লস্কর নামে জাহাজ শ্রমিকদের আলাদা একটা অংশ আছে সেটাই অনেকের জানা ছিল না। সেই লস্কররা আবার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, এ কথা জানার তো কথাই না। কিন্তু বাংলা থেকে জাহাজে গিয়ে কাজ করে যারা লস্কর হয়েছিল তাদের একটি অংশ যোগ দিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। কেবল যোগ দেয়াই নয়, যুদ্ধের ময়দানে তাদের অনেকের মৃত্যুও হয়েছিল। এমনিতে আরবি বা ফারসিতে লস্কর বলতে সেনাদল বোঝায়, কিন্তু উপমহাদেশের লস্কররা ছিল জাহাজ শ্রমিক। কিন্তু যুদ্ধের সময় তারা সৈনিকের মতোই যুদ্ধ করেছিল। যুদ্ধে মারা গিয়েছিল তাদের অনেকে। এ লস্করদের স্মৃতিতে কলকাতার নেপিয়ার রোডে ১৯২০ সালে নির্মিত হয়েছিল লস্কর মেমোরিয়াল। তবে কলকাতার এ স্মৃতিস্তম্ভের খবর অনেকেই জানেন না। সেখানে দর্শনার্থীরও ভিড় থাকে না।

পর্তুগিজরা ভারতে আসার পরপরই এখানে সমুদ্র বাণিজ্যে জোয়ার আসে। তার আগেও যে সমুদ্র বাণিজ্য হতো না এমন নয়। কিন্তু পর্তুগিজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় আসার পর তারা নিজেদের গরজে ব্যবসা বাড়ানো শুরু করে। এক্ষেত্রে তারা নিজেদের বাণিজ্য বাড়াতে সবসময়ই উদ্যোগী ছিল। কিন্তু ইউরোপ থেকে তো খুব বেশি নাবিক আসত না। এ কারণে দেশীয়দের মধ্য থেকে তারা জাহাজের শ্রমিক নেয়া শুরু করে। আবার অনেক সময় জোর করেও শ্রমিক তৈরি করা হতো। অপহরণের মাধ্যমে জাহাজে কাজে লাগানোর কথা আমাদের অজানা নয়। দাঁড় টানা থেকে শুরু করে জাহাজের অন্যান্য কাজ এ লস্কররা করত। ইংরেজ শাসনামলে রীতিমতো লস্কর নিয়োগ করা হতো। কাজের জন্য সেখানে যোগ দিত বহু ভারতীয়।

জাহাজে লস্কর হিসেবে যোগ দেয়া এসব ভারতীয়ের বেশির ভাগ আসত দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল থেকে। অর্থাৎ দক্ষিণ ভারত ও বাংলা থেকে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের এক হিসাব থেকে দেখা যায় সে সময় ইংরেজ জাহাজের লস্করদের ১৮ শতাংশ ছিল ভারতীয়। সংখ্যার হিসাবে তারা ছিল প্রায় ১২ হাজার। লস্করদের জীবন ছিল কঠিন, কাজ পরিশ্রমের। অনেক সময়ই জাহাজে করে ইংল্যান্ড যাওয়ার পর অনেক দিনের জন্য তাদের বেকার থাকতে হতো। জাহাজেও ছিল নানা কষ্ট। তবু এর মধ্যেও তারা জাহাজে যোগ দিত। এর মধ্যে কারো ছিল অ্যাডভেঞ্চারের নেশা। আবার কেউ কেউ বেকারত্ব ঘোচাতে এ কাজে যোগ দিত। কখনো আবার জাহাজের জীবন, দূরদেশের স্বপ্নও হাতছানি দিত।

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের সময়ে একটি সাধারণ দৃশ্য ছিল—লন্ডনের রাস্তায় পড়ে কিছু লোক শীতে কাঁপছে। খোঁজ নিলে জানা যেত এরা জাহাজের লস্কর। লন্ডন আসার পর তারা কোনো কাজ পায়নি। কিংবা যে জাহাজে করে এসেছিল তার মালিক এ লস্করদের চাকরিচ্যুত করেছে। হতে পারে সারেং বা ক্যাপ্টেনের সঙ্গে বিরোধের কারণে চাকরি খুইয়েছে কেউ। এরপর লন্ডনে এদের থাকার একটি ব্যবস্থা করা হয়। ১৮৫৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ওপর চাপ প্রয়োগ করে একটি লজিং তৈরি করা হয়েছিল। এর নাম ছিল ‘স্ট্রেঞ্জার্স হোম ফর এশিয়াটিকস, আফ্রিকানস অ্যান্ড সাউথ সি আইল্যান্ডারস’। লন্ডনের ডক এলাকায় তৈরি হয়েছিল এটি। আর এ বাসস্থানের জন্য প্রথম বড় অনুদান (৫০০ পাউন্ড) দিয়েছিলেন মহারাজা দিলীপ সিং।

প্রায় ভবঘুরে বা জাহাজে না খেয়ে শুকিয়ে মরা এ লস্কররা যোগ দিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ভারতের জন্য ভিন্ন অভিজ্ঞতা ছিল। বহু যুবকই যোগ দিয়েছিল সে যুদ্ধে। বাদ পড়েনি লস্কররাও। তারা যোগ দিয়েছিল রয়্যাল নেভি ও ব্রিটিশ মার্চেন্ট সার্ভিসে। সেখান থেকেই যোগ দিয়েছিল বিশ্বযুদ্ধে। লস্করদের এ ইতিহাস বিস্মৃতপ্রায়। কেননা লস্কররা যে যুদ্ধে গিয়েছিল সে বিষয়টিই চর্চিত নয়। তারা কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে যুক্ত হয়েছিল যুদ্ধে তা নিয়েও এ কারণে কোনো আলাপ নেই। কেবল এটা জানা যায় যে লস্কর মেমোরিয়াল স্মৃতিস্তম্ভটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মৃত ৮৯৬ জন লস্করের স্মরণে নির্মিত। এদের বেশির ভাগই ছিল অবিভক্ত বাংলা ও আসামের মানুষ।

ব্রিটিশ শাসনে আসা ভারতের মানুষেরা না চাইতেও জড়িয়ে গিয়েছিল কোম্পানি ও পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরাজের শাসনের সঙ্গে। কোম্পানির সিপাহিদের একটি বড় অংশ ছিল ভারতীয়। পরবর্তী সময়ে মহারানীর শাসনের অধীন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতেও ভারতীয় সৈন্যদের একটি বড় অংশগ্রহণ ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতীয়দের মধ্য থেকে নেয়া হয়েছিল রংরুট। বহু তরুণ সেনাদলে যোগ দিয়ে গমন করে যুদ্ধক্ষেত্রে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে স্থলযুদ্ধের সঙ্গে নৌপথে যুদ্ধ ও রসদ সরবরাহের সরাসরি যোগ ছিল। ফলে জাহাজের লস্কররা যুক্ত হয় যুদ্ধে। সে সংখ্যাটাও কম ছিল না। কেননা যুদ্ধে মৃতের সংখ্য ৮৯৬ ধরে স্মৃতিস্তম্ভ বানানো হয়েছে। বলার চেষ্টা করা হচ্ছে, মৃতের সংখ্যাই যদি ৮৯৬ জন হয়, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল আরো বেশি।

কলকাতার নেপিয়ার রোডে অবস্থিত স্মৃতিস্তম্ভটি ১০০ ফুট উঁচু। এতে তেমন কোনো স্থাপত্য কৌশল ব্যবহার করা হয়নি। স্তম্ভটি খুবই সাধারণ। তবে খুঁটিয়ে দেখলে এর মধ্যেই কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। দীর্ঘ স্তম্ভটিতে রয়েছে একটি গম্বুজ ও চারটি মিনার। এর মাধ্যমে স্তম্ভটিতে ইন্দো-মোগল স্থাপত্যরীতির পরিচয় পাওয়া যায়। মিনারগুলো আকারে খুবই ছোট। এগুলোকে প্রতীকী মিনার বললেও ভুল হয় না। স্তম্ভের চারদিকে জাহাজের আকৃতি খোদাই করার পাশাপাশি রয়েছে বারান্দার মতো প্রলম্বিত অংশ। স্মৃতিস্তম্ভটির নকশা করেছিলেন উইলিয়াম কেয়ার। তিনি ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন স্থপতি। একটি প্রতিযোগিতায় নকশা আহ্বান করা হয়েছিল। কেয়ারের নকশাটি সে প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হয় এবং তিনি ৫০০ রুপি পুরস্কার পেয়েছিলেন। ১৯২০ সালে শুরু হয়ে লস্কর মেমোরিয়ালের নির্মাণ শেষ হয় ১৯২৪ সালে। লর্ড লিটন এর উদ্বোধন করেছিলেন।

লস্কর মেমোরিয়ালের ভেতরে একটি প্রকোষ্ঠ রয়েছে। সেখানে দুটো ফলক দেখা যায়। একটিতে লেখা রয়েছে, This monument was erected by the shipping companies & mercantile community of calcutta to the memory of 896 seamen of Bengal Assam & upper India who lost their lives in the service of the British Empire in the great war of 1914-1918.

ভেতরের সোনালি দেয়ালে এর পাশেই আরেকটি ফলক রয়েছে। সে ফলকটিতে লেখা রয়েছে, Unveiled by his excellency Lord Lytton. Governor of Bengal on the 6th February 1924.

 

আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক