জীবনে দরজার গুরুত্ব অসীম। কেবল যে ঘরবাড়ির এপার-ওপার দুদিকের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে তা নয়, দরজাই কাউকে স্বাগত জানায়, কাউকে আবার দূরে ঠেলে দেয়। তৈরি করে গোপনীয়তা, লুকিয়ে রাখে রহস্য। দ্বারই আমাদের আগলে রাখে বাহ্যিক ঝামেলা থেকে। এমন দরজা নিয়ে আমাদের উদাসীনতার জবাব মেলে শুধু অফিস রুটিনের বেলায় কিংবা উঠতি সন্তানের জন্য উন্মুখ হয়ে দরজার পানে চেয়ে থাকার সময়।
এ কারণেই কিয়ারোস্তামির দরজার প্রতি আগ্রহ। একের পর এক দরজার ছবি তুলেছেন তিনি, চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি কিয়ারোস্তামি প্রচুর ছবি তুলেছেন, তার আলোকচিত্র নিয়ে প্রদর্শনী হয়েছে দুনিয়ার বড় বড় গ্যালারিতে, সর্বশেষ প্রদর্শনীটি হয় কানাডায়। আগা খান জাদুঘর।
দরজা নিয়ে টরন্টোয় আগা খান জাদুঘরের দরজা খোলে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে। এখানে ইরানি চলচ্চিত্রকার আব্বাস কিয়ারোস্তামির পঞ্চাশের অধিক রঙিন দরজার আলোকচিত্র নিয়ে প্রথম কোনো একক প্রদর্শনীর আয়োজন।
আগা খান জাদুঘরের প্রদর্শনীর আলোকচিত্রের দরজাগুলো ছিল ইরান, মরক্কো, ইতালি ও ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানের তোলা সব দরজার ছবি। বেশির ভাগ দরজা কাঠের তৈরি, পুরনো। এবং সব দরজাই বন্ধ, অনেক দরজায় ঝুলছেল তালা, কিছু দরজা শিকল বা বল্টু বা হুড়কো দিয়ে আটকানো। এ কারণেই কিয়ারোস্তামি প্রদর্শনীটির নাম দিয়েছিলেন ‘ডোরস উইদাউট কি’। দরজাগুলোর পেছনের গল্প কানাডার গণমাধ্যম দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল আর আবুধাবির দ্য ন্যাশনালকে দুটি সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন তিনি, তারই কিছু চম্বুক অংশ এখানে পত্রস্থ হল :
একবার বলেছিলেন, ডিজিটাল ছবি তোলা বেশি স্বাধীন, তবে চলচ্চিত্র বেশি চিত্তাকর্ষক ও চিন্তাশীল। আপনার সে চিন্তা কি বদলেছে?
ডিজিটাল মিডিয়ার আবির্ভাব না ঘটলে আমি অন্য কিছু করতাম। তাছাড়া রগচটা ও অনাত্মীয় কেউ ‘সঙ্গী’ হলে আমি দীর্ঘ সময় ধরে তার সঙ্গ উপভোগ করতাম না। আমি জানি না, সিনেমার ব্যাপারেও আমার এমন ভাবনা এসেছিল কিনা। তবে আমি বরাবরই ডিজিটাল নামক সুন্দর এই ‘সঙ্গী’র সঙ্গ উপভোগ করেছি। আমি এর একান্ত অনুগতও। ডিজিটাল ফটোগ্রাফিকে অসমাপ্ত ফটোগ্রাফি হিসেবে তুলনা করা যায়।
আপনার আগের তোলা ইরানের গাছপালা ও প্রকৃতির ছবিগুলোকে পৃথিবীর অন্য কোনো স্থানের ছবি বলে চালিয়ে দেয়া যায়। কেননা ছবিগুলো দেশ-কাল-পাত্র বিভেদকে পাশ কাটিয়ে বৈশ্বিক হয়ে ফুটে উঠেছে। একইভাবে আমরা জানি না, কোন দরজা কোন দেশের বা কোন অঞ্চলের। আমরা কেবল অনুমান করতে পারি।
ছবিগুলো কোথায় তোলা হয়েছে, সেটা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। তবে দর্শকদের কাছে দরজাগুলোর ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্ব রয়েছে। দরজাগুলোর অবস্থান প্রমাণ করে, একটি সংস্কৃতি অন্যটির সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত। গত দুই দশকে দরজাগুলোয় আমূল পরিবর্তন এসেছে। নিজস্ব সংস্কৃতির সবটুকু তারা ধরে রাখেনি বা রাখতে পারেনি। তবে দরজাগুলো আর কাউকে কখনো স্বাগত জানাবে না।
বন্ধ দরজা দর্শকদের কৌতূহলী করে তুলেছে। তারা জানতে চান, এর পেছনে কী রয়েছে। আপনার চলচ্চিত্রও দর্শকের কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। আপনি কি সচেতনভাবে দর্শকদের প্ররোচিত করেন বা খেপিয়ে তোলেন?
আমার প্রজন্মের মানুষের কাছে দরজাগুলো একটা অভিজ্ঞতা। সে অভিজ্ঞতা আমরা একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতাম। আপনার প্রজন্মের মানুষের কাছে এর পেছনের গল্পই বেশি কৌতূহলের ঠেকতে পারে। আরো তরুণ প্রজন্ম কিংবা শিশুরা হয়তো ভাববে, এমন দরজার পেছনে আমরা কীভাবে বসবাস করতাম। শিশুদের প্রয়োজন স্বচ্ছতা; তাদের জানা প্রয়োজন এর পেছনে কী রয়েছে।
তখন সেলফোন ছিল না। সুতরাং দরজার একপাশ থেকে আমরা বলতেও পারতাম না যে, আমি আসছি। আমরা দরজার কাছে গিয়ে জোরে আঘাত করতাম। কেউ ওপাশ থেকে উত্তর দেবে অথবা দরজা খুলে দেবে, সে আসায় থাকতাম। কোনো ডোরবেল ছিল না তখন, নোট রাখার কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। এটাই বন্ধ দরজার পেছনের রহস্য। বন্ধ দরজার পেছনে ব্যক্তির ইচ্ছাই মূল, রহস্য— হয়তো তিনি দরজা খুলে দেবেন, হয়তো খুলবেন না।
আপনার কাছে দরজার পেছনের মানে কী?
এর উত্তর আমি যে জানি না, তা নয়। তবে আমি এর উত্তর দিতে পারব না। কেউ পারবে বলেও মনে হয় না। আমরা কেবল অনুমান ও কল্পনা করতে পারি। হয়তো এ কারণেই অপেক্ষারত তরুণ প্রজন্মের কাছে এটা ধারণ করা সম্ভব নয়। দরজাগুলো বিভিন্ন সময়ের। তখন কোনো ডিজিটাল কোডও ছিল না। এখনকার আধুনিক দরজা কোড ছাড়া ভাবাই যায় না। কোড বা চাবি হলে যে কেউ দরজা খুলতে পারে। অথচ আগেকার দিনে দরজা খুলতে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হতো— কেউ আসবে, দরজা খুলবে। ব্যক্তিগতভাবে দরজাগুলো আমার কাছে স্মৃতিজাগানিয়া। পুরনো দরজা আমার দাদির দরজার কথা মনে করিয়ে দেয়। একবার দরজা খুলতে তার যেন বয়স ফুরিয়ে যেত, মনে হতো অনেক কষ্টে হাতলে হাত রেখে খোলার চেষ্টা করছেন। এখনকার দিনে কেউ কি এত কষ্ট করতে চায়?
ফটোগ্রাফি ও কবিতা— অন্তর্মুখী শিল্পকলা, আর সিনেমা তৈরি সহযোগিতাপূর্ণ। এ বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
ফটোগ্রাফি স্বতন্ত্র প্রক্রিয়া। সেখানে সিনেমা তৈরির মতো বাহ্যিক হস্তক্ষেপের বালাই নেই। ফটোগ্রাফির মধ্য দিয়ে আপনি যেখানে খুশি যেতে পারেন। কিন্তু সিনেমায় তা সম্ভব নয়। আমরা চাই বা না চাই, এমনকি স্বীকার করি বা না করি, সিনেমার মাধ্যমে আমরা কিন্তু দর্শকের রুচি ও চাহিদা এবং আর্থিক বিনিয়োগের দিকগুলোয় বেশি নজর দিয়ে থাকি। আমি প্রায়ই বলে থাকি, একটি আলোকচিত্র একটি ‘সিঙ্গেল-শট’ সিনেমা। এ সিনেমায় কড়চা বা বর্ণনার দায়ভার নেই, গল্প বলায়ও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কোনো ছবি তোলার পর যে কেউ ছবিটি ঘরে নিয়ে যেতে পারে, বিচার-বিবেচনা করে ফেলে দিতে পারে অথবা অন্যের সামনে উপস্থাপন করতে পারে। একজন দর্শক তার মর্জিমতো ছবির ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে, আবার নিজের মতো গল্প সাজাতে পারে, এমনকি অন্যের কাছে বর্ণনাও করতে পারে।
ফটোগ্রাফিতে আগ্রহী হলেন কীভাবে?
১৯৭৯ সালের বিপ্লব এর মূল কারণ। তখন সিনেমা তৈরি বেশ কঠিন ছিল। সিনেমার পরিবর্তে তখন ছবি তোলা শুরু করি। সিনেমা তৈরির কাজে মন দেয়ার চেষ্টাও করি। সবই চলত সমান্তরালভাবে।
এমন একসময়ে আপনার স্থিরচিত্রের প্রদর্শনী চলছে, যখন বিশ্বের মুভিং ইমেজের জয়জয়কার চলছে— কীভাবে দেখছেন বিষয়টিকে?
ছবি দেখতে প্রয়োজন মনোযোগ ও গভীর চিন্তা। বিশ্বজুড়ে চলা যে গতিচাঞ্চল্য তার মূল্য কী? স্থিরচিত্রের মাধ্যমে আমি এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তাকিয়ে দেখুন, দর্শকরা কীভাবে ছবির সঙ্গে নিজেকে গেঁথে ফেলেছেন। তারা নিজেদের মতো করে অবস্থান পরিবর্তন করে কিংবা ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে, স্থির দৃষ্টিতে, কখনো বড় বড় চোখ করে ছবিগুলো দেখছেন। এ সুযোগের অবকাশ মেলে কি মুভিং ইমেজে?
দরজার ছবিই কেন তুলেছিলেন?
প্রথমে দেয়ালের ছবি দিয়ে শুরু করি। দেয়াল আমাকে নিয়ে যায় জানালার কাছে। জানালা দেখায় দরজা। এভাবেই চলতে থাকে। তবে আমি গাছপালা ও বরফের ছবিও তুলেছি।
ছবি তোলার আগে দরজাগুলোর কি সাজানো-গোছানোর প্রয়োজন হয়েছিল?
আমি বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ধুলো-ময়লা পরিষ্কার করে নিতাম। (একটি ছবি উল্লেখ করে) ছবিটি তুলতে সকালে গিয়েছিলাম। প্রথমে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করি। এর পর দুপুরের খাবার শেষে ছবি তুলি।
দরজার ২০০ ছবি থাকলে প্রদর্শনীর একটি সিক্যুয়েল তৈরি করা যেত।
তা যেত। তবে একটি প্রদর্শনীই যথেষ্ট। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দরজাগুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে যেত। তাই আমি বেছে বেছে ভালো মানের ছবির প্রতি গুরুত্ব দিয়েছি। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া একটি দরজারও অস্তিত্ব আজ নেই। এ প্রসঙ্গে বলা যায় ইতালির কথা। সেখানে ছবির লোকেশনের জন্য চষে বেড়িয়েছি। কিছু দরজা সেখানে দেখেছি। সেই দরজাগুলো এখন আর নেই।
ইতিহাসের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনে দরজাগুলো কি কিছু জানাচ্ছে ?
প্রতিটি দরজার সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত বর্ণনা সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে সেখানে বসবাসরত একজন মানুষের শিল্পরসবোধ তুলে ধরেছে। দরজার পেছনে থাকা মানুষের অর্থবহুল ছবি ফুটিয়ে তুলেছে। তবে এখন সেখানে কোডভিত্তিক দরজার আবির্ভাব ঘটেছে।






