ভারতীয় উপমহাদেশে প্রত্নতত্ত্বচর্চার ‘গুরু’ আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮৭৯ সালের শেষার্ধ থেকে ১৮৮০-এর প্রথমার্ধজুড়ে বিহার থেকে বাংলা মুলুকের একাংশ রীতিমতো ঢুঁড়ে বেড়িয়েছিলেন। না,  স্রেফ ভ্রমণ নয়, বরং প্রায় একটি পূর্ণ শীতকাল ধরে চলা তার ওই পরিশ্রমসাধ্য সফর আদতে ছিল এক ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রসমীক্ষা। বাংলার (এবং বিহারের) প্রত্নসম্পদ ও ঐতিহাসিক নানা নিদর্শন তিনি নিজের চোখে জরিপ করেছেন, বিস্তারিত আকারে টুকে নিয়েছেন সেসবের খুঁটিনাটি। সফর থেকে পাওয়া বহু তথ্য ও অভিজ্ঞতা জড়ো করে দ্রুতই কানিংহাম এক সুচারু প্রতিবেদন রচনা করলেন। যার শিরোনাম ছিল রিপোর্ট অব আ ট্যুর ইন বিহার অ্যান্ড বেঙ্গল ১৮৭৯-১৮৮০: ফ্রম পাটনা টু সোনারগাঁও (পরে শুধু বেঙ্গল রিপোর্ট বলে উল্লেখ করা হবে)। ১৮৮২ সালে ইংরেজ রাজ সরকারের ছাপাখানা বিভাগের প্রধান অধ্যক্ষের কলকাতার দপ্তর থেকে তা ছেপে বেরোয়।

কানিংহামের বাংলা মুলুক পরিদর্শনের এ বিবরণের ভূমিকায় খানিক চোখ বোলালে চমকে যেতে হয়। কারণ, তিনি সে কালের পূর্ববঙ্গের ভূগোল-ইতিহাসের স্বাতন্ত্র্যের কথা পূর্বোক্ত ভূমিকার শেষাংশে বেশ জোর দিয়ে লিখে গেছেন। তার বাংলা ভ্রমণের উদ্দেশ্য প্রধানত ছিল গৌড় ও পাণ্ডুয়ার ইসলামী ঘরানার বহুখ্যাত স্থাপনাগুলোকে খুঁটিয়ে দেখা; কিন্তু তা সত্ত্বেও পূর্ববঙ্গের টান উপেক্ষা করতে তিনি পারেননি। পূর্ববঙ্গ যে তখনকার বাংলা প্রদেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে ভীষণভাবে আলাদা এবং তার ভূপ্রকৃতি নিয়ত পরিবর্তনশীল তা কানিংহামের নজরে এসেছিল: “পূর্ববঙ্গ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য [ভূপ্রকৃতির] বিরাট পরিবর্তনের জন্য, যে বদল কিনা ঘটেছে এর প্রধান দুই নদী গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের গতিপথে। অতীতকালে পুরো বিক্রমপুর জেলাই ছিল গঙ্গার দক্ষিণমুখো হয়ে—নদীর ওই অংশকে ডাকা হতো ‘কীর্তিনাশা’ নামে, বা [ইংরেজিতে] ফেইম ডেস্ট্রয়ার। সেই কীর্তিনাশা এখন বয় দক্ষিণ থেকে বহু দূরে, সম্পূর্ণ নতুন এক গতিপথে। এ বদল ঘটবার আগে ঢাকা ও সোনারগাঁও—এ দুই বৃহদাকৃতির শহর ছিল গঙ্গার বেশ কাছে। সাবেক রাজধানী ঢাকা এখনো বেশ বড় এক শহর। কেননা তা এ এলাকার বেসামরিক প্রশাসনের সদর দপ্তর। কিন্তু শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত প্রতিবেশী শহর নারায়ণগঞ্জের ক্রমবর্ধমান শ্রীবৃদ্ধির কারণে ঢাকার বাণিজ্যিক গুরুত্ব দিনে দিনে ক্ষীয়মাণ হচ্ছে। যে সোনারগাঁও এককালে পূর্ববঙ্গের রাজধানী ছিল, তা এখন নিছক ঘন জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটি অজপাড়াগাঁ। তার ওপর সেখানে যাওয়া যায় শুধুমাত্র একটি ক্ষুদ্র খাল বেয়ে—যা কিনা এক সময় মেঘনা নদীর খাত ছিল।”

বেঙ্গল রিপোর্ট-এর ভূমিকার এই এক অনুচ্ছেদ পড়েই বোঝা যায়, পূর্ববঙ্গের অতীত ইতিহাস ও ভূগোলের খুঁটিনাটি খোঁজখবর সেখানে পা দেয়ার আগে থেকেই কানিংহাম রাখতেন। অতীত ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের সরেজমিন অভিজ্ঞতা মেলানোর পর তিনি দুঃখের সঙ্গে দেখেছেন একদা সমৃদ্ধ সোনারগাঁওয়ের চরম অধঃপতন ও ঢাকার স্থবির কিংবা জড়পাথর দশা। তবে উনিশ শতকের শেষার্ধে নারায়ণগঞ্জ বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার বিষয়টি তার মনে আশা জাগিয়েছিল। আর এও তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, নদীকে না বুঝলে পূর্ববঙ্গকেও পুরো বোঝা যাবে না; নদীই এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য ফেরায় বা ডোবায়।

সেকালের পূর্ববঙ্গ সফরের ওপর ভিত্তি করে লেখা কানিংহামের রিপোর্ট মুখ্যত বিভিন্ন জেলার ঐতিহাসিক স্থাপনা ও পুরাকীর্তির জরিপনির্ভর বিবরণ। তা সত্ত্বেও মাঝেমধ্যেই তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ঝলক সেখানে দেখা যায়। বেঙ্গল রিপোর্ট-এর মূল অংশে পূর্ববঙ্গের যে জায়গাটির উল্লেখ প্রথম পাই, সেটি হলো আজকের জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল (তখন গৌড়ের অংশ ছিল বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা, তাই এর কথা বাদ দিচ্ছি; বস্তুত কানিংহামের দেখা চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিবরণ নিয়ে আলাদা লেখাই হতে পারে), ‘ক্ষেতলাল একটি বৃহৎ আকারে গ্রাম ও পুলিশ স্টেশন। দিনাজপুর থেকে বগুড়ার দিকে যে বড় রাস্তাটি গেছে তার পাশেই অবস্থিত।...যা হোক, এর নাম কিন্তু কোনো মানচিত্রে পাওয়া যায় না।...জায়গাটি নিঃসন্দেহে প্রাচীন, কারণ এখানে একাধিক ইটের ভবনের ধ্বংসাবশেষ ও অনেক চমত্কার জলাধারের দেখা মেলে। পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য ভাস্কর্য।...’ এরপর ক্ষেতলাল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে ৩০ মাইল এগিয়ে নাগর নদের পূর্বতীরে ‘বিহার’ নামের একটি গ্রামের দেখা পাবার কথা জানিয়েছেন কানিংহাম। এ গ্রামের বিশাল জলাধারের উত্তর প্রান্তে তিনি দেখতে পান ইটের তৈরি এক ভবনের বিরাট ধ্বংসাবশেষ, যা কিনা লম্বায় ৭০০ ও চওড়ায় ৬০০ ফিটের কম নয়। জলাধারের পশ্চিম প্রান্তে আবার দেখা পান ‘চৌধুরাণী’র বাড়ির, যিনি কিনা এ গ্রামের সাবেক জমিদারের স্ত্রী। কানিংহাম লিখেছেন,  ‘[চৌধুরাণীই] বিহার ও মহাস্থানের সমস্ত জমির মালকিন।...’ বিহার গ্রামে একাধিক ঐতিহাসিক স্থাপনার অবশিষ্টাংশের দেখা পেয়ে কানিংহাম চমকিত হয়েছিলেন। পরে বিহার গ্রামের উত্তরে গিয়ে দেখা পান ‘বাসু-বিহার’ গ্রামের, সেখানে থাকা ঘন জঙ্গলে ঢাকা পড়া ৩০ ফুট উঁচু এক ভগ্ন স্থাপনার চিহ্ন ও বৃহদাকৃতির জলাধার ‘রাজা শশাঙ্কের দীঘি’-এর বিবরণ বেঙ্গল রিপোর্ট-এ উঠে এসেছে।  কিন্তু এও হতাশার সঙ্গে কানিংহাম খেয়াল করেন, ওই দুই গ্রামের ‘স্থানীয় মানুষজন এইসব [ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর] ধ্বংসাবেশষ সম্পর্কে কিছুই জানে না, এবং এমনকি তাদের মধ্যে এগুলোকে আপন বলে ভাববার কোনো ঐতিহ্যও নেই।...’কানিংহাম দীর্ঘ বিবরণ দিয়েছেন বগুড়ার মহাস্থানগড়েরও। মহাস্থানগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক বিবরণ তো তিনি দিয়েছেন, পাশাপাশি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সঙ্গে যুক্ত লোকাচার ও মিথের বর্ণনাও নিপুণভাবে উপস্থাপনে ত্রুটি রাখেননি। সেখান থেকে তিনি যান হালের নওগাঁর বদলগাছি উপজেরার পাহাড়পুর বা সোমপুর বিহার দেখতে। ফ্রান্সিস বুখানন পাহাড়পুরের বিহারের ধ্বংসাবশেষের যে মাপ নিয়েছিলেন, তা নিয়ে কানিংহাম নিজের খটকার কথা এখানে জানিয়েছেন। বুখানন লিখেছিলেন, পাহাড়পুর বিহারের উচ্চতা ১০০ থেকে ১৫০ ফিটের কম নয়; কিন্তু কানিংহাম বলেছেন, ‘আমার নেওয়া মাপ অনুযায়ী ভূমি থেকে এর উচ্চ কোনোভাবেই ৮০ ফিটের অধিক নয়।’ পাহাড়পুরে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চালানোর জন্য বেশ কজন দক্ষ মজুরকে সঙ্গে নিয়েছিলেন কানিংহাম। কিন্তু তাদের নিয়ে নিজের তাঁবুতে ফিরে তিনি দেখেন—বলিহারের স্থানীয় জমিদার ও পাহাড়পুর বিহার এবং তত্সংলগ্ন এলাকার জমির মালিক রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের এক প্রতিনিধি হাজির। তিনি কানিংহামকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাদের জিম্মায় থাকা জমিতে কোনো রকমের খোঁড়াখুঁড়ি করা নিষিদ্ধ।  অগত্যা আর উপায় না দেখে মজুরদের তিনি বিহারের উপরিভাগ থেকে জঙ্গল ও আবর্জনা সরানোর কাজে নামিয়ে দেন, অন্তত যতটা সাফ করা যায়—তারা ওইটুকুই করুক। সাফসুতরোর কাজ শেষ হওয়ার ওপর বিহারের দৃশ্যমান অংশ কানিংহাম খুঁটিয়ে দেখেছিলেন। এমনকি লুকিয়ে-চুরিয়ে সেখানে কিছু ‘হালকা খননকার্যও’ চালিয়েছিলেন।

ঢাকার বয়স খুব বেশি নয়, এ কথা নিয়ে কানিংহামের মনে সংশয় ছিল। বেঙ্গল রিপোর্ট-এর ঢাকা অংশের গোড়াতেই তাই তিনি লেখেন, ‘...অনেক লেখকই ঢাকাকে অপেক্ষাকৃত নবীন শহর বলে মনে করেন। কিন্তু বুড়িগঙ্গার তীরে এর স্বচ্ছন্দ অবস্থান থেকে মনে হয়, এই নদী তার গতিপথ বদল করার বহু আগেই শহরটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এমনকি আমি এও মনে করি যে, ঢাকা টলেমি-কথিত “টুগমা মেট্রোপলিস”ও হতে পারে। কারণ ঢাকা বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর (ব্রহ্মপুত্রের একটি আদি খাত) সঙ্গমস্থলের খুব কাছেই অবস্থিত।...’ ‘বায়ান্ন বাজার ও তিপান্ন গলির’ ঢাকায় অতীতকালের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে একটিকেই তখন মোটামুটিভাবে ঠিকঠাক টিকে থাকতে দেখেছিলেন কানিংহাম, সেটি হলো শায়েস্তা খানের কন্যা পরী বিবির সমাধিসৌধ।

উল্লেখ্য, সেকালের অধিকাংশ ইংরেজ কর্তাব্যক্তি যেমন লিখতেন বা ‘সরকারি বানান’ অনুযায়ী যেভাবে লেখা হতো—সেই Dacca বানান লেখেননি কানিংহাম; তিনি বরাবরই লিখেছেন, Dhakka। তিনি কি মূলানুগ দেশীয় উচ্চারণকেই রাজ সরকারের ভাষিক অস্মিতার বিপরীতে গিয়ে মান্যতা দিতে চেয়েছিলেন?

ঢাকার পরে বিক্রমপুরের কথা উঠে এসেছে কানিংহামের বেঙ্গল রিপোর্ট-এ। শুরুতেই তিনি জানান ‘সমৃদ্ধশালী জেলা বিক্রমপুর’কে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে চারটি নদী, ‘পশ্চিমে ছোট্ট নদী ইছামতী, উত্তরে ধলেশ্বরী, পুবদিকে মেঘনা আর দক্ষিণে গঙ্গা।...’ বিক্রমপুরে সেন আমলের ঐতিহাসিক স্থাপনা খুঁজতে গিয়ে হতাশ হতে হয়েছিল কানিংহামকে। তিনি দেখেন, ‘সেন আমলের আদি রাজধানীর চিহ্ন হিসেবে শুধু টিকে আছে বল্লাল-বাড়ি, এর সংলগ্ন অগ্নিকুণ্ডসহ। আর আছে বিশাল আকারের রামপাল দীঘি। এখান থেকে উত্তরে একটু গেলেই দেখা মিলবে বাবা আদমের সমাধি ও মসজিদের, যিনি কিনা ছিলেন এ জেলার আদি মুসলিম শাসকদের অন্যতম।...’ রামপাল দীঘি দেখে কানিংহাম কি মুগ্ধ হয়েছিলেন? তার রিপোর্টে তেমন আভাস আবছা আবছা মেলে: ‘বল্লাল-বাড়ি থেকে দক্ষিণে আধা মাইল এগিয়ে আমার চোখে পড়া সবচেয়ে বড় ও চমত্কার জলাধারগুলোর একটির দেখা মেলে। এর নাম রামপাল দীঘি। দীঘিটি উত্তর থেকে দক্ষিণে ১৮০০ ফুট চওড়া, আর ৮০০ ফুট গভীর। দীঘির জল গভীর ও স্বচ্ছ এবং এর পাড়গুলো আদিকালের দীর্ঘকায় যত গাছে আচ্ছাদিত। এর উত্তর পাড়ে নাকি রাজ-দরবারের হাতিগুলোকে স্নান করানো হতো। দীঘির দক্ষিণপাড়ের জমি এখনো আদিকালের রাজাদের উত্তরপুরুষদের মালিকানায় রয়েছে।...’ রামপাল দীঘির পর কানিংহাম দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন বাবা আদমের সমাধিস্থল ও মসজিদের। ছয়টি গম্বুজের এ মসজিদটির স্থাপত্যশৈলীর বিস্তারিত ও এর নেপথ্য ইতিহাসের উল্লেখও রয়েছে বেঙ্গল রিপোর্ট-এ। তবে স্থাপত্যশৈলী ও ব্যবহূত নির্মাণ উপকরণ দেখে কানিংহামের মনে হয়েছিল, মসজিদটি বিক্রমপুরে প্রথম মুসলিম অভিযানের সময় নির্মিত হয়নি। সম্ভবত এর ভিত্তি প্রথম স্থাপিত হয় জালালউদ্দিন ফতেহ শাহর আমলে।

সোনারগাঁয়ের বিবরণ দেয়ার সময় এর পূর্বতন গৌরব ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে শহরটি যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল—সেই তথ্য বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন কানিংহাম। সুগম নৌ-যোগাযোগের ব্যবস্থা ও মেঘনা-ব্রহ্মপুত্রের মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর শাখায় অবস্থিত হওয়ায় ঢাকাকে ছাপিয়ে ১৫ মাইল পুবে থাকা সোনারগাঁ অতীতের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠতে পেরেছিল—এমনটাই তার অভিমত। তুলনায় তখনকার পরিপ্রেক্ষিতে খানিক নবীন পানাম নগরে গিয়ে তিনি বেশ মুশকিলে পড়েছিলেন; কারণ সেখানে পথগুলো এতই সরু ছিল, হাতির বহর নিয়ে চলাচল রীতিমতো অসাধ্য হয়ে পড়ে। কাদায় পড়ে গিয়ে তাদের বহরের একাধিক হাতি নাস্তানাবুদ হয়, চেঁচিয়ে তা জানান দেয় তখন। তবে পরে পানামের আশপাশের জঙ্গলের গাছপালা খেতে পেয়ে হস্তীদল বেশ সন্তুষ্ট হয়। পানাম থেকে এক মাইল দক্ষিণে, খানসানগর গ্রামের কাছাকাছি গিয়ে ৬০০ ফুট গভীর ও ১ হাজার ২০০ ফুট চওড়া এক দীঘির সন্ধানও পান কানিংহাম। যদিও সোনারগাঁয়ের মসলিনের কথা আগে বহুবার শুনেও সরেজমিন তার দেখা পাননি। লিখেছেন, শুধু মখমলের দেখা মেলে এখন। যাকে কিনা ‘গরিবের মসলিন’ বলা যায় চালু বুলিতে। আরো মর্মান্তিক যেটা, কাপড় বোনার জন্য সোনারগাঁর তাঁতিদের ভরসা করতে হয় বিলেত থেকে সুতার ওপর! সোনারগাঁর গৌরবময় ইতিহাসের মাত্র দুটি জিনিসেরই দেখা পেয়েছিলেন কানিংহাম, তা হলো আম আর পান—‘এখানকার আম এখনো খ্যাতি ছড়ায়। এদের মধ্যে সেরা হলো ‘শাহি-পছন্দ’ বা রাজার পছন্দসই আম...আর ‘সিন্দুরি’ বা লাল রঙের আম। আর [এখানে] পানের সেরা জাত হলো ‘কাফুরি পান’, এই পান থেকে কর্পূরের সুবাস আসে বলেই এমন নাম। খোদ লক্ষেৗ শহরে এর খুব চাহিদা রয়েছে বলে শোনা যায়। এছাড়া সোনারগাঁয়ের দইয়ের দারুণ খ্যাতিও বাংলার উত্তর-পূর্ব প্রান্তে আছে।...’

কানিংহামের বেঙ্গল রিপোর্ট-এ পূর্ববঙ্গের যে বিবরণ মেলে, তা নিছক কেতামাফিক তৈরি করা আর দশটা সরকারি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রতিবেদনের মতো নয়। কানিংহাম সরেজমিন এখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের বিবরণ যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি স্থানীয় ইতিহাসের নানা প্রসঙ্গও বাদ রাখেননি। পূর্ববঙ্গের আদি প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস রচনার জন্য তার এ প্রতিবেদন যেমন পাঠ করা জরুরি, তেমনি তা জেলাভিত্তিক বিবরণ রচনার ক্ষেত্রে অনেক কৌতূহলোদ্দীপক উপাদানেরও জোগান দিতে পারে। আজকের আধুনিক প্রত্নতত্ত্ববিদরা যেমনটি বলছেন, ঢাকার বয়স ৪০০ বছর নয়, বরং আরো অনেক বেশি; খেয়াল করলে দেখতে পাই, প্রায় দেড়শ বছর আগেই কানিংহাম তার বেঙ্গল রিপোর্ট-এ ঢাকার বয়স নিয়ে প্রায় একই রকম মন্তব্য করে গেছেন। একেই সম্ভবত বলে প্রকৃত প্রজ্ঞা।

 

মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক