তিনি আধুনিক পদ্ধতিনির্ভর জ্ঞানচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মোহর মারা ইতিহাসবিদ কিংবা প্রত্নতত্ত্ববিদ—কোনোটাই নন। কিন্তু তার মৃত্যুর বহু বছর পরও এখনো ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে আলোচনায় যেকোনো বিশেষজ্ঞকে তার পদচ্ছাপ অনুসরণ করতে হয়, তার লেখা থেকে সাইটেশনও দিতে হয়। অলেকজান্ডার কানিংহাম—ছিলেন ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা। ভারতবর্ষে সেনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় স্বভাবতই ঘুরেছেন অনেক জায়গা। নিজের কাজের বাইরে প্রাচীন ভারতের যে রহস্য সর্বত্র ধুলোয় ঢাকা পড়েছিল তার প্রতি অমোঘ আকর্ষণ জন্মেছিল কানিংহামের মনে। এ আকর্ষণ আর প্রতিভা তাকে ‘ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বের জনক’ পরিচয়ে ইতিহাসের মঞ্চে স্থান করে দিয়েছে।

ভারতের অতীতের নিদর্শনের যে নামগুলো বিশ্ববাসীকে চমকে দেয় তার মধ্যে অনেকগুলোর শনাক্ত ও খননে পথপ্রদর্শক ছিলেন এ ব্রিটিশ সেনা। হরপ্পায় প্রথম খননটি তিনিই শুরু করেছিলেন। সাঁচী ও সারনাথের মতো বিখ্যাত বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্রে তিনিই প্রথম জরিপ ও খননকার্য সূচনা করেন। ১৮৫১ সালে বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে থাকা সাঁচী স্তূপ ও সংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন স্থাপনাকে জরিপের মাধ্যমে শনাক্ত করেন। তক্ষশীলা নগরীর সঠিক অবস্থান তিনিই নির্ণয় করেন। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে মহাজনপদ আমলে মাদ্রাজের রাজধানী ওরনোস তিনি আবিষ্কার করেন। কানিংহাম এমন সব খোদাইচিত্র, মুদ্রা ও ভাস্কর্যকে লোকচক্ষুর সামনে এনেছেন, যেগুলো আগে কখনো বিদ্যাচর্চায় মনোযোগ পায়নি।

কানিংহাম ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ছিলেন ২৮ বছর। অবসরে গিয়েছেন মেজর জেনারেল পদ থেকে। ৪৭ বছর বয়সে সেনাজীবনকে বিদায় জানিয়ে নেমে পড়েন ইতিহাসের সন্ধানে। মাটি খুঁড়ে তুলে আনেন ভারতবর্ষের সবচেয়ে আলোচিত বেশকিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ১৮৬১ সালে তার আগ্রহে প্রতিষ্ঠিত হয় আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া। তিনি এ প্রতিষ্ঠানের প্রথম ডিরেক্টর-জেনারেল।

কানিংহামের জীবন নানা নাটকীয়তায় পূর্ণ। জন্ম ১৮১৪ সালের ২৩ জানুয়ারি লন্ডনে। তার পিতা ছিলেন একজন কবি। কানিংহাম মাত্র ১৯ বছর বয়সে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার্স বিভাগে যোগ দিয়ে ভারতে পা রাখেন। ১৮৩৩ সালে কলকাতায় আসার পর তার সাক্ষাৎ হয়েছিল জেমস প্রিন্সেপের সঙ্গে। আর প্রিন্সেপের সঙ্গে মোলাকাত তার জীবনকে বদলে দেয়। জেমস প্রিন্সেপ নিজে খরোষ্ঠী ও ব্রাহ্মী লিপির মর্মোদ্ধার করে আলোড়ন তৈরি করেছিলেন। তরুণ কানিংহাম প্রাচীন ভারতের প্রতি কৌতূহলী হয়ে ওঠার পেছনে বেশ গভীর প্রভাব ছিল প্রিন্সেপের।

সেনাজীবনে কানিংহাম পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে ঘুরেছেন ভারতের বহু প্রান্ত। ১৮৪৩ সালে গোয়ালিয়র অভিজানের অংশ হিসেবে পুনিয়ার যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছেন। প্রথম অ্যাংলো-শিখ যুদ্ধের পর সীমানা নির্ধারণে যে কমিশন হয়েছিল তার সদস্য ছিলেন কানিংহাম। এ সীমানা নির্ধারণের কাজে তিনি আগেও যুক্ত হয়েছিলেন। কাশ্মীরে কিংবা লাদাখ-তিব্বত সীমান্ত নির্ধারণেও তিনি কাজ করেছেন। এসব কাজ করতে গিয়ে তিনি অসংখ্য প্রাচীন স্থাপনা দেখেছেন। অন্যদিকে এ জরিপ বিদ্যা তাকে পরবর্তী জীবনে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপেও সহায়তা করেছে। তার প্রথম সিরিয়াস অ্যাকাডেমিক কাজ ছিল ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত এসে অন দি আরিয়ান অর্ডার অব আর্কিটেকচার।

অর্থাৎ প্রাচীন ভারতের প্রতি তার আকর্ষণ সামরিক জীবনেও তাকে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে দূরে রাখতে পারেনি। ১৮৩৭ সালে বিখ্যাত বৌদ্ধ কেন্দ্র সারনাথে কর্নেল মিজলের সঙ্গে খননকাজে যুক্ত হন। ১৮৪২ সালে তিনি সংকাশ্য নগরে খনন চালান। ১৮৫১-তে তিনি সাঁচীর বৌদ্ধ স্তূপে খনন শুরু করেন।

এসব খনন, গবেষণার ফলাফল নিয়ে কানিংহাম ১৮৫৪ সালে প্রকাশ করেন ৩৬৮ পৃষ্ঠার বই দ্য বিলসা টোপস, এতে ছিল তার করা ৩২টি মানচিত্র ও প্রতিকৃতি। এখনো ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ববিদরা এ গ্রন্থটির শরনাপন্ন হন।

১৮৪৮ সালে কানিংহাম ছিলেন বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার্সের তরুণ সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট। সে সময় তিনি জেমস প্রিন্সেপের সঙ্গে মিলে ইন্ডিয়ান আর্কিওলজিকাল সার্ভের খসড়া পরিকল্পনা করেন। এটি ব্রিটিশ সরকারের সামনে পেশ করা হয়। কিন্তু কোনো সাফল্য আসেনি। পরবর্তী সময়ে প্রত্নতত্ত্ব ও সংরক্ষণ নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে সরকারের ওপর চাপ আসে এবং এসব কাজে বরাদ্দ দেয়া হয়।

১৮৪৪ সালে গভর্নর-জেনারেল জন লর্ড হার্ডিঞ্জ। প্রাচীন ভারতের ওপর গবেষণা প্রস্তাব অনুমোদনে তিনি একটি ব্যবস্থা সচল করেন। কিন্তু ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে এ উদ্যোগ স্থবির হয়ে যায়।

১৮৬১ সালটি ছিল কানিংহামের জীবনে বেশ নাটকীয়। আর্কিওলজিকাল সার্ভে প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতা তাকে কষ্ট দিয়েছিল। সে বছর সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে চলে গেলেন বিলেতে। এর পরই ব্রিটিশ সরকার আর্কিওলজিকাল সার্ভেয়ারের পদ অনুমোদন করে কানিংহামকে সে পদে নিয়োগ দেয়। তবে অর্থ বা লোকবল বরাদ্দ বলতে তেমন কিছু ছিল না। কানিংহাম অবশ দমে যাওয়ার মানুষ নন। তিনি চৈনিক ভিক্ষু হিউয়েন সাং ও ফা হিয়েনের নিবিষ্ট ছাত্র ছিলেন। তাদের ভ্রমণ বিবরণী তিনি মন দিয়ে পড়েছেন। সিদ্ধান্ত নিলেন হিউয়েন সাংয়ের বিবরণী পথ ধরে তার উল্লেখ করা সব স্থাপনা শনাক্ত করবেন। অনুসরণ করলেন ফা হিয়েনের পথও।

কানিংহামের পথ তখনো অনেক বাকি। তিনি শনাক্ত করলেন প্রাচীন নগরী—ওরনোজ, তক্ষশীলা, বৈরাট, সংকাশ্য, শ্রাবস্তী, কৌসাম্বী, বৈশালী, নালন্দা। তক্ষশীলায় প্রথম খননকার্য তিনিই চালিয়েছিলেন। স্যার জন মার্শালের কাজ ছিল তারই ধারাবাহিকতা।

প্রাচীন রচনায় উল্লেখিত স্থান ও স্থাপনা শনাক্ত করার নেশা ছিল কানিংহামের। তিনি বিস্তির্ণ অঞ্চলজুড়ে কষ্টসাধ্য জরিপ চালিয়ে অসংখ্য বৌদ্ধ স্থাপনা শনাক্ত করেন। ১৮৬১-১৮৬৫ সময়কালে কানিংহাম এমন জরিপ চালিয়েছিলেন। এরপর সরকারি বরাদ্দের অভাবে তার কাজ থেমে যায়। পরে লর্ড মায়োর আমলে আবার বরাদ্দ পেলে কানিংহাম নতুন নতুন এলাকায় কাজ করেন।

কানিংহাম তার কর্মজীবনে এএসআইয়ের ১১ খণ্ড প্রতিবেদন রচনা করেছেন এবং সম্পাদনা করেছেন ২৩ খণ্ডের। ১৮৮৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি অবসর নেন। ফিরে যান লন্ডনে। অবসর জীবনের নিজের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও প্রাচীন মুদ্রার ওপর বই লিখেছেন।

জার্নাল অব এশিয়াটিক সোসাইটি ও নুমিসম্যাটিক ক্রনিকল-এ তার অসংখ্য প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। কর্মজীবনে পেয়েছেন অনেক সম্মাননা—১৮৭০ সালে অর্ডার অব দ্য স্টার অব ইন্ডিয়া, ১৮৭৮ সালে কমান্ডার অব দি ইন্ডিয়ান এম্পায়ার। ১৮৮৭ সালে তাকে নাইট কমান্ডার অব দি অর্ডার অব দি ইন্ডিয়ান এম্পায়ার এ ভূষিত করা হয়।

১৮৯৩ সালের ২৮ নভেম্বর স্যার আলেকজান্ডার কানিংহামের কর্মচঞ্চল, কৌতূহলী জীবনের অবসান হয়। প্রাচীন ভারতে ইতিহাস ও প্রত্নচর্চায় তিনি কিংবদন্তি নাম। আধুনিককালে বিদ্যায়তনের গবেষকরা তার কাজের অনেক সীমাবদ্ধতা খুঁজে বের করেছেন। কিন্তু ‘সেলফ মেড’ এ অনুসন্ধিত্সু মানুষটি যে আগ্রহ আর কৌতূহল নিয়ে শত প্রতিকূলতা পায়ে দলে অতীতের যা যাত্রা করেছেন তা অসামান্য। অনেকে বলেন তিনি প্রাচীন ভারতের দরজা খুলে দিয়েছিলেন।

 

এসএম রশিদ: লেখক