শহীদ কাদরীকে প্রথম যখন পড়ি, তাঁকে বুঝবার বয়স হয়নি। কলেজ শুরু করেছি মাত্র, কলেজ-লাগোয়া শহীদ আতিক-নুরু পৌর পাঠাগারের সদস্য হয়েছি। সেখানে সত্যেন সেন, রিজিয়া রহমান, হাসান আজিজুল হক আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একই র্যাকে বিচরণ করেন; আল মাহমুদ, আলাউদ্দিন আল আজাদ, শামসুর রাহমান, আবদুল কাদির, বন্দে আলী মিয়া আর শহীদ কাদরীও একই আলমারির বাসিন্দা। কোনটা আগে আর কোনটা পরে পড়তে হবে সেই বোঝাপড়া করবার বয়সও নয় সেটা। ফলে এঁরা আমার স্মৃতির ভেতর একে অপরের হাড়মজ্জা খেয়ে বড় হতে থাকবেন— এ আর বিচিত্র কী?
এর মাশুলও দিতে হয়েছে বিস্তর। একবার পড়ে ফেলেছি বলে, ইলিয়াসকে ফিরে পড়তে পড়তে অন্তত ১০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। আর শহীদ কাদরীকে পুনরায় পড়বার জন্য তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো! এখন এই প্রায়-কাব্যোত্তর জীবনে এই পুনর্পঠনের জাবেদা কিভাবে বানাই? শহীদ কাদরীকে নিয়ে আমার কোনো ব্যক্তিগত স্মৃতি নেই, অতিদূর সম্পর্কের আত্মীয়তাহেতু আমার স্ত্রীর ফেসবুক অ্যালবামে তাঁর জবুথবু বার্ধক্যের কয়েকটা ফটোগ্রাফ আছে মাত্র। এর বাইরে যা আছে তা সকলের সম্পত্তি, বাংলা কবিতাকে ঘিরে গড়ে ওঠা নতুন ন্যারেটিভের অংশ।
আপাতত আমি সেই ন্যারেটিভে মনোনিবেশ করতে চাই। শহীদ কাদরীর দীর্ঘ প্রবাসজীবন-সংক্রান্ত ন্যারেটিভ। এর নানা ভাষ্য চালু আছে কবিসমাজে। তিনি প্রেমে ব্যর্থ হয়েছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডে ব্যথিত হয়ে দেশ ছেড়েছিলেন, ৩০০ টাকা বেতনের একটা চাকরি পেলে দেশ ছেড়ে কোথাও যাবেন না— এমন বলতে বলতে প্লেনে চেপেছিলেন ইত্যাদি। মনে করিয়ে দিই, শহীদ কাদরী দেশ ছেড়ে যাবার মাত্র চার বছর আগেই বাংলাদেশের কবিতা বিয়োগব্যথা অনুভব করতে শিখেছে। আবুল হাসানের মৃত্যুর মাধ্যমে।
বলা বাহুল্য, দেশভাগের প্রেক্ষাপটে বাংলা সাহিত্যের যতটুকু ঐতিহ্য পূর্ববঙ্গে স্থানান্তরিত হয়েছিল, তাতে একদিকে যেমন ছিল অখণ্ডবঙ্গীয় সাবেক সম্পর্কের কাতরতা, অন্যদিকে আরেকটা ভুল দাম্পত্যের যাপন থেকে উঠে আসা অনিবার্য তিক্ততা। ফলে এই পর্বে বাংলা সাহিত্যের পক্ষে বাংলাদেশের সাহিত্য হয়ে ওঠা হয়নি। বাংলাদেশকে তাঁরা মুক্তি আকারে দেখেছিলেন মাত্র। সেই দেখা ছিল যত না কাব্যিক, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক।
তবু যে যত্সামান্য ছিটেফোঁটা সম্ভাবনা ছিল, তার নিশানা পাওয়া যায় কবিদের পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিং আর নিউমার্কেটের রেকস রেস্তোরাঁকেন্দ্রিক নড়াচড়ায়। শহীদ কাদরী এই দলের পুরোভাগে ছিলেন। আদিপুরুষের সূত্রে ইনি কলকাতারই বাসিন্দা, তবু ঢাকা শহর তাঁর কবিতাতেই প্রথম বুদ্ধিদীপ্তভাবে মূর্ত হয়ে উঠল। এর সাথে কেবল তুলনীয় হতে পারে আরেক মায়েস্ত্রো কথাশিল্পী মাহমুদুল হকের ঢাকা। ‘কেবল’ বলায় একটুখানি অ্যাবসলিউটিজম হয়ে গেল, গায়ক আযম খানের ঢাকাকেও আমি একই গুরুত্ব দিতে চাই। দুঃখের বিষয়, সত্তরের দশকের টালমাটাল ঢাকাকে বুঝবার জন্য আমাদের হাতে এ রকম দৃষ্টান্ত খুব বেশি নাই।
কিন্তু শহীদ কাদরীর নগরমনস্কতা প্রতিপাদন করার জন্য এই আলাপটুকু তুলিনি। আমি বলতে চাইছিলাম একটা নবীন ঐতিহ্য কিভাবে সাবালক হয়। এই নবীনত্ব অবশ্যই কৃত্রিম, যেহেতু রাষ্ট্র ব্যবস্থাটাই কৃত্রিম। কিন্তু এটা অনস্বীকার্য বাস্তবতাও। ফলে রাষ্ট্র যতই নবীন হোক, পোক্ত একটা সাহিত্যিক ঐতিহ্য তার লাগবে। আবুল হাসান পঁচাত্তর সালে মরে গিয়ে এবং শহীদ কাদরী ঊনআশি সালে দেশ ছেড়ে গিয়ে বাংলাদেশের কবিতার স্বতন্ত্র ঐতিহ্যের জন্য দরকারি সামাজিক বয়ানের জোগান দিয়েছিলেন।
শহীদ কাদরী কেন দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন? এটা আমাদের খুব পছন্দের প্রশ্ন। এজন্য না যে, এর উত্তর আমাদের জানা খুব দরকার। আমরা যদি কবিতা থেকে মুখ তুলে এই প্রশ্নের উত্তর পেতে চাইতাম, তবে জগেজাড়া অভিবাসনের রীতিনীতির মাঝেই এর সহজ স্বাভাবিক জবাবটুকু পাওয়া যেত। কিন্তু আমরা তো সেটা চাই না। বরং শহীদ কাদরীকে নানাবার নানাভাবে এই প্রশ্নটি করা হয়েছে। তাঁর কৌতুকী মেজাজের কথা কারো অজানা নয়। তিনি তাঁর মর্জিমতো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। এই জবাবগুলোর সূত্র ধরেই আমরা বাংলাদেশের কবিতার নতুন সামাজিক বয়ানে প্রবেশ করতে চেয়েছি।
ব্যক্তি শহীদ কাদরীর মাঝে পর্যটকের স্বভাব ছিল, নানা সূত্রে জানা যায়। ফলে দেশত্যাগ তাঁর ক্ষেত্রে কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত হবার কথা নয়। দেখা যায়, এমনকি তাঁর প্রথম বই উত্তরাধিকার-এও তিনি নিজের সাথে এ বিষয়ে বাহাসে নেমেছেন, ‘ন্যুইয়র্কে নির্বাসনে যদিও অমিয় চক্রবর্তী তবুও তো পেয়েছেন/ কবিতার উজ্জ্বল অমল ডালপালা/ আর ক্ষিপ্ত মিসিসিপি’র গাজনে যমুনার উচ্ছল ভজন,/ ভলগা-গঙ্গার ধারে ধারে’ (নিসর্গের নুন, উত্তরাধিকার)। এই কবিতার কবি বিশ্বনাগরিক। তিনি মিসিসিপির সাথে যমুনার পার্থক্য পান না, ভলগা-গঙ্গাকে কেবল হাইফেন দিয়েই জুড়ে দিতে পারেন। ভলগা আর গঙ্গার এই হাইফেনজনিত যোগসাজশ আমাদের বামপন্থী লেখক রাহুল সাংকৃত্যায়নের কথা মনে করিয়ে দেয়। রাহুল ঐতিহাসিক বস্তুবাদী ছিলেন, ফলত তার পরিক্রমায় ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’য় পৌঁছানোর একটা ব্যাপার থাকে। কিন্তু শহীদ কাদরী কবি। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তাঁর কৌশল নয়, বরং তিনি নৈসর্গিক আন্তর্জাতিকতাবাদ দিয়েই বিশ্বপর্যটনে শামিল হতে চান।
কিন্তু মার্কিন মুল্লুকে এই অভিবাসী কবি তাঁর অভীষ্ট বিশ্বনাগরিকতার দেখা যে পাননি, সেই বেদনাদায়ক প্রমাণটুকু আমরা তাঁর সর্বশেষ কবিতাগ্রন্থ আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও-এর নানান কবিতায় পাচ্ছি। ‘প্রবাসের পঙিক্তমালা’ নামে যে কবিতাটি সেখানে আছে, সেখানে তিনি একটি একই বিদেশী চড়ুইকে বাংলা ভাষার বর্ণমালা শেখাতে চাইছেন, কালো কাককে এমন একটি ‘বর্ণবাদী’ দেশে দেখে আঁতকে উঠে বলছেন, ‘এ রাজ্যে অশ্বেতাঙ্গের মূল্য নেই কোনো।’ নিরুদ্দেশ যাত্রা নামে শেষ বইয়ের আরেকটি কবিতায় লিখেছেন,
‘তিন তিনটে মহাদেশ থেকে
অন্তত ছ’বার উড়োজাহাজের টিকেট কিনেও
তোমাদের উঠান পেরিয়ে
নিজস্ব আটচালার দিকে যাত্রা সাঙ্গ হয় নি এখনো।’
আরেক কবিতা ‘কোনো নির্বাসনই কাম্য নয় আর’-এ তিনি লিখছেন—
‘নিজস্ব শহর থেকে অচেনা ফুটপাতে
এশিয়ার আকাশে ময়ূর নীল থেকে
কুয়াশাচ্ছন্ন পাশ্চাত্যে
না, কোনো নির্বাসনই
কাম্য নয়
আর।’
এভাবে তাঁর অনুপস্থিতি, নির্বাসন আর প্রত্যাবর্তনের নানান বয়ান তিনি হাজির করেছেন তাঁর বিভিন্ন সময়ের কবিতায়। সেই শুরুতে, উত্তরাধিকার গ্রন্থের ‘অগ্রজের উত্তর’ কবিতায় আমরা দেখছি, শহীদ কাদরী বাড়ি থাকেন না, চুলের জায়গায় শোকের পতাকা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ান। এই অনুপস্থিতি, এই চলে যাওয়া, আমরা পরবর্তীতে আবুল হাসানের মধ্যেও বিপুল পরিমাণে দেখি। কবিতা তাঁকে ক্লান্ত করে, সভ্যতা তাঁকে ব্যথিত করে, তাই তিনি স্মৃতির ভেতর শৈশবে ডুব দিতে চান। সেই শৈশব, শহীদ কাদরীর বেলায় আবার দেশভাগের ছুরি দিয়ে ছিন্নভিন্ন, কেননা সে বর্ধমান জেলার বটগ্রাম, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের অংশ। ফলত কবির শৈশব আজ রাষ্ট্রীয় কাঁটাতারের ভেতর হারিয়ে গেছে। কাজেই এটা স্বাভাবিক যে, তিনি রাষ্ট্র মানেই ‘লেফট রাইট লেফট রাইট’ মনে করবেন। কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই বইয়ের ‘যাই, যাই’ কবিতায় তিনি যে শৈশবের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন, সেটা রাষ্ট্রসীমানার ঊর্ধ্বে অবস্থিত এক দেশ—
‘আজ আবার ইচ্ছে হলো যাই, এই রঙ-বেরঙের শার্ট—জামা—জুতো,
মাছ থেকে মাছের আঁশের মতো কৌশলে ছাড়াই ...যাই ...
একটি নতুন নম্র বীজ হয়ে, বকুল অথবা
চামেলীর ছদ্মবেশে এক্কেবারে শব্দহীন চলে যাই।’
কিন্তু এই দেশ একটা ভৌগোলিক অস্তিত্ব, একটা ঐতিহাসিক অস্তিত্বও বটে। শহীদ কাদরী বোহেমিয়ান ছিলেন না, ফলে সাবদার সিদ্দিকীর মতো কখনই বলেননি যে, ‘যেখানেই যাই/ পায়ের নিচে দু-টুকরো জমি/ হয়ে যায় আপন মাতৃভূমি।’ বরং তাঁকে ‘দেশ’ আর ‘বিদেশ’-এর মধ্যে একটা নিত্য বোঝাপড়ার ভেতর থাকতে হয়েছে। বাংলাদেশে বসে যখন তিনি শৈশবের আখ্যান লিখছেন, তাঁকে যেমন রাষ্ট্রসীমা উতরে বর্ধমান যেতে হয়েছে, তেমনি ন্যুইয়র্কের ল্যান্ডস্কেপকে বুঝবার এবং বোঝানোর জন্য বাংলাদেশই তাঁর কাছে আরাধ্য ক্যাটাগরি। মৃত্যুর আগে নেয়া সর্বশেষ সাক্ষাৎকারেও তিনি ‘বাসা’ আর ‘ঘর’-এর ফারাক করেছেন। ফলে তাঁর দ্বৈতবাদের গভীরতা অনুমান করা যায়। এই দ্বৈততা অভিবাসীর অনিবার্য অভিজ্ঞতা। তার সাথে আবার যুক্ত হয়েছে কবির বেদনাঘন নিয়তি। আর এই দুয়ে মিলে যে তীব্রতা তৈরি হয়েছে শহীদ কাদরীর প্রবাসজীবনে, তার একটা নমুনা পাওয়া যাবে কবির সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থের ‘কবি’ কবিতাটির মাঝে—
‘এক নক্ষত্রছুট্ কালো রাত্রিতে
উতরোল এ্যাটলান্টিকের উপকূলে দাঁড়িয়ে
অস্ফুটে তুমি বলেছিলে:
দ্যাখো, কী ভয়াবহ সৌন্দর্য।
আমি দেখেছিলাম,
মধ্য-সমুদ্রে দাউদাউ আগুনলাগা
একটি জাহাজ ক্রমশ যাচ্ছে ডুবে
কবিরাও এভাবে তীব্র সুন্দর সৃষ্টি করতে করতে
পরিণত হন হাঙরের সুখাদ্যে
মিশে যান জলের লবণে,
কুয়াশায় ও রাত্রির অন্তহীন শরীরে।’
এই সৌন্দর্যের কথা, ক্রন্দনহীন বেদনার কথা, বেদনা-ঊর্ধ্ব কবিজীবনের অনিবার্য নিয়তির কথা আমরা শহীদ কাদরীর কণ্ঠে আগেও শুনেছি। কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই বইয়ের ‘কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না’ কবিতায় তিনি লিখছেন—
‘একটি মাছের অবসান ঘটে চিকন বটিতে
রাত্রির উঠোনে তার আঁশ জ্যোত্স্নার মতো
হেলায়-ফেলায় পড়ে থাকে
কোথাও কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না
কোথাও কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না;’
এই দুই বয়ানের মাঝে পার্থক্যটুকু কেবল দৃশ্যকল্পের। একটা ঘনিষ্ঠ, অন্যটা দূরের। একটা দেশী, অন্যটা বিদেশী। কিন্তু কবিকে যে এইভাবে আটপৌরে জীবনের হাতে খুন হয়ে যেতে হয়, নিজেকে জ্বালিয়ে হাঙরের সুখাদ্যে পরিণত হয়ে যেতে হয় এবং এতে করে জগতে কোথাও যে কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না, এইটাই সার্বজনীন নিয়ম। কবিতার। কবির। ফলে এই যে শহীদ কাদরী, আমাদের প্রধানতম কবিদের একজন, যিনি বিদেশ চলে গিয়েছিলেন এবং ফিরে আসবার খোয়াবের মধ্যে সারাজীবন কাটিয়ে দিলেন, তাঁর এই ফিরে আসা আমাদের জন্য আনন্দের এবং খানিক বিষাদমাখা হলেও, তাঁর এই মৃত্যুতে আমাদের কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না। তিনি চিরকাল আমাদের আত্মার সাথী হয়েই ছিলেন, আর এখন মৃত্যুতে তাঁর ব্যথাদীর্ণ দেহখানিও আমাদের হলো।
লেখক: কবি ও জনসংস্কৃতি বিষয়ক গবেষক






