‘যতদিন সিংহদের নিজেদের ইতিহাসবিদ থাকবে না
ততদিন শিকারের গল্প
শিকারিকেই মহিমান্বিত করবে।’
—আফ্রিকার প্রবাদ
রোমানি বা জিপসিরা ইউরোপে হাজির হয়েছিল ১৪ শতকের শেষ ও ১৫ শতকের প্রথম ভাগে, মানে আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে। ‘তখন ইউরোপীয়দের কৌতূহল আমরা কোত্থেকে এসেছিলাম সেটা জানতে। কিন্তু ততদিনে আমরা আমাদের উৎসকে ভুলে গিয়েছিলাম।’ তবে ১৪২২ খ্রিস্টাব্দে কিছু নতুন আসা রোমানি ইতালির ফোরিল শহরে স্থানীয়দের জিজ্ঞাসার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে পেরেছিল যে, তাদের মাতৃভূমি ছিল ভারত। এ সত্য বহুদিন মহাফেজখানায় চাপা পড়ে ছিল। ১৮ শতকের শেষ দিকে রোমানিদের ভারতীয় আদিবাসের কথা ধীরে ধীরে প্রকাশ হতে থাকে। শুরুতে বিষয়টি স্পষ্ট হয় পণ্ডিত মহলে, যার মধ্যে এ বিষয়ে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেন হাইনরিখ গ্রেলমান। এ অনুসন্ধানচর্চা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে ১৯ শতকের শেষভাগে ‘জিপসি স্টাডিজ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। ২০ শতকে জিপসিবিষয়ক চর্চার মনোপলি চলে যায় ব্রিটেনের জিপসি লোর সোসাইটির হাতে। এ সংগঠনটি ছিল একদল ভিক্টোরিয়ান পুরুষতান্ত্রিক বর্ণবাদীদের। এরা ছিল আবার সমসাময়িক প্রাচ্যবিদদের একটি অফশুট। এ সংগঠনের জার্নাল অব দ্য জিপসি লোর সোসাইটি ছিল একাডেমিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও বিভিন্ন ধরনের গবেষকদের মিশ্রণে তৈরি। শিগগিরই এ জার্নাল দুনিয়ায় রোমানি মানুষের সম্পর্কে জানার মূল উৎস হয়ে উঠেছিল। তাই ১৯ শতকের শেষ নাগাদ জিপসি বা রোমানিদের সম্পর্কে তাদের বাইরের পণ্ডিতদের মতামতই সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে উঠল। জিপসিদের বক্তব্য আর কারো কানে পৌঁছল না। এরপর শুরু হলো আরামকেদারায় বসে জিপসিদের নিয়ে একদল লেখকের রোমান্টিক উপন্যাস লেখালেখি এবং এগুলোই হয়ে উঠল সাধারণ পাঠকদের কাছে জিপসি সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব খোঁজার উৎস। যদিও এসব উপন্যাস লিখিয়েরা একদিনও কোনো জিপসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। মানে চর্মচক্ষে না দেখে তারা তাদের মনের চোখ দিয়ে দেখতে চেয়েছেন জিপসি নামের রহস্যে ঘেরা, কৌতূহলজাগানিয়া একদল উন্মূল মানুষকে। বিশিষ্ট পণ্ডিত ডোরা ইয়েটস ১৯৭৪ সালে ৯৫ বছর বয়সে মারা যান। এরপর রুগ্ণ, বয়স্ক জিপসি লোর সোসাইটি নতুন জিপসি একাডেমিকদের আধিপত্যে পরিবর্তিত হয়। রোমানি অ্যাক্টিভিস্টরা এবার এ প্রতিষ্ঠানকে ‘নন-রোমানি জিপসি ইন্ডাস্ট্রি’ নামে ডাকতে শুরু করেন।
জিপসিদের মূল ভারতেই— এ সত্য এখন প্রশ্নাতীত বলেই মনে করা হয়। কিন্তু এখনো দুনিয়ায় অনেকেই আছেন, যারা মনে করেন, জিপসিদের আদি নিবাস মিসরে! পশ্চিমে অনেক সচিত্র বইয়ে স্ফিংস, পিরামিড, ফারাও, উটের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয় রোমানিদের ভার্দো বা সজ্জিত ক্যারাভান।
জিপসিরা মিসর থেকে এসেছে, এমন ভাবনা কীভাবে তৈরি হলো? গাঢ় গায়ের রঙযুক্ত মধ্যপ্রাচ্যের মানুষকে ইউরোপে এনেছিল ভেনেসিয়ান ও অন্যান্য উদ্যোক্তা। এদের আনা হয়েছিল বাজিকর, গায়ক, নাচিয়ে ও আরো বিভিন্ন ধরনের শারীরিক কসরত দেখানোর জন্য। এটা রোমানিরা ইউরোপের রাস্তায় হাজির হওয়ার আগের ঘটনা। মধ্যপ্রাচ্যের এ অতিথিদের গড়পড়তা ‘ইজিপশিয়ান’ নামের ডাকা হতো। কারণ তারা এসেছিল মিসরীয় মামলুক সাম্রাজ্য থেকে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে রোমাদেরও ইজিপশিয়ান বা মিসরের মানুষ বলে অভিহিত করা হয়। পরবর্তীতে এর সংক্ষিপ্ত চেহারা নিয়ে হয় ‘জিপশিয়ান’ বা জিপসি। অন্য রোমানি দলগুলো এসেছিল মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ থেকে, এ অঞ্চলটি ছিল গ্রিক পেলোপনেয়াস, যাকে ‘লিটল ইজিপ্ট’ নামে ডাকা হতো। এ এলাকায় রোমানিদের ‘রোমিতি’ নামে ডাকা হতো, যারা মূলত ১৫ শতকে আনাতোলিয়া বা বর্তমানের তুরস্ক থেকে সেখানে গিয়েছিল। অন্যদিকে এটাও প্রমাণিত যে, অনেক রোমা ইউরোপে এসে নিজেদের মিসরীয় বলে দাবি করত এবং বলত, তাদের পাপ মোচন করতে তারা ধর্মীয় তীর্থে বের হয়েছে। এটা বললে বিভিন্ন গির্জা থেকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হতো। রোমানিরা এ কৌশল গ্রহণ করেছিল। এ কৌশল তখন কার্যকর ছিল। কারণ তখন বাইজানটিয়ামে অনেক মিসরীয় খ্রিস্টান (কপটিক) উদ্বাস্তু হিসেবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এরা মিসরে মুসলিম আধিপত্যের পরিপ্রেক্ষিতে দেশ ছেড়েছিল। বাইজানটিয়ামে শুরুর দিকে রোমাদের অ্যাথিনগানোই নামে ডাকা হতো। এ অ্যাথিনগানোই ছিল একটি গ্রিক টার্ম, যার অর্থ ‘যাকে স্পর্শ করা উচিত নয়।’ এ নামটি মূলত ব্যবহার হতো পারস্যের একটি আধ্যাত্মিক গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে। এ গোষ্ঠীটি অষ্টম শতকে পারস্যে আরবদের বিজয়ের পর দেশ ত্যাগ করে বাইজানটিয়ামে হাজির হয়েছিল। এ টার্মটি বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় সামান্য পরিবর্তিত রূপে (যেমন সিগানি) গৃহীত হয়েছিল রোমানি মানুষদের সম্বোধন করতে। গ্রিস ও বলকান এলাকায় ব্যবহার করা আরেকটি টার্ম ছিল জিপথি/জাপতি/কিবতি, যা ইজিপশিয়ান বা কোপ্টকে বোঝাত। সাম্প্রতিক কালে ভারতীয় এবং ইউরোপে রোমানি ও অরোমানি পণ্ডিতদের গবেষণায় জিপসিদের উৎস নিয়ে মিসরীয় ধারণা পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে এবং এটা নিশ্চিত করেছে যে, তাদের মাতৃভূমি একদিন ছিল ভারতবর্ষের মাটি। মাহমুদ গজনীর দরবারের কবি শাহনামাখ্যাত ফেরদৌসি ও সমসাময়িক অন্যান্য লেখকের বিবরণী থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব যে, জিপসিদের মাতৃভূমি ছিল ভারতবর্ষ। তবে তারা ভারতের কোনো নির্দিষ্ট এলাকা, গোষ্ঠী, বর্ণের মানুষ ছিল না। ১১ শতকে ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে একটি রাজ্য ছিল গুরজারা। সেটা তখন রাজপুত সংঘের একটি আবাস। এগুলো ছিল যোদ্ধ বর্ণ বা ক্ষত্রিয়দের ছোট ছোট সামন্তীয় সমাজ। এদের সঙ্গে ছিল ব্যবসায়ী বৈশ্য বর্ণ ও অন্যান্য কাজের জন্য শূদ্ররা। নিম্নবর্ণের মানুষ ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের সেবায় নিয়োজিত ছিল। সব বর্ণের মানুষ তাদের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা কাজ করত। এটাই ছিল মনুর আইন। অতীতে ইউরোপেও রোমাদের এভাবেই কর্ম বিভক্ত দেখা যেত। এরাও তাদের বিশেষ কর্মদক্ষতাকে তাদের উত্তরসূরিদের মধ্যে প্রবাহিত করে যেত, যেমন— সংগীত, ঘোড়ার কসরত, ইট তৈরি, কামারের কাজ কিংবা আরো অনেক কিছু। রাজপুত সংঘগুলোয় একজন করে শাসক থাকতেন, যাদের বলা হয় ঠাকুর। আবার এ ছোট সংঘগুলোর ঠাকুরদের জন্য থাকতেন একজন সর্বোচ্চ ঠাকুর। রোমানিদের দলনেতাকে বলা হয় থাগার, যা ঠাকুর শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে।
দশম শতকে আরব খিলাফত শাসনকে পরাজিত করে একটি তুর্কি-মুসলিম বংশ মাথা তোলে, যা আফগানিস্তানে গজনবী সাম্রাজ্যের সূচনা করে। ১১ শতকের শুরু থেকে এ গজনবীদের নেতা মাহমুদ গজনী ভারতে হানা দিতে শুরু করেন। এ সময় মাহমুদ গজনীর সঙ্গে রাজপুত সংঘগুলোর সরাসরি সংঘাত শুরু হয়। ১১৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চলে ধারাবাহিক যুদ্ধ, লুটপাট, ধ্বংসযজ্ঞ। ফলাফল রাজপুত সীমানায় বিপর্যয়। এ আক্রমণ শুরু হয়েছিল ১১ শতকের শুরুতে মাহমুদ গজনীর হাতে। আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে বছরে একবার করে মাহমুদ গজনী ভারতে হানা দিতেন। ফলে মধ্য ও উত্তর ভারতে লুটপাট, মন্দির ধ্বংস, বন্দিদের দাসে পরিণত করার মতো ঘটনা ঘটতে থাকে। বিপর্যস্ত রাজপুত রাজ্যগুলোকে তিনি কিছু শর্তে হামলা থেকে নিষ্কৃতি দেন। এসব শর্তের মধ্যে ছিল নিয়মিত কর প্রদান এবং পারস্য জয় করতে তার সেনা ও প্রশাসন সম্প্রসারণে সহায়তা করা। এজন্য তাকে মাহুতসহ হাতি, মূলবান রত্নপাথর এবং আরো অনেক পণ্য দিতে হয়েছে রাজপুতদের। একই সঙ্গে তার রাজধানী গাজনা সম্প্রসারণে ভারত থেকে কারুশিল্পী, প্রকৌশলী ও আরো অনেক দক্ষতাসম্পন্নদের নিয়ে যাওয়া হয়। আর বিভিন্ন কাজ করার জন্য নেয়া হয় অনেক দাস। তার দখল করা অনেক রাজপুত এলাকা থেকে অনেক পুরুষকে তার সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হয়, যাদের বলা হতো গোলাম বা দাস সৈনিক। এ সেনারা তখন ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, গজনবী সেনাবাহিনীতে একটা জাতিগত গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হয়। এ রাজপুত সেনাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন মাহমুদের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী। যা হোক, রাজপুত সেনাদের অনেকে তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে নিয়ে আসতেন। এ নারীরাও সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন সহায়ক কাজ করতেন, যেমন— সেনাদের জন্য পানি আনা, রাতে পাহারাদারি করা প্রভৃতি। বলা হয়, অনেক ভারতীয় ক্ষত্রিয় যোদ্ধা মাহমুদের সেনাবাহিনীর সেনাপতিও হয়েছিলেন। এ সেনাবাহিনীর সঙ্গে চলত পুরো একটা সমাজ। এখানে থাকতেন ব্যবসায়ী, গায়ক, লবণ ও পানিবাহক, ধর্মীয় নেতা প্রমুখ। মাহমুদের সেনাবাহিনীতে ভারতীয় ছাড়াও তুর্কোমান, আরব, কুর্দি সেনারাও ছিলেন। আরো ছিলেন স্তেপ অঞ্চলের যোদ্ধারা। এসব ভিন্ন ধর্ম ও ভাষার যোদ্ধারা সেনাবাহিনীতে তাদের নিজ নিজ সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে চলতেন। অনেক সময় যুদ্ধবন্দিদেরও সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হতো। পারস্য থেকে রোমান কিংবা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যেও পরাজিত বাহিনী কিংবা উপনিবেশের যোদ্ধাদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হতো। সে আমলে সেনাবাহিনী ছিল মূলত বিজয়ী হওয়ার পর লুটের মালের ভাগ নেয়ার লোভে দুষ্ট একদল মানুষ। নিজের ঘরবাড়ি ভিন দেশীর হাতে আক্রমণের ভয় ছাড়া দেশপ্রেম দেখানোর অবকাশ তাদের খুব একটা হতো না। ভাড়াটে সেনা কিংবা যাযাবর গোষ্ঠী তাদের আশপাশে কোনো অভিযান হচ্ছে দেখলে সেই সেনাদলে জুটে যেত লুটের মালের লোভে। সৈন্যর জন্য সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত রোমানিদের ডায়ালেক্টে একটা শব্দ আছে ‘লুর’ বা ‘লুরডো’, যার অর্থ ‘লুটেরা’। আর লুট করা ক্রিয়াপদের জন্য রোমানিরা ব্যবহার করে ‘লুরেল’। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সংস্কৃত লুণ্টায়াতি অর্থ লুট করা, যা থেকে তৈরি হয়েছে হিন্দি লুটনা, আবার এ লুটনা থেকে ইংরেজি ভাষার অভিধানে যুক্ত হয়েছে একটা শব্দ লুট। ১৭ শতকে ইউরোপে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে বহু বছরজুড়ে চলা যুদ্ধেও এমন লুটপাট অব্যাহত ছিল।
১০৩৮ খ্রিস্টাব্দে সেলজুকরা আমু দরিয়া নদী অতিক্রম করে খুরাসানে গজনবী সাম্রাজ্যে প্রবেশ করে। স্তেপ অঞ্চল থেকে আসা একদল দুর্ধর্ষ যুদ্ধবাজ গোষ্ঠীর সঙ্গে টিকতে না পেরে সেলজুকরা আমু দরিয়া পার হয়েছিল। সেলজুকরা তখন তাদের পশুর পাল চরানোর জন্য বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর শান্তিমতো বাস করার জন্য একটা জায়গা খুঁজছিল। সেলজুকদের এ আগমন ছিল গজনবী সাম্রাজ্যে এক ধরনের আগ্রাসন। ফলে শুরু হলো এ দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে ধারাবাহিক যুদ্ধ। ১০৪০ সালে অনুষ্ঠিত হলো ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী তিনদিনের দান্দানকান লড়াই। এ লড়াই হয়েছিল মার্ভ শহরে। লড়াইয়ে মাহমুদের যুদ্ধে অদক্ষ সন্তান মাসুদ চরমভাবে পরাজিত হন। মাসুদ বা গজনবী সেনাবাহিনীতে থাকা ভারতীয় সেনা ও তাদের পরিণতি কী হয়েছিল, সেটা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে এটা নিশ্চিত যে, অনেকে বিজয়ী সেলজুক সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। আরো একটি বিষয়ের প্রমাণ পাওয়া যায় যে, দান্দানকান লড়াইয়ের পর সেলজুক সেনাদের হাত থেকে বাঁচতে উদ্বাস্তু মানুষের একটি বিরাট দল ইউরোপের সীমান্তে আছড়ে পড়ে। দান্দানকান লড়াইয়ের কিছুদিন পরই আর্মেনিয়ায় ভারতীয়দের ঢল নামে। আজকের দিনে ইউরোপে রোমানিদের সব কথ্য ভাষাতেই বেশকিছু বিচ্ছিন্ন আর্মেনীয় শব্দের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যেমন— অ্যাম্বরোল (নাশপাতি), আঙ্গুশত্রি (আংটি), বোভ (চুলা)। এ ভাষাতাত্ত্বিক চিহ্ন থেকে বোঝা যায় যে, গ্রিক ভাষার বাইজানটাইন আনাতোলিয়ায় প্রবেশের আগে আর্মেনিয়া থেকে শব্দগুলো রোমানিদের ভাষার অংশ হয়ে গিয়েছিল। আরো পরে রোমানিরা প্রবেশ করেছিল বলকান অঞ্চলে। এ পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সময় লেগেছিল ২০০-৩০০ বছর। আর্মেনিয়ায় লোম জিপসি নামে একটি সম্প্রদায় এখনো সেখানে বাস করে। খুব সম্ভবত এ গোষ্ঠীই সেই প্রথমবার আর্মেনিয়ায় প্রবেশের পর বাইজানটিয়ামে না গিয়ে রয়ে যাওয়া একটি দলের বংশধর। তবে এ সিদ্ধান্তের পেছনে এখনো শক্ত প্রমাণ হাতে নেই।
দান্দানকান লড়াইয়ের পর সেলজুকরা নজর দিল আর্মেনিয়ার দিকে। ১০৬৪ সালে ব্যাটল অব আনি শেষে তারা আর্মেনিয়া দখল করে নিল। ফলে অনেক আর্মেনীয় ও সেখানে অবস্থান করা আগে থেকেই উদ্বাস্তু ভারতীয়রাও পশ্চিম দিকে যাত্রা করে সিসিলিয়ায় পৌঁছল। সিসিলিয়া তখন বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের অধীন। সেলজুক তুর্কিরা এবার রোমান সাম্রাজ্যের এ পূর্বাঞ্চলীয় কেন্দ্র বাইজানটিয়ামে আধিপত্য স্থাপন করল। এ বাইজানটিয়ামই আনাতোলিয়া। ১০৭১ খ্রিস্টাব্দে ব্যাটল অব মানজিকিরতে বাইজানটাইন সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে সেলজুকরা আনাতোলিয়ায় তাদের সাম্রাজ্য স্থাপন করে। সেলজুকদের এ সাম্রাজ্য সালতানাত অব রউম নামে পরিচিত হয়। পরবর্তী ১০০ বছরের মধ্যে আনাতোলিয়ার নাইসিয়া, কনস্ট্যান্টিনোপল ও বসফরাসের তীরে বলকান সাম্রাজ্য বাদে বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের বেশির ভাগ এলাকা সেলজুকরা নিজেদের করে নিয়েছিল। গ্রিকভাষী এ অঞ্চলে ভারতীয়রা নিজেদের আবাস গড়ে তুলল। এসব এলাকায় আধিপত্য ছিল সেলজুক তুর্কিদের, যারা তাদের প্রশাসনিক কাজে ফার্সি ভাষা ব্যবহার করত। গজনবী সেনাবাহিনীর সৈনিক হিসেবে ভারতীয়রা ইন্দো-আর্য ভাষার একটি মিশ্র রূপ ব্যবহার করে কথা বলত। তারা একটা সামরিক লিংগুয়া ফ্রাংকা ব্যবহার করত, যেটা গড়ে উঠেছিল তাদের স্থানীয় ভাষার ওপর ভিত্তি করে। সেলজুকদের কাছ থেকে কিছু ফার্সি শব্দও এবার যুক্ত হয় এ লিংগুয়া ফ্রাংকায়। এ লিংগুয়া ফ্রাংকাটি কারো নিজস্ব ভাষা ছিল না। বরং বিভিন্ন অঞ্চলের ও ভাষার সেনাদের মধ্যে যোগাযোগের একটি সাধারণ মাধ্যম হিসেবেই এ লিংগুয়া ফ্রাংকা তৈরি হয়েছিল। ১১ শতকে গজনবী সাম্রাজ্যের ভারতীয় সেনারা দেশ ছাড়ার পর ভারতে এ সামরিক ভাষাটি টিকে ছিল। ষোড়শ শতকে আরো বিবর্তিত হয়ে এটি উর্দু ভাষায় পরিণত হয়।
সালতানাত অব রউম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ভারতে থেকে যাত্রা করা সেই গোলামরা নিজেদের উন্মূল ভারতীয় বা উদ্বাস্তু হিসেবে মনে করেছে। কিন্তু এবার তারা নিজেদের পুরনো পরিচয়কে পেছনে ফেলে নতুন পরিচয়কে গ্রহণ করতে প্রস্তুত হলো। বিষয়টা ছিল এমন যে, ভারত থেকে আসা সেই গোলামরা আজ আর নেই। তারা কমবেশি মৃত। অন্যদিকে তাদের বংশধরদের জন্ম ভারতের বাইরে, উদ্বাস্তু জীবনে। এ নতুন প্রজন্ম আর ভারতে তাদের শিকড় খুঁজতে গেল না। বরং নতুন পরিচয়কে স্বাগত জানাল। তারা সালতানাত অব রউময়ের অংশ হিসেবে নিজেদের রোমা পরিচয়ে পরিচিত করল। রোমা অর্থ ‘প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ’। শব্দটি এসেছে রোম থেকে, যা দিয়ে রোমানিতে বিবাহিত বা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে বোঝানো হয়।
রোমারা তাদের ভারতীয় ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে বিভিন্ন অর্থনৈতিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। এসব পেশা আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে। যেমন ভারতে ঘোড়ার ব্যবসা ছিল না। কিন্তু আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে পশ্চিমে এগোনোর সময় তারা এ পেশায় যুক্ত হয়ে পড়ে। ২০ শতকে এসে ঘোড়ার ব্যবসা আর চলে না। তাই অনেক রোমানি যুক্ত হয়ে পড়ে— কেউ হয়ে যায় অটোমোবাইল কিংবা ট্রাকের ডিলার, কেউ শুরু করে বাতিল মালপত্রের ব্যবসা। নারীরা অবশ্য সবসময়ই জ্যোতিষ, ধাত্রী, কবিরাজ, হকার কিংবা বািনোদন কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। রউম সালতানাতে রোমানি গোষ্ঠীর পেছনের দিনের স্মৃতি হিসেবে টিকে রইল কেবল তাদের ভাষা, যা আদতে ছিল ভারত, বাইজানাটিয়াম, আর্মেনিয়া ও পারস্যের ভাষার সমন্বয়ে তৈরি লিংগুয়া ফ্রাংকা। এটাই হয়ে উঠল তাদের মাতৃভাষা বা রোমানি সিব। নতুন এ আবাসে তারা দেখল, মানুষের পেশা এখানে মূলত কৃষিকাজ, নয়তো যাযাবর ব্যবসায়ী। রোমানিরা ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী, বণিক, কারুশিল্পী, গায়ক বা এককথায় মধ্যস্বত্বভোগী, বণিক, এন্টারটেইনার হিসেবে সমাজে পরিচিত হয়ে ওঠে। সেই সুদূর ভারত থেকে আসা ক্ষত্রিয়রা, যুদ্ধই যাদের ধর্ম, আর ক্ষত্রিয় রইল না। রউম সালতানাতে রোমানিদের পরিবারগুলো যখন বড় হচ্ছিল, তখন অনেকে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় পশ্চিমে নাইসিয়া বসফরাস পার হয়ে কনস্ট্যান্টিনোপলে যাত্রা করে। সেলজুক তুর্কিদের ক্ষমতা ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোম সালতানাত টুকরো টুকরো হয়ে গেল। ছোট ছোট শহর শাসন শুরু করল যুদ্ধবাজ স্থানীয় নেতারা। ক্ষমতার এ শূন্যস্থানে আবির্ভূত হলো একদল নতুন শাসক অটোমান তুর্কি। এরা বাইজানটিয়াম ও বলকান এলাকায় আধিপত্য তৈরি করল। বলকান এলাকায় তারা রোমানি শিল্পীদের সঙ্গে নিয়ে গেল। এভাবে বলকান অঞ্চলে রোমানিদের উপস্থিতি নিশ্চিত হলো। এটা প্রমাণিত যে, আভিযান চালানো অটোমান সেনাদের সঙ্গে রোমানি সংগীতশিল্পীরা ছিল। রোমানিরা কেবল গানই গাইত না, সেনাদের বিনোদনের জন্য তারা এক ধরনের তুর্কি বাঁশি, বেহালা বাজাত।
বাইজানটাইন নাইসিয়া থেকে রোমাদের বলকানে প্রবেশ শুরু হয়েছিল ১৪ শতকে। সামান্য কিছু রোমানি গিয়েছিল স্লাভভাষী অঞ্চলে। পথে তারা তাদের ভাষায় সার্বিয়ান ও অন্যান্য স্লাভ ভাষার কিছু শব্দ আপন করে নিয়েছিল। মলদোভিয়ায় পৌঁছে তারা গ্রহণ করে কিছু রোমানীয় শব্দ।
ষোড়শ শতক নাগাদ ব্রিটিশ আইল থেকে স্পেন, পোল্যান্ড থেকে রাশিয়ার পশ্চিমাংশ, নরওয়ে থেকে গ্রিসে ছড়িয়ে পড়ে। উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে যাত্রা, গোলাম সেনা হয়ে আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে পারস্য, আর্মেনিয়া, বাইজানটিয়াম, রউম সালতানাত, গ্রিস, সার্বিয়া ও রোমানিয়া হয়ে আজকের মধ্য ইউরোপ— এই হচ্ছে রোমানি বা জিপসিদের ঐতিহাসিক এক্সোডাস ও ডায়াস্পোরা।
ইউরোপীয় পণ্ডিতদের দাবি, রোমানিরা ভারত ত্যাগ করেছিল বিভিন্ন সময় এবং এ সময়ের পরিধি প্রায় ৫০০ বছর। কিন্তু এ ধারণা যথাযথভাবে প্রমাণিত নয়। রোমানিদের ভাষায় একটি সামরিক লিংগুয়া ফ্রাংকা, যা গড়ে উঠেছিল সংস্কৃতিভিত্তিক অনেকগুলো ভাষা, যেমন— পাঞ্জাবি, হিন্দি, বাংলা, মুলতানি প্রভৃতি ভাষার সমন্বয়ে। এসব ভাষা বিকশিত হয়েছে সমান্তরালভাবে।
রোমানিরা যখন ইউরোপে পৌঁছে, তখন তাদের আদিপুরুষের পেশা ত্যাগ করতে হয়েছে। কিন্তু সে সময় ইউরোপীয় পণ্ডিতরা জিপসি চর্চা শুরু করেন ইউরোপে রোমাদের তখনকার পেশাগুলোর ওপর নির্ভর করে। এ চর্চার একজন প্রভাবশালী পণ্ডিত হাইনরিখ এম. গ্রেলমান। উনিশ শতকে তিনি রোমাদের একটি ঘৃণিত, জঘন্য জাতি বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরো মত প্রকাশ করেন, এ জাতি সভ্য ইউরোপে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। গ্রেলমান ও তার অনুসারীদের ধারণা ছিল রোমারা শুরু থেকেই নিচু বর্ণের যাযাবর, এমনকি ভারতেও তারা এ রকমই ছিল। এ মত ইউরোপে রোমাদের বিরুদ্ধে একটি জাতিবিদ্বেষী ধারণার উদ্ভব ঘটায়। তাদের মনে বিশ্বাস জন্মায় যে, রোমাদের পূর্বপুরুষরা ছিল ‘ডোমবা’। এ ডোমবা নামটি ইউরোপীয়রা আবিষ্কার করেছিলেন রোমানিদের একটি শব্দ ‘রোম’ থেকে। যাহোক, এ জিপসি বিশেষজ্ঞরা কখনো ভারতে না গিয়েই ধারণা করে নেন যে, রোম হচ্ছে ভারতের একটি নীচু জাতি, যারা মূলত ভিক্ষুক, চোর, পতিতা ও গোরখোদক। পরবর্তীতে অধ্যাপক ডোনাল্ড কেন্ডরিক দেখিয়েছেন, রোম শব্দটির অর্থ মানুষ। একটি ইংরেজি অভিধানে ডোম সম্পর্কে লেখা আছে—
…a very low caste, representing some old aboriginal race, spread all over India. They perform such offices as carrying dead bodies, removing carrion, and so on. (Hancock, Ian, 1995, A Handbook of Vlax Romani p.19)
ভারতীয় ডোমরা ঐতিহাসিকভাবে একটি যাযাবর বর্ণ, এরা কোনো জাতি নয়। এই বর্ণগোষ্ঠীতে বিভিন্ন জাতি-ধর্মের সদস্য ছিল। তাদের পেশা ছিল গান গাওয়া ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক কসরত দেখানো। ধারণা করা হয় এই গোষ্ঠী ভারতে বেশ আগে থেকেই আছে। একসময় এই গোষ্ঠীতে হিন্দুদের সঙ্গে সঙ্গে অনেক মুসলমানের আগমন ঘটে। উপরন্তু, ডোমদের পেশার মধ্যে আছে কামার, সংগীতশিল্পী, ফেরিওয়ালা ও কৃষক। ভারতে ডোম শব্দটি ঠিক কী অর্থে ব্যবহূত হতো, তা শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলাটা কঠিন। ডোমবাদের নিজস্ব ভাষা আছে এবং এটা রোমানিদের ভাষার মতো সংস্কৃতনির্ভর নয়। ডোমদের নিজস্ব ধর্ম আছে। এটা বলা অবশ্যই অসঙ্গত হবে না যে, গজনবীদের সেনাছাউনিতে আরো অসংখ্য জাতি-বর্ণের মধ্যে ডোমরাও ছিল। এ ডোমরা হয়তো সেই সামরিক লিংগুয়া ফ্রাংকা গ্রহণ করে নিয়েছিল।
সমস্যাটা রয়ে যায় রোম শব্দ নিয়ে। ধারণা করা হয়, রোমানিদের রোম শব্দটি এসেছে ডোম থেকে। যদিও ডোম শব্দের মূল অর্থ এবং রোমানির উদ্ভবে এর ভূমিকা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। সামনের দিনে হয়তো এসব রহস্যের অনেক ভালো ব্যাখ্যা আবিষ্কৃত হবে। এখানে অবশ্য আরেকটি ধারণার কথা উল্লেখ করা যায়, অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, রোম শব্দটি এসেছে রোমিতি থেকে। রোম বা রউম সালতানাতে বসবাসকারীদের রোমিতি বলা হতো। অন্যদিকে এখন পর্যন্ত লব্ধ জ্ঞানে ‘রোম’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে স্বামী বা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। ভারতীয় ডোমের সঙ্গে এ অর্থ মেলে না।
অ-রোমানি বিশেষজ্ঞদের একটি দল রোমানিদের উৎস খুঁজেছে ভারতের তথাকথিত জিপসি সম্প্রদায়ের মধ্যে, যেমন— পাঞ্জাবের সানসিস ও সিকলিগার। কিন্তু এখানে মনে রাখা দরকার, ১৯ শতকে ব্রিটিশ শাসকরা আবিষ্কারের আগে ভারতে কোনো জিপসি সম্প্রদায় ছিল না। ঐতিহাসিকভাবে ভারতে অনেক যাযাবর বণিক ও পেশাজীবী গোষ্ঠী থাকলেও জিপসিরা হচ্ছে ব্রিটিশদের আবিষ্কার। ব্রিটিশরা ভারতে বিভিন্ন যাযাবর গোষ্ঠীকে ‘জিপসি ক্রিমিনাল ট্রাইবস’ নামে শ্রেণীভুক্ত করেছিল। ব্রিটিশ শাসকদের এ জিপসি নামকরণের একটা কৌতূহলোদ্দীপক ও তাত্পর্যপূর্ণ কারণ আছে। ইউরোপ বা ব্রিটেনের রোমানিরা অনেক সময় কৃষি খামার থেকে টুকটাক চুরি করে। এই স্বভাব ভারতের যাযাবর গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ছিল, তাই ব্রিটিশরা এমন নামকরণ করেছিল বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। তবে এখানে আরেকটি জরুরি সত্য লুকিয়ে আছে, সেটা হলো ব্রিটিশরা পুরো ভারতকেই লুটে নিচ্ছিল। এই বিষয়টি স্পষ্ট হয় রোমানিদের মধ্যে প্রচলিত একটি প্রবচনে-“O Rrom chorel e khaini, o Gazho chorel e ferma” অর্থ- রোমানি চুরি করে একটি মুরগি আর অ-রোমানি চুরি করে পুরো খামার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে ইংরেজদের তথাকথিত ‘জিপসি ক্রিমিনাল ট্রাইবস’কে সাধারণ যাযাবর হিসেবে নতুনভাবে শ্রেণীকরণ করা হয়।
আজকের দিনে ঐতিহ্যধারণকারী রোমারা কঠোরভাবে একটি জীবনবিধি মেনে চলে, যা মাহরিম নামে পরিচিত। তবে রোমানিদের আরো দুটি দল আছে— উজহো বা পরিষ্কার, মেলালো বা নোংরা। আর মাহরিম বলতে বোঝায় দূষিত/ট্যাবু। কট্টর রোমানিরা নিজেদেরকে বিশুদ্ধ বর্ণ এবং অন্য সবাইকে দূষিত বিবেচনা করে। এই গোত্রে যদি কেউ পতিতাবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তাকে দল ছাড়া করা হয়। নিজেদের গোত্রের বাইরে অন্যদের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষেত্রে রোমারা যথেষ্ট সতর্ক। বহিরাগতকে এরা বলে গাদজো বা গাদঝো। ভাষাতাত্ত্বিকরা এই শব্দের উৎস খুঁজে পান সংস্কৃত ‘গারহায়া’তে। এ শব্দ থেকেই নীচু বর্ণের কাউকে বলা হয় গাজহা। পাঞ্জাবের যাযাবর গোষ্ঠী ‘গাজ্জা’ বলতে বোঝায় কৃষক। রোমারা নিজেদের উঁচু বর্ণের মানুষ মনে করে এবং অন্যদের বলে গাদজো, যার উৎস গাজহা বা গাজ্জা।
এই ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞরা একটা বিষয় নিয়ে খুবই আগ্রহী, সেটা হলো হাজার বছরের এই ডায়াস্পোরায় কত ভারতীয় শব্দ হারিয়ে গেছে এবং অ-ভারতীয় শব্দ যুক্ত হয়েছে। প্রায় ৩০০ বছর ধরে অ-রোমানি বিশেষজ্ঞ এবং জিপসিলরিস্টদের ভুল গবেষণা রোমানিদের ইতিহাসচর্চাকে পিছিয়ে দিয়েছে। তবে শেষমেশ এখন রোমানি কিংবা অ-রোমানি সবাই রোমাদের ভারতীয় উৎসকে বিবেচনায় নিয়ে গবেষণা করছেন। ফলে সংশ্লিষ্টদের আশাবাদ ধীরে হলেও এবার রোমাদের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উন্মোচিত হবে।
তথ্যসূত্র :
আ নিউ লুক অ্যাট আওয়ার রোমানি অরিজিনস অ্যান্ড ডায়াস্পোরা, রোনাল্ড লি
অ্যানালস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিজ অব রাজস্থান অর দ্য সেন্ট্রাল অ্যান্ড ওয়েস্টার্ন রাজপুত স্টেটস অব ইন্ডিয়া, জেমস টড
জিপসিজ ইন অটোমান এম্পায়ার, এলানা অ্যান্ড ভ্যাসেলিন






