২৫ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, বিশ্ববাসীর কাছে সে খবর যারা পৌঁছে দিয়েছেন, তাদের অন্যতম নিউইয়র্ক টাইমস প্রতিনিধি সিডনি শনবার্গ। ২৭ মার্চ সকালে যে ৩৫ জন সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহককে বলপূর্বক হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে উঠিয়ে তাদের দেহ ও লাগেজ তল্লাশি করে ফিল্ম ও নোটবই ছিনিয়ে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রায় তাত্ক্ষণিকভাবে বের করে দেয়া হয়, সিডনি শনবার্গ তাদের একজন।
২৮ মার্চ নিউইয়র্ক টাইমস তার দুটি বড় প্রতিবেদন প্রকাশ করে:
১. বিদ্রোহ দমাতে সৈন্যরা কামান দাগাচ্ছে
২. পূর্ব পাকিস্তানে কামানের বিরুদ্ধে লাঠি ও বল্লম
১৯৭১-এ বাংলাদেশ ভূখণ্ড ও সীমান্তের ওপারে কী ঘটেছে, তার বিশ্বস্ত সাক্ষী সিডনি শনবার্গ।
বাংলাদেশের সেই যুদ্ধদিনের বন্ধু পুলিত্জার বিজয়ী সিডনি শনবার্গ ৯ জুলাই ২০১৬ হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৮২ বছর বয়সে নিউইয়র্কে মৃত্যুবরণ করেন।
সিডনি হিলেল শনবার্গের জন্ম ১৭ জানুয়ারি ১৯৩৪ ম্যাসাচুসেটসের ক্লিনটনে। স্কুলপাঠ ক্লিনটন হাইস্কুলে, ১৯৫৫তে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। সেনাবাহিনীতে কিছুকাল, ১৯৫৯-এ যোগ দেন নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায়। ১৯৭১-এ দিয়েছেন পাকিস্তানের গণহত্যা ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কাভারেজ। দিল্লিতে ছিলেন নিউইয়র্ক টাইমসের ব্যুরো চিফ। তার পর হলেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগের প্রধান। তাকে আকৃষ্ট করল কম্বোডিয়া। সবাই যখন প্রাণ নিয়ে কম্বোডিয়া ছেড়ে পালাচ্ছে, সিডনি গোঁ ধরে মৃত্যুপুরীতে রয়ে গেলেন।
নমপেন পতনের পর তিনি রয়ে গেলেন এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেও দায়িত্ব থেকে সরে আসেননি। খেমাররুজদের কম্বোডিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ এবং নির্মম শাসনের জীবন্ত ইতিহাস উঠে এসেছে তার হাতে। তার কম্বোডিয়া কাভারেজ ১৯৭৬-এ তাকে এনে দেয় পুলিত্জার পুরস্কার।
অবশ্য কমিউনিস্ট শাসন নিয়ে তার আশাপ্রদ ভবিষ্যদ্বাণী আদৌ সত্যে পরিণত না হওয়ায় তিনি কঠোরভাবে সমালোচিত হয়েছেন। তিনি তার ভুল বিবেচনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। খেমাররুজদের হাতে ২০ লাখ কম্বোডীয় নিহত হয়।
কম্বোডিয়ায় তার বন্ধুত্ব হয় ডিথ প্রান নামে একজন সহযোগী ও ফটোগ্রাফারের সঙ্গে। সিডনি শনবার্গের কম্বোডিয়া জীবন তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রান তাকে খেমাররুজদের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। আর সিডনি চার সন্তানসহ প্রানের পরিবারকে সঙ্গোপনে আমেরিকা পাঠিয়েছেন, কিন্তু খেমাররুজদের হাত থেকে ডিথ প্রানকে রক্ষা করতে পারেননি। তবে শ্রমশিবিরে মরণাপন্ন প্রান একসময় পালাতে সক্ষম হন এবং থাইল্যান্ডে দুই বন্ধুর আবার মিলন হয়। তিনি লেখেন ‘দ্য ডেথ অ্যান্ড লাইফ অব ডিথ প্রান’। এ বইয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বহুল নন্দিত চলচ্চিত্র ‘দ্য কিলিং ফিল্ডস’।
১৯৭৩-এ কম্বোডিয়ায় বেসামরিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বি-৫২ বোমারু বিমান ২০ মেট্রিক টন বোমা বর্ষণ করে— তার পাঠানো প্রামাণ্য সংবাদ মার্কিন বিবেককে নাড়িয়ে দেয়।
নিউইয়র্ক টাইমসে ২৬ বছর কাজ করার পর নীতিগত বিরোধে তিনি পদত্যাগ করেন এবং নিউইয়র্ক নিউজ ডে পত্রিকায় সহযোগী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। দুঃসাহসী সাংবাদিকতার জন্য শ্রেষ্ঠ পুরস্কারগুলোর প্রায় সবই পেয়েছেন তিনি।
তার প্রকাশিত গ্রন্থ তিনটি:
১. দ্য ডেথ অ্যান্ড লাইফ অব ডিথ প্রাণ
২. দ্য কিলিং ফিল্ডস: দ্য ফ্যাক্টস বিহাইন্ড দ্য ফিল্ম
৩. বিয়ন্ড দ্য কিলিং ফিল্ডস
সিডনি শনবার্গের একটি সাক্ষাত্কারের অংশ অনূদিত হলো এবং ১৯৭১-এ তার পাঠানো নিউ টাইমসে প্রকাশিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রতিবেদনের তালিকা সংযুক্ত হলো।
সিডনি শনবার্গ সাংবাদিক হতে চাননি
হিস্ট্রিনেটডটকম ও ভিয়েতনাম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত সাক্ষাত্কারের অংশবিশেষ: এটি ডিসেম্বর ২০১০ প্রকাশিত হয়। অনুবাদ করেছেন এমএ মোমেন।
প্রশ্ন: আপনি তো সাংবাদিক হতে চাননি?
শনবার্গ: এটা আমার জন্য একটি দুর্ঘটনা বলতে পারেন। আমাদের পাড়াতেই আমার বাবার একটি মুদি দোকান ছিল। আমরা সীমিত আয়ে জীবনযাপন করতাম। কিন্তু আমি হার্ভার্ডে পড়াশোনার জন্য একটি বৃত্তি পেয়ে গেলাম। আমার ফলও ভালো হলো। স্নাতক পাস করার পরও আমি কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি হার্ভার্ড ল’ স্কুলে ভর্তি হলাম। তিন মাস পর টের পেলাম এটা আমার জন্য ভুল জায়গা। আমার সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া হবে না— এ নিয়ে আমার পরিবারে শোকের ছায়া নামল। আমি নিউইয়র্কের একটি বড় কোম্পানিতে ভাইস প্রেসিডেন্টের সহকারী হিসেবে ইন্টার্নশিপ শুরু করলাম। কিন্তু শিগগিরই বুঝে গেলাম এটাও আমার জায়গা নয়। আমি ভাবলাম বড় শহরের হইচই থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে আমি আসলে কী করতে চাই ভাবার সুযোগ পাব। যুবক হিসেবে বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে যোগদানের বিষয়টিও আমার সামনে ছিল। আমি যোগ দিলাম এবং মৌলিক প্রশিক্ষণগুলো নিলাম। আমাদের ট্রুপ তখন জার্মানি যাচ্ছে। আমি ভাবলাম, বরফের মধ্যে কসরত্ আমার কাজ নয়। শুনতে পেলাম আমাদের কাগজে কাজ করার সুযোগ আছে। আমি আবেদন করলাম। খুব স্বস্তিকর সময় কাটল এবং আমি অনেক শিখলাম।
আমি পেশাজীবী সৈন্যদের সম্পর্কে জানলাম। তাদের কেউ কেউ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে লড়াই করেছেন। মুক্তি, সম্মান, সাহস— তাদের কাছ থেকে এসবের মানে বুঝতে পারলাম। স্নায়ুযুদ্ধ কাভার করছেন এমন ক’জন পেশাজীবী সাংবাদিকের দেখা পেলাম। ভাবলাম এ কাজটা নিশ্চয়ই আমি পছন্দ করব। সেনাবাহিনী থেকে ফেরার পর চাকরির জন্য বিভিন্ন সংবাদপত্রে আবেদন করলাম। নিউইয়র্ক টাইমস ‘স্যাট’ ধরনের পরীক্ষা নিল, নিশ্চয়ই পাস করেছিলাম। তার পর ২৬ বছর কাটল টাইমসের সঙ্গে।
প্রশ্ন: ভিয়েতনাম যুদ্ধই আপনার প্রথম অভিযান, কিন্তু তা আপনাকে নিয়ে যায় আসলে কম্বোডিয়ায়?
শনবার্গ: ১৯৭০-এ নিক্সন যখন আক্রমণ চালান, আমি কম্বোডিয়ায় পাঁচ মাস থাকি। এটি ছিল আমার জন্য ভয়ঙ্কর গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। আমি সায়গনে থাকতাম না। আমি থাকতাম নর্দার্ন প্রভিন্সে। কম্বোডিয়া নিরপেক্ষ থাকতে চেয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ কম্বোডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
প্রশ্ন: ভিয়েতনাম যুদ্ধ কাভার করার পর কোথায় গেলেন?
শনবার্গ: আমাকে ভারতে পাঠানো হলো। সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে আমি নিউইয়র্ক টাইমসের ব্যুরো চিফ হিসেবে নয়াদিল্লি এলাম। তখন শুরু হলো ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। যখন আমি ভারত থেকে গুটিয়ে নিলাম, আমাকে পাঠানো হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। তখন ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড থেকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের খবর পাঠাচ্ছেন রণাঙ্গণ প্রতিনিধিরা, আমার সম্পাদক চাচ্ছেন আমি ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার ওপর বিশেষ নজর দিই, কিন্তু আমার মন পড়ে আছে কম্বোডিয়ায়। যুদ্ধ এই ছোট্ট দেশকে তছনছ করে দিচ্ছে, কিন্তু কেউ এদিকটায় নজর দিচ্ছেন না। আমি বারবার কম্বোডিয়ায় ফিরে আসি। একসময় সম্পাদক স্বীকার করেন কম্বোডিয়া নিয়ে থাকুন, ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া বিশ্রামে থাকুক।
আমেরিকানদের যখন সরিয়ে নেয়া হচ্ছিল, আমি মার্কিন দূর্তাবাসে যাই এবং আমার কম্বোডীয় সহকারী ডিথ প্রানের পরিবারকে তাদের সঙ্গে আমেরিকায় পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হই। আমি ও প্রান রয়ে যাই। অন্যদের মতো ব্যাংককে বসে থেকে যুদ্ধের খবর পাঠাব— আমরা তা ভাবতে পারিনি। অবশ্য সেজন্য আমাদের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। খেমাররুজ বর্বরতা থেকে ডিথ প্রানকে রক্ষা করতে পারিনি। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে রয়েছে।
প্রশ্ন: আপনার বই ‘দ্য লাইফ অ্যান্ড ডেথ অব ডিথ প্রাণ’ ও ‘কিলিং ফিল্ডস’ সিনেমা বড় পুরস্কার পেয়েছে; কিন্তু পরবর্তী সময়ে অমানবিক পরিস্থিতি উপেক্ষা করায় আপনি সমালোচিত হয়েছেন।
শনবার্গ: খেমাররুজ বাহিনী যখন নমপেনে প্রবেশ করে, তখন উত্সব হয়েছে। সবাই তাদের কাছে ছুটে এসেছে, পতাকা উড়িয়েছে— শুরুতে মনে হয়েছে ব্যাপারটা শান্তিপূর্ণ। কিন্তু শিগগিরই দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে ভয়ঙ্কর সব খবর আসতে শুরু করল। বন্দুকের মুখে মানুষকে শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে কৃষিবিপ্লব ঘটানোর জন্য আদেশ দেয়া হচ্ছে। সাড়া দিতে দেরি হওয়ায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
খেমাররুজ বাহিনী এমন উন্মত্ত হবে, তা ভাবতে পারিনি। আমাদের আমেরিকানদের প্রত্যাশা যে কেবলই প্রত্যাশা ছিল, আমরা বুঝে উঠতে পারিনি...
আমাদের বিচারে ভুল করেছি... আমি শিখেছি ভবিষ্যদ্বাণী করতে নেই। আগামীতে একটি দেশ, স্থান কিংবা পরিস্থিতি কেমন হবে— সে বর্ণনা দিতে নেই। যতটুকু আমার জানা আছে কেবল সেইটুকুই বলব।
প্রশ্ন: খেমাররুজদের হাত থেকে আপনি বেঁচে গেলেন কেমন করে?
শনবার্গ: ডিথ প্রান, আমি এবং অন্যরা খেমাররুজদের হাতে বন্দি হই, আমাদের মেকং নদীর তীরে আনা হয়। যুদ্ধের আগে বন্দিদের ধরে এনে এখানে খেমাররুজরা তাদের হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দিত। আমরা জানি, আমাদেরও তাই হবে। এ এক দীর্ঘ কাহিনী, আমার বই এবং কিলিং ফিন্ডস সিনেমায় এ কাহিনী উঠে এসেছে। আমাকে ছেড়ে দেয়া হয় আর অন্যরা নদীর তীরে অপেক্ষা করতে থাকে। কখন তাদের হত্যা করার পালা আসবে।
নিউইয়র্ক টাইমসে সিডনি শনবার্গের কয়েকটি প্রতিবেদনের তালিকা:
২৮ মার্চ ১৯৭১ In Dhaka, Troops use artillery to halt redial
২৮ মার্চ ১৯৭১ Sticks and spears against tanks in East Pakistan
৪ এপ্রিল ১৯৭১ Pakistan: All post of a game - A grim and deadly one
৭ এপ্রিল ১৯৭১ Foreign Evacuees from East Pakistan Tell of grim Fight
১৪ এপ্রিল ১৯৭১ Bengalis form a cabinet as the bloodshed goes on
১৪ এপ্রিল ১৯৭১ With the Bangla Forces
১৫ এপ্রিল ১৯৭১ Economic Havoc
১৭ এপ্রিল ১৯৭১ Hours of Terror for a trapped Bangali officer
এপ্রিল ১৯৭১ In this case ‘war is hell’ for one side only
৫ জুন ১৯৭১ Death Despair Follow Pakistan Refugee
৩০ জুন ১৯৭১ East Pakistan Economy is badly hurt as most transport is crippled
১৪ জুলাই ১৯৭১ West Pakistan pursues subjugation of Bangalis
২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ Bengali refugees say soldiers continue to kill loot and burn
১৭ অক্টোবর ১৯৭১ The grim fight for Bangladesh
২০ অক্টোবর ১৯৭১ India and Pakistan armies confront each other along borders
৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ Bengalis dance in ‘liberated’ Jessore
১১ জানুয়ারি ১৯৭২ Mujib vows ‘eternal’ amity with India






