১৯৭০ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে আব্বাস কিয়ারোস্তামি আটটি শর্টফিল্ম নির্মাণ করেছিলেন। এ সময়কালে একদল সমালোচক ছিলেন যারা মনে করতেন, বিশ্বসিনেমার জগতে কী হচ্ছে না হচ্ছে, তার সবই তাদের নখদর্পণে। আব্বাসের এ শর্টফিল্মগুলো ছিল এই সমালোচকদের প্রতি সরস প্রত্যুত্তর। কিন্তু এমনকি ইরানেও এ শর্টফিল্মগুলো শুধু একটা অনুষ্ঠানের বেশি আর কোনো আবেদন তৈরি করেনি। এগুলোর কোনোটাই কোথাও তেমন দৃষ্টি আকর্ষণ করত না, যদি পরিচালক (কিয়ারোস্তামি) ১৫ বছর ধরে একগুচ্ছ মাস্টারপিস তৈরি না করতেন। সিনেমার দুনিয়ায় এ ধরনের ঘটনা আর হয়নি।
কিয়ারোস্তামির প্রথম দিককার শর্টফিল্মগুলো তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রীয় সংস্থা কানুনের অধীনে, কানুন মানে সেন্টার ফর দ্য ইন্টেলেকচুয়াল ডেভেলপমেন্ট অব চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়াং অ্যাডালটস। এ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইরানের শাহ রেজা পাহলভীর স্ত্রী। আব্বাস ষাটের দশকে একজন বাণিজ্যিক শিল্পী হিসেবে কাজ করতেন। শুরুতে তিনি পোস্টার ও বইয়ের প্রচ্ছদের ডিজাইন করতেন। এর পর তৈরি করেন টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন ও সিনেমার শুরুর ক্রেডিট সিকোয়েন্স। তিনি যখন ৩০ বছরের উদ্যমী যুবক, তখন যে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করতেন, তার মালিক ছিলেন কানুনের পরিচালক। তিনি ১৯৬৯ সালে কানুনে একটি চলচ্চিত্র ইউনিট তৈরি করার জন্য কিয়ারোস্তামির সহায়তা চাইলেন।
শিক্ষামূলক চলচ্চিত্র তৈরির দায়িত্ব পেয়ে কিয়ারোস্তামি নির্মাণ করেন বিশেষ ধরনের বিজ্ঞান শিক্ষামূলক সিনেমা। এগুলো একদিকে ছিল নিরীক্ষাধর্মী এবং একই সঙ্গে উপভোগ্য। কিয়ারোস্তামি অবশ্য একবার বলেছিলেন যে, এগুলো যখন নির্মাণ করেছেন, তখন তিনি নিজেকে চলচ্চিত্রজগতের শিল্পী মনে করতেন না। ইরানে শিশুদের নিয়ে সিনেমা তৈরির ধারা জনপ্রিয় করতে এগুলো বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিল। তবে সিনেমাগুলো যে সবসময় শুধু শিশুদের জন্যই নির্মাণ হতো, এমনটা নয়। ১৯৯০ দশকের শুরুর দিকে কানুনের জন্য তার তৈরি করা সর্বশেষ চলচ্চিত্র দুটি শিল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবেশ করে। এ দুটি ছিল ক্লোজ-আপ এবং অ্যান্ড লাইফ গোজ অন। এদের মধ্যে কিয়ারোস্তামিকে ক্লোজ-আপ পশ্চিমা দুনিয়ায় প্রবেশের আমন্ত্রণ এনে দেয়, তবে এ চলচ্চিত্রে কোনো শিশুর ভূমিকা ছিল না।
অনেকগুলো শর্টফিল্ম— ব্রেকটাইম (১৯৭২), টু সলিউশনস ফর ওয়ান প্রবলেম, সো ক্যান আই (১৯৭৫), অর্ডারলি অর ডিজঅর্ডারলি (১৯৮১)— এসব ছবির প্রায় পুরোটাই বা বেশকিছু অংশ স্কুলের ভেতরেই নির্মাণ হয়েছে। সবগুলোই উপদেশমূলক কাজ হিসেবে উতরে গেছে, যেগুলোকে বার্টল্ট ব্রেখটের শিক্ষামূলক নাটকের সঙ্গে তুলনা করা যায়। কম আকর্ষণীয় হলেও সবচেয়ে শিক্ষামূলক ছিল ১৯৮০ সালে নির্মিত ‘টুথঅ্যাখ’। এতে শিশুরা কেন এবং কীভাবে দাঁত ব্রাশ করবে, সে বিষয়ে শিক্ষা দেয়া হয়েছে।
এ ধরনের কাঠামোয় কাজ করতে গিয়ে কিয়ারোস্তামি বিভিন্ন বিষয়কে তুলে ধরেছেন— সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা (টু সলিউশনস ফর ওয়ান প্রবলেম), অ্যানিমেশন (সো ক্যান আই) বা বিমূর্ততা (দ্য কালারস, ১৯৭৬), শৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলা বিষয়ে দার্শনিক প্রশ্ন (অর্ডারলি অর ডিজঅর্ডারলি) কিংবা শব্দ নিয়ে আনুষ্ঠানিক বা সামাজিক প্রশ্ন (দ্য কোরাস) এবং এমনকি একজন মানুষ কীভাবে মহাসড়কে টায়ার গড়িয়ে নিয়ে যায় (সলিউশন, ১৯৭৮) কিংবা এক ছোট্ট বালক রুটি নিয়ে ক্রুদ্ধ কুকুরের সামনে দিয়ে পার হয়।
সর্বশেষ গল্পটি কিয়ারোস্তামির প্রথম সিনেমা ব্রেড অ্যান্ড অ্যালাই (১৯৭০)-এর কাহিনি। সিনেমার গল্প তৈরি হয়েছিল তার ভাই তাঘির অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে (চিত্রনাট্যের কৃতিত্ব তাঘিরকেও দেয়া হয়েছে); বিটলসের ওব-লা-দা’র জ্যাজ সংস্করণ ব্যবহার করা হয়েছিল। পরবর্তী ফিল্ম ব্রেকটাইমে দেখা যায়, জানালা ভাঙার কারণে শ্রেণীকক্ষ থেকে বের করে দেয়া এ বালকের বাড়ি ফিরে যাওয়ার গল্প।
রবার্ট ব্রেসোর পরিচালিত লরেল অ্যান্ড হার্ডিকে কল্পনা করলে টু সলিউশনস ফর ওয়ান প্রবলেমের অভিনয়শৈলী সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। এক বালক তার সহপাঠীর কাছ থেকে ধার নেয়া বইয়ের কভার ছিঁড়ে ফেরত দিলে শুরু হয় দুজনের মধ্যে বিবাদ। এর পর ক্যামেরায় দেখা যায় বিবাদের ফল— ভাঙা পেনসিল, ছেঁড়া শার্ট, ভাঙা রুলার— ক্যামেরার পেছন থেকে একজন ধারাভাষ্যকার জানাচ্ছিলেন, কার জিনিসপত্রের এ হাল হয়েছে। এর পর গল্প আবার শুরু হয়। সেখানে দেখা যায়, যে বই ছিঁড়েছে, সে আঠা দিয়ে সেই ছেঁড়া অংশ জুড়ে দিয়ে বইটি ফেরত দিচ্ছে। সমস্যার দ্বিতীয় সমাধান।
টেস্ট অভ চেরিতে (১৯৯৭) দেখা যায়, মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি অচেনা মানুষদের বলছেন যে, তিনি আত্মহত্যা করতে সফল হলে তারা যেন তাকে সমাহিত করে। দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস (১৯৯৯) সিনেমায় দেখা যায়, প্রত্যন্ত এক কুর্দি গ্রামে বেপরোয়া এক ব্যক্তি সেলফোনে কল রিসিভ করার জন্য বারবার এক পাহাড়ে উঠছেন।
এভাবে বিভিন্ন ধরনের কাঠামো হচ্ছে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়ার একটি পদ্ধতি। কিয়ারোস্তামি পরিচালকদের সেই গোত্রের সদস্য, যাদের কাছে একটি দৃশ্য উত্তর দেয়া নয়, বরং প্রশ্ন করা। এ গোত্রে আছেন জন কাসাভেতেস, ক্রিস মার্কার, ওটো প্রিমিঙ্গার, জ্যাক রিভেট, আন্দ্রে তারকোভস্কি, জ্যাঁ তাতি। এ পরিচালকরা তাদের দর্শকদের অবাক করেন, কখনো তাদের প্রত্যাশার চেয়ে ভিন্ন কোনো ন্যারেটিভ দিয়ে এবং তাদের বেশির ভাগেরই দীর্ঘ দার্শনিক দৃশ্যের প্রতি পক্ষপাত আছে, যেখানে তারা পরোক্ষভাবে তাদের প্রশ্নগুলো প্রকাশ করেন।
কিয়ারোস্তামির শর্টফিল্মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় হচ্ছে অর্ডারলি অর ডিজঅর্ডারলি। এখানে দেখা যায়, বালকরা ক্লাসরুম ত্যাগ করছে, পানির ট্যাংক থেকে পানি পান করছে, কিংবা বাসে চড়ছে— সব ঘটনাই দুবার করে দেখানো হয়— একবার শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে, আরেকবার বিশৃঙ্খলভাবে। তবে এখানে দেখানো অনেক কিছু নিখুঁত মনে হয়নি এবং এ অস্পষ্টতা কিয়ারোস্তামির কাজ ‘টেন’ পর্যন্ত দেখা গেছে।
১৯৮২ সালের শর্টফিল্মে কিয়ারোস্তামি পুরোদমে একজন পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন, নিজে নির্দেশনা দিয়েছেন, প্রতিটি শটে সহকারীদের পরামর্শ দিয়েছেন। আর এর দুই দশক পর তিনি যখন টেন নির্মাণ করছেন, তখন তিনি খোলাখুলিভাবে নির্দেশনা ছাড়া সিনেমা বানানোর চেষ্টা করেছেন। নিজেকে তিনি একজন ফুটবল কোচের মতো দেখতে চেয়েছেন, যেখানে তিনি বিভিন্ন শটের মাঝে শুধু বেল বাজাবেন, যেন দৃশ্যগুলো ভিন্ন ভিন্ন ইনিংস। এসব সিনেমায় মনে হবে, তিনি শিক্ষকের চেয়ে বরং একজন সাংবাদিকের মতো কাজ করেছেন। ক্লোজ-আপে আমরা দেখেছি তিনি কতটা শিল্পসম্মতভাবে সাংবাদিকতা করেছেন, যা খুব অল্প কজন আধুনিক পরিচালকই করতে পেরেছেন।
কিয়ারোস্তামি যখন শুরুর দিকে তার উচ্ছল শর্টফিল্মগুলো নির্মাণ করছিলেন, তখন দুনিয়ার অন্য অঞ্চলের সমালোচকরা তাদের পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন যে, বিশ্বসিনেমায় সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলো এসেছে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ ও জাপান থেকে। আর কিছু ব্যতিক্রম আছে (প্রতি অঞ্চলে একজন) যেমন— ভারতে সত্যজিত্ রায় এবং আফ্রিকায় ওসমান সেমবেন। চীন, তাইওয়ান, হংকং, কোরিয়া, মিসর ও ইরানের কথা আলোচনায় আসত না, কারণ তারা শুধু তাদের নিজ নিজ দেশের অধিবাসীদের জন্যই সিনেমা বানাতেন। আর তাই তা সিনেমাপাগলদের তেমন আকর্ষণ করত না। আর আজকের দিনে গোলমেলে মনে হওয়ায় অনেক সিনেমার দিকে আমরা নজর দিই না। তাই এটা বিবেচনা করা অসঙ্গত হবে না যে, আমরা হয়তো সেই আমলের মতোই অনেক সিনেমাকে মিস করছি।
অনুবাদ: এস এম রশিদ
জোনাথন রোজেনবম: মার্কিন চলচ্চিত্র সমালোচক, শিকাগো রিডারের প্রধান সমালোচক, তিনি নিয়মিত লেখেন কায়েই দ্য সিনেমা ও ফিল্মকমেন্ট পত্রিকায়






