গোটা দুনিয়া তাঁকে চেনে একজন প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে, ইরানি চলচ্চিত্রের নতুন যুগের একজন উদ্ভাবক হিসেবে, যিনি ইরানি চলচ্চিত্রে নবতরঙ্গ শিল্প আন্দোলনের অন্যতম শক্তিমান প্রতিনিধি। সারা দুনিয়ায় ইরানি চলচ্চিত্রের যে মর্যাদাকর অবস্থান, যেসব চলচ্চিত্র নির্মাতার মিলিত অবদানে তা নির্মিত হয়েছে— তিনি ছিলেন তাদের পুরোধা। তিনি নির্মাণ করেছেন ‘সার্টিফায়েড কপি’, ‘টেস্ট অভ চেরি’, ‘ক্লোজআপ’-এর মতো ভুবনখ্যাত সব সিনেমা, যেসবের তুঙ্গস্পর্শী উদাহরণ ‘টেস্ট অভ চেরি’, যা তাঁকে এনে দিয়েছিল কান চলচ্চিত্র উত্সবের (১৯৯৭) শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার— পালমে ডি’অর। আমি সদ্যপ্রয়াত খ্যাতিমান ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামির কথাই বলছি।

তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন গোটা পৃথিবী জানে, সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তুলেছেন মানবজীবনের বিস্ময়কর নন্দন ও নাটক, সূক্ষ্মতারই মাধুর্যে। কিন্তু তিনি যে একজন কবি এ বিষয়টি অনেকের কাছেই অজানা। আসলে যিনি শিল্পী, যার হূদয়ে শিল্পের অধিবাস তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন কিংবা কবিতা লেখেন— সর্বত্রই শিল্পের ছোঁয়া রেখে যান, তৈরি করেন মানবজীবন ও সম্পর্কের অমর কাব্য। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন পারস্যে, যে দেশে কবিতাই হলো শিল্পের সবচেয়ে মর্যাদাকর ও সমৃদ্ধ শাখা, যেখানে জন্মগ্রহণ করেছেন জালালুদ্দিন রুমি, শেখ সাদী, হাফিজ, ওমর খৈয়ামের মতো জগদ্বিখ্যাত কবিরা। সুতরাং আব্বাস কিয়ারোস্তামির রক্তের ভেতরেই কবিতা প্রবহমান।

কী আছে তাঁর কবিতায়? কবিতা কি তাঁর ছবি নির্মাণের পরিপূরক, না কি যে কথা তিনি ক্যামেরায় ফুটিয়ে তুলতে পারেননি, তাই ফুটিয়ে তুলেছেন কলমে। নাকি এ তাঁর দ্বিভাজিত সত্তা? দুটি ভিন্ন মাধ্যমে কী ঐক্য কিংবা কী বৈপরীত্য তিনি ধারণ করেছেন? তাঁর কবিতার সঙ্গে সবচেয়ে মেলে জাপাান হাইকু, নিটোল মাত্রায় স্বল্পতম পরিসরে একটি চিত্রকল্প নির্মাণ। চিরায়ত ফারসি কবিতার যে ঐতিহ্য— ছন্দ ও মাত্রার আঁটোসাঁটো বাঁধন তা অবশ্য মানেননি আব্বাস কিয়ারোস্তামি, কিন্তু ভাবসংকোচন আর চিত্র নির্মাণের জাদুকরী খেলাটি তার কবিতায় ঠিকই বিদ্যুচ্চমকের মতো উদ্ভাসিত হয়, তৈরি করে চিত্র ও চিন্তার ভেতরকার এক কাব্যিক টেনশন— হাইকু যা তৈরি করে। ছন্দ ও মাত্রার ঘেরাটোপ থেকে ফারসি কবিতায় যিনি আধুনিকতার ছোঁয়া এনেছেন যে নিমা ইউসজি, যাকে ইরানের আধুনিক কবিতার জনক বলা হয়, তার কবিতাও বের হতে পারেনি। সে তুলনায় আঙ্গিকের বিচারে কিয়ারোস্তামির কবিতা প্রথামুক্ত। চলচ্চিত্রে ক্যামেরা যেমন সর্বদাই গতিশীল, তার কবিতার বিষয়বস্তুগুলোও তেমনি গতিশীল। পরিব্যপ্ত অন্ধকারের ভেতর মেঘ থেকে মেঘে যেমন লাফ দেয় বিদ্যুত্, তেমনি তাঁর কবিতা।

পৃথিবীর চারটি মৌলিক বস্তু অগ্নি, বায়ু, মাটি ও জল— পারস্যের কবিদের কাব্যে বিভিন্ন মাত্রায় প্রকাশিত হয়েছে, কবিরা আক্ষরিক অর্থেই এসব উপাদানের ভেতর তাদের কাব্যিক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মূর্ত হয়েছেন। ইরানের বিখ্যাত প্রকৃতিমনস্ক কবি সোহরাব সেফেরির কবিতায় প্রাধান্য পেয়েছে মাটি, আরেক নামি কবি ফরুখ ফাররুখাজাদের কবিতার প্রধান উপজীব্য হলো বায়ু। আব্বাস কিয়ারোস্তামির কবিতারও প্রধান প্রতীকায়িত জীবনসঞ্চারী উপাদান হলো বায়ু। বস্তুর ভেতর প্রাণারোপের যে পদ্ধতি ফারসি কবিতার ঐতিহ্য তা প্রবলভাবে দেখা যায় কিয়ারোস্তামির কবিতায়। তাঁর কবিতা প্রকৃতি সত্তার ভেতরে মানবসত্তাকে স্থাপন করে, মানুষের স্পর্শ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক বিশাল মহাজাগতিক নকশার কথা বলে, যা মূলত ফারসি কবিতার আধ্যাত্মবাদেরই প্রতিফলন, প্রতিসরণ তার মরমি ভাবাদর্শের।

যিনি ক্যামেরা নিয়ে কাজ করেন, ফ্রেমে বেঁধে ফেলেন দৃশ্যবস্তু বা প্রেক্ষাপট, তিনি যখন কলম নিয়ে বসেন তখন ক্যামেরা কিন্তু আড়াল হয়ে যায় না, খোলা থাকে সেই চোখ, যা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন। একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা যখন ক্যামেরার ভেতর দিয়ে তাকান, তখন তিনি দৃশ্যসম্ভার থেকে কী নেবেন আর কী নেবেন না, কোথায় থামবেন আর কোথায় গতিশীল হবেন— তা জানে কেবল তারই শিল্পসত্তা। শব্দের ইন্দ্রজালে চিত্র ও অনুভব ধরে রাখার ভেতরেও সেই চলা ও থামার ছন্দ কাজ করে, কবি কী আঁকেন তার ক্যানভাসে, আর কী বাদ পড়ে যায় তার তুলির আঁচড় থেকে— সে এক দৈবতাড়িত ব্যাপার, এক অব্যাখ্যাত জিজ্ঞাসা।

চলচ্চিত্র আর কবিতার যোগসূত্রের বিষয়টি হচ্ছে ‘ইমেজ’; কিন্তু এ কথা সবাই স্বীকার করবেন কবিতায় লিপিবদ্ধ একটি ইমেজের বিবরণ ওই একই বিষয় বা বস্তুর একটি ফটো থেকে কতটা আলাদা। সাধারণের চোখে যা পড়ে না কিংবা যা এড়িয়ে যান গড়পড়তা মানুষ, তাই ধরা পড়ে একজন কবি বা ফটোগ্রাফার কিংবা প্রকৃতিবিদের চোখে। কবি বা ফটোগ্রাফার নিজ রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী খাতায় বা ফ্রেমে ধরে নিয়ে আসেন সেসব আপাত গুরুত্ব বা সৌন্দর্যহীন বিষয়, মনে হতে পারে অসংলগ্ন বা অপ্রয়োজনীয়, কিন্তু সেসব কখনো উদ্ভট বিষয় কলম কিংবা লেন্সের জাদুতে হিরণ্ময় হয়ে ওঠে, পাঠক ও দর্শক তখন আশ্চর্যান্বিত না হয়ে পারেন না। এজন্য প্রয়োজন দেখবার চোখ, গভীর পর্যবেক্ষণক্ষমতা— যা ছিল ইংরেজ কবি শেলির কিংবা ইতালীয় কবি লিওপার্ডির। আরেক ইতালীয় কবি যিনি ১৯৭৫ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হযেছিলেন সেই ইউজেনিও মনতালের এবং বিখ্যাত ফরাসি কবি ফ্রান্সিস পজের প্রকৃতি ও জগেক পর্যবেক্ষণের অসাধারণ ক্ষমতা ছিল, যা ছিল বাংলার কবি জীবননানন্দ দাশের। বলাই বাহুল্য যে, আব্বাস কিয়ারোস্তামির রয়েছে এই দুর্লভ দেখার চোখ।

আব্বাস কিয়ারোস্তামির কবিতার ভুবনটি প্রতীকী, ফারসি কবিতার যে চিরবৈশিষ্ট্য— সরল পঙিক্তর ভেতরে গভীরতর দর্শন প্রোথিত করা, শব্দের কপাটের আড়ালে অন্তর্দৃষ্টির আলোকের সন্নিবেশ— তা রয়েছে তার কবিতার পরতে পরতে। বিশেষ করে সমার্থক বা বিপরীতার্থক দুটি চিত্রকল্প বা ধারণা বা ভাবের মধ্য দিয়ে একটি বিতর্ক ও আখ্যান তৈরির যে প্রথা ফারসি কবিতায় দেখা যায়, যা রয়েছে রুমি ও হাফিজের কবিতায়— তার পুরোটাই রয়েছে আব্বাসের কবিতায়। তার কবিতা নরম বলেই কঠিন, পরিমিত বলেই বৃহত্, নীরব বলেই কোলাহলময়। প্রতীকধর্মী ও ইঙ্গিতময় এসব চিত্রকল্পপ্রধান কবিতা যা বলে তার চেয়ে বেশি অনুক্ত থেকে যায়, আর সেখানেই পাঠকের ভাবনার আন্দোলন, কল্পনার সম্প্রসারণ।

তাঁর অনেক কবিতায় বরফের শুভ্রতা ছড়িয়ে আছে। আছে ঋতু বদলের চিত্র, কুয়াশা, প্রাণী ও পাখির জগত্। আছে আপেলের আকর্ষণ, সৈনিকের অন্তরে লালিত বিদ্রোহ, জীবনের অনিত্যতা, বস্তুর ভেতরকার বৈপরীত্য ও ঐক্য। প্রায়ই তাঁর কবিতা পাঠককে হতবুদ্ধি করে রাখে পঙিক্তর আপাত সারল্যের নিচে গভীর ব্যঞ্জনাময় ভাবার্থের কারণে। অভ্যাসগত উদাসীনতায় কিয়ারোস্তামি ফারসি ভাষার নমনীয় শব্দভাণ্ডারের সঙ্গে সে ভাষার সুবিশাল নান্দনিকতার শক্তি মিলিয়ে দেন একটি নতুন কাব্যিক রীতি প্রবর্তনের অভিপ্রায়ে। তার বৈশিষ্ট্য হলো— তিনি অভিক্ষেপের আলোটি ফেলেন পর্যবেক্ষিত বস্তুটির ওপর, যে মনন তা উপলব্ধি করছে সেই মননের ওপর নয়, যাতে আমরা আমাদের একাগ্রতা চতুর্পার্শ্বের প্রকৃতির ভেতর যে কাব্যিকতা আছে, তার ওপর নিবিষ্ট রাখতে পারি।

বলা হয়ে থাকে অনুবাদ হলো তাই, যা কবিতা নয়। আর নিচের অনুবাদগুলো হলো অনুবাদের অনুবাদ। মূল ফারসি থেকে ইংরেজি অনুবাদ— তা থেকে বাংলা। মূল কবিতার সূক্ষ্ম বিষয়গুলো তাতে ধরা পড়বে না জানি, তবুও মোটা দাগে পাঠক কিয়ারোস্তামির কবিতার স্বাদ গ্রহণ করতে পারেন বাংলায় করা এই অনুবাদপ্রয়াসে। চল্লিশটিরও অধিক শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ করা এই মহত্ প্রতিভার প্রতি আমাদের আন্তরিক শ্রদ্ধা রইল, যিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর ভুবনজয়ী চলচ্চিত্র ও সংবেদনশীল কবিতায়।