এটি অস্বীকারের পথ নেই যে আমাদের বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলে সামাজিক ইতিহাস চর্চার ধারাটি এখনো অপরিণত। ফলে সিদ্ধাচার্যদের লেখা বৌদ্ধ-সাধনসংগীত ‘চর্যাপদ’ থেকে আরম্ভ করে রাজকবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’: প্রাচীন ও মধ্যযুগের প্রধান সাহিত্যকর্মগুলো কেবল আমাদের কাব্যরসই নিবারণ করে না, সেই সঙ্গে নিবারণ করে ইতিহাসের খামতিটুকুও। বিশেষত, সামাজিক ইতিহাসের, মানুষের ইতিহাসের। আর এখানেই সাহিত্যের ‘সমাজদর্পণ’ নামক পুরনো, চর্চিত ও বিস্তৃত অভিধাটির সার্থকতা প্রতিপন্ন হয়। সাহিত্যের এই দর্পণে যেমন অঙ্কিত থাকে চলতি সমাজের চিত্র, তেমনি ধরা থাকে বিগত সমাজগুলোর যাপনবাস্তবতা। আরোপিত ধর্মীয় পরিচয় বা হিন্দু-মুসলমান তর্ক ব্রাত্য রেখেও বলা চলে, বাংলা ভূখণ্ডের প্রান্তিক মানুষদের আহমদ ছফা উপস্থাপন করেছিলেন মারখাওয়া মানুষ হিসেবে। যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী; নির্যাতন, লাঞ্ছনা, অত্যাচারের নিচে কেবল মানুষ পরিচয়টি নিয়ে টিকে রয়েছে। এ সব মানুষের ভাগ্যে ঐতিহাসিকভাবে এই মার এসেছে প্রধানত তিনটি প্রান্ত থেকে: শাসক শ্রেণীর পক্ষ থেকে, বৈষম্যনির্ভর সমাজের পক্ষ থেকে, বিদেশী বেনিয়া শক্তির পক্ষ থেকে।

বেনিয়া শক্তির মার থেকে বাংলা ভূখণ্ডের তথাকথিত বড়, প্রতাপশালী মানুষরাও নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি। বরং এই মারের চরিত্র ছিল যথার্থই গণতান্ত্রিক। যার গতিবিধি ও পতন; ধন, মান, জাত কিংবা চামড়ার বর্ণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। মধ্যযুগের নদীমেখলা, শ্যামল বাংলায় মগ ও ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের অত্যাচার, নির্যাতন আমাদের কাছে এই বাস্তবতা নিয়েই উপস্থিত হয়। যে বাস্তবতা বা নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে সব শ্রেণীর মানুষকেই। আমাদের অজ্ঞাত নয় যে ইউরোপ থেকে ভারতবর্ষ: সবখানেই মধ্যযুগের জনমণ্ডলী কতগুলো সুনির্দিষ্ট সামাজিক বিন্যাসে মধ্যে আবদ্ধ ছিল। যেখানে মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথ ছিল সার্বিকভাবে অনবমুক্ত। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ও সাহিত্যিকরাও এই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে সক্ষম হননি। আর তখনকার দিনে দেব-দেবী ও নবী-পয়গম্বর নির্ভর কাব্য রচনাই ছিল মুখ্য সাহিত্যিক সংস্কৃতি। ফলে মধ্যযুগের সাহিত্য থেকে বাংলায় মগ-ফিরিঙ্গি দস্যুতার তাত্ক্ষণিক ও বিস্তৃত চিত্র আশা করা নিরর্থক। তবু এই দস্যুতার যে ব্যাপকতর সামাজিক বাস্তবতা; সেই বাস্তবতা থেকেই মধ্যযুগের সাহিত্যিকরা এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করতে পারেননি। স্বল্প পরিসরে হলেও চেষ্টা করেছেন ইতিহাসের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে, বাস্তবতাকে ভাষা প্রদান করতে।

এ প্রসঙ্গে ‘মগ’ ও ‘ফিরিঙ্গি’ শব্দ দুটি ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে। ‘মগ’ শব্দটির উত্পত্তি বার্মিজ শব্দ ‘মঙ’ থেকে। মগধ থেকে আগত ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বী অনেকেই নিজের আভিজাত্য প্রমাণ করার অভিপ্রায়ে পরিচয় দিত ‘মাগধী’ নামে। এই মনোভাব আরাকানের অভিজাত সম্প্রদায় থেকে আরম্ভ করে সাধারণ মানুষদের মাঝেও ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ও আরাকানে যেসব কাব্যসাহিত্য রচিত হয়েছে, সেখানে আমরা এর প্রমাণ লাভ করতে সক্ষম হই। আরাকান রাজসভার বিশিষ্ট কবি দৌলত কাজী তার পৃষ্ঠপোষক রোসাঙ্গরাজের প্রশস্তি কাব্যে ব্যক্ত করেছেন এভাবে : ‘কর্ণফুল নদী পূর্বে আছে এক পুরী।/রোসাঙ্গ নগর নাম স্বর্গ অবতরি\/ তাহাতে মগধ বংশ ক্রমে বুদ্ধাচার/নাম শ্রীসুধর্ম রাজা ধর্ম অবতার\’ এ প্রসঙ্গে ড. আহমদ শরীফের মূল্যায়নও উল্লেখ করার অবকাশ রয়েছে: ‘‘মঘী প্রত্যক্ষ আরাকানী অর্থে এবং পরোক্ষ মগধ সম্ভূত আরাকানী ‘বৌদ্ধ রাজকীয়’ অর্থে ব্যবহূত।’’ এই মঘী শব্দটির অর্থান্তর ঘটে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যপাদ থেকে। পর্তুগিজ জলদস্যুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আরাকানী বৌদ্ধরা যখন বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে ধর্ষণ, হত্যা, লুণ্ঠন ও দাস ব্যবসার কাজে লিপ্ত হয়েছিল। সেই সময় থেকেই ‘মগ’ ও ‘মগের মুল্লুক’ কথাটি প্রচলিত হয়ে আসছে। অন্যপ্রান্তে, ‘ফিরিঙ্গি’ শব্দটির উত্পত্তি ঘটেছে ফরাসি ‘ফ্রঙ্ক’ শব্দের অপভ্রংশ থেকে। যখন পর্তুগিজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভারতবর্ষে বাণিজ্যের উদ্দেশে আগমন করে, তখন তারা এদেশের মানুষদের কাছে ‘ফিরিঙ্গি’ পরিচিত হয়। পর্তুগিজ জলদস্যুদের ‘হার্মাদ’ বা ‘বোম্বেটে’ নামেও অভিহিত করা হতো। এই মগ-ফিরিঙ্গি দস্যুগোষ্ঠী নিজ দেশের শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক অত্যাচার, নির্যাতন আরম্ভ করে। মানুষের জীবনকে করে তোলে যথার্থই বিপন্ন।


২.

মোগল বাদশাহ আকবরের শাসনকালে ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা সপ্তগ্রাম অঞ্চলে বেশ আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তাদের অনুমতি ব্যতিরেকে তখন হুগলীতে অন্য কোনো বণিক জাহাজ-তরী ভেড়ানোর সাহস পেত না। সমগ্র জলপথেই ছিল তাদের একাধিপত্য। এ কারণে বাঙালি বণিকদের বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে এই সময়ের বন্দরের বর্ণনা প্রদান করতে গিয়ে ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের সম্পর্কে লিখেছেন: ‘দক্ষিণে মেদিনীমল্ল বামে বীরখানা।/কোরোয়ালে ঝমঝমি নদীজুড়ে ফেনা\/কানাহাট ধুলিগ্রাম পশ্চাতে করিয়া।/ফিরিঙ্গির দেশ খান বাহে কর্ণ ধারে।/রাত্রিদিন বয়ে যায় হার্মাদের ডরে\’ মগ-ফিরিঙ্গি দস্যুদের কামান ও বন্দুকের মোকাবেলার সাধ্য বাঙালিদের ছিল না; তারই পরিচয় লিপিবদ্ধ করেছেন কবি বংশীদাস: ‘মগ ফিরিঙ্গি যত/বন্দুক পলিতা হাত/ একেবারে দশগুলি ছোটে।’ এই সময়খণ্ডে হাতে রচিত কিছু কুলপঞ্জিতেও মগ-ফিরিঙ্গি অত্যাচারের পরিচয় লিপিবদ্ধ রয়েছে। দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য দস্যুদের শিকার কিছু পরিবারের করুণ-কাহিনী ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় তুলে ধরেছিলেন। নদীয়া, যশোহর, হুগলি, বিক্রমপুর, মাটিয়ারি ও শান্তিপুর ভূখণ্ডের বহু পরিবারের স্ত্রী, কন্যা, পুরুষ অপহরণের বিশ্বস্ত চিত্র এসব কুলপঞ্জিতে উপস্থাপিত হয়েছে। মগ-ফিরিঙ্গি দস্যুদের অত্যাচারের শঙ্কায় বহু পরিবার তাদের বাসস্থানের ভিটেমাটি ত্যাগের পর পলায়ন করতে বাধ্য হয়েছিল। একটি কারিকায় (শ্লোক) এই ঘটনার উল্লেখ দৃষ্টিগোচর হয়: ‘কৃষ্ণচরণ বন্দবর,/পাইয়া ফিরিঙ্গি ডর/ কাঁঠালতলা করি পরিত্যাগ।’

বাংলার সাধারণ মানুষ, ব্রাহ্মণ থেকে আরম্ভ করে শাসক সমাজের স্ত্রীলোক; কেউ এই দস্যুদের হাতে নিরাপদ ছিল না। নারী, পুরুষ; নির্বিশেষে সবাইকে ধরে নিয়ে গিয়ে তারা নদী বন্দরগুলোয় দাস হিসেবে বিক্রি করে দিত। ‘পূর্ববঙ্গ-গীতিকা’র ‘নছর মালুম’ পালায় মগ দস্যুদের কথা উল্লিখিত হয়েছে এভাবে: ‘পচ্ছিম দিকেতে রাজ্য দারোয়ার শেষ।/মানসে মানুষ বেচি খায় আচানক দেশ\/দাঁড়ি মাল্লা ছিল যত ছুয়নি টেণ্ডল।/ সেই দেশেতে সক্কলে বেচে ডাকুর দল\’ মগদের সঙ্গে তুলনা করলে ফিরিঙ্গি দস্যুদের অত্যাচার ছিল আরো নৃশংস, রোমহর্ষক, নিদারুণ। ফিরিঙ্গি দস্যুরা বঙ্গোপসাগরের বাঁকগুলোয় দলবদ্ধভাবে ভ্রমণ করত, আর সুযোগ পেলেই সমুদ্রযাত্রীদের সবকিছু লুণ্ঠন করে তাদের নিঃস্ব করে দিত। সঙ্গে ছিল হত্যা, ধর্ষণ, বন্দি করার মতো অপরাধগুলোও। ‘পূর্ববঙ্গ-গীতিকা’য় এরও বিশ্বস্ত বিবরণ লিপিবদ্ধ হয়েছে: ‘সেইনা সাইগরের মাঝে হার্ম্মাদ্যার দল।/বাঁকে বাঁকে ঘুরে সদাই বড় বেয়াক্কল\/লুড তরাজ করে তারা আর দ্যাগবাজি।/সাইগরে হার্ম্মাদ্যার ডরে কাঁপে নায়ের মাঝি।’ তখনকার জনমণ্ডলী এই দস্যুদের ভয়ে যে সবসময় তটস্থ থাকত; এই বিবরণ সেই ইতিহাসই উন্মোচিত করে।


৩.

কবি সৈয়দ আলাওলের জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে মগ-ফিরিঙ্গিদের জলদস্যুতা। পিতার সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে আরাকান যাত্রাপথে তিনি এই দস্যুদের হাতে নিপতিত হয়েছিলেন। দস্যুরা আলাওলের পিতাকে হত্যা করেছিল, তাকে বিক্রি করে দিয়েছিল দাস হিসেবে। আলাওল পরবর্তীকালে আরাকান রাজসভায়, মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তার বিখ্যাত কাব্য ‘পদ্মাবতী’র আত্মপরিচয় খণ্ডে তিনি জলদস্যুদের হাতে নিপতিত হওয়ার বিবরণ দিয়েছেন এভাবে: ‘কার্য্যাহেতু যাইতে পন্থে বিধির ঘটন।/হার্মাদের নৌকা সঙ্গে হৈল দরদশ\/বহুযুদ্ধ আছিল শহীদ হৈল তাত।/রণক্ষেতে শুভযোগ আইলুং এথাত\’ মগ-পর্তুগিজ দস্যুরা বাংলার রাজধানী ঢাকাও আক্রমণ করেছিল এবং তিনদিন লুণ্ঠন করেছিল। মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল ঢাকার মোগল সুবেদারের প্রাসাদ। সুবেদার শায়েস্তা খান এ কারণে বঙ্গে এসেই মগ-ফিরিঙ্গি দস্যুদের দমনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। এ সময় মোগল সৈন্যদের ভয়ে দস্যুরা চট্টগ্রাম ছেড়ে আরাকানে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল; ঐতিহাসিক সত্যের এই বিবরণও পাওয়া যায় ‘পূর্ববঙ্গ-গীতিকা’য়: ‘অরাজক হৈল দেশ জঙ্গ হৈল ভারি।/দহিন মিক্যা ধাইয়ে মগ বাড়ীঘর ছাড়ি\/ সোনা-রূপা, দন-দৌলত মাডিতে গাড়িয়া।/দহিন মিক্যা ধাইয়ে মগ চাডিগাঁ ছাড়িয়া\’

মোগল বাহিনীর হামলার মুখে আরাকানে পালানোর সময় মগ দস্যুরা তাদের লুণ্ঠিত সব ধন-সম্পদ নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেনি। তারা লুণ্ঠিত ধন-সম্পদ মাটিতে পুঁতে রেখে গিয়েছিল এবং সুযোগ পেলেই এসে সেগুলো তুলে নিয়ে যেত। ‘পূর্ববঙ্গ-গীতিকা’তে এসব ঘটনার বিবরণও লিপিবদ্ধ হয়েছে: ‘বারঘড়া সোনার মোহর ডিঙার মাঝে রাখি।/গেড়াম ছাড়িয়া এখন নানার বাড়ীত থাকি\/বলিতে বলিতে মাডি কুড়িতে লাগিল।/বারঘড়া সোনার মোহর তুলিয়া আনিল\/বুড়ারে কহিল তারা লও দুই ঘড়া।/এতদিন এই দন দিয়াছ পাহাড়া\/পাইল বুড়া দুই ঘড়া সোনার মোহর।/রাইতে রাইতে ধাইলারে মগ না হইতে ফজর\’ মনোযোগ দিয়ে পাঠ করলে উপলব্ধি করা যায়, এই বিবরণের মাঝে খানিকটা ব্যঙ্গও গীতিকার কবি মিশিয়ে দিয়েছেন।

৪.

আধুনিক যুগে এসে কাব্যের পরিবর্তে বাংলা সাহিত্যে রাজা হয়ে উঠল মৌলত গদ্য, আখ্যান। একালেও বিভিন্ন উপন্যাসে, গল্পে উঠে এসেছে বাংলায় মগ-ফিরিঙ্গির দস্যুতার প্রসঙ্গ। মহাত্মা বিদ্যাসাগরের পর যার হাতে বাংলা গদ্যের সার্থক প্রতিফলন দেখা দিয়েছিল সেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘কপালকুণ্ডলা’র প্রথম পরিচ্ছেদ ‘সাগরসঙ্গমে’ আরম্ভ করেছেন নদীপথে একদল তীর্থযাত্রীর জলদস্যু আক্রান্ত হওয়ার সমূহ শঙ্কা দিয়ে: ‘প্রায় দুইশত পঞ্চাশ বৎসর পূর্ব্বে একদিন মাঘ মাসের রাত্রিশেষে একখানি যাত্রীর নৌকা গঙ্গাসাগর হইতে প্রত্যাগমন করিতেছিল। পর্ত্তুগিস ও অন্যান্য নাবিকদস্যুদিগের ভয়ে যাত্রীর নৌকা দলবদ্ধ হইয়া যাতায়াত করাই তত্কালের প্রথা ছিল; কিন্তু এই নৌকারোহীরা সঙ্গিহীন। তাহার কারণ এই যে, রাত্রিশেষে ঘোরতর কুজ্ঝটিকা দিগন্ত ব্যাপ্ত করিয়াছিল; নাবিকেরা দিঙিনরূপণ করিতে না পারিয়া বহর হইতে দূরে পড়িয়াছিল।’ এই নৌকাতেই ছিলেন ‘কপালকুণ্ডলা’র, বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত নায়ক নবকুমার। আবার বঙ্কিম-বর্ণিত সুবিপুল অরণ্যের মধ্যে মন্দিরের অধিকারী নবকুমারের কাছে কপালকুণ্ডলার যে পরিচয় তুলে ধরেছিলেন, সেখানেও আমরা এক ফিরিঙ্গির তস্করবৃত্তির পরিচয় লাভ করি: ‘ইনি ব্রাহ্মণকন্যা। ইহার বৃত্তান্ত আমি সবিশেষ অবগত আছি। ইনি বাল্যকালে দুরন্ত খ্রীষ্টিয়ান তস্কর কর্তৃক অপহূত হইয়া যানভঙ্গপ্রযুক্ত তাহাদিগের দ্বারা কালে এ সমুদ্রতীরে ত্যক্ত হয়েন।’

‘যকের ধন’ খ্যাত হেমেন্দ্রকুমার রায় তার ‘হন্তারক নরদানব’ উপন্যাসে জলদস্যুদের ভয়ংকর কাহিনী উপস্থাপন করেছেন অ্যাডভেঞ্চারের মিশেলে। আমরা জানি, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তার ‘উপনিবেশ’ উপন্যাসের বিষয় বিস্তার করেছেন পর্তুগিজদের এদেশে আগমন ও উপনিবেশ স্থাপনের ইতিহাসকে ভিত্তি করে। এখানে সমকালীন পটভূমিও দক্ষতা সহযোগে উপস্থাপন করেছেন ঔপন্যাসিক; ফিরিঙ্গি দস্যুতার প্রসঙ্গও যার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিশিষ্ট সাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরীর ইতিহাস নির্ভর বহুমাত্রিক একটি উপন্যাস ‘লালবাঈ’। এই উপন্যাসেও বাংলার বুকে মগ-ফিরিঙ্গি দস্যুদের অত্যাচারের ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়েছে। এখানে শোভাসিংহ ও বিষ্ণুপুরের যুবরাজ দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহের কথোপকথনে উঠে এসেছে তত্কালীন মোগল বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে মগ-ফিরিঙ্গি দস্যুদের অত্যাচারের প্রসঙ্গ। ‘লালবাঈ’-এর আখ্যানে জগন্নাথ ধাম থেকে ফেরার পথে বঙ্গোপসাগরে হার্মাদ দস্যুদের অর্ধশতাধিক নৌকা বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রীর উপরে আক্রমণ করেছিল। বালেশ্বর উপকূলের আরেকটি ঘটনাও তখনকার শাসক দুর্জয় সিংহকে বিচলিত করে তুলেছিল: ‘পাঁচ হাজার নারী-পুরুষকে বন্দি করে এনে ‘কড়ি’ আর ‘দামে’র মূল্যে তাদের বেচে দিয়েছিল ফিরিঙ্গি দস্যুর দল। লুণ্ঠন করেছিল উপকূলের শত শত গ্রাম। ধুলোয় লুটিয়ে দিয়েছিল নারীত্ব। কৌমার্য আর সতীত্ব নিশ্চিহ্ন হয়েছিল দস্যুর অত্যাচারে। বিবাহমণ্ডপ ভেঙে তছনছ করে দিয়েছিল, লুটে নিয়ে গিয়েছিল হাজারো সুন্দরী গৃহবধূকে।’ এর বাইরে, মগ-ফিরিঙ্গি দস্যুদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি গ্রাম্য হাটের বিবরণও ‘লালবাঈ’ উপন্যাসে প্রত্যক্ষ করা যায়।


৫.

‘চট্টগ্রামের পর্তুগিজদের ভূমিকা’য় ড. আহমদ শরীফ জানিয়েছিলেন, ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দে উড়িষ্যার পিপলি বন্দরে পর্তুগিজ বণিকরা বাণিজ্যকুঠি নির্মাণ করে। সেখান থেকেই তারা মেদিনীপুরের হিজলী বন্দরে যাতায়াত করত। ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে জোয়াও দ্য সিলভীরার নেতৃত্বে প্রথম বাণিজ্যবহর চট্টগ্রাম বন্দরে উপস্থিত হয়েছিল। জোয়াও দ্য সিলভীরা বাণিজ্যের অনুমতি লাভের প্রত্যাশা নিয়ে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। বন্দরে এসেই তিনি দুটো স্থানীয় বাণিজ্যতরী লুণ্ঠণ করেন, চালান অত্যাচার। এমনই এক ঐতিহাসিক পটভূমিকে অবলম্বন করে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় নির্মাণ করেছেন তার ‘রক্ত-সন্ধ্যা’ গল্পটির আখ্যান। গল্পটিতে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা কালিকট বন্দরে উপস্থিত হয়ে তার বাহিনী নিয়ে এদেশীয় বণিকদের বাণিজ্যতরী লুণ্ঠন করেন এবং ছোট্ট এই বন্দর নগরের মানুষের উপরে চালান নানাবিধ অত্যাচার। এখানে কালিকটের প্রতিষ্ঠিত ও বিশিষ্ট বণিক মির্জা দাউদের ওপরে ভাস্কো দা গামা বাহিনীর অত্যাচারের করুণ চিত্র প্রত্যক্ষ করা যায়। মক্কায় ধর্মীয় ব্রত পালন শেষে বৃদ্ধ পিতা, স্ত্রী, কন্যা ও অসহায় একদল যাত্রী নিয়ে জাহাজে কালিকটে ফিরছিলেন দাউদ, তখনই তার ওপরে হামলা করে ফিরিঙ্গিরা: ‘এইবার পাঁচখানা জাহাজ হইতে এককালে কামান ডাকিল। গোলার সংঘাতে বৃদ্ধের মতো মির্জা দাউদের জাহাজখানা কাঁপিয়া উঠিল। পালের কাপড়ে দপ করিয়া আবার আগুন জ্বলিয়া উঠিল। ধীরে ধীরে টলিতে টলিতে জাহাজ নিমজ্জিত হইতে লাগিল। আবার কামান গর্জিল। এবার জাহাজের সম্মুখ দিকটা ছিন্নভিন্ন হইয়া গেল। কলকল শব্দে জল ঢুকিতে লাগিল। তারপর নিমেষের মধ্যে সব শেষ হইয়া গেল।’

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘অভিশপ্ত’ গল্পটির আখ্যান ভিত্তি দিয়েছেন সুন্দরবন অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। এই গল্পে দেশীয় রাজাদের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা সহায়ক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। বলাবাহুল্য, এই সহায়তা তারা করে ধনলাভের আশাতেই। সামন্ত কীর্তি রায়ের পরাজয়ের পর লুণ্ঠনের চিত্রও এখানে বিভূতিভূষণ উপস্থাপন করেছেন: ‘এই ঘটনার দিনকয়েক পরে পর্তুগিজ জলদস্যুর দল লুঠপাট করে চলে গেলে, কীর্তি রায়ের এক কর্মচারী গড়ের মধ্যে প্রবেশ করে।’ লুণ্ঠন করার অভিপ্রায় নিয়ে কেবলমাত্র পর্তুগীজ দস্যুরাই ভারতবর্ষে আসেনি; ধর্ম বিস্তারের অভিপ্রায় নিয়ে এসেছিল কিছু পর্তুগিজ পাদ্রী, ধর্মপ্রচারকও। এই শ্রেণীটিও অনেক সময় বহু লুণ্ঠন, অত্যাচার কার্যে পর্তুগিজ দস্যুদের কাজে সহায়ক ছিল। সুবোধ ঘোষের ‘ধার্মিক দাক্রুজ’ গল্পে আমরা এর বিপরীত এক মানবিক পাদ্রীর চরিত্র প্রত্যক্ষ করি। মানুষের জন্য যার অন্তরে রয়েছে সীমাহীম মমত্ববোধ, ভালোবাসা। গল্পকার এখানে কেবল দাক্রুজের মানবিক দিকটিই উন্মোচিত করেননি; সঙ্গে তুলে ধরেছেন ফিরিঙ্গি দস্যুদের দাস বিক্রির এক ঐতিহাসিক চিত্র: ‘দাস বিক্রয়ের বাজার। গ্রীষ্মের রোদে আর বর্ষার জলে খোলা মাঠের ওপর শত শত জীবন্ত মানুষকে এক একটি দড়ির বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে রাখা হতো। নৌকা বোঝাই করে দাস নিয়ে এসেছে পর্তুগিজ দস্যুবণিক। এসেছে সন্দ্বীপ থেকে, এসেছে বাকলা থেকে, এসেছে সুন্দরবন ও বালেশ্বর থেকে। দক্ষিণবঙ্গের কত গ্রামের মাঝরাতের ঘুম আগুনে পুড়িয়ে দিয়ে, ভীত, দুর্বল, অসহায় নর ও নারীকে ধরেবেঁধে ব্যবসায়ের পণ্যবস্তুর মতো বহন করে নিয়ে এসেছে পর্তুগিজ নৌকা।’ এসব গল্পের বাইরে, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ময়ূরকূট’, নিখিলনাথ রায়ের ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’সহ প্রভৃতি গল্পে মগ-ফিরিঙ্গিদের দস্যুতার বিবরণ উপস্থাপিত হয়েছে।

বাংলায় মগ-ফিরিঙ্গি দস্যুদের অত্যাচার আমাদের ইতিহাসের এক পঙ্কিল, স্থায়ী ক্ষত: কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সময়ের বাস্তবতায় খানিকটা অগ্রসর হলেও আমরা এর ঐতিহাসিক তাত্পর্যকে অস্বীকার করতে পারি না। মধ্য ও আধুনিক যুগের বিভিন্ন সাহিত্যিক এই তাত্পর্য, বাস্তবতাকে গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করেই মগ-ফিরিঙ্গি দস্যুদের অত্যাচার, নির্যাতনের কাহিনীকে নিজেদের রচনায় ভাষা দিয়েছেন। যা কিছু ক্ষেত্রে খণ্ডিত, অপূর্ণ হলেও আমাদের দাঁড় করায় স্বজাতির দুঃসময়ের সম্মুখে। তাদের দুঃখে আমরা আপ্লুত হই; আর ঘৃণা করি মগ-ফিরিঙ্গি দস্যুদের অপরিণামদর্শী কর্তৃত্বকে, নির্যাতনকে, ক্ষমতাকে।

 

সহায়ক গ্রন্থসমূহ:

ড. এনামুল হক, আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য।

ড. আহমদ শরীফ, চট্টগ্রামের পর্তুগিজদের ভূমিকা।

ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল, বঙ্গে মগ-ফিরিঙ্গি ও বর্গীর অত্যাচার।

 

নাজমুল হাসান: লেখক