ইংরেজ শাসন পোক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলার বহু এলাকাই যে জলদস্যুতে ‘পূর্ণ থাকিত’—এ কথা ‘পথের পাঁচালী’-র শুরুর অংশেই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় পাঠকদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন। আদতে বঙ্গোপসাগরের মগ ও পতুর্গিজ বা ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা সমুদ্রঘেরা বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে নিজেদের সিংহভাগ কার্যক্রম চালালেও সুযোগ-সময় বুঝে তারা নিজেদের ‘সেফ জোন’ চাটগাঁর সীমানা ছাড়িয়ে বাংলা মুলুকের অন্যত্রও হামলা যে করবে—সে সম্পর্কে তাদের মনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা কি সংশয় ছিল না। সে ইংরেজরা আসার আগে হোক কিংবা তারা আসার পরে— সব আমলেই বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভয়ংকর জলদস্যুরা তত্পর ছিল। প্রকৃতপক্ষে, শায়েস্তা খানের হাতে চূড়ান্ত পিটুনি খাওয়া ও ইংরেজদের চতুর সতর্ক শাসনের খপ্পরে পড়ার পর জলদস্যুদের কাজকর্মে খানিক ভাটা পড়লেও তা কখনই পুরোপুরি থামিয়ে দেয়া যায়নি। সীমিত-স্তিমিত আকারে হলেও জলদস্যুরা নিজেদের লুণ্ঠণবৃত্তি চালিয়ে যাচ্ছিল। সেকালের শহর কলকাতা থেকে সুন্দরবন এলাকার গহীনতম প্রান্ত পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের দুর্ধর্ষ বোম্বেটেরা নানাবিধ (অপ) তত্পরতার মারফত নিজেদের কুিসত পদচ্ছাপ রেখে গেছে বেশ কয়েক শতক ধরেই। এসব এলাকায় লুণ্ঠন, নির্যাতনসহ হেন কদর্য কর্ম নেই যা কিনা মগ ও ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা করতে ছাড়েনি। উল্লেখ্য, তাদের দোসর হিসেবে মাঝে মধ্যে বাঙালি দস্যুদলের দেখাও মিলত।

সুন্দরবনে মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের তত্পরতার শুরু সেই ষোড়শ শতকে। ঐতিহাসিক মহাগ্রন্থ ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’-এর লেখক সতীশচন্দ্র মিত্র প্রচণ্ড খেদের সঙ্গে জানিয়ে গেছেন, ‘সুন্দরবন ধ্বংসের...শেষ কারণ মগ ও ফিরিঙ্গিদিগের অমানুষিক অত্যাচার।... সুন্দরবন ধ্বংসের যাহা বাকি ছিল, এই আরাকানবাসী মগ ও পাশ্চাত্য দেশ হইতে আগত ফিরিঙ্গি জাতীয় জলদস্যুগণের দৌরাত্ম্যে তাহা শেষ করিয়া দিয়াছিল।...[মগ-ফিরিঙ্গিরা] সুন্দরবনের অনেক স্থান লোকশূন্য করিয়া পার্শ্ববর্তী দেশে এক ভীষণ অরাজকতার সৃষ্টি করিয়া ‘মগের মুল্লুক’ করিয়া লইয়াছিল।’ সতীশচন্দ্র আরো জানিয়েছেন, সুন্দরবনের বহু স্থানে আগে জনবসতি থাকলেও তা জলদস্যুদের হামলার মুখে মানবশূন্য হয়ে পড়ে। তবে ওইসব জায়গায় জনপদ যে ছিল, সে চিহ্ন দস্যুকুলের ভয়ানক হামলার পরেও টিকে গেছে ভাগ্যক্রমে: ‘মগ ও ফিরিঙ্গি দস্যুগণ বঙ্গের দক্ষিণ দিক হইতে নদীপথে দেশের মধ্যে যেখানে-সেখানে প্রবেশ করিত এবং লুণ্ঠন, গৃহদাগ ও জাতিনাশ করিয়া বঙ্গের শান্ত পল্লীগুলিকে শ্মশানে পরিণত করিবার উপক্রম করিয়াছিল। বর্তমান বরিশাল, খুলনা ও চব্বিশ পরগণা জেলার দক্ষিণাংশ উহাদের প্রধান ক্রীড়াক্ষেত্র হইয়াছিল।’ মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা দক্ষিণ বঙ্গের দুর্গম ভূমিতে কীভাবে তাদের তত্পরতা চালাত? এক্ষেত্রে সতের শতকে মোগল আমলের ভারতবর্ষে আসা ফরাসি ডাক্তার ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়েরের ভ্রমণকথার শরণ নেয়া যেতে পারে। বার্নিয়ের লিখেছেন, মগ-ফিরিঙ্গিরা ছোট ছোট দ্রুতগামী জাহাজ নিয়ে সমুদ্রপথে দ্বীপপুঞ্জের ওপর হামলে পড়ত এবং গঙ্গার অসংখ্য শাখা-প্রশাখা দিয়ে নিম্নবঙ্গের ভেতরপানে একশ মাইল অব্দি ঢুকে যেত। কোনো শহর, জনসমাবেশ, হাটবাজার, উৎসব ও বিয়ের অনুষ্ঠানের দেখা পেলে সেখানে থেমে হামলা চালাত ও যা যা পেত তার সবই লুট করত। সব বয়েসী নারীদের তারা অপহরণ করে দাস বানিয়ে রাখত। সক্ষম পুরুষদেরও দাস বানিয়ে বিক্রি করে দিত। আর বয়স্ক পুরুষদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। যেসব দ্রব্য জাহাজে আঁটত না, তা রেখে যাবার মতো সামান্য উদারতাটুকুও তাদের ছিল না, ওগুলো তারা আগুনে পুড়িয়ে দিত। বার্নিয়ের আরো লিখেছেন, জলদস্যুদের অত্যাচারের ফলে নিম্নবঙ্গের অনেক এলাকায় জনমনিষ্যি উধাও—সেখানে এখন কেবল বাঘ ঘোরাফেরা করে। বিশেষ করে বর্তমান যশোর জেলার ভূখণ্ডে এদের উৎপাত ছিল সবচেয়ে বেশি।

আরেক মর্মান্তিক ব্যাপার ছিল এই যে সেকালে বাঙালি নারীই মগ-ফিরিঙ্গি দস্যুদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছিলেন। এমনও হয়েছে কোনো জনপদে গিয়ে বিশেষ ধনসম্পদ লুঠ করতে না পেরে জলদস্যুরা গাঁয়ের গৃহবধূকে অপহরণের পর নিজেদের জাহাজে বন্দি করেছে। আবার সেকালের সমাজের গোঁড়ামিহেতু, অনেক নারীকে দস্যুরা স্রেফ স্পর্শ করেছে—এই সামান্য কারণেও সমাজচ্যূত হতে হয়েছে। সুন্দরবন এলাকার এমন একটি দুঃখজনক ঘটনার বর্ণনা পাই সতীশচন্দ্র মিত্রের কলমে: ‘একটি স্ত্রীলোক নদীর ঘাটে স্নান করিতেছিল, এমন সময়ে দুই-একজন মগ...পার্শ্ববর্ত্তী পথ দিয়া যাইতেছিল। স্ত্রীলোকটি মগের ভয়ে জলে ডুব দিয়া রহিল, ভাবিল মগেরা চলিয়া গেলে উঠিবে। কিন্তু একজন মগ তাহাকে ডুব দিতে দেখিয়া ভাবিল, স্ত্রীলোকটি বোধহয় আত্মহত্যার জন্য ডুব দিয়াছে। অমনি সে ছুটিয়া গিয়া জল হইতে চুল ধরিয়া তাহাকে ডাঙায় আনিল। পরে জীবিত দেখিয়া ব্যাপার বুঝিয়া, তত্ক্ষণাৎ তাহাকে পরিত্যাগ করিয়া হাসিতে হাসিতে চলিয়া গেল। স্ত্রীলোকটি কিন্তু সেই স্পর্শমাত্র দোষে চিরজীবনের জন্য চিহ্নিত ও কলঙ্কিত হইয়া থাকিল।’

এ তো গেল সতেরো শতকের কথা, পরে আঠারো শতকের গোড়ার দিকেও দক্ষিণবঙ্গে মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা হামলা চালিয়ে সম্পদ লুঠ ও একাধিক ব্যক্তিকে অপহরণ করতে ছাড়েনি। তখন অবশ্য তাদের জোর অনেক কমে এসেছিল,  তা-ও এমনটি ঘটেছে। ১৮৮২ সালে প্রকাশিত ইংরেজ লেখক ডব্লিউ এইচ ক্যারি বিখ্যাত ‘গুড ওল্ড ডেইজ অব অনারেবল জন কোম্পানি’ বইতে এমন একটি খবর লিপিবদ্ধ করে গেছেন। ‘ইস্ট ইন্ডিয়া ক্রনিকল’ পত্রিকায় ১৭৫৮ সালে প্রকাশিত সেই খবরটি এমন: ‘ফেব্রুয়ারি ১৭১৭—মগেরা বাংলার দক্ষিণাঞ্চল থেকে নারী-পুরুষ ও শিশু মিলিয়ে ১ হাজার ৮০০ জনকে অপহরণ করেছিল। তারা ১০ দিনের মধ্যে আরাকানে পৌঁছায়। আরাকানের শাসকের সামনে তাদের আনা হয়েছিল। তিনি তাদের মধ্যে থেকে যারা হস্তশিল্পে দক্ষ তাদের দাস হিসেবে বেছে নিলেন, তারা সংখ্যায় [বন্দিদের] প্রায় এক-চতুর্থাংশ। বাকি বন্দিদের গলায় দড়ি বেঁধে বাজারে নিয়ে যাবার পর শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ২০ থেকে ৭০ রুপি দরে বিক্রি করা হয়। দাসদের মালিকরা তাদের জমি চাষ করতে পাঠাল, সঙ্গে প্রত্যেকের মাসিক খোরাকের জন্য মাথাপিছু ১৫ কেজি চাল দিল।’ খোদ কলকাতা শহরে মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা দাসব্যবসা করত, এমন প্রমাণও মেলে। রেভারেন্ড জেমস লং তার ‘ক্যালকাটা অ্যান্ড ইটস নেইবারহুড’ (১৮৫২) বইতে মগ-ফিরিঙ্গিদের কাফ্রি দাস ক্রয়-বিক্রয়ের বিজ্ঞাপনের কিছু নমুনা উপস্থাপন করেছিলেন। এগুলোর বেশির ভাগ দেয়ালে সাঁটিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হতো বা লিফলেট আকারে বিলি করা হতো। দু-একটি উদাহরণ এমন: ‘বিক্রয় হইবে। একটি চমত্কার কাফ্রি বালক যে কিনা খাসনামার কর্ম, খিদমতগিরি ও রান্নাবান্না ভালো জানিয়া থাকে। দাম মাত্র চারশত সিক্কা রুপি। যে সকল ভদ্রলোক চাকর খুঁজিতেছেন, তাহারা দর্শনপূর্বক এই বিজ্ঞাপনদাতার কাছ হইতে বাকি করণীয় জানিয়া লইতে পারেন।’ আবার কখনো কখনো দাসেরা পালিয়ে গেলে তাদের সন্ধান চেয়ে প্রচারপত্র ছাপা হতো এই ভাষায়: ‘পলায়ন সংবাদ। চিনাবাজারের জনাব রবার্ট ডানকানের গৃহ হইতে গত বৃহস্পতিবার আনুমানিক বারো বৎসর বয়সের ইনডে নামক একটি কাফ্রি বালক পালাইছে। যে ব্যক্তি উহাকে অক্ষত দশায় মালিকের নিকট ফিরাইয়া দিবে, সে একটি স্বর্ণমোহর পাইবেক।’ কী অবাক কাণ্ড—আঠারো ও উনিশ শতকের কলকাতা কী মুর্শিদাবাদ শহরে মগ-ফিরিঙ্গিরা গরিব জেলেদের সুস্বাদু মাছভর্তি নৌকা ভয় দেখিয়ে লুট করে নিয়ে গেছে, এমন খবরও মেলে। কোম্পানি আমলে জলদস্যুদের পাকড়াও করার নিমিত্তে তাই সরকার বাহাদুর সেই সাবেকি জমানাতেই জলপুলিশ ধরনের একটি দারোগা-দল তৈরি করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

বঙ্গোপসাগরে তত্পরতা চালিয়ে ও লুঠতরাজে তথাকথিত ‘সাফল্য’ পেয়ে ক্রমেই মেকি আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান হয়ে ওঠা দাম্ভিক মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের নজর পড়েছিল সেকালের সম্পদশালী মোগল রাজধানী ঢাকার দিকেও। সেই সুদূর চাঁটগা ছাড়িয়ে মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা তখন বুড়িগঙ্গাপারে আক্রমণ হানতে উদগ্রীব। ইসলাম খাঁ ১৬০৮ সালে বাংলার সুবেদার পদে নিয়োগ পান। পরে তিনি ঢাকাকে রাজধানী করেন। সম্ভবত, ওই সময়পর্ব থেকেই তিনি মগ-ফিরিঙ্গিদের হঠকারী তত্পরতার দিকে তীক্ষ নজর রেখেছিলেন। ইসলাম খাঁ সম্ভবত এও খেয়াল করেছিলেন মগ ও ফিরিঙ্গি এই দুই তরফের জলদস্যুদের মধ্যে আগে সাপে-নেউলে সম্পর্ক থাকলেও তারা তখন এক অশুভ ঐক্যজোট প্রতিষ্ঠার পথে এগোচ্ছে। তাদের হীন উদ্দেশ্য এই, তারা বিরামহীন রক্তপাত ও স্থানীয়দের ওপর নির্যাতনের মাধ্যমে নবীন রাজধানী ঢাকার পতন ঘটিয়ে পুরো সুবে বাংলার শাসনভার নিজেদের হাতের মুঠোয় নিয়ে আসবে। মগরা যখন ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে মিলে ঢাকাতে হামলা চালাবে ভেবে অগ্রসর হচ্ছিল, ঠিক তখনই ইসলাম খাঁ অশ্বারোহী বাহিনী পাঠিয়ে তাদের পর্যুদস্ত করে দিয়েছিলেন। অতএব মগ-ফিরিঙ্গি দস্যুজোটের ঢাকা দখলের দিবাস্বপ্ন মুহূর্তেই চুরমার হয়ে গেল।

কিন্তু বিপত্তি ফের শুরু হলো ১৬১৩ সালে, যখন ইসলাম খাঁ প্রয়াত হলেন। তার পাঁচ বছরের সুবেদারির সাফল্যের কথা মাথায় রেখে তারই আপন ভাই কাসিম খাঁ চিশতিকে সুবেদার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলেও তিনি জলদস্যুদের সঙ্গে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। ওই সময়কার একজন লেখক শামসুদ্দিন তালিস তার ‘তারিখ-ই-আসাম’ গ্রন্থে ফারসি ভাষায় স্থানীয়দের ওপর মগদের নৃশংস অত্যাচারের যে বিবরণ লিখে গেছেন, তা রীতিমতো রোমহর্ষক বললেও কম বলা হবে। এখানে তালিসের সেই কান্নাভেজা বয়ানের অংশবিশেষ কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদে উদ্ধৃত করা যাক: ‘...মগ ও পতুর্গিজ জলদস্যুগণ জলপথে আসিয়া বাঙ্গালা লুণ্ঠন করিত। তাহারা হিন্দু-মুসলমান, স্ত্রী-পুরুষ, ছোট-বড় সকলকেই বন্দি করিয়া তাহাদের হাতের পাতা ছিদ্র করিয়া তন্মধ্যে সরু বেত প্রবেশ করাইয়া বাঁধিত এবং একজনের উপর আর একজনকে চাপাইয়া জাহাজের পাটাতনের নিম্নে ফেলিয়া রাখিত। যেমন লোকে পাখিকে আহার দেয়, সেইরূপ তাহারা প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় উপর হইতে বন্দিদের আহারের নিমিত্তে চাউল ছড়াইয়া দিত।...ফিরিঙ্গি দস্যুরাই বন্দিগণকে বিক্রয় করিতে যাইত। মগেরা বন্দিদিগকে নিজের দেশে কৃষিকার্যে ও অন্যান্য কর্মে নিযুক্ত করে। বহু সৈয়দ ও সম্ভ্রান্তবংশীয় মুসলমান ভদ্রলোক ঐ সকল দুষ্ট লোকদিগের দাসত্ব করিতে বাধ্য হইয়াছে এবং বহু সদ্বংশজাত ও সৈয়দ মহিলা উহাদের দাসী ও উপপত্নী হইয়াছেন। ঐ অঞ্চলে মুসলমানরা যে অত্যাচার সহ্য করিয়াছে, ইউরোপেও সেইরূপ লাঞ্ছনা পাইতে হয় নাই।...মগেরা বহুকাল ধরিয়া দস্যুতা করার ফলে তাহাদের দেশ শ্রীসম্পন্ন হইয়াছে এবং তাহাদের সংখ্যা বাড়িয়াছে...কিন্তু বাঙ্গলা দেশ ক্রমেই জনশূন্য হইয়াছে এবং দস্যুদিগকে বাধা দিবার শক্তিও ক্রমে কমিয়া আসিয়াছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে এই দস্যুদলের যাতায়াতের পথে নদীগুলির উভয় পার্শ্বে একজন গৃহস্থও রহিল না।’ তালিস আরো জানিয়েছেন, বরিশাল-বাকলা অঞ্চলে সুপারির ব্যবসা করে বাঙালি বণিকেরা প্রচুর পয়সা একসময় কামালেও তারা মগ-ফিরিঙ্গিদের লুটপাটের কারণে এখন নিঃস্বপ্রায়, তাদের ভিটায় প্রদীপও আর জ্বলে না। সব সুখশান্তি কেড়ে নিয়েছে মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুদল।

যাহোক, কাসিম খাঁর পর সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের ভগ্নিপতি ইব্রাহীম খাঁ বাংলার সুবেদার হয়ে এলেন, কিন্তু তিনিও মগ-ফিরিঙ্গি দস্যুদের কুপোকাত করতে পারলেন না। তার পরে যারা সুবেদার হয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে কেবল ইসলাম খাঁ মাশহাদি খানিক শান্তিবাদী পথে দস্যুদের ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হয়নি। মোগলদের উদার শান্তির আহ্বানের প্রতি গোঁয়ার দস্যুরা নামেমাত্র শ্রদ্ধা রেখেছিল। পরিস্থিতি বাস্তবে ছিল আগের মতোই। শেষমেশ শায়েস্তা খান বাংলার সুবেদার হয়ে আসার পর সত্যি সত্যিই মগ-ফিরিঙ্গিদের শায়েস্তা করতে পারলেন। শায়েস্তা খান ঢাকায় এলেন যখন, তখন হঠাৎ করেই যেন দস্যুজোটের আস্ফাালন বেড়ে গিয়েছিল। ঢাকার সীমানার মধ্যেও তারা এসে লুটতরাজ চালাতে থাকে। এমন অবস্থায় শায়েস্তা খান ভাবলেন, এই ভয়ানক জলদস্যুদের বিরুদ্ধে এবার অন্তিম লড়াইয়ের সময় এসেছে। শায়েস্তা খানের এই মগ-ফিরিঙ্গি নিধনের বিশালাকার ‘এন্ডগেমের’ আয়োজন একটুও সহজ ছিল না। বুড়িগঙ্গার বুকে ৩০০ যুদ্ধজাহাজে ৪৩ হাজার সৈন্যের এক অভিনব বাহিনী সাজানো হলো। বিপরীত পক্ষে দস্যুরাও সমানতালে কাঁটায় কাঁটায় আরো ৩০০ যুদ্ধজাহাজ সাজিয়ে প্রস্তুত। কিন্তু দিনের শেষে জয় হলো শায়েস্তা খানেরই। তিনি যেভাবে দস্যুজোটকে নাজেহাল করেছিলেন, তাতে তাদের দাঁড়াবার শক্তি আর থাকেনি। যদিও তারা বিলুপ্ত হয়নি, মাঝে মধ্যেই বাংলার নানা অঞ্চলে মাথা চাড়া দিতে চেয়েছে পরবর্তীকালে। তার উদাহরণ তো লেখার শুরুতেই খানিকটা দিয়েছি।

তথ্যসূত্র:

মধ্যযুগে বাঙ্গলা—কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রাচ্যের রহস্য নগরী—এফ বি ব্রাডলি বার্ট (রহীম উদ্দিন সিদ্দিকী অনূদিত)

বাদশাহী আমল—বিনয় ঘোষ

যশোহর-খুলনার ইতিহাস- সতীশচন্দ্র মিত্র

গুড ওল্ড ডেইজ অব অনারেবল জন কোম্পানি—ডব্লিউ এইচ ক্যারি

ক্যালকাটা অ্যান্ড ইটস নেইবারহুড—রেভারেন্ড জেমস লং

 

মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক