবই মিষ্টি আর জ্ঞানী লোক’ হিসেবে বর্ণনা করার কথা পড়ার সময় আমরা যেন তার কণ্ঠেই কথাগুলো শুনতে পাই। এখানে একটা রহস্য আছে। (এ সম্পর্কটা কেমন চেহারা নিয়েছিল? আসলে অড্রে হেপবার্নের যেকোনো সম্পর্ক যেমন শরীরী সম্পর্ক হয়ে দাঁড়ায়? তিনি কখনো কি ‘কাজটা করেছেন?’ অনেকভাবেই তিনি নিখুঁত প্রডাকশন কোড নায়িকা, শেষ পর্যন্ত দ্ব্যর্থবোধক ও দুর্বোধ্য।

সবশেষে হেপবার্ন শিশুসুলভ ও নারীত্বের অখণ্ড মিশেল, যিনি কথা বলেন, আবেগের ক্ষেত্রে এমন জায়গায় ছুটে যান, যেখানে পুরুষরাও পা ফেলতে ভয় পায়। খোলাখুলি ও প্রত্যাখ্যানের ভয় ছাড়াই নিজের ভালোবাসা স্বীকার করেন, সক্রিয় হন, তবে প্রজ্ঞা ও কোমলতার সঙ্গে। মহান রোমান্টিক তারকা আইরিন ডান, মার্গারেট সাল্লিভানের মতো তার মৃদুভাব এবং রসিকতা, সাহসিকতাই সবচেয়ে করুণ দৃশ্যকে শক্তিশালী করে তোলে।

প্রেমের অগুনতি সূক্ষ্ম বিভাজনের একজন শিল্পী তিনি, রোমান হলিডেতে গ্রেগরি পেক সাংবাদিকের জীবনের সেরা সুযোগ পেয়েছেন, রাজকন্যার নেপথ্য জীবনের প্রথম পাতার খবর। কিন্তু তার প্রতি ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার কারণে এবং নিজের ভেতর হেপবার্নের সৃষ্টি আবেগের কারণে গ্রেগরি পেক এ সুযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানান। (অড্রে হেপবার্নের বাস্তব জীবনের আলকেমির আরেকটা নজির: গ্রেগরি পেক সুদর্শন হলেও কখনই তেমন ভালো অভিনেতা ছিলেন না, পেছনে তাকালে এখানে তিনি তার সব সেরা, সাবলীল ও অনায়াস অভিনয় তুলে ধরেছেন।)

রাজকন্যার সাক্ষাৎ গ্রহণকারী সাংবাদিকদের সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন পেক; তাদের সবার সঙ্গে করমর্দন করার প্রকাশ্য কারণে কিন্তু আসলে (এডি অ্যালবার্টের) কাছ থেকে কেলেঙ্কারিমূলক ছবিগুলো উদ্ধারের উদ্দেশ্যে এবং শেষবারের মতো প্রেমিকের চোখের দিকে তাকাবেন বলে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছেন হেপবার্ন, যার বিছানা থেকে আর কখনই জেগে উঠবেন না তিনি এবং যাকে আর কখনো ভালোবাসবেন না।

এটা কি ইদিপাস জটিলতায় আশ্রয় গ্রহণ নাকি ফিরে আসা? রাজকুমারী কি নিজের জীবনের মিস্ট্রেস নাকি দাসী? এর একমাত্র উত্তর হলো পর্দায় অড্রে হেপবার্ন তার নিজস্ব প্যারাডক্সের মিস্ট্রেস, স্রষ্টা ও লালনকারী।