রেভারেন্ড টমাস ম্যালথাস ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, জনসংখ্যার বিপুল বৃদ্ধি দুর্ভিক্ষ ও দুর্যোগ সৃষ্টি করে দুনিয়ার ধ্বংস ডেকে আনবে। তার এ ধারণা কতটা ভুল, সে সম্পর্কে ম্যালথাসের কোনো ধারণাই ছিল না।

দুই শতক পর পৃথিবীর জনসংখ্যা যখন ৭০০ কোটি হয়েছে, তখন তার তত্ত্ব পুরোপুরি খারিজ হয়ে যায়। আর ভাগ্যের পরিহাসে, তার নিজের রক্তের ধারা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অ্যান এসে অন দ্য প্রিন্সিপলস অব পপুলেশন লেখার মাত্র ৮৬ বছরের মাথায় তার একমাত্র জীবিত কন্যা এমিলির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ম্যালথাসের ফ্যামিলি ট্রির সমাপ্তি ঘটে।

ম্যালথাস আগেভাগে তার পরিবারের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার মতো পরিণতি সম্পর্কে ধারণা করতে পারেননি। ম্যালথাস বিশ্বাস করতেন, প্রতি ২৫ বছরে জনসংখ্যা দ্বিগুণ হবে। এটা তত দিন চলতে থাকবে, যত দিন মানুষ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করতে পারবে না।

ম্যালথাসের অনুমান ছিল তারপর যা ঘটবে, সেটা এখন ম্যালথুসিয়ান ক্রাইসিস নামে পরিচিত। ম্যালথাসের সেই অনুমান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাঙ্গলিয়ার ইতিহাসবিদ এবং ‘আ শর্ট হিস্টরি অব দ্য ব্রিটিশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভুলিউশন’ গ্রন্থের লেখক ড. এমা গ্রিফিন বলেছেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে অভাব, দুর্ভিক্ষ, মহামারী এবং আরো অন্যান্য সমস্যা জনসংখ্যা হ্রাস করবে, যাতে জনসংখ্যা ও প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। কিন্তু অতি অবশ্যই, এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি।’ প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর জনসংখ্যা এখন ৭০০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে বলছেন যে, ২০৫০ নাগাদ জনসংখ্যা ৯০০ কোটিতে পৌঁছাবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শিল্প-বিপ্লবই আমাদের ম্যালথাসের অনুমানকৃত ধ্বংস থেকে রক্ষা করেছে। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন আধুনিক সমাজকে পর্যাপ্ত সম্পদের সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। ড. গ্রিফিন ব্যাখ্যা করেছেন, ‘যখন আপনি শিল্পনির্ভর সমাজে পৌঁছবেন, তখন জনসংখ্যা ও প্রাকৃতিক সম্পদের আকারের মধ্যকার সম্পর্ক ভেঙে যাবে। তখন আমরা আর খাবারের জন্য নিজেদের কৃষি উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে থাকি না।’

ম্যালথাসের সময়কালে অবশ্য পরিস্থিতি আজকের দিনের চেয়ে অনেক ভিন্ন ছিল। সে সময় পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তার মনে হয়েছিল, জনসংখ্যা বৃদ্ধির যেকোনো ঢেউ পাল্টা কোনো আঘাতে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে, যেমন মধ্যযুগের প্লেগের মহামারী। তবে ম্যালথাসের পরিবারের সবাই মারা গেলেন আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে দুনিয়ার পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করার আগেই। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ পরিবারটি বিলুপ্ত হয়ে যায় সম্পূর্ণ পারিবারিক কারণে, এক্ষেত্রে ম্যালথাস তার প্রবন্ধে যেসব বিষয় অনুমান করেছিলেন, সেগুলোর কোনোটাই দায়ী ছিল না।

থমাস ম্যালথাস জন্মেছিলেন ঠোঁটকাটা খুঁত নিয়ে। এজন্য তিনি বহু বছর নিজের কোনো প্রতিকৃতি আঁকাননি। তিনি তার সময়কালে সবচেয়ে বিশিষ্ট মানুষদের একজন হয়ে উঠেছিলেন, একজন প্রভাবশালী অর্থনীতিবিদ ও রয়্যাল সোসাইটির ফেলো। ম্যালথাস ছিলেন অ্যাংলিকান চার্চের পাদ্রি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ম্যালথাস নৈতিক সংযমের চর্চা করার কথা প্রচার করেছেন। তিনি মনে করতেন, সন্তান লালন-পালনের সামর্থ্য না থাকলে দম্পতিদের সন্তান গ্রহণ করা উচিত নয়।

তবে ম্যালথাসের তত্ত্ব তার মৃত্যুর বহু বছর পরও মানুষকে প্রভাবিত করেছে। তার উত্থাপিত ‘অস্তিত্বের জন্য অবিরাম সংগ্রামের তত্ত্ব’ ডারউইনকে অরিজিন অব স্পিশিজ লিখতে প্রভাবিত করেছিল। ডারউইনের অরিজিন অব স্পিশিজ ম্যালথাসের মৃত্যুর ২৫ বছর পর ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল।

১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে ম্যালথাস তার কাজিন হ্যারিয়েটকে বিয়ে করেন। এ দম্পতির ছিল তিন সন্তান। এ তিন সন্তানই নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান, ফলে ম্যালথাসের প্রত্যক্ষ রক্তের ধারার ইতি ঘটে। ম্যালথাসের কনিষ্ঠ সন্তান লুসি ১৭ বছর বয়সে অবিবাহিত অবস্থায় মারা যান। অন্য দুই সন্তান হেনরি ও এমিলি বিয়ে করেন। হেনরি ৭৮ বছর ও এমিলি ৭৯ বছর বেঁচেছিলেন। অজ্ঞাত কারণে হেনরি কিংবা এমিলি নিঃসন্তান ছিলেন।

অনুবাদ: শানজিদ অর্ণব