গল্প শেষে আজ তুমি, মাইল মাইল শোয়া অচল জীবন
গরল গাদের ধকে মরে যাচ্ছ শেষ বিকালের আলো রাঙা?
যেন ধু-ধু চরাচরে ভেড়ার পালেরা হাবা নেশাতুর অচেতন
চিতার আগুনসাজে সহমরণের পথে মনে পড়ে শেষ কথা?
রক্তঝরা রক্ত জ্বলে, বুকে মহাধস চোখে ভাসে প্রলয়ের ছায়াছবি
উদিত দুঃখের দেশ বলে তবে কেন মেতে উঠেছিল বিষাদের কবি?
গুঞ্জরিত প্রিয় নদী তোমার সিথানে কাঁদে গলগল
ছিলে তুমি যে দেশের আভাজ্বলা টিপ, সে দেশ বিরল।
ইউটোপিয়ার মতো সুন্দর শপথ ছিল এই যুদ্ধমুক্ত নগরীর,
কথা ছিল প্রাচ্যমেঘে তুমি হবে আশা, রোদেলা সংশপ্তক!
শিরীষের সারি তুমি মানিক নগরে, রূপপুরে ঝুরি বট
ধানমন্ডির ঝিলের বায়ু আর রোডে রোডে লেবু শরবত।
রমনার পিতামহ গাছে কতবার হেলান দেওয়া ভোর
দেশজুড়ে কত ভিটাহারা লোকজন তোমাতে খুঁজেছে ঘর।
জানের কদর জানা মানুষেরা কেন মরে তোর উদরেতে,
সারাবে মরণব্যাধি বল কোন সে তালিসমান কবিরাজে?
মাটির কুমার ছিল এক রূপলাল মঠে মিরপুরে আরে
পলিজাগা বনগ্রামে ছিল শ্যামাঘোর সেই মায়াবতী মেয়ে,
মাটিচাপা দিয়ে দিছ অপঘাতে মরা সব হাড়গোড় ধুয়ে
জ্বেলেছ কালশী-বস্তি সাত আসমানে ছাইমেঘ গেছে ছেয়ে।
একাত্তরে শালবনে আর গাজীপুরে মুক্তিফৌজ হলে জড়ো,
ঢাকা কি কাছেই খুব, ভেবে রক্তকণা হতো খুব থরথর।
দেশটা নিজের হবে, বলে গিয়েছিল এক কৌম কবিয়াল;
ছাতিমের ঘ্রাণরেখা শুঁকে চিনে বাড়ি দেব পতাকা উড়াল।
পালানো দুপুরে ফের শিশুরা গলিতে জমে দিতেছে ভোঁ দৌড়,
নির্ভয়া বোনের শাড়ি শুকাবে বাতাসে, দোলে কার্নিশে কৈতর।
পুরান ঢাকার ঘুড়ি সুতা ছিঁড়ে উড়ে চোখে বুড়িগঙ্গা দেখে,
যেন কোনো শঙ্কা নাই জিঞ্জিরার দিকে আর সোয়ারির ঘাটে।
দাগলে কামান মীর জুমলার দাগি সিপাহিরা ছিঁড়বে জিঞ্জির
ব্ল্যাকাউট সন্ধ্যায়ও তুলসীতলায় ভয় নাই শ্রাবণ দিদির।
পাপসৌধে দিয়ে ভর তবু নিছ কেড়ে মুগ্ধ আশা চাতকের;
স্বাধীন দেশের বুকে দেখি ফিরে আসে হত্যা দখলি-খোঁয়াড়?
বসাও কাচারি দশ দিকে চেকপোস্টে যত তমসা বাহিনী,
পিতৃহারা বুকে ঘষা খায় জেদ জ্বলে প্রতিশোধের চিমনি।
লোভের দোজখে মরা মানুষের ঘৃণা পুষে বাঁচে না শহর,
গ্রাম পারে পুনরায় ঘাত সয়ে বারেবারে জাগাতে প্রহর।
তোমার কলিজা কালো, বুকে নাই অপঘাত সহনের জোর,
সামলে আবার তুমি মানবের জেদে দাঁড়াবে না হে নাগর?
সহস্রাব্দ পার হয় একটি কবিতা, সমুদ্র পেরোয় ছোট ছোট পাখি,
শহরে বাঁচে না দম, জান ও জবান আর মিহি সব প্রাণের কিশোরী।
জীবনীশক্তির ঝাড় ছিল সেই গ্রাম—তার গৃহ ও গতর,
মখলুকাতের গানে প্রাণের বন্দনা ছিল আঠারো হাজার।
মাটি নেয় ঘাম আর শ্রমের সুনাম, দেখাক তাদের যতই শিরশিরে,
মরদেরা দিতে পারে সুখের নিড়ানি সুলতানের তুলিতে আঁকা নারীর শরীরে।
গজব পেরিয়ে শত প্রতিবার তারা বীজধান থেকে ফলাত উদ্গম
কিসের বড়াই করো তরুপ্রাণে যদি জাগাতে না পারো পাখির মাতম?
প্রতিটি যুদ্ধের পর পতাকার মতো নবজাত শিশু আর যত মাতিয়ে মৌমাছি,
দিতাম জানান আমি, শেষাবধি কারা আছে খাড়া কারা সত্যিকার জয়ী।
নদীভাঙা গাবুরেরা পুনরায় খোঁজে আশাজাগানিয়া চরের বসত,
অশোধিত বাসনায় ডুবাচ্ছ কপাল, তোমার সিঁধেল নিজেরই ঘরত।
হারিয়েছ তুমি জান, প্রাচীন মহিমা নিয়ে বুননের নকশা-খেয়াল,
শব্দ এসে বোবা করে, দৃশ্য করে অন্ধ; শুধু দেয়ালের পরেও দেয়াল।
নদীপাড়ে গিয়ে দেখি ইঁদুর কলোনি—হিংসা ভরা পিঁপড়ারা গাছে গাছে,
আত্মা মরে গেলে পর সকলই মিছা, উত্তর মেলে না বোবা প্রশ্নক্ষতে।
সিলিকন মাকড়েরা চোখে বসা মাছি,
ধোঁয়াজাল ওড়ে মনে পুরান প্রাসাদে।
নতুন শহর শাদ্দাদের বালাখানা
শরীরসর্বস্ব শূল, চোখে চকমকি।
এই কি নগর নাকি খোলা জেলখানা,
এই কি জীবন নাকি জম্বি পায়খানা!
সারি সারি বাক্সবাড়ি সারি সারি বন্ধ জানালার কালো শিক,
সারি সারি বাক্সগাড়ি খাঁচার মুরগি রাখিয়াছি মাথা ফিট।
কয়েদির মতো দিনে জবানে কুলুপ রাতে মাথানিচু ছুটি,
দম চেপে ফিরি ঘরে, জীবনটা ধুকপুক মন আরো ধোঁকে।
জানালার লোভে বেচি ঘর ও দরোজা সব আড়তে-বাজারে,
আবার দরোজা দিয়ে হেঁটে তারা ঢুকে বাড়িঘরে বা মাজারে
মরণের কালে নাহি পায় জানালার শ্বাস এতটুকু খোলা!
তুমি আর পারছ না, নদীগুলি মরা তোমার বুকেতে হিম,
জলবিনাশিনী তুমি জল ফিরিয়েছ, নদীর বিরুদ্ধে পিঠ;
নদীতেই চিরকাল বুকজলে যারা করে শুদ্ধতা গোসল
সেই নদী আজ বুক ঘষে ঘষে বয় নিয়ে মানুষের গরল
নদী মেরে মরে গেছে কত পরশুরাম আর সীমার-হার্মাদ।
নদীটার স্রোত ঘুরে গেছে বলে দেখ মরেছে মুর্শিদাবাদ
মেঘনার ধারাপাত সরে গেছে দেখে কাঁদে পানামের ঘাট।
তুমি ভুলে গেছ মানবিক মানচিত্র, যেন কোনো শিল্পী তোমায় এঁকেছে সুদর্শন
যেন তুমি বামে ঝুঁকে তোমার সোহাগী নদীটার মুখে করছ চুম্বন
তোমার কাঁদন ছিল গঙ্গাবুড়ি ঢেউ, গাল বেয়ে নামা অশ্রু—গলিত রোদনরূপা।
মেঘনার কূলে কূলে বাছুর চরাচ্ছে তার বোন, ধলেশ্বরী প্রেমিকার বিছা।
শীতলক্ষ্যা ছিল স্মৃতি, ভোররঙা কাশবন শারদীয় শাড়ি
নিজেরি নদীকে মেরে, তুই কই যাবি দাগি পাষাণ আনাড়ি!
গাজীপুর, রূপগঞ্জ আর হলদিয়া যেন ৩০০ ফুটি প্রশস্ত কবর
তুমি মরে যাচ্ছ তুমি বাসনার বিষে আত্মাহুতি চলে নিজের ভেতর।
তোমার খালেরা নাই, রক্তবাহী শিরা-উপশিরা নাই
জ্বরের বিকারে রোজ খেয়ালে ফাটাচ্ছ ছলনার রোশনাই।
দেখো গ্রাম ছিল কত সর্বজয়া দেবী
আর তুমি শতছিদ্র ক্ষতভরা রোগী,
দাবানল লাগা রাতে ঝাঁঝরা বুকের মতো দীর্ণ,
হূদয় বিধ্বস্ত খুব, পালকেরা খসা; আত্মা জীর্ণ।
শত শত বাতিজ্বালা আলোর তরাসে তুমি অন্ধ
সারা গায়ে দাহ্যগুঁড়া, জতুগৃহ অবশ-নিস্পন্দ,
নিজেকে হারিয়ে খোঁজো একচোখা মন খোলা রেখে?
খামখেয়ালের কালো ভাটা জ্বলে দালানে দালানে।
কিন্তু দ্যাখো গ্রামগুলি, থাকে না কখনো জেগে জর্জরিত বাসনার রাগে?
নদীটাকে পাহারায় শিয়রেতে রেখে, ঘুমাতে সে পারে বর্ষণের রাতে।
পারছ না তুমি ঢাকা, ডিপো ভরে ট্রেন তবু কেন ধরে রাখো?
সাধু আর শয়তান মাপো যদি ফের তুমি সমান পাল্লায়,
দেশখানি ছেঁকে কেন আনলে তাদের এ গাড্ডায়!
কেবলই মাসুমের কেবলই নিষ্পাপের মৃত্যু করে দিয়ে
কতজনা খুব ফাঁকা, একসঙ্গে আছি কাঁটাতারে খুব একা।
চোখে চোখে সিসিটিভি দ্যাখে ভাঙা তাঁতে অশান্তিতে মরা মাকু
আমাদের মেরে তুমি কি করবে নিরজনে দিল আঁকু-পাঁকু?
স্মৃতির শহর বলে আর কোনো কবি ওড়াবে না ঘ্রাণ—বুকের রুমাল,
ফাগুনে শহীদ যারা, হেসে উঠবে না তারা কোনো এক ফাগুনে আবার।
তোমার ওপরতলা সবটাই হয়ে গেছে ভাড়া,
নিচতলা বিবরের মতো মুখ করে আছে ফাঁকা!
রাজধানী নাকি তুমি দেশের প্রচ্ছদ, বলো কে বলবে আর
ধ্বংসের ব্যাপারিরা তোমাকে করেছে দল বেঁধে সুখে চিতার আহার।
তোমার মলাটে রক্ত-পুঁজ-বসা-গন্ধ, তাজরীনে পোড়া দেহ,
রাংতার মতো তুমি বুকে চকচকে, ভেতরটা বীভৎস বেরঙা সন্দেহ।
তুমি সেই মিথ্যা বহি, পৃষ্ঠাগুলি ফাঁকা;
লিখি আর মুছে যায় নীল সব কথা;
ঢাকা তুমি ডাকিনীর উদরের খিদা,
মরে যায় গর্ভফুল মানুষের আয়ু
তোমার ওপর দিয়ে বয়ে যায় ঝড়,
দাবানল আর যত দুষ্টগ্রহবায়ু।
অন্তিম লালাভ ভয় বাংলাদেশে নামে
পতনের আগে দিন চুপ হয়ে আসে।
মৃতের নগরী নিচ্ছে প্রেতপুরী সাজ,
জীবনটা মওকুফ মৃত্যু লাখেরাজ।
শহর মরণ চায়, নারীটার তরে সুখের মরণ শুধে যায় পুরুষ মাকড়
অবিস্মরণীয় প্রেমে আত্মঘাতী জোড়া ইল মাছ জানে সহমরণ সাঁতার
রানী মৌমাছিকে আরো গরীয়ান করে যেতে মরে যায় পুরুষ মৌমাছি।
সুখের খোদলে দিয়ে বিষের পুরিয়া এ শহরে মৃত্যু আসে রোজ ছদ্মবেশী।
হাঁটাপথে তবু আসি তোমার কিনারে হে সভ্যতা!
আমাদের ভাইবোন আজও খায় নুন লতাপাতা,
জানে না কোথায় মাতা হারাল যে তার নোলকটা,
উন্নয়নের পাতাল খোঁড়ার মজুরি খাটে আমাদের বাবা।
গুষ্টিশুদ্ধ গালি খাই, মশা খাই, কাটি মরা মাছের সাঁতার
৪০০ বছর পর, কচ্ছপের মুঠি ছেড়ে দিচ্ছে শেষ মাটির কামড়।






