রাজমহল থেকে রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরিত না হলে এবং ইসলাম খানের মতো একজন উদ্যোগী ও সাহসী গভর্নর না পেলে মেঘনা প্রান্ত থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল হয়তো কয়েকশ বছর রিপাবলিক অব পর্তুগালের অংশ হয়ে থাকত। যেমন ছিল এখন ভারতভুক্ত গোয়া, দমন ও দিও।

ইতিহাস ভাস্কো দা গামাকে বিশ্বখ্যাত করেছে, অভিযাত্রীর মর্যাদা দিয়েছে। বাস্তবে তিনিও ছিলেন জলদস্যু, অন্তত তার কর্মকাণ্ড জলদস্যুর নির্মমতার চেয়ে কম কিছু ছিল না।

বঙ্গোপসাগরের দিকে এগিয়ে আসা পর্তুগিজ জলদস্যু সেবাস্টিয়ান গঞ্জালেস যদি তার ঔদ্ধত্য সামলে নিয়ে কৌশলগত রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারতেন বাংলার অংশ ও আরাকান জুড়ে স্থাপন করতে পারতেন দীর্ঘস্থায়ী পর্তুগিজ উপনিবেশ।

ভাস্কো দা গামা কালিকটে অবতরণ করেন ১৪৯৮ সালে আর চট্টগ্রামে পর্তুগিজ অভিযাত্রী ও দস্যুদের অবতরণ ১৫১৭ সালে। সপ্তদশ শতকের শুরুতে সন্দ্বীপ সেবাস্টিয়ান রাজের রাজত্বেই পরিণত হয়েছিল। উভয়ের মধ্যে বৈরিতার সম্পর্ক থাকলেও এই বাংলা হয়ে ওঠে পর্তুগিজ দস্যু ও আরাকানের মগদের লুণ্ঠনের প্রিয়ভূমি। পূর্ববঙ্গ গীতিকা থেকে উদ্ধৃতি:

দুরন্ত হার্ম্মাদ্যার ডাকু কি না কাম করে।

কন্যারে বাঁধিয়া লইল কাঁধের উপরে\

বাংলার সম্পদ থেকে শুরু করে নারী—বছরের পর বছর জলদস্যুদের লুণ্ঠনের শিকার হয়েছে। পূর্ববঙ্গ গীতিকা থেকে আরো একটি উদ্ধৃতি প্রাসঙ্গিক:

ফিরিঙ্গী বোম্বাট্যা আর মঘ ডাকু মিলি।

হার্মাদ্যা সাইগরে চলে সুলুপে পাল তুলি\

পরাণের লালছ নাইরে বড়ই জাহিল।

সাইগরে লড়িতে তারা হয় না কাহিল\

বৈদেশে কামাইয়া আইসে যত সদাইগর।

বাওটা তুলি ধরে হার্মাদ্যা ডিঙ্গার উপর।

লুড তরাজ করিন্দারে ডিঙ্গা ডুপাইত।

মাঝিমাল্লা বাঁধি তারার সঙ্গে করি নিত\...

তেলের মত নাও রে তারার পঙ্খীর মত উড়ে।

জাহিল হার্মাদ্যা ডাকু কি না কাম করে\

আরাকান উপকূলে লুণ্ঠন ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করায় আরাকান রাজার নির্দেশে পর্তুগিজদের বেশ কজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সেবাস্টিয়ান গঞ্জালেসের নেতৃত্বে কয়েক দফা প্রতিশোধও নেয়া হয়। কিন্তু স্বার্থগত ঐক্যের কারণে পর্তুগিজ জলদস্যু এবং মগ জলদস্যুদের মধ্যে আঁতাত সৃষ্টি হয় এবং আরাকান সরকার তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে থাকে। শিহাবউদ্দিন তালিশের ‘ফার্সি ভাষায়’ লেখা অভিসন্দর্ভে উল্লেখ আছে ফিরিঙ্গি পর্তুগিজদের আশ্রয় ও নিরাপত্তার বিনিময়ে রাজার নির্দেশেই তার সঙ্গে লুণ্ঠিত দ্রব্য আধাআধি ভাগের শর্তে জলদস্যুদের বাংলায় পাঠাতেন। ফরাসি পর্যটক ফ্রাসোয়াঁ বার্নিয়ার এবং ইংরেজ সৈনিক ও শিক্ষক চার্লস স্টুয়ার্টের লেখায় পর্তুগিজ ও মগ দস্যুদের লুণ্ঠন ও নির্মমতার কাহিনী ও ইতিহাস উঠে এসেছে।

কেবল বাংলা নয়, বৃহৎ ভারত উপমহাদেশকে বেষ্টন করা সাগরের বিভিন্ন অংশ বন্দর ও বন্দরসংলগ্ন এলাকায় পর্তুগিজ ও অন্য ইউরোপীয় জলদস্যুদের নিপীড়ন অব্যাহত ছিল। এমনকি মোগল রানি মরিয়ম জার্মানির নিজস্ব জাহাজ ‘রাহিমি’ও পর্তুগিজ জলদস্যুরা লুণ্ঠন করে এবং দখলে নিয়ে নেয়। যেসব উপকূলে দস্যু প্রকোপ ছিল সেগুলো ‘পাইরেট কোস্ট’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে:

জলদস্যুর তালি মারা চোখ

পাইরেট বা জলদস্যুর ইমেজটি তৈরি করে দিয়েছে জলদস্যুদের নিয়ে নির্মিত সিনেমাগুলো। দস্যুর একটা চোখের ওপর প্যাঁচ বা তালি। কারণটা কী?

স্বাভাবিকভাবে যা হওয়ার কথা তা হচ্ছে, সম্ভবত চোখটাই নেই কিংবা ডাকাতি দস্যুতার ব্যাপার, হয়তো ছুটির খোচ কিংবা গুলি লেগে এতটাই জখম হয়েছে যে ঢেকে রাখা ছাড়া উপায় নেই। হয়তো এক-দুজনের বেলায় এটাই কারণ হতে পারে কিন্তু জলদস্যুরা সেকালে বাস্তব প্রয়োজনেই এই পট্টিটা বাঁধত। দস্যুদের দিনের আলোয় রাতে ঘুটঘুটে অন্ধকারে জাহাজ নিয়ে এগোতে হয় ভেবে নামতে হয়, শত্রু কিংবা টার্গেট সামনে পড়লে ওত পাততে এমনিতেই আলো নিভিয়ে দিতে হয়। আলোকিত পরিবেশ হঠাৎ গাঢ় অন্ধকার হয়ে গেলে আঁধারের সঙ্গে দৃষ্টিশক্তির সমন্বয় ঘটাতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কিন্তু জলদস্যুদের জন্য যে প্রতি মুহূর্ত এর মুহূর্তের খণ্ডাংশও গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই অন্ধকারের সঙ্গে চোখের সমন্বয় করানোর মতো অপচয় করার সময় তাদের নেই। তাত্ক্ষণিকভাবে অন্ধকারের সঙ্গে তাল মেলাতে একটি চোখকে আগে থেকে অন্ধকারের প্রস্তুতির মধ্যেই রাখা হয়। ক্যাপ্টেন ব্ল্যাকবিয়ার্ড লঙ জন সিলভার কিংবা ক্লাইড পিউর যে ছবি বই কার্টুন কমিকে ছাপা হয়েছে, সেখানে দেখানো হয়েছে, জলদস্যুর তালি মারা চোখের কারণ ফ্যাশনও নয়, জখম হওয়া চোখ ঢাকাও নয়, মূল কারণ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে একটি চোখকে আগে থেকে প্রস্তুত রাখা। তবে পেশাদার একজন জলদস্যু বলেছে, এতে ভীতিকর দেখায়, টার্গেটকে বশীভূত করা সহজ হয়।

পারস্য উপমহাসাগরের বিখ্যাত দস্যু রাহাম ইবনে জাবির আল-জালাইমের চোখে তালি পড়েছে একটি চোখ উপড়ে ফেলার কারণে।

একালের জলদস্যু

একালের জলদস্যুও কখনো কখনো নিজেদের পেশাগত মর্যাদা বাড়াতে আগেকার জলদস্যুর বেশ ধারণ করে। তাতে এক চোখের ওপর প্যাঁচ বা তালি তো থাকবেই। এখনো তারা আগের মতোই লুটতরাজ করে টাকার জন্য জিম্মি করে রাখে, বাধা দিলে পাল্টা আক্রমণ করলে হত্যা করে গভীর সমুদ্রে হাঙরের খাবার হিসেবে নিক্ষেপ করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাদের অপারেশন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।

ক. তারা নাইট ভিশন গগলস পরে।

খ. তারা স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করে।

গ. হাতে হাতে একে ৪৭ রাইফেল রাখে।

ঘ. তারা মেশিনগান ও রকেট লঞ্চার সঙ্গে রাখে।

ঙ. জিপিএফ (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) ডিভাইস ব্যবহার করে।

চ. মর্টার বসানো অত্যাধুনিক স্পিডবোট ব্যবহার করে।

(সোমালিয়ার জলসদ্যুরা ৮২ মিলিমিটার মর্টার চালিয়েছে)

ছ. অনেক ক্ষেত্রে সুবিধাজনক স্থানে তাদের মাদার ভ্যাসেল বা বড় জাহাজ থাকে।

জ. আধুনিক জলদস্যুদের টার্গেটের মধ্যে কার্গো ভ্যাসেল, ক্রুজ শিপ ব্যক্তিগত লাক্সারি ওয়াচও রয়েছে।

ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে একালের জলদস্যুরা যথেষ্ট অবহিত। কোন দেশের জাহাজ অবরোধ করলে কোন কোন দেশ ক্ষিপ্ত হবে, পাল্টা আক্রমণে এগিয়ে আসবে, এটা তাদের হিসাব করা। বর্ণিত অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জলদস্যুদের অপারেটিং ভেন্যুও পরিবর্তিত হয়। ২০১৫-১৬ সালের জলদস্যুতার হিসাব ধরে কম থেকে বেশি এমন ১০টি সর্বোচ্চ পাইরেসিপ্রবণ ভেন্যুর উল্লেখ করা হচ্ছে।

১০. সেলেবেস সি (পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল)

৯.   নর্থ ইয়েলো সি (চীন ও কোরিয়ার মধ্যবর্তী)

৮.   আরব সাগর (পাকিস্তান, ইরান, ভারত হয়ে যাওয়া)

৭.   জাভা সাগর (ইন্দোনেশিয়া-সংলগ্ন, সাউথ চায়না সির সঙ্গে যুক্ত)

৬. বঙ্গোপসাগর (বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভারত, শ্রীলংকা)

৫.   মালাস্কা স্ট্রেইট (ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোজন শিপিং চ্যানেল)

৪.   ক্যারিবিয়ান সাগর (সেন্ট মার্টিন, অ্যান্টিগা ভার্জিন আইল্যান্ডসহ বহুসংখ্যক দ্বীপ ধারণ করা আটলান্টিক মহাসাগরের অংশ)

৩.   সিঙ্গাপুর স্ট্রেইট (সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালাস্কা স্ট্রেইট স্পর্শ করা)

২.   সাউথ চায়না সি (ইন্দোচিন, তাইওয়ান, সাউথ চায়না)

১.    গালফ অব গিনি (লাইবেরিয়া, আইভরি কোস্ট, ঘানা, টোগো, বেনিন, নাইজেরিয়া, গ্যাবন)

এর আগের পাইরেসি জোনগুলোর মধ্যে ছিল: গালফ অব এডেন, গালফ অব গিনি, বে অব বেঙ্গল, নর্থ চায়না সি, স্ট্রেইট অব মালাক্কা, ক্যারিবিয়ান সি, পেরু ও ব্রাজিলসংলগ্ন সাগর।

নব্য জলদস্যুর কবলে পর্তুগিজ জাহাজ

শুধু বঙ্গোপসাগরেই নয়, ভাস্কো দা গামার আগমনই ভয়ংকর রক্তাক্ত ও নির্মম অভিযানের মধ্য দিয়ে। ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে পর্তুগিজ অভিযানগুলোর লক্ষ্য ছিল দস্যুতা সম্পদ আহরণ এবং সম্ভব হলে সাম্রাজ্য বিস্তার। সেই পর্তুগিজদের সবচেয়ে জৌলুশপূর্ণ দুটি জাহাজের একটি ‘সান্তা মারিয়া’ ১৯৬১ সালের ২২ জানুয়ারি অপহূত হলো সাগর থেকে। তারপর টানা ১১ দিন বিশ্বসংবাদের শিরোনাম হয়ে রইল সান্তা মারিয়া।

৬০৯ ফুট দীর্ঘ ২০৯০০ টন ওজনের জাহাজ সান্তা মারিয়া আর তার যমজ বোন একই ডিজাইন ও আকৃতির জাহাজ ভেরা ক্রুজ। দুটোর মালিক পর্তুগালের কোম্পানি কলোনিয়াল অব লিসবোয়া। ১০৭৮ যাত্রীর সান্তা মারিয়া আটলান্টিকের সঙ্গে বেশ খাপ খাইয়ে নিয়েছে। পর্তুগালের রাজধানী শহরের বন্দর ছেড়ে মেডেরিয়া টেনেরিফ লা গুইয়ারা, হাভানা পোর্ট এভারগেডস বন্দরে যাত্রী ওঠানামা করে। ১৫৬ জন প্রথম শ্রেণীর যাত্রী, কেবিন ক্লাসে ২২৬ জন আর তৃতীয় শ্রেণীতে প্রায় ৭৪০০ যাত্রী। বেলজিয়ামের ডকইয়ার্ডে ১৯৫৩ সালে নির্মিত জাহাজ আটলান্টিক ভূমধ্যসাগর, ক্যারিবিয়ান সাগর চষে বেরিয়েছে। যাত্রীদের ভেতরেই ছিল পর্তুগিজ নব্য জলদস্যু। তাদের ক্যাপ্টেন পর্তুগিজ বেলরিখ গ্যালভোয়া। তার দলের ২৪৭ সদস্যের অধিকাংশই পর্তুগিজ, ক’জন স্প্যানিশ। সশস্ত্র নব্য জলদস্যুরা একসময় তাদের স্যুটকেস খুলে অস্ত্র বের করে খুব অল্প সময়ের মধ্যে জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল। ফলে গভীর সমুদ্রে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল সান্তা মারিয়া। বিভিন্ন সমুদ্রসংলগ্ন দেশ উড়োজাহাজ পাঠিয়ে জাহাজটির অবস্থান নির্ধারণ করার চেষ্টা করল—একসময় প্রশ্ন উঠল তাহলে কি সান্তা মারিয়া আটলান্টিকের অতলে বিলীন হয়ে গেছে? অনুসন্ধানে ব্রিটিশ, ডাচ ও যুক্তরাষ্ট্রের নেভি ফ্লিট। যোগ দিল চারটি ডেস্ট্রয়ার ও ইউএসএস হার্মিটেজ। সান্তাকে পাওয়া গেল মধ্য আটলান্টিকে ভাসমান অবস্থায়। ব্রাজিলের রেসিফ থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে জাহাজটিকে ঘেরাও করা হলো। আমেরিকান নেভির রিয়ার অ্যাডমিরাল অ্যালেন স্মিথ তার ফ্ল্যাগশিপ ছেড়ে নামলেন লঞ্চে, দস্যুদের সঙ্গে দরকষাকষি ও সমঝোতার দায়িত্ব তার। দলপতি গ্যালভোয়া সোনা রুপা ডলার পাউন্ড কিংবা সুন্দরী নারী কিছুই দাবি করলেন না। তার চাওয়া পর্তুগালের স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট সালাজার এবং স্পেনের স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কোকে পদত্যাগ করতে হবে।


জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার সময় থার্ড পাইলট নাসিমেন্তো কোস্তাকে হত্যা করতে হয়, একজন আহত হয়। সে সময় ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট কোয়াদ্রোসও সালাজার বিরোধী হওয়ায় এই রাজনৈতিক দস্যুদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। যাত্রী, ক্রু ও জাহাজের চুক্তির বিনিময়ে তিনি ২৪ জন রাজনৈতিক জলদস্যুকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে সম্মত হন। ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ তাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে শতাব্দীর ভিন্নধর্মী একটি পাইরেসির অবসান ঘটে।

বিপ্লবী গ্যালভোয়া পরে বলেছেন, তার উদ্দেশ্য ছিল অ্যাঙ্গোলায় গিয়ে সালাজারকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে একটি বিদ্রোহী সরকার গঠন করা। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয়েছে তার বই ‘সান্তা মারিয়া: মাই ক্রুসেড ফর পর্তুগাল’।

সান্তা মারিয়ারও বয়স বাড়ে। প্রতিযোগী নেমে যায় সাগরে। ওদিকে তুলনামূলকভাবে বিমান ভাড়া কমে আর সান্তার পক্ষে লাভজনকভাবে টিকে থাকা সম্ভব হয় না। কিছুকাল মালবাহী কার্গো জাহাজ হিসেবে কাজ করে, ১৯৭৩-এ ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দেয়। হিসাব করে দেখা যায় ইঞ্জিন ওভারহোল্ডিং আর জাহাজ মেরামত করে পোষাবে না। সামান্য কিছু ক্রু নিয়ে জাহাজটি তাইওয়ানে চলে আসে। এখানেই ভেঙে টুকরো টুকরো করা হয় ঐতিহাসিক সান্তা মারিয়াকে।

বঙ্গোপসাগরে নিরাপত্তা

২১ লাখ ৭২ হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত জলসীমায় বঙ্গোপসাগরের অববাহিকা ছুঁয়েছে পাঁচটি দেশ। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও শ্রীলংকা। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশে পাল তোলার অনেক আগেই পর্তুগিজ অভিযাত্রীর দল ১৫১৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে অবতরণ করে। ১৫৯৮ সালে চট্টগ্রাম ও আরাকানে পর্তুগিজ ও ইউরোপিয়ানের সংখ্যা ছিল অন্তত ২৫০০। বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক অবস্থান, আকার, গুরুত্ব ইত্যাদি বিবেচনা করে এর সুরক্ষার প্রয়োজনও অনেক বেশি। বর্ণিত পাঁচটি দেশ ছাড়াও ভূমিবেষ্টিত নেপাল ও ভুটান এবং দূরবর্তী কিছু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশকেও আর্থিক কারণে বঙ্গোপসাগরের ওপর নির্ভর করতে হয়। হালের ভারত-চীন বিরোধ বঙ্গোপসাগরের নিরপেক্ষ নিরাপত্তার প্রশ্নটি আরো জোরদার করে তুলেছে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশ ও ডাচদের মধ্যে আনুভূমিকভাবে ভাগ করে ন্যস্ত করা হয়েছিল। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন প্রণীত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর সমুদ্র-তীরবর্তী রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে এবং তার অপারেশনস গাইডলাইনও দিয়েছে। ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইন কনভেনশন জলদস্যুতা মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি রচনা করেছে।

পাইরেট কোড

সাফল্যের পূর্বশর্ত শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড রক্ষা করা। একটি প্রচীনতম অর্থকরী প্রতিষ্ঠান হিসেবে জলদস্যুতারও প্রতিষ্ঠিত কোড রয়েছে। ১৭২৪ সালে প্রকাশিত চার্লস জনসনের ‘এ জেনারেল হিস্ট্রি অব দ্য পাইরেটস’ জলদস্যুদের প্রণয়ন করা নয়টি পূর্ণাঙ্গ এবং প্রায় পূর্ণাঙ্গ কোড প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে

১.   আর্টিকেলস অব বার্থেলমিউ রবার্টস

২.   আর্টিকেলস অব জন ফিলিপস

৩. আর্টিকেলস অব জন এডওয়ার্ড লো অ্যান্ড জন জর্জলাউথার

৪.   আর্টিকেলস অব জন গাও

৫. আর্টিকেলস অব হেনরি মর্গান অ্যান্ড আদার কুকানিয়ার্স।

আর্টিকেলের সঙ্গে যাদের নাম যুক্ত তারা দস্যু সর্দার এবং আইনপ্রণেতা।

বিধানগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত সারাংশ উপস্থাপন করা হচ্ছে:

১.   জলদস্যুর প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার থাকবে।

২.   দস্যুতার প্রাপ্ত মালামাল, সম্পদ, পানীয় সমানভাবে বঞ্চিত হবে।

৩. মালামাল নিয়ে কেউ প্রতারণা করলে নির্বাসনে পাঠানো হবে।

৪.   রাত ৮টার পর সমস্ত বাতি নিভানো থাকবে।

৫. জুয়া খেলায় অংশগ্রহণ করা নিষিদ্ধ।

৬. প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পিস্তল, ডেগার ইত্যাদির সঠিক যত্ন নিতে হবে।

৭.   একদিন ছুটি ভোগ করতে পারবে।

৮. জাহাজের ক্যাপ্টেন, কোয়ার্টার মাস্টার, সারেং, খালাসি সবার ভাগ নির্ধারিত থাকবে।

১০.       নিজেদের মধ্যে কলহ, মারামারি নিষিদ্ধ।

১১.        প্রয়োজনের সময় জাহাজে বা কোয়ার্টারে পাওয়া না গেলে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

১২.       কোম্পানির কোনো বিষয় গোপন রাখলে তাকে কোনো নির্জন দ্বীপে নামিয়ে দেয়া হবে।

১৩.       কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া তার সঙ্গে সহবাস করলে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্য হবে।

১৪.       কমান্ডারের সব নির্দেশ মান্য করতে হবে।

১৫.       জখমপ্রাপ্ত ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।

১৬.      কেউ কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করলে তার খালি পিঠে ৪০টি আঘাতের শাস্তি দেয়া হবে।

১৭.       কোম্পানির (অর্থাৎ দস্যু দলের প্রাতিষ্ঠানিক) কোনো দ্রব্য চুরি করলে তার ৮ গুণ মূল্য পরিশোধ করার পর অপরাধীকে নির্জন দ্বীপে নামিয়ে দেয়া হবে।

১৮.       কোনো অবৈধ অস্ত্র (কোম্পানির বরাদ্দের বাইরে) কেউ রাখতে পারবে না।

১৯.       লুট করা কোনো দ্রব্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোয়ার্টার মাস্টারের কাছে জমা না দিলে এবং পরে ধরা পড়লে কঠোর শাস্তি হবে, তাকে দলে রাখা হবে কিনা এ ব্যাপারে কোম্পানি সিদ্ধান্ত নেবে।

২০.       কোনো অপারেশনের সময় কাউকে মদ্যপ অবস্থায় পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তি হবে এবং ক্যাপ্টেন তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।

 

তিনটি পাদটীকা:

১.   অঢেল ধনদৌলত এবং লুট করে আনা নারী সঙ্গে থাকার পরও সাধারণত জলদস্যুরা পুষ্টিহীনতায় ভুগত। সাগরের দীর্ঘপথে খাদ্যে বৈচিত্র্য ছিল না, কখনো কখনো দিনের পর দিন না খেয়ে ও অর্ধাহারে তাদের কাটাতে হয়েছে। ক্ষুধার রাজ্যে সোনাদানা নেহায়েত মূল্যহীন।

২.   পৃথিবীর অনেক উপকূলীয় দেশে এবং দক্ষিণ এশিয়ায়ও সাধারণ ক্ষমায় মুক্ত জলদস্যুদের অনেককেই কোস্টগার্ড হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং কেউ কেউ জীবন বাজি রেখে দেশের স্বার্থ রক্ষা করেছেন।

৩. উত্তরাধিকার সূত্রে রাষ্ট্রক্ষমতা পুত্রকন্যাদের হাতে তুলে দেয়ার প্রবণতা যেমন একালের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিদের মধ্যে আছে, জলদস্যুদেরও একই প্রবণতা ছিল। এতে প্রভাবশালী জলদস্যুরা অসন্তুষ্ট হয়ে কখনো তাদের হত্যা করত। রাজনীতিতেও এসব ঘটনার অনুসৃতি লক্ষ করা যায়।

 

এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা