আমাদের ভূমি আমাদের মানুষের অভিধান—দিগন্ত বিস্তৃত এ ভূমিতে আমাদের পূর্বপুরুষরা তাদের কবরে ঘুমিয়ে আছেন, এ মাটি পুত্র ও পুত্রদের পুত্রের শোভাযাত্রায় প্রকম্পিত।

—ইয়েমেনে মাটি নিয়ে তার শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি আবদুল্লাহ আল-বারাদ্দুনি এমনটা লিখেছেন ১৯৯৫ সালে।

আরব ভূমিতে ইয়েমেন একটি বিশেষ নাম, যদিও তা সৌদি, মিসর কিংবা কাতারের নামের মতো মানুষের মুখে মুখে ফেরে না। ইসলামের আগমন পর্বে ইয়েমেনে মানুষের আরবের বিভিন্ন প্রান্ত অভিবাসী হয়েছে। এর পেছনে নির্দিষ্ট কারণও ছিল—ইসলামের বিজয়ী সেনাদলের অগ্রভাগে ছিল ইয়েমেনের সেনারা। সিরিয়া ও ইরাকে গড়ে ওঠা নতুন শহরগুলোর অধিকাংশ বাসিন্দাই ছিলেন ইয়েমেনি। কোনো কোনো ইয়েমেনি সুদানের ডংগোলা পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন। অনেকে থিতু হয়েছিলেন তিউনিসিয়ায়, সেখানে স্থানীয় বারবার অধিবাসীদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। স্পেন এবং কিছু সময়ের জন্য ফ্রান্সের বোর্দোতেও নিজেদের উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। ইয়েমেনি রক্ত আরব বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বয়ে চলে। অনেক আরব একালে এসে তাদের ইয়েমেনি উৎসের কথা ভুলেও গেছেন। তবে সবাই যাননি। ব্রিটিশ আরব বিশেষজ্ঞ, ভ্রামণিক ও লেখক টিম ম্যাককিনটশ-স্মিথ ১৯৮২-২০১৯ সাল পর্যন্ত স্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন ইয়েমেনের সানায় এক পুরনো টাওয়ার হাউজে। গৃহযুদ্ধের দাপটে আপাতত থাকছেন মালয়েশিয়ায়। তবে এ পশ্চিমা ভদ্রলোক মগজে, সংস্কৃতিতে প্রায় ইয়েমেনি মানুষই হয়ে গেছেন। টিম একবার মাসকটে এক ট্যাক্সি ড্রাইভারকে পেয়েছিলেন, যিনি তার কাছ থেকে ভাড়া নেননি। কারণ ছিল ‘‌তুমি আমার পিতামহের ভূমিতে বাস করো। তিনি মারিবের মানুষ ছিলেন।’ অথচ এ দাদা বলতে সে যাকে বোঝাচ্ছিল তিনি কমপক্ষে ৫০ প্রজন্মের আগের কেউ।

২.

বেশ প্রাচীনকালে আরবের দক্ষিণাংশের জাতিগুলো সুগন্ধি উদ্ভিজ্জ আঠার চাহিদা বুঝতে পেরেছিল। বিশেষত মিসরীয়রা তাদের চিকিৎসা ও মমি তৈরিতে এ আঠা ব্যবহার করত বেশ। খ্রিস্টপূর্ব দশম শতাব্দী নাগাদ উত্তর দিকের সঙ্গে স্থলে উট বাহিত বাণিজ্য চালু করেছিল ইয়েমেনিরা। রাজা সলোমনের কাছে রানী শেবার সফর সে প্রমাণ দেয়। এ উর্বর এলাকায় সভ্যতা যত বিকশিত হচ্ছিল সুগন্ধির ব্যবহারও তত বাড়ছিল। হেরোডোটাসের আমলে কোনো অ্যাসিরীয় নারী সুগন্ধি না মেখে প্রেমিক কিংবা স্বামীর কাছে যেতেন না। সুগন্ধি তৈরির জন্য যে চুলা ব্যবহার হতো তা পুরো পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় পাওয়া গেছে। প্রাচীনকালে ইয়েমেনের সমৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তার। সাম্রাজ্য বিস্তৃত হতে থাকলে প্রাচ্যের পণ্যের প্রতি তাদের আকর্ষণ বাড়তে থাকে। প্রাচ্যের পণ্য রোমান সমাজে তখন মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

লোবান ও সুগন্ধির সঙ্গে আরো অনেক পণ্য এ ইয়েমেন থেকে বিক্রি হতো। এর মধ্যে ছিল দারুচিনি। তবে এটা তারা আনতেন ভারত থেকে এবং এর উৎস তারা সফলভাবে পশ্চিমাদের কাছে গোপন রাখতে পেরেছিলেন। তবে লোবানই ছিল তাদের প্রধান রফতানি পণ্য। এর উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ইচ্ছা করেই নানা তথ্য, ভুল তথ্য ছড়ানো হতো, যেন এটি নিয়ে একরকম রহস্যময়তা ও আকর্ষণ তৈরি হয়। এসব প্রচারণা থেকে রোমানরা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সুগন্ধি গাছের বনে ভয়ানক সব উড়ুক্কু সাপ থাকে, যেগুলোকে কেবল বিশেষ গাছ পুড়িয়ে তৈরি ধোঁয়া দিয়ে বশ মানানো যায়। পুরো বিষয়টা ছিল বিজ্ঞাপন কৌশলের প্রাচীন নিদর্শন।

দক্ষিণ আরব থেকে বছরে তিন হাজার টন ধূপ ও ৬০০ টন সুগন্ধি আঠা রফতানি হতো। রোমানরা বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতেন এসব সুগন্ধির পেছনে। তবে পরিস্থিতি পাল্টে যায় রোমান সাম্রাজ্য খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলে। দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষভাগ থেকে পাদ্রিরা ধূপের ব্যবহারের বিরুদ্ধে জোর প্রচারণা শুরু করেন। তবে ভিন্নমতও ছিল। শেষমেশ খ্রিস্টীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ধূপের সামান্য ব্যবহার টিকে যায়। তবে সেটা আর কখনই প্যাগান আমলের মতো হয়নি।

৩.

বাণিজ্য সবসময়ই দুই তরফাই হয়ে থাকে। অর্থ, পণ্য, ধর্ম সবই বিনিময় হয়। ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা থেকে এমন অনেক কিছু এসেছিল দক্ষিণ আরবে। ভূমধ্যসাগরের মানুষ প্রাচীন ইয়েমেনিদের দেখত সুগন্ধি ও বিলাসীপণ্যের রফতানিকারক হিসেবে। কিন্তু ইয়েমেনিদের কাছে তাদের মুখ্য জীবিকা ছিল দৈনন্দিন খাদ্য তালিকার মুখ্য শস্যগুলো উৎপাদন করা, মানে কৃষিকাজ। মারিবে দুটো বাগান ছিল অন্তত ১৫ মাইলজুড়ে বিস্তৃত, এটা ছিল পানি সেচ ব্যবস্থার মাস্টারপিস। অন্যত্র আরো দুটো নমুনা পাওয়া গেছে, যেখানে সীমিত পানির ব্যবহার করে কৃষিকাজের অত্যাশ্চর্য ব্যবস্থার কথা জানা যায়। হাদরামি, যেখানে এখন বিরান মরু, একসময় ১২ হাজার একর জমি ছিল কৃষিকাজে ব্যবহার হতো। বায়নুনের মারিব বাঁধ সেচ ব্যবস্থার এক আশ্চর্য নমুনা। এখানে বন্যার পানি পর্বতের পাথর কেটে তৈরি টানেল দিয়ে নিয়ে বাঁধে জমা করা হতো। এমন একটি টানেল এখনো অক্ষত, যার মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালানো সম্ভব। ইয়েমেনের পার্বত্যাঞ্চলের অনেক গ্রামের মানুষ এখনো দুই হাজার বছর আগের তৈরি পানির ট্যাংক ব্যবহার করে।

৪. 

ইসলামের আগমনে ইয়েমেনের পৌত্তলিক সংস্কৃতি মুছে যায়। সারা আরবেই এমনটা হয়েছিল। কিন্তু ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তারে একসময় ইয়েমেনিরা প্রান্তিক হয়ে পড়ে। যদিও ইসলামের শুরুর দিনগুলোয় তার সেনাদলে ইয়েমেনিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আব্বাসীয় আমলে উত্তর আরবের মুসলিম শাসন কেন্দ্র থেকে নিজেদের দূরের মানুষ মনে হতে থাকে ইয়েমেনিদের। এ সময় ইয়েমেন নিজের পরিচয় খুঁজতে শুরু করে। কবি-লেখকরা সক্রিয় হন। এ সময় তাদের নিজস্ব ইতিহাস, কাব্যে নতুন অসংখ্য সৃষ্টি দেখা যায়। অতীত নিয়ে নিজস্ব ধারণা শক্তিশালী হয়। দশম শতাব্দীতে আল-হামদানি, যিনি ইয়েমেনের জিহ্বা নামে পরিচিত, তার পূর্বপুরুষদের লেখাজোখা নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং সেগুলোকে তার নতুন গবেষণা দিয়ে সমৃদ্ধ করেন। এভাবে তিনি আল-ইকলিল নামে বংশলতিকা ও ঐতিহাসিক বিষয়ে একটি ১০ খণ্ডের সংকলন তৈরি করেন। নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইয়েমেনিদের বেশ পছন্দ করতেন। তিনি ইয়েমেনিদের দয়ালু ও নম্র মানুষ হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন।

এসএম রশিদ: লেখক ও অনুবাদক