[চার্লস স্টুয়ার্টের জন্ম ১৭৬৪ সালে, ১৭ বছর বয়সে ১৭৮১ সালে বেঙ্গল আর্মিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন এবং মেজর পদে কর্মরত অবস্থায় ১৮০৮ সালে চাকরি ছেড়ে দেন। এর মধ্যেই তিনি আরবি, ফার্সি ও হিন্দুস্তানি ভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠেন, চাকরিকালেই কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে ফার্সি ভাষার সহকারী অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে হেইলিবারিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কলেজে অধ্যাপক পদে যোগ দেন এবং ১৮২৭ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৮৩৭ সালে ইংল্যান্ডে মারা যান। তিনি ১০টি গ্রন্থ রচনা, অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন।

তার স্মরণীয় গ্রন্থ ‘দ্য হিস্ট্রি অব বেঙ্গল, ফ্রম দ্য ফার্স্ট মোহামেডান ইনভেসান আনটিল ১৭৫৭’ লন্ডনে ১৮১৩ সালে প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থের অধ্যায় থেকে নির্বাচিত অংশ ভাষান্তর করে নিবন্ধটি তৈরি করা হয়েছে]

জাহাঙ্গির কুলি খান ১৬০৭ সালে গভর্নর হিসেবে বাংলার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এমনকি প্রার্থনারত অবস্থায়ও বেত্রাঘাত, ফাঁসির দণ্ড ও মস্তক বিচ্ছিন্ন করার আদেশ দিয়ে নির্মমতার জন্য তিনি নিন্দিত হতে থাকেন। তবে এক বছর শাসন করতে না করতেই তার মৃত্যু হলে ১৬০৮ সালে ইসলাম খান গভর্নর হয়ে রাজমহল থেকে রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরিত করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরকে সন্তুষ্ট করতে ঢাকার নাম রাখেন জাহাঙ্গীরনগর। রাজধানী স্থানান্তরের কারণ ব্যাখ্যা করা না হলেও তা পর্তুগিজদের দমনে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যই তা করা হয়েছে এটা স্পষ্ট। পূর্ববর্তী শতবর্ষের শেষ ভাগ থেকেই আরাকান ও চট্টগ্রাম উপকূলে পর্তুগিজরা বসতি স্থাপন করতে শুরু করে, যারা সাগরের বিচিত্র চরিত্রের সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে জানত। তারা দুঃসাহসী ও দুর্বৃত্ত প্রকৃতির। জীবনধারণের জন্য জলদস্যুবৃত্তি গ্রহণ তারা অন্যায় মনে করেনি। তাদের আধিপত্য বেড়ে যায় এবং উপকূলের অনেক জমি তাদের দখলে চলে আসে। তাদের ষড়যন্ত্র ও অবাধ্যতায় অতিষ্ঠ হয়ে আরাকানের রাজা তাদের নিশ্চিহ্ন করার পদক্ষেপের এক পর্যায়ে অনেককে হত্যা করেন। অন্যরা নৌকায় নিয়ে পালিয়ে উপকূলে আশ্রয় নেয় এবং দস্যুতা করে জীবন যাপন করতে থাকে। সন্দ্বীপাঞ্চলের কমান্ডার ফতেহ আলী খান পর্তুগিজ ও খ্রিস্টধর্মানুসারীদের অবরুদ্ধ ও হত্যা করার নির্দেশ দেন। তার ৬০০ সৈন্যের বহর উপকূলে ৪০টি নৌকায় অবস্থানকারী জলদস্যুদের শনাক্ত করে এবং তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। কিন্তু পর্তুগিজদের সমর দক্ষতা এবং যুদ্ধাস্ত্রের প্রকৃতি সম্পর্কে এ বাহিনীর তেমন ধারণা ছিল না। পর্তুগিজ কামানের গোলা অধিকসংখ্যক মোগলবাহিনীর বিরুদ্ধে কেবল ভারসাম্যই প্রতিষ্ঠিত করেনি, রাতভর যুদ্ধের পর তাদের পরাস্ত করল, নিহত হলেন কমান্ডার ফতেহ আলী খান এবং তার বহরের অধিকাংশ সৈন্য ও মোগল নৌবহর পর্তুগিজরা দখল করে নেয়।

এই পর্তুগিজ বিজয়ে একই সঙ্গে দুঃসাহসী হিসেবে তাদের খ্যাতি ও হার্মাদ হিসেবে কুখ্যাতি দুই-ই ছড়িয়ে পড়ল। ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানসহ বহুসংখ্যক উপকূলবাসী বাংলা সরকারের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। তাদের লুটতরাজ থেকে রক্ষা পেতে এটা অনেক ক্ষেত্রে অপরিহার্যও হয়ে পড়েছিল। কারণ বাংলা সরকার তাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ।

পর্তুগিজরা সেবাস্টিয়ান গঞ্জালেস নামেও একজন নাবিক নেতা নির্বাচিত করল এবং সন্দ্বীপের পুরোটাই দখল করে সেখানে বসতি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিল। ১৬০৯ সালের মার্চে প্রায় ৪০০ সশস্ত্র পর্তুগিজ সৈন্য সন্দ্বীপে অবতরণ করলে তাদের সঙ্গে লড়াই করে পেরে উঠবেন না বিবেচনা করে নিহত কমান্ডার ফতেহ আলী খানের ভাই কেবল টিকে থাকার জন্য প্রতিরক্ষামূলক কৌশল অবলম্বন করে দুর্গে টিকে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। স্থানীয় হিন্দুরা সেখানকার প্রশাসনের ওপর থেকে কার্যত আনুগত্য প্রত্যাহার করে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। পর্তুগিজ বাহিনীর পক্ষে দুর্গ আক্রমণ করে তা পুড়িয়ে দেয়া সম্ভব ছিল না। সে সময় স্পেনের একটি জাহাজ সন্দ্বীপ বন্দরে নোঙর করলে পর্তুগিজরা তাদেরও দলভুক্ত হতে অনুরোধ করে। তারা লাভজনক বিবেচনায় সম্মত হয়। রাতে ৫০ জনের একটি দল হাতে টর্চ লাইট ও ড্রাম নিয়ে নামে। পর্তুগিজ বাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রবল শব্দে ড্রাম বাজাতে বাজাতে এবং আলো ফেলতে অগ্রসর হলো। দুর্গের ভেতরের প্রতিরক্ষা বাহিনী বিচলিত হয়ে পড়ে। পর্তুগিজ ও স্প্যানিশদের সম্মিলিত আক্রমণ তারা আর প্রতিহত করতে পারেনি। তাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। তাদের হাতে মুসলমান বাহিনীর সব সদস্য নিহত হয়। এর আগে ফতেহ খানের বাহিনীর হাতে অনেক পর্তুগিজ ও তাদের পরিবারের সদস্য নিহত হয়েছিল। এবার তারা প্রতিশোধ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

দ্বীপবাসীর মধ্যে হিন্দুরা তো পরোক্ষ সমর্থন শুরু থেকেই পর্তুগিজদের দিয়ে এসেছে। মুসলমান দ্বীপবাসীর আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু সে আত্মসমর্পণ নিঃশর্ত ছিল না। শর্তটি ভয়ংকর, দ্বীপের মুসলমানদের ধরে দুর্গে এনে দিলেই অবশিষ্ট দ্বীপবাসীর জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা দেয়া হবে।

পর্তুগিজরা দুর্গের ভেতরে-বাইরে বাছাই করে এক হাজার মুসলমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং অবশিষ্টদের রেহাই দেয়। সেবাস্টিয়ান গঞ্জালেস হয়ে ওঠেন সন্দ্বীপের অবসংবাদিত অধিপতি। পর্তুগিজদের এবং দ্বীপের বেঁচে যাওয়া অধিবাসী সবাই সেবাস্টিয়ানকে স্বাধীন রাজা হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে এবং তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।

সেবাস্টিয়ান গঞ্জালেজ খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিশাল সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলেন। তার ভালো দিক হচ্ছে তিনি ন্যায়পরায়ণ ও নিরপেক্ষ হিসেবে সুনাম অর্জন করেন এবং তার প্রতি আনুগত্য উপকূলের অধিবাসীদের জন্য মঙ্গলজনক প্রমাণিত হয়।

কিছু ভালো গুণের পাশাপাশি এটাও সত্য, সেবাস্টিয়ান গঞ্জালেস ভয়ংকর লোভী, দুর্দমনীয় ও অকৃতজ্ঞ প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। গর্তুগিজরা যখন বাস্তুহারা ও দুর্দশায় নিপতিত, সে সময় বাটেকালার রাজা তাদের আশ্রয় দেয়ায় সেবাস্টিয়ান তার প্রতি খুব কৃতজ্ঞ ছিলেন। কিন্তু তার পরও সেই রাজার দুটো দ্বীপ শাহবাজপুর নিজ দখলে নিয়ে নেন। তখনকার অন্য যেকোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজার মতো সেবাস্টিয়ানও তার রাজ্য বিস্তারে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন এবং একের পর এক দ্বীপ দখলে আনতে থাকেন। মূল স্থলভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে দ্বীপ দখলের সময় তাকে বড় কোনো শক্তির মোকাবেলা করতে হয়নি।

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা পর্তুগিজ জলদস্যুদের অধিকতর খ্যাতিমান ও শক্তিশালী করে তোলো। আরাকান রাজার ভাই আনাপোড়াম ছিলেন এ রাজ্যের একটি অংশের গর্ভনর (দেয়াং নামক স্থানের সামন্ত অধিপতি)। আইন অমান্য করা ও রাজার অবাধ্যতার কারণে দোষী সাব্যস্ত হলে তিনি পালিয়ে সন্দ্বীপে এসে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সহায়তা প্রার্থনা করেন। এতে আরাকান রাজার হাতে নিগৃহীত পর্তুগিজদের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়। আনাপোড়াম এ সমর্থনের বিনিময়ে তাকে প্রচুর অর্থ দেবেন এবং নিজের বোনকেও তার হাতে তুলে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন।

সেবাস্টিয়ান গঞ্জালেস রাজ্য উদ্ধারের জন্য আনাপোড়ামের সঙ্গে তার সৈন্য ও জাহাজ মোতায়েন করেন। এ বাহিনী আরাকান উপকূলে আক্রমণ চালায় এবং বড় ধরনের প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। তবে আনাপোড়ামের সম্পদ ও তার পরিবারের সদস্যদের ফিরিয়ে দিতে রাজা সম্মত হন। এ সম্পদের একটি বড় অংশ সেবাস্টিয়ানকে দেয়া হয়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তার বোনকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার অনুমতি প্রদান করে তাকে জলদস্যু নেতার স্ত্রী হওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়। সম্পদ ও ভগ্নি হস্তান্তরের পর পরই আনাপোড়ামের মৃত্যু ঘটে। তার পক্ষে এটা অনুমান করা সম্ভব ছিল না যে তাকে সতর্কভাবে বিষ প্রয়োগ করা হতে পারে। কার্যত বিষ প্রয়োগ করে রাজার ভাইকে হত্যা করে তিনি তার সব সম্পদের মালিক হয়ে যান। সেসব ঘটনার সময় ১৫০৯ সাল।

আরাকান রাজা পরের বছর বাংলা আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এক্ষেত্রে বাংলা মোগল রাজত্বের অংশ হওয়ায় তাকে লড়াই করতে হবে মোগল বাহিনীর বিরুদ্ধে। তিনি সন্দ্বীপের দূতকে বেশ কয়েকটি বিষয়ে ক্ষমতা দেন। তিনি পর্তুগিজ জলদস্যুদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করবেন, মোগলদের বিরুদ্ধে আরাকানের যুদ্ধে পর্তুগিজদের সাহায্য-সহযোগিতা চইবেন এবং মৃৃত রাজভ্রাতা আনাপোড়ামের স্ত্রী ও সন্তানদের আরাকানে ফিরিয়ে দেয়ার অনুরোধ জানাবেন।

শেষ অনুরোধটি তাত্ক্ষণিকভাবে মঞ্জুর করা হয়। সন্তানসহ আনাপোড়ামের স্ত্রীকে ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং সেখানকার গভর্নরের সঙ্গে তার বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়।

আরাকান রাজা ও পর্তুগিজদের মধ্যে চুক্তি সম্পাদন হয়ে যাচ্ছিল। আসলে এটি সামরিক চুক্তি। চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়, আরাকান রজার বাহিনী জলপথে বাংলা আক্রমণ করবে। তখন পর্তুগিজ বাহিনী তাদের নৌবাহিনীর প্রদেয় সব সামরিক সহযোগিতা দিয়ে যাবে। এছাড়া ছোট আকারের পর্তুগিজ জাহাজ নৌপথের দিকে নজর রাখবে এবং সব ধরনের নিরাপত্তা প্রদান করবে। রাজার নৌবাহিনীও সেনাস্টিয়ান গঞ্জালেসের অধীনে থাকবে। তবে শর্তযুক্ত হলো আরাকান রাজ্যের জাহাজগুলো নিরাপদে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে সেবাস্টিয়ানের ভাইয়ের ছেলেকে আরাকানিদের জিম্মায় রাখা হবে। যা কিছু যুদ্ধে তাদের দখলে আসবে, যা কিছু মালপত্র তারা লুট করবে, তা দুই পক্ষ সমান ভাগে ভাগ করে নেবে।

আরাকানি ও পর্তুগিজ বাহিনী যৌথ সিদ্ধান্ত নিয়ে এখনই সঙ্গে বাংলা অভিযানে বের হয়ে কোনো ধরনের প্রতিরোধ ছাড়াই মেঘনার পূর্বঞ্চলে চলে আসে এবং লাকিপুর ও ভুলুয়া দখল করে নেয়। কিন্তু সুগঠিত মোগল বাহিনী তাদের মোকাবেলা করে এবং আরাকানি বাহিনী বহুসংখ্যক সৈনিক হাতাহত হয়। অবশিষ্টরা পরাজিত হয়ে পলায়ন করে। রাজা নিজেও হাতিতে চড়ে দুর্গম পথে পালিয়ে প্রাণ বাঁচান। মোগল সৈন্যদের ধাওয়ায় কিছুসংখ্যক সৈন্য নিয়ে সন্তস্ত্র রাজা আরাকানে ফিরে যান। ইসলাম খানের রাজধানী স্থানান্তরের যৌক্তিকতা এতে প্রতিষ্ঠিত হলো।

 

ইবনে মোতালিব: লেখক