১৮৮৬ সাল, আগ্রার জেল সুপার জন টাইলার লন্ডনে সদ্যসমাপ্ত কলোনিয়াল ও ভারতীয় প্রদর্শনী শেষে আগ্রায় ফিরে এসেছেন। তার কাছে নির্দেশ রয়েছে রানী ভিক্টোরিয়ার স্কটিশ চাকর জন ব্রাউনের (১৮৮৩) মৃত্যুর পর রানী খুবই একাকী হয়ে পড়েছেন, তার দেখভালের জন্য নতুন লোক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে রানীর শাসনকালের সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানের আগেই প্রাসাদ কর্তৃপক্ষ মনে করছে, শুধু এ উদযাপনের জন্য হলেও এক-দুজন ভারতীয় চাকরকে লন্ডনে আনা প্রয়োজন। সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে ভারত থেকে আগত প্রিন্স ও প্রিন্সেসদের লন্ডনে সেবাযত্নের জন্যও ভারতীয় চাকরের প্রয়োজন। এসবের আলোকেই রানী জন টাইলারকে দায়িত্ব দিলেন অন্তত দুজন ভারতীয় চাকার যেন তিনি দ্রুতই লন্ডনে পাঠান। টাইলার যাচাই-বাছাই করে দুজন সেবক নির্বাচন করলেন, তাদের একজন তার অতি পুরনো ও বিশ্বস্ত সেবক ২৪ বছর বয়সী আবদুল করিম, আর অন্যজন হলেন টাইলারের আরেক পরিচিত ভৃত্য মোহাম্মদ বক্স। নিয়োগ পাওয়ার পর দুজনই ১৮৮৭ সালের ২০ মে জাহাজে চেপে ভারতবর্ষ থেকে ইংল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা দিয়ে যথাসময়ে ইংল্যান্ড পৌঁছান।

চাকরিতে যোগদানের এক বছরের মধ্যেই টাইলারের বিশ্বস্ত সেবক আবদুল করিম রানীর দরবারের বেশ প্রভাবশালী ব্যক্তিতেই পরিণত হলেন। যার কারণে শুধু খাসভৃত্যই নয়, করিমকে রানীর উর্দু ভাষার শিক্ষক, মুন্সী এবং ভারতীয় বিষয়ের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো। রানী ভিক্টোরিয়ার আগের খাসভৃত্য জন ব্রাউনের মৃত্যুর পর অনেকটাই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। আবদুল করিমের নিয়োগের মধ্য দিয়ে রানীর দেখভালের লোকের অভাব দূর হলো। পরবর্তীতে আবদুল করিমের সঙ্গে রানীর প্রগাঢ় সম্পর্ক রাজপরিবারের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্কটিশ জন ব্রাউনের সঙ্গে রানীর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পরিবারে অস্বস্তি থাকলেও, ভারতীয় আবদুল করিমের সঙ্গে ভিক্টোরিয়ার ঘনিষ্ঠতাকে রাজপরিবারের বেশির ভাগ সদস্য ভালোভাবে নেয়নি।

নিয়োগের পর যত দিন গড়িয়েছে, আবদুল করিম তত রানীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন: আবদুল রানীর জন্য ভারতীয় খাবার পরে যা ইংল্যান্ডে ইন্ডিয়ান কারি হিসেবে ব্যাপক প্রসিদ্ধি পায়; সেই কারি আবদুলই প্রথম রানীর জন্য নিয়মিত রান্না করতেন, এ ভারতীয় খাবার অল্প সময়ের মধ্যেই প্রাসাদের জনপ্রিয় ডিশে পরিণত হয়, আর আবদুল করিম রানীর হিন্দি ও উর্দু ভাষা শিক্ষক হওয়ায় খাসভৃত্য হলেও রানী তাকে মুন্সীজি (ওস্তাদজি) খেতাব দেন। আবদুলের প্রতি রানীর অন্ধত্ব এতটাই প্রবল ছিল যে, এ ভৃত্যকে তিনি প্রচুর অর্থ, জমি প্রদানের পাশাপাশি নাইট উপাধিও দিতে চেয়েছিলেন; রয়্যাল কোর্ট এ বিষয়ে তীব্র আপত্তি জানায়। তারা রানীকে বোঝান যে, একজন মুসলমান চাকরকে নাইট উপাধি প্রদান করলে ভারতের হিন্দু জনগোষ্ঠী বিষয়টিকে ভালোভাবে নেবে না; ফলে তাদের অসন্তোষ থেকে ভারতে হিন্দু-মুসলমান রায়টের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই রানী ভিক্টোরিয়ার একনিষ্ঠ অনুগত হিন্দু প্রজাদের মধ্যে রোষ দেখা দেয়, এমন কোনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া একেবারেই ঠিক হবে না। রয়্যাল কোর্টের এ বিরোধিতার মুখে রানী আবদুলকে নাইট উপাধি দেয়া থেকে পিছিয়ে আসেন।

আবদুলকে নিয়ে রাজপরিবারে এর পরও একের পর এক বিতর্ক দেখা দিয়েছে: ৭৮ বছর বয়স্ক রানী ১৮৯৭ সালের বাকিংহাম প্যালেসে রয়্যাল পার্টি টু নাইস অনুষ্ঠানে আবদুল করিমের যোগদানের ঘোষণা দিলে, অসন্তোষ জানিয়ে সভাসদদের অনেকেই এ অনুষ্ঠানে যেতে চাননি, কেউ কেউ পদত্যাগ করারও সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিলেন। (উল্লেখ্য, নথিতে জানা যায় এ সময় মুন্সীজি অর্থাত্ আবদুল করিমের যৌন রোগের চিকিত্সা চলছিল)।

আবদুলের অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার বিরুদ্ধচারীদের অসন্তোষের খবর রানীর কানে পৌঁছালে, তিনি খুবই ক্ষুব্ধ হন ও রাগে জিনিসপত্র ছুঁড়ে মারতে থাকেন। (সূত্র: স্টিফেন হালিডের দ্য গ্রেট স্টিংক অফ লন্ন— দ্য হিস্ট্রি প্রেস লি., ২০০১।

আবদুল করিম ও রানী ভিক্টোরিয়ার এ আন্তরিক ও হূদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়ে স্টিফেন হালিডের তার দ্য গ্রেট স্টিংক অব লন্ডন গ্রন্থে বেশ জোরালোভাবেই উল্লেখ করেন, ‘আমরা আমোদিত নই। কারণ এসব ঘটনা আরো আগেই মানুষের সামনে আসা উচিত ছিল।’

আরো পরে শ্রাবণী বসুর ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আবদুল বইটি প্রকাশ হলে রানী ভিক্টোরিয়ার খাসভৃত্য নিয়ে নতুন করে আবার বিতর্কের জন্ম হয়: বিবিসি হিস্ট্রি ম্যাগাজিন এ বিষয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবং সেখানে বিশাল শিরোনামে বলা হয়, ‘এই মনোমুগ্ধকর কাহিনী আরো আগেই বলা উচিত ছিল।’ বিবিসির এ প্রতিবেদনের পর ইংল্যান্ডে ভিক্টোরিয়া ও আবদুলের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয় এবং তখনই রানীর আগের ভৃত্য জন ব্রাউনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়েও নতুন তথ্য বেরিয়ে আসে। রানীর সঙ্গে জন ব্রাউনও যথেষ্ট অন্তরঙ্গ ছিলেন: জন ব্রাউনের ঔরসে রানী এক কন্যাসন্তানেরও জন্ম দিয়েছিলেন, যাকে গোপনে আমেরিকায় পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং সেখানেই সে বড় হয়।

কে এই আবদুল করিম
১৮৬৩ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের ঐতিহাসিক ঝাঁসি শহরে আবদুল করিমের জন্ম। তার পিতা হাজি মোহাম্মদ ওয়াজিরউদ্দিন ছিলেন স্থানীয় একটি সামরিক হাসপাতালের সহকারী। আবদুল করিমের বড় ভাইয়ের নাম ছিল আবদুল আজিজ, আর বোন ছিল চারজন। ছোটবেলাতেই গৃহশিক্ষকের কাছে আবদুল করিম ফার্সি ও উর্দু ভাষা   শেখেন এবং উঠতি বয়সেই করিম উত্তর ভারত ও আফগানিস্তান সফর করেন। করিমের পিতা ১৮৮০ সালে প্রথম অ্যাংলো-আফ্রিকান যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, যুদ্ধের পর তাকে ব্রিটিশ সরকার সিভিলিয়ান সার্ভিসে পদায়ন করে। এ সময় আবদুল করিম মধ্য প্রদেশের নওয়াবের অধীনে কাজ শুরু করেন। তিন বছর সেখানে কাজ করার পর চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে আগ্রায় ফিরে আসেন এবং আগ্রা জেলখানায় একজন (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ) কেরানি হিসেবে যোগদান করেন। করিমের পিতা এ সময় তার এক সহকর্মীর মেয়ের সঙ্গে করিমের বিয়ে দেন।

আগ্রা জেলে শাস্তিপ্রাপ্ত কয়েদিদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে কয়েদিদের দিয়ে কার্পেট বুনানো হতো। ১৮৮৬ সালে ৩৪ জন আসামিকে তাদের বোনা কার্পেট এক প্রদর্শনীতে প্রদর্শনের জন্য লন্ডনে পাঠানো হয়। ওই প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন রানী ভিক্টোরিয়া। করিম কয়েদি দলের সঙ্গে ইংল্যান্ডে আসেন জেল সুপার জন টাইলারের সহযোগী হিসেবে। তিনি এ সফরে দল ব্যবস্থাপনা ও অংশগ্রহণকারী কয়েদিদের আদব-কায়দা-সহবত শেখানোর দায়িত্বও পালন করেন।

 প্রদর্শনী চলার সময় টাইলার রানীকে দুটি স্বর্ণের ব্রেসলেট উপহার দেন। উল্লেখ্য, ভারতীয় স্বর্ণশিল্পীদের হাতে তৈরি এ ব্রেসলেট আবদুল করিমই পছন্দ করে কিনেছিলেন।

এর পরই রানীর কাছ থেকে টাইলারের কাছে ভারত থেকে দুজন সেবক নির্বাচন করে পাঠানোর নির্দেশ আসে। এ ধরনের কিছু ঘটতে পারে টাইলার যেন আগেই অনুমান করেছিলেন, তাই করিমকে দ্রুত ব্রিটিশ আদব-কায়দা ও ইংরেজিতে মোটামুটি দক্ষ করে ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দেন, সঙ্গে পাঠান আরেক সেবক মোহাম্মদ বক্সকে। ইংল্যান্ড যাওয়ার আগে মোহাম্মদ বক্সও এক ইংরেজ মেজর জেনারেলের বাসায় চাকর হিসেবে কাজ করতেন, এ যোগ্যতার কারণেই তাকে রয়্যাল কোর্টে পাঠানোর জন্য বিবেচনা করা হয়। মোহাম্মদ বক্স ইংলিশ জেনারেলের বাসায় কাজ করার সুবাদে ব্রিটিশ আদব-কায়দা সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন।

রাজকীয় সেবকের যাত্রাপথ
আবদুল করিম ট্রেনে করে আগ্রা থেকে মুম্বাই আসেন এবং তারপর জাহাজে চড়ে ব্রিটেনে পৌঁছান (১৮৮৭)। প্রাসাদে আসার পর তারা মেজর জেনারেল দেনেহির অধীনে দেয়া কাজ শুরু করেন।

সেখানে প্রাথমিক প্রশিক্ষণের পর (২৩ জুন ১৮৮৭ সালে) উইন্ডসর প্রাসাদে রানীকে প্রথম সকালের নাশতা পরিবেশন করেন করিম ও বক্স। এ দুজনের সঙ্গে প্রথম দিনের পরিচয় পর্বের বর্ণনা দিতে গিয়ে রানী তার ডায়েরিতে উল্লেখ করেন, অন্যজন (আবদুল করিম) ছিল অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং হালকা (মোহাম্মদ বক্সের চেয়ে), লম্বা এবং চেহারার মধ্যে ছিল দৃঢ়তা। তার বাবা ভারতের আগ্রা অঞ্চলের একজন স্থানীয় চিকিৎসক। দুজন ভৃত্যই আমার পায়ের পাতা চুম্বন করেছিল।’

পঞ্চম দিনের ঘটনা বর্ণনা করে রানী লেখেন: ভারতীয় দুজন এখন অপেক্ষা করে থাকে, কখন ডাক দেব, তারপর তারা খুব নীরবে কাজ করে।

৩ আগস্ট তিনি পুনরায় লেখেন: আমি দু-একটি হিন্দুস্থানি শব্দ শিখছি, যাতে করে আমার হিন্দুুস্থানি চাকরদের সঙ্গে কথা বলতে পারি। আসলে আমার কাছে এ ভারতীয় দুজন এবং তাদের ভাষা উভয়ই খুব কৌতূহলোদ্দীপক মনে হচ্ছে।

তবে ২০ আগস্টের আগ পর্যন্ত রানী ভিক্টোরিয়া সরাসরি তাদের সান্নিধ্য গ্রহণ করেন। এ কথা উল্লেখ করে তিনি তার রোজনামচায় লেখেন: একজন ভৃত্য কিছু অসাধারণ কাজ করেছে, এ অভিজ্ঞতা অতি চমত্কার।

৩০ আগস্ট থেকে করিম রানীকে উর্দু শেখাতে শুরু করেন, ওই বছরই ডিসেম্বরে রানী ভিক্টোরিয়া বারোদার মহারানী চিমনাবাইকে শুভেচ্ছা জানানোর সময় করিমকে সঙ্গী হিসেবে উপস্থিত রাখেন। এর পর যতই দিন গড়াতে থাকে, ভিক্টোরিয়া করিমকে এত বেশি পছন্দ করা শুরু করেন যে, তিনি আদেশ জারি করেন আবদুলকে যেন আরো ভালো করে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করা হয়। ভিক্টোরিয়ার ডায়েরির নোট থেকেই জানা যায় ফেব্রুয়ারি (১৮৮৮) সালের মধ্যেই করিম ইংরেজিতে যথেষ্ট পারদর্শী হয়ে ওঠে। ইংরেজিতে পারদর্শী হয়ে ওঠার পরই করিম নিজের পদোন্নতির জন্য রানীর কাছে আর্জি জানান। আর্জিতে তিনি বলেন, ভারতেই সে একজন কেরানি হিসেবে কাজ করেছে, এখানে এসে তাকে ভৃত্যের কাজ করতে হচ্ছে, এটা তার জন্য সম্মানজনক নয়, আর ব্রিটিশ পদবিতে ভৃত্যের সামাজিক মর্যাদা ক্লার্কের যথেষ্ট নিচে।

আর্জি পেশের পর, আগস্ট মাসে রানী তাকে মুন্সী পদবিতে উন্নীত করেন। রানী তার ডায়েরিতে উল্লেখ করেন: আমি ওকে পদোন্নতি দিয়েছি, কারণ ও চাকরি ছেড়ে চলে যাক তা চাই না। আমি চাই ও এখানে থাকুক, কারণ ও অন্যান্য কাজের পাশাপাশি আমাকে হিন্দি শিখতে সাহায্য করছে, আর ও খুবই বুদ্ধিমান, ওকে দিয়ে অনেক কাজ করানো যায়।

এই আদেশের পর রানীর ওয়েটার বা ভৃত্য হিসেবে করিমের যেসব আলোকচিত্র ছিল, তা ধ্বংস করে ফেলা হয়। এবং করিমই ছিলেন প্রথম ভারতীয়, যিনি রানীর কেরানি বা মুন্সী পদে উন্নীত হতে পেরেছিলেন।

আবদুল করিমের জীবনী লেখক সুসিলা আনন্দের মতে, আবদুলের কাছে লেখা রানীর চিঠিই প্রমাণ করে রানী ও আবদুলের সখ্যের বিষয়বস্তু ছিল বিস্তৃত; যা দর্শন, রাজনীতি সমসাময়িক ঘটনাবলি— কোনোটিই বাদ যায়নি।

দুই ভারতীয় ভৃত্যসহ রানী ভিক্টোরিয়া
একটি বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, রানী ভিক্টোরিয়া আবদুল করিমের মধ্যে অন্য এক জগতের সন্ধান পেয়েছিলেন এবং সে ছিল রানীর একান্ত বিশ্বস্তদের একজন। শুধু তা-ই নয়, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই করিম রানী ভিক্টোরিয়ার ঘনিষ্ঠবন্ধু হয়ে উঠেছিল। ভিক্টোরিয়ার লেখা চিঠি ও রোজনামচায় তার প্রচুর প্রশংসা লিপিবদ্ধ হয়েছে। রানীর কাছে করিম ছিলেন একজন পরিশোধিত ব্যক্তি। ডায়েরিতে রানী লিখেছেন, ‘করিম সব বিষয়েই বলে এটি ঈশ্বরের ইচ্ছা। ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই ঘটেছে কিংবা হবে এবং ঈশ্বরের আদেশ অমান্য করার কোনো সুযোগই নেই। ওর ঈশ্বরের প্রতি এত বিশ্বাস ও আস্থা, যা আমাকে মুগ্ধ করেছে...’।

রানীর স্কটল্যান্ড প্রাসাদে আবদুল করিমের জন্য একটি কক্ষ বরাদ্দ ছিল, যা এর আগে রানীর আরেক প্রিয় ভৃত্য জন ব্রাউনের জন্য নির্ধারিত ছিল। জন ব্রাউন ১৮৮৩ সালে মারা যান।

তবে করিমের দ্রুত উত্থানে রাজপ্রাসাদে অস্বস্তি পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। ১৮৮৯ সালের ২৬ এপ্রিল রানীপুত্র এডওয়ার্ড সপ্তম, রানীর সৌজন্যে তার নিজের প্রাসাদে এক পার্টির আয়োজন করেন। করিম রানীর সঙ্গে এ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে দেখেন তার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে প্রাসাদের ভৃত্যদের কোয়ার্টারে। এ ব্যবস্থাপনায় করিম খুবই অসন্তুষ্ট হন এবং তিনি পার্টিতে অংশগ্রহণ না করে বিশ্রাম নিতে তার কামরায় চলে যান।

করিমের এ আচরণ ঔদ্ধত্য হিসেবে গণ্য হলেও রানী করিমের পক্ষ অবলম্বন করেন এবং তাকে ভৃত্যদের সঙ্গে নয়, বরং সাধারণ অতিথিদের সঙ্গে বসতে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে করিমকে উল্টো সম্মানিত করেন।

এর পরের বছর (১৮৯০), রানীর প্রাসাদে এক পার্টিতে গিয়ে পুত্র এডওয়ার্ড দেখেন, আবদুল করিমকে আসন দেয়া হয়েছে অন্য ভদ্র অতিথিদের সঙ্গে। এটা দেখে তিনি ক্রোধে ফেটে পড়েন এবং এর জন্য রানীর ব্যক্তিগত সচিব স্যার হেনরি ফ্রেডরিক পনসবিকের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেন। উত্তরে পনসবি স্পষ্টই জানিয়ে দেন, রানীর নির্দেশেই আসন ব্যবস্থাবিন্যাস করা হয়েছে। এ ব্যাপারে তার কোনো বক্তব্য থাকলে তিনি যেন রানীর সঙ্গে কথা বলেন। এ কথা শোনার পর উিউক একদম চুপ হয়ে যান। রানী ভিক্টোরিয়ার জীবনীকার ক্যারলি এরিকসন মনে করেন, ‘দ্রুত উত্থান ও ব্যক্তিগত অহমিকা মুন্সীর জনপ্রিয়তা কমার মূল কারণ হলেও বর্ণবাদী প্রথাও এ পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করে দেয়। তাছাড়া সে সময় বর্ণবাদের অভিশাপ ছিল ব্রিটেনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। প্রাসাদে সাদা চামড়ার এত চাকর/পরিচারকের ওপর একজন কালো চামড়ার চাকর রানীর প্রিয়ভাজন হবে এবং তাদের সবার ওপর ছড়ি ঘোরাবে, এটা প্রাসাদের কোনো কর্মচারীরই পছন্দ ছিল না। তাদের সবারই প্রায় দাবি ছিল মুন্সীজিকেও তাদের মতো ভৃত্য কোয়ার্টারে থাকতে হবে এবং তাদের সঙ্গে একই টেবিলে একই খাবার খেতে হবে। কিন্তু রানী তার প্রাসাদে বর্ণবিদ্বেষ মোটেও পছন্দ করতেন না এবং রানীর ভাষ্য অনুযায়ী কেবল একটু সম্মানের সঙ্গে থাকা ছাড়া আবদুল করিমের অন্য কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। যে কারণে রানীর কাছে যখন আবদুল করিম সম্পর্কে অভিযোগ তোলা হয়, ভিক্টোরিয়া তার সম্পর্কে ওঠা সব অপবাদ-অভিযোগ উড়িয়ে দেন এবং আবদুল করিমের আচার-আচরণ ও ব্যবহার সম্পর্কেও সব অভিযোগ নাকচ করে দেন তিনি।

১৮৮৯ সালে আরেক ঘটনায় করিম অভিযুক্ত হলেও রানীর কৃপায় বেঁচে যান। করিমের বোনের জামাই হুরমেত আলি রানী ভিক্টোরিয়ার একটি নেকলেস উইন্ডসরের এক জুয়েলারি দোকানে বিক্রয় করে দেন। এ ব্যাপারে করিমকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ভারতীয় রীতিতে কেউ কোনো জিনিস খুঁজে পেলে সে জিনিসের মালিকানা কুড়িয়ে পাওয়া ব্যক্তির হয়ে যায় এবং চাইলে সে তার কাছে তা রেখে দিতে পারে। রানী আবদুল করিমের ব্যাখ্যা মেনে নিলেও প্রাসাদের অন্যরা এই যুক্তি মেনে নেয়নি, বরং তারা প্রচার করতে থাকে যে, করিমের ভগ্নিপতি নেকলেস চুরি করেছে।

এর পরও করিমের বিরুদ্ধচারীদের প্রচারণায় রানীর আস্থা ও স্নেহ তো কমলই না, বরং প্রাসাদে তার জন্য একটি ব্যক্তিগত কামরা বরাদ্দ দেয়া হয়। এ সুবিধা কেবল আগের ভৃত্য জন ব্রাউন পেতেন।

স্কটল্যান্ডের ব্রেমার গ্রামের বালমোরাল এস্টেটে এক সুপেয় হ্রদের পাশে রানীর আরেকটি ছোট প্রাসাদ ছিল। ১৮৮৯ সালের সেপ্টেম্বরে যখন ভিক্টোরিয়া সেখানে বেড়াতে গিয়ে একরাত যাপন করেন, তখনো রানীর সঙ্গী হয়েছিল আবদুল করিম। এ ঘটনায় প্রাসাদের সবাই বিমূঢ় হয়ে যান এবং করিম আর রানীকে ঘিরে নানা ধরনের গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। যদিও এর আগে রানী তার বিশ্বস্ত ভৃত্য জন ব্রাউনের সঙ্গে অনেক রাত এ প্রাসাদে কাটিয়েছেন। কিন্তু জন ব্রাউনের মৃত্যুর পর এই প্রথম আবদুলকে নিয়ে ওই প্রাসাদে রাত্রি যাপন করেন।

১৮৯০ সালে করিম অসুস্থ হয়ে পড়েন, তার ঘাড়ে একটি বড় আকারে বিষফোঁড়া দেখা দেয়। করিমের যন্ত্রণা দেখে রানী ভিক্টোরিয়া তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. রিডকে করিমের চিকিত্সার নির্দেশ দেন। করিমের অসুস্থতায় রানী দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে ডাক্তার রিডকে একটি চিঠিও লেখেন; যেখানে তিনি উল্লেখ করেন— তার এ কর্মী মাতৃভূমি ছেড়ে বহুদূরের এ ইংল্যান্ডে এসেছেন, কাজেই তারও উচিত হবে করিমকে সহানুভূতির সঙ্গে চিকিত্সা ও সেবা দেয়া।

রানীর নির্দেশে ডাক্তার রিড তার ফোঁড়া  কেটে ফেলেন। এর পর করিম দ্রুতই সেরে ওঠেন। ডা. রিডের ডায়েরি থেকে জানা যায়, (১ মার্চ ১৮৯০) রানী আবদুলকে দিনে দুবার দেখতে যেতেন এবং তার ঘাড়ের ক্ষতের কী অবস্থা, তা নিজ চোখে দেখতেন এবং তার রুমে বসে হিন্দি ভাষা শিখতেন।

আবদুল করিমের জমিজমা ও অন্যান্য পারিবারিক বিষয়
১৮৯০ সালে রানী ভিক্টোরিয়া অস্ট্রিয়ার বিশিষ্ট পোর্ট্রেট শিল্পী হাইনরিশ ফন অ্যাংগেলিকে দিয়ে আবদুলের একটি পোর্ট্রেট তৈরি করান। উল্লেখ্য, হাইনরিশ ফন অ্যাংগেলি রানী ভিক্টোরিয়া, তার প্রথম কন্যা প্রিন্সেস ভিক্টোরিয়া, প্রিন্সেস বিয়াট্রিস প্রমুখের প্রতিকৃতি এঁকে খুবই বিখ্যাত হয়েছিলেন। শিল্পী হাইনরিশ ফন অ্যাংগেলি আবদুল করিমের পোর্ট্রেট আঁকার জন্য খুব উত্সাহী ছিলেন; কারণ এর আগে কোনো ভারতীয়র পোর্ট্রেট তিনি আঁকেননি। অ্যাংগেলির নিজের মুখের স্বীকারোক্তি ছিল, তিনি (করিম ছিলেন খুবই সুদর্শন) এবং তাই তিনি ওর পোর্ট্রেটে মনের মাধুরী মিশিয়ে রঙ দিতে পেরেছিলেন।

১৮৯০ সালের জুলাইয়ে রানী ভারতের গভর্নর ল্যান্সডোনকে চিঠি লেখেন যে, তার মুন্সীজি হাজিফ আবদুল করিমের জন্য যেন কিছু জমি বরাদ্দ দেন। আশঙ্কা ছিল, ধীরে ধীরে বার্ধক্যে ধাবিত হওয়া, তার অবর্তমানে উন্ডসর প্রাসাদের লোকজন আবদুল করিমকে হয়তো প্রাসাদের কোনো কাজে রাখবে না। তাই তার মৃত্যুর আগেই করিমের জন্য কিছু করে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করেছিলেন।

রানীর চিঠির জবাবে ল্যান্সডোন লেখেন যে, কেবল সৈন্যদেরই জমি দেয়ার নিয়ম রয়েছে এবং যারা দীর্ঘ সময় ধরে সৈনিক হিসেবে কাজ করেছে, অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছে, তারাই কেবল জমি বরাদ্দ পেয়ে থাকে। তিনি চিঠিতে এটিও উল্লেখ করেন যে, করিমকে কোনো জমি বরাদ্দ দিলেও যে ক’বছর তিনি ওই জমি ব্যবহার করবেন কিংবা তার তত্ত্বাবধানে রাখবেন, তাকে প্রতি বছর ৬০০ রুপি করে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।

কিন্তু রানী চাচ্ছিলেন ভারতের ভাইসরয় সত্বর আবদুল করিমের জন্য জমির ব্যবস্থা করেন, তাই জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভাইসরয় ও রানীর মধ্যে বেশ কয়েকবার এ বিষয়ে চিঠি চালাচালি হয়। এবং ভারতে পরিত্যক্ত জমির অভাব না থাকলেও করিমের জন্য রানীর পছন্দমতো জমি কোথায় পাওয়া যায়, এ বিষয়টি ভাইসরয় ল্যান্সডোনকেও ভাবিয়ে তুলেছিল।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর ল্যান্সডোন আগ্রার কাছাকাছি সরকার নিয়ন্ত্রিত ছোট্ট একটি জমির সন্ধান পান। এদিকে চার মাসের ছুটি নিয়ে আবদুল করিম ৩০ অক্টোবর বালমোরাল ত্যাগ করেন এবং একই দিনে ভারতের উদ্দেশে জাহাজে চাপেন। যথারীতি ল্যান্সডোন রানীকে এ জমির সংবাদ জানিয়ে টেলিগ্রাফ প্রেরণ করেন। তিনি লেখেন, ‘... সাম্প্রতিককালে একজন ব্যক্তি যিনি অনেক বিপদ ও নিজের জীবন উপেক্ষা করে সেবা প্রদান করেছেন, ভবিষ্যতে তার জীবনের নিরাপত্তার জন্য তিনি চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর এককালীন ২৫০ টাকা জমা দেয়ার পর এ জমির পূর্ণ মালিকানা লাভ করবেন।

আবদুল করিম ২৬ বছর বয়সেই এ স্থায়ী বন্দোবস্ত পেয়ে যান এবং এর বাইরেও প্রচুর উপার্জন ছিল তার, যা তার সময়ে একই পদে থাকা প্রাসাদের অন্য কর্মচারীদের উপার্জনের দ্বিগুণ। এর পর করিম তার পিতা ওয়াজিরউদ্দিনকেও ১৮৯৪ সালে তাকে খানবাহাদুর উপাধি জুটিয়ে দেন রানীর মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে ভাইসরয় বলেছিলেন, একজন সাধারণ ডাক্তার এ উপাধি আশা করতে পারেন না। কিন্তু তার দাবি উপেক্ষিত হয়।

১৮৯২ সালের মে মাসে মুন্সীজি ছয় মাসের ছুটি নিয়ে ভারতে আসেন এবং ছুটি শেষে স্ত্রী ও শাশুড়িকে সঙ্গে করে উইন্ডসর প্রাসাদে ফেরেন। এ প্রসঙ্গে রানী তার ডায়েরিতে লেখেন, ‘দুই নারীই মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাপড় দিয়ে আবৃত ছিলেন। শুধু তা-ই নয়, ট্রেনে তাদের কম্পার্টমেন্টও পর্দা দিয়ে ঘেরা ছিল। আমার মনে হয় এরা দুজনই প্রথম কোনো ভারতীয় মুসলমান, যারা পর্দাপ্রথা মেনে ইংল্যান্ডে এসেছেন। আর তারা যখনই বাইরে যান, সারাক্ষণই তারা পর্দাপ্রথা মেনে চলেন। তাদের পর্দাপ্রথা এতই কঠোর যে, পুরো শরীর ঢাকা, কেবল চোখ দুটির স্থানে দুটি গোলাকার ছিদ্র রয়েছে। তবে আমি রানী হওয়ার কারণে নয়, নারী হওয়ার কারণে তাদেরকে পর্দা ছাড়া দেখতে পেরেছি।’

মুন্সী ও তার পরিবারের থাকার জন্য বালমোরালের উইন্ডসরে একটি কটেজ বরাদ্দ করা হয়, যেখানে আগে রানী অবসরের সময় যেতেন। ভিক্টোরিয়া প্রায়ই সেখানে তাদেরকে দেখতে যেতেন এবং মাঝে মধ্যে তাদেরকে রানীর প্রাসাদেও নিমন্ত্রণ করতেন। এ প্রসঙ্গে রানী ভিক্টোরিয়ার সহকারী মেরি ম্যালেট বর্ণনা করেন যে, আমি মুন্সীজির স্ত্রীকে দেখেছি। তিনি ছিলেন অপেক্ষাকৃত মোটা একজন মহিলা এবং গায়ের রঙ চকোলেটের মতো, তাকে দেখে তেমন শান্ত মহিলা মনে হয়নি, তার আঙুলে অনেকগুলো আংটি ছিল এবং তার নাকেও একটি আংটির মতো ছিল। তার বুড়ো আঙুলেও একটি আংটির মতো ছিল, যেখানে একটি উজ্জ্বল পাথর লাগানো ছিল, যা দিয়ে অনেকটা আয়নার কাজ চালানো যেত। মোটামুটিভাবে বলা যায়, তার শরীরের পুরোটাই ভরা ছিল স্বর্ণের চেইন, ব্রেসলেট এবং পরনে ছিল সিল্কের তৈরি পোশাক। তিনি ভাঙা ভাঙা দু-একটি ইংরেজিও বলতে পারতেন।

১৮৯২ সালে কোর্ট বিজ্ঞপ্তিতে যারা রানীর সঙ্গে বার্ষিক ফ্রেঞ্চ রিভারিয়া ক্রুজে যাবেন, তার তালিকা প্রকাশ করা হয়: যথারীতি মুন্সীজির নাম সেই তালিকায় স্থান পায়। এর আগের বছর রানী বড়দিনের অনুষ্ঠান উদযাপন করতে অসবর্ন হাউজে এলেও রানীর অতিথি কাম-সহকারী হিসেবে সঙ্গী হয়েছিলেন মুন্সীজি। পরের বছর রানী ভিক্টোরিয়া ইউরোপে তার বার্ষিক ছুটি কাটাতে গেলে অন্য সফরসঙ্গীদের সঙ্গে আবদুল করিম মুন্সীও সঙ্গী হন। রানী মুন্সীজিকে ইতালির রাজা প্রথম উমবের্তোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তত্কালীন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায় যে, ইতালির রাজা তার সঙ্গে রানী কেন একজন সুদর্শন হিন্দুস্থানিকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন, তার সঠিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাননি।

১৮৯৩ সালের মধ্যেই রানী উর্দুতে মোটামুটি পারদর্শী হয়ে ওঠেন এবং করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা তথা নোট প্রেরণ করতেন উর্দুতে। চিঠির শেষে তিনি লিখতেন, ‘তোমার স্নেহময়ী মা- your affectionate mother- VRI)” **VRI : Victoria Regina et Imperatrix (VRI)- Victoria, Queen and Empress

আরেকবার রানীর সঙ্গে ইতালিতে ভ্রমণের সময় রানী ভিক্টোরিয়ার পক্ষ থেকে ফ্লোরেন্স গেজেটে মুন্সীজির বিবরণ দিয়ে এক বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন। তাতে বলা হয়: আবদুল করিম ভারতে এক সুশীল ও সম্মানিত পরিবারের সন্তান।

বিভিন্ন সময়ে করিমের মর্যাদা নিয়ে নানা মহল থেকে আপত্তি উত্থাপন হলে রানী ভিক্টোরিয়া মর্মাহত হয়ে বলেন: মুন্সীজির মতো একজন দরিদ্র ও ভালো ব্যক্তিকে ইংল্যান্ড থেকে বের করে দেয়ার মানসিকতা খুবই নিচু মনের পরিচায়ক এবং ইংল্যান্ডের মতো একটি দেশে যেখানে জায়গার কোনো অভাব নেই, সেখানে এটা খুবই লজ্জার বিষয়...। তাছাড়া তিনি অন্তত দুজন আর্চবিশপকে চেনেন, যাদের একজনের বাবা ছিলেন কসাই ও অন্যজনের পিতা ছিলেন সাধারণ দোকানদার...,। অন্যদিকে আবদুলের পিতা একটি সম্মানজনক চাকরি করতেন এবং স্থানীয় ডাক্তার... এবং সে (করিম) সবসময়ই অকাট্য সত্যটা বলে।

১৮৯৪ সালে লর্ড ল্যান্সডোনের সময়কাল শেষ হয়ে আসে। তার স্থলে স্যার লর্ড এলগিনকে স্বল্প সময়ের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়। এ রকম সময় রানী ভিক্টোরিয়ার বড় মেয়ে ফ্রেডরিক ভারত সফরে যাওয়ার মনস্থির করলে রানী তাকে অনুরোধ করেন ফ্রেডরিকের ভারত সফরের সময় তিনি যেন মুন্সীজি আবদুল করিমের পিতা আগ্রা জেলের জেনারেল সার্জন ওয়াজিরউদ্দিনের সঙ্গে দেখা করেন। প্রিন্সেস ফ্রেডরিক তার মায়ের অনুরোধ রক্ষা করেছিলেন, কিন্তু ভারত ভ্রমণ শেষে ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে তিনি রানীকে জানান, মুন্সীজির পিতা আগ্রা জেলের কোনো সার্জন নন, তিনি সেখানকার একজন ফার্মাসিস্ট-জাতীয় কর্মচারী, যার কাজ রোগীদের ওষুধ বিতরণ ও খাওয়ার নিয়ম বুঝিয়ে দেয়া। ফ্রেডরিকের কাছ থেকে এ ধরনের কথা শুনে ভিক্টোরিয়া অসন্তুষ্ট হন। তিনি পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, তুমি নিশ্চয়ই অন্য কোনো লোকের সঙ্গে দেখা করেছ। এ ঘটনার পর পরবর্তী এক বছর রানী তার প্রাসাদে কোনো রাজকীয় ডিনার অথবা পার্টিতে ফ্রেডরিককে নিমন্ত্রণ করেননি।

১৮৯৫ সালের জানুয়ারিতে ফ্রেডরিক ভাইসরয় এলগিনকে জানান, ‘প্রাসাদে করিম মোটেও জনপ্রিয় নন..., তিনি অনেকটা জন ব্রাউনের স্থান দখল করে আছেন সত্যি, কিন্তু প্রাসাদের লোকজন তাকে পছন্দ করে না। প্রিন্সেস লুইস বিয়াট্রিস, প্রিন্স হেনরি, লর্ড রোজবেরি এবং ইন্ডিয়ার প্রদেশের সচিব হেনরি ফ্লাওয়ার সবাই তার (করিমের) বিষয়ে কমবেশি উদ্বিগ্ন যে, তিনি কখন কী ঘটিয়ে ফেলেন।’

ফ্রেডরিক করিম ও রানীর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও মন্তব্য করেন: রানী করিমের সমালোচনা শুনতে একেবারেই অপারগ। তার সমালোচনা করে কিছু জানাতে গেলেই রানী খুবই রেগে যান। আসলে মুন্সীজি আর রানীর সম্পর্ক অনেকটা পোষা কুকুর কিংবা বিড়ালের মতো। করিম যত কিছুই করুক না কেন, রানী তাকে কোনোভাবেই বাদ  দেবেন না বা তার বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেবেন না...।

১৮৯৫ সালে রানীর জন্মদিনে করিমকে আরো একদফা পদোন্নতি দেয়া হয় এবং তিনি হন সিআই (কমপেনিয়নস অব দি অর্ডার অব দ্য ইন্ডিয়ান এম্পায়ার), যদিও এতে রোজবেরি ও ফ্লাওয়ারের কঠিন আপত্তি ছিল। রানীর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে ভারতে দায়িত্ব শেষে লন্ডনে ফিরে আসা টাইলারও করিমের উত্থান দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান।

১৮৯৫ সালে ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী রোজবেরির স্থলে আসেন লর্ড সালিসবারি, ভারতের সেক্রেটারি হিসেবে যোগদান করেন লর্ড জর্জ হ্যামিলটন, তিনি অবশ্য ব্রিটেনের ক্যাবিনেট মন্ত্রীও ছিলেন।

তবে জর্জ হ্যামিলটন মনে করতেন, করিমকে আসলে যতটা বিপজ্জনক বলা হয়, ততটা না। তার মতে, করিম বিপজ্জনক না, বরং স্টুপিড ধরনের; যাকে অন্যরা সহজেই ব্যবহার করতে পারতেন, ক্রীড়নক বানাতেন।

১৮৯৩ সালে রানী ভিক্টোরিয়া স্বয়ং করিমের স্ত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য একজন নারী ডাক্তারকে নির্দেশ দেন, আবদুল দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও তাদের কোনো সন্তান ছিল না। রিডের মতে, ১৮৯৭ সালে আবদুল করিমের দেহে গনোরিয়ার জীবাণু পাওয়া যায় এবং তাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, করিম দীর্ঘদিন ধরেই গনোরিয়ায় ভুগছিলেন।

১৮৯৭ সালের মার্চ রানীর ফ্রান্সে বার্ষিক ভ্রমণের সময় করিমের সফরসঙ্গী হওয়া নিয়ে আবার পারিবারিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। পরিবারের সদস্যরা একজোট হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় যে, এবার ভ্রমণের সময় আবদুল করিমকে সঙ্গে নেয়া হবে না। এবং এটা নিয়ে করিম কোনো রকম ঝামেলার চেষ্টা করলে তাকে পদত্যাগ করতে বলা হবে। পরিবারের সদস্যদের এ ষড়যন্ত্রের কথা রানী তার এক নারী পরিচারিকা হ্যারিয়েট ফিপসের মাধ্যমে জেনে যান।

সম্মিলিত এ সিদ্ধান্তের কথা জানার পর ক্রোধে ফেটে পড়েন রানী ভিক্টোরিয়া। রাগে টেবিলের সবকিছু ছুঁড়ে ফেলেন মেঝেতে। এতে পুরো ভ্রমণই পণ্ড হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়ে। রানীর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আবদুল করিমের ওপর তার পরিবারের সদস্যদের অবিশ্বাস ও আস্থার অভাব হিংসা এবং বর্ণবৈষম্য ছাড়া আর কিছু না। ১৮৯৭ সালের বার্ষিক ভ্রমণের সময়ই আবার রানীর এক সিদ্ধান্তে পারিবারিক পরিবেশ তিক্ত হয়ে ওঠে। রানী তার ভ্রমণে সফরসঙ্গীর তালিকায় এবার করিমসহ যোগ করেন আরেক মুসলমান ব্যারিস্টার রাফিউদ্দিনকে, যিনি করিমের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। এ যাত্রায় রানী পরিবারের সদস্য ও পারিষদদের প্রতিবাদের মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। রাফিউদ্দিনকে রানীর সফরসঙ্গীর তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। এ ঘটনায়ও রানী তার আগের কথারই পুনরুক্তি করেন: মুন্সীজি ও রাফিউদ্দিনের প্রতি বিদ্বেষ স্পষ্টত বর্ণবৈষম্যপ্রসূত। তার পরিবার ও পারিষদদের এ-জাতীয় নোংরা চিন্তা-চেতনা থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

শেষ মুহূর্তে ব্যারিস্টার রাফিউদ্দিন আহমেদকে ফ্রান্সের সিমেইজ থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। রানী ঘটনা সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রীকে রাফিউদ্দিনের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে একটি চিঠি লিখতে নির্দেশ দেন।

১৮৯৭ সালের এ লজ্জাজনক ঘটনার পর রানী মুন্সীজিকে আশ্বস্ত করার চেষ্টায় একটি চিঠিও লেখেন। সেখানে তিনি জানান, ‘আমি আমার উইলেই তোমার পরবর্তী জীবন যেন আরামদায়ক হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করেছি। আমি সবসময়ই তোমার মঙ্গল কামনা করেছি এবং সে অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করেছি। দীর্ঘ এ চিঠিটি আমি প্রায় এক মাস আগে লিখেছি, এটি আমার সম্পূর্ণ নিজের বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণা থেকে লেখা। তোমাকে আমি আরো নিশ্চয়তা দিতে চাই যে, তুমি এ চিঠির যে উত্তরই দাও না কেন, আমি ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো মানুষ তা জানতে পারবে না। এ চিঠিটি যদি বুঝতে তোমার অসুবিধা হয়, তবে আমি নিজে এসে তোমাকে পড়ে শোনাব। তার পর আপনার সামনেই এটা পুড়িয়ে ফেলা হবে।’

এ সময় রানী ডাক্তার রিডকে বলেন, আবোল-তাবোল অভিযোগ তুলে পরিবারের লোকজন মুন্সীজিকে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রেখেছেন। রানী রিডকেও অভিযুক্ত করে বলেন, এত দিন আমি মনে করতাম যে, বাসার কুচক্রী চাকর দল ও আমার মাঝখানে তোমার অবস্থান; কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তুমিও আসলে তাদের দলেরই একজন প্রতিনিধি। রানীর দৃঢ়চেতা স্বভাবের ব্যাপারে রিড যথেষ্টই আবগত ছিলেন। ফলে সরাসরি অভিযুক্ত হলেও তিনি কোনো প্রতিবাদ করেননি।

আবদুল করিমের শেষ জীবন
আবদুল করিম ১৮৮৯ সালে তাকে বরাদ্দ দেয়া জমির আরো জমি ক্রয় করেন, যদিও তখন পর্যন্ত তার নামে জমি বরাদ্দ হলেও তা হস্তান্তর হয়নি। তবে তত দিনে করিম নিজেই যথেষ্ট অর্থবিত্তের মালিক হয়েছিলেন। আবদুল করিমের অর্থবিত্ত ও তার জমি ক্রয় সম্পর্কে রানীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাক্তার রিড তার ডায়েরিতে মুন্সীজিকে উদ্ধৃত করে লেখেন: রানীকে সে মিথ্যে তথ্য দিয়েছে যে, ভারতে কোনো কিছু ক্রয়-বিক্রয়ে রসিদ দেয়া হয় না। রাজকীয় খাজাঞ্চিখানার পরিচালক স্যার ফ্লিটউড ইসহাম এডওয়ার্ডসকে এ মিথ্যে মেনে নিতে হয়েছে। কিন্তু এটা রানীর তার (করিমের) প্রতারণা। পরে রিডের সঙ্গে সরাসরি এক আলোচনায় এ প্রসঙ্গ উঠলে আবদুল করিম রিডকে বলেন, তার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য প্রয়োজনীয় রসিদ ও নথিপত্র সে দেখাতে পারবে। পরে রিডের এ অভিযোগ রানীর কান পর্যন্ত পৌঁছালে রিডকে তিনি ভর্ত্সনা করে লেখেন, এটি একটি লজ্জাকর ব্যাপার, তার উচিত এ অভিযোগ খারিজ করে দেয়া।

নানা অভিযোগের তীর, বিদ্বেষ প্রতিনিয়ত করিমের দিকে ধেয়ে গেলেও তাতে তার দৃঢ়তায় কোনো ফাটল ধরাতে পারেনি। তার প্রমাণ পাওয়া যায় করিম যখন এ প্রবল বিরুদ্ধ স্রোতের মুখে দাঁড়িয়েও নিজেকে ‘নাইট কমান্ডার অব দি অর্ডার অব দ্য ইন্ডিয়ান এম্পায়ার’ খেতাবে ভূষিত করার জন্য রানীকে অনুরোধ করেন। করিম জানতেন রানী এ অনুরোধে সাড়া দিলে তিনি হয়ে যাবেন স্যার আবদুল করিম। আবদুল করিমের এ আবদারে ব্রিটিশ-ভারতের ভাইসরয় এলগিন (১৮৯৪-১৮৯৯) হতবাক হয়ে গেলেও করিমের প্রস্তাব খারিজ করে দেয়ার সাহস করেননি। তিনি রানীকে বিকল্প প্রস্তাব এমভিও, যার অর্থ মেম্বার অব দ্য ভিক্টোরিয়ান অর্ডার করার জন্য সুপারিশ করেন। এর আক্ষরিক ব্যাখ্যা হলো, ব্রিটিশ রাজতন্ত্রে তিনি অসাধারণ সেবা দিয়েছেন এবং এর জন্য রানী নিজেই তাকে উপাধি ও উপহার দিতে পারবেন। এ পদক্ষেপে রানী সাড়া দেন, কারণ তিনি মনে করেন, এ উপাধি করিমকে দিলেও ভারত ও ইংল্যান্ডে রাজনৈতিক কোনো বিতর্ক উঠবে না। তবে খাজাঞ্চিখানার প্রধান স্যার ফ্লিটউড এবং প্রধানমন্ত্রী লর্ড সালিসবারি করিমকে এমভিও উপাধি প্রদান করাতেও আপত্তি জানিয়েছিলেন।

১৮৯৯ সালে রানী তার ৮০তম জন্মদিনে করিমকে এমভিওর পরিবর্তে বিতর্ক এড়াতে সিভিও (কমান্ডার অব দ্য রয়্যাল ভিক্টোরিয়ান অর্ডার, এটা নাইট ও এমভিওর মাঝামাঝি একটি উপাধি) খেতাবে ভূষিত করেন। ওই বছরই মুন্সীজি (১৮৯৯) বছরখানেকের জন্য ভারতে আসেন। এরই মধ্যে ভাইসরয় সালিসবারি মারা গেলে তার স্থলাভিষিক্ত হন লর্ড কার্জন। মুন্সীজির পিতার এক ভাষ্যে জানা যায়, ১৮৯৯ সালে লর্ড কার্জনের সঙ্গে তার সাক্ষাত্ হলে, নতুন ভাইসরয় তাকে একজন কেতাদুরস্থ ভদ্রলোক হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

ছুটি শেষে করিম যখন নভেম্বরে ব্রিটেনে ফিরে যান, তখন রানীর স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে। কয়েক মাসের মধ্যেই রানী মারা যান (২২ জানুয়ারি ১৯০১)। রানীর মৃত্যুর পর সিংহাসনে আরোহণ করেন তার পুত্র এডওয়ার্ড (পরবর্তীতে রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড নামে তিনি পরিচিতি পান)। তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেই মুন্সীজিকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন এবং তাকে ভারতে পাঠিয়ে দেন। তবে এডওয়ার্ড রানীর কফিন শেষবারের মতো বন্ধ করার আগে মুন্সীজিকে দেখার সুযোগ করে দেন এবং তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণেরও অনুমতি প্রদান করেন। তার নির্দেশেই রানীর সঙ্গে আবদুল করিমের সকল যোগাযোগের নথিপত্র ফিরিয়ে দিতে বলা হয় এবং সেগুলো আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংসের নির্দেশ জারি করেন। ১৯০১ সালের ৯ আগস্ট হস্তগত হওয়া সব নথিপত্র আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

করিমের সব নথি পুড়িয়ে ফেলার ঘটনাকে রাজপরিবারের এক মূর্খতা বলে উল্লেখ করেছেন লেডি কার্জন, তিনি বলেন: ‘শ্যারোলেট কলি (ডেনমার্কের প্রিন্সেস আলেসেন্দ্রা, পরবর্তীতে ব্রিটেনের রানী আলেকজেন্দ্রা ও সর্বশেষ রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের কনসর্ট) আমাকে বলেন যে, মুন্সীজি উইন্ডসর লজে রানীর সময়কালে সবাইকে বোকা বানিয়ে তটস্থ করে রেখেছিল। রানীর সঙ্গে তার যোগাযোগের সকল নথিপত্র ফেরত দেয়াটা ছিল এক চরম প্রহসন। রানীর সঙ্গে তার যেসব চিঠি চালাচালি হয়েছিল, সেগুলো ফেরত দিলেও রানীর স্বাক্ষর করা ছবি এবং আরো অনেক দলিল সে আগেই ভারতে পাচার করে দিয়েছিল, যা করে সাধারণত সচতুর হাউন্ড কুকুর।

আবদুল করিমের পতনের পর ধীরে ধীরে ইংল্যান্ডের প্রাসাদ থেকে সব ভারতীয়কেই চাকরিচ্যুত করে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়। ইংল্যান্ডের রানীর এখনকার প্রাসাদে কিংবা  কোনো কোর্টে ভারতীয়দের সঙ্গে রানী ভিক্টোরিয়ার কোনো ছবি নেই।

১৯০৫-১৯০৬ সালে জর্জ প্রিন্স অব ওয়েলস পঞ্চম জর্জ আগ্রা ভ্রমণে এলে তার সঙ্গে মুন্সীজির সাক্ষাত্ হয়। তিনি তার ডায়েরিতে এ সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘সে আগের মতো সুদর্শন আর নেই, বেশ মোটা হয়ে গেছে। তবে সে রাজপরিবার থেকে পাওয়া ব্যাজ পরিধারণ করেছিল। আমি জানি না সে কীভাবে ওই সম্মানিত ব্যাজ ভারতে নিয়ে এসেছিল। তবে আমি এখানে খোঁজ-খবর করে যতটুকু শুনেছি, সে চুপচাপ নিজের মতো এখানে বসবাস করছে, কারো সঙ্গে কোনো ঝামেলায় জড়াচ্ছে না।

মুন্সী আবদুল করিম আগ্রা এস্টেটে তার নিজস্ব বাড়ি করিম লজে ১৯০৯ সালে মারা যায়। আগ্রার পাঁচকুইন কবরস্থানে তার বাবার পাশে তার মরদেহ কবরস্থ করা হয়। আবদুল করিমের দুই স্ত্রী তখনো জীবিত ছিলেন। তার মৃত্যুর পর রাজা সপ্তম এডয়ার্ডের নির্দেশে আগ্রার কমিশনার ডাব্লিউএইচ কব করিমের বাসা পরিদর্শন করেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুন্সীজি ও রানীর কোনো স্মৃতিচিহ্ন বা গোপন চিঠিপত্র রয়েছে কিনা, সন্ধান করে তা বাজেয়াপ্ত করা এবং পরবর্তীতে সেসব ইংল্যান্ডে রাজার কাছে প্রেরণ করা।

কিন্তু তত্কালীন ভাইসরয় লে. জন ইিউইট ও ভারতে কর্মরত অপরাপর ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তারা আবদুল করিমের বাসা থেকে কাগজপত্র কিংবা অন্য কোনো নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করাকে অনুমোদন করেননি। তবে তারা মত দেন যে, এ ধরনের কোনো চিঠিপত্র কিংবা অন্য কোনো নথি পাওয়া গেলে তা মুন্সীজির প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর ইংল্যান্ডে পাঠানো যেতে পারে। 

আবদুল করিমের উত্তরাধিকার
আবদুল করিমের কোনো সন্তান ছিল না, তাই তার ভাইয়ের পুত্র ও পৌত্রগণই তার সব সম্পদের উত্তরাধিকারী হন। ১৯৪৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত তারা দিল্লির আগ্রাতেই ছিলেন এবং দেশ বিভাগের পর তারা পাকিস্তানে অভিবাসী হন।

আগ্রায় অবস্থিত করিম লজ সরকার বাজেয়াপ্ত করে তা দুই ভাগে ভাগ করে এক ভাগ পাকিস্তান থেকে আসা একটি হিন্দু পরিবারকে দেয়া হয় এবং বাকি অর্ধেক অংশে একটি নার্সিং হোম বানানো হয়।

১৯৫১ সালে ফ্রেডরিক পনসবির মেমেরিস বইটি প্রকাশ হওয়ার আগ পর্যন্ত মুন্সী আবদুল করিমের জীবন সম্পর্কে মানুষ খুব কমই জানত। লর্ড লিটনের (ভারতের ভাইসরয় ১৮৭৬-১৮৮০) স্ত্রীর ডায়েরি থেকে জানা যায়, ‘যদিও সবাই জানত ও বুঝত যে, মুন্সীজিকে প্রাসাদের অনেকেই পছন্দ করেন না, কিন্তু তারা কেউ মুন্সীজির মনের ব্যথা অনুধাবন করতে চেষ্টা করেননি; প্রাসাদের অন্যসব পরিচারক-পরিচারিকা থেকে শুরু করে রাজপরিবারের সদস্যরা পর্যন্ত (রানী ব্যতীত) শুধু তাদের নাক উঁচু স্বভাব ও বিশেষ চামড়ার প্রতি দুর্বলতা এবং আবার কোনো বিশেষ চামড়ার প্রতি ঘৃণা থাকার কারণে মুন্সীকে অপছন্দ করেছে।’

মুন্সী আবদুল করিম প্রাসাদে নিগৃহীত হলেও ভারতের জন্য নিবেদিত প্রাণ ছিল। ভারতের অনেক বিষয়ে সে রানীকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিল। বিশেষ করে সবকিছুতেই হিন্দুদের প্রাধান্য না দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মুসলমানদেরও সে দায়িত্ব দিতে সুপারিশ করত। তবে ব্যারিস্টার রাফিউদ্দিনের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকার কারণে তার অনেক সিদ্ধান্তই রানীর উপদেষ্টাগণ বাস্তবায়ন হতে দেননি, যদিও তাতে ইংল্যান্ডের মঙ্গল বৈ ক্ষতি হতো না।

রানী ও আবদুলের সম্পর্ক শুধু চাকর-প্রভুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, অনেক সময়ই তারা ছিলেন ছাত্র ও শিক্ষক, কারণ রানী যেমন উর্দুতে পারদর্শী ছিলেন না, তেমনি আবদুলের ইংরেজি জ্ঞানও ছিল সীমাবদ্ধ। তাই ভারত থেকে পাঠানো নথিপত্র বোঝার জন্য রানীর কাছে মুন্সীজি অপরিহার্য ছিল। রানী মনে করতেন, মুন্সীজি ছাড়া অন্য কেউ সঠিক অনুবাদ করতে পারবে না। ভারতের জন্য নীতিনির্ধারণে কোন শব্দ চয়ন সঠিক হবে, সে বিষয়েও মুন্সীজি রানীকে সহায়তা করতেন।