প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু মুসা আশআরি। আদি নিবাস ইয়েমেন। খায়বার যুদ্ধে বিজয়ের পর হজরত মুহাম্মদ (দ.) তাকে ইয়েমেনে পাঠালেন। উদ্দেশ্য সেখানকার অধিবাসীদের মাঝে ইসলাম প্রচার। সে যাত্রায় হজরত আবু মুসা আশআরি ৫০ জনের বেশি মানুষকে ইসলামে দীক্ষিত করতে পেরেছিলেন। সেই প্রথম ইয়েমেনে পৌঁছল শান্তির বাণী। নওমুসলিম ইয়েমেনবাসীদের সঙ্গে নিয়ে হজরত আবু মুসা আশআরি মদিনায় ফিরলেন। হাজিরা দিলেন রাসুলের দরবারে। উৎফুল্ল হজরত মুহাম্মদ (দ.)। উপস্থিত সাহাবিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ইয়েমেনবাসীরা তোমাদের কাছে এসেছে। তারা খুবই অমায়িক ও তাদের হৃদয় সবচেয়ে দয়ালু। বিশ্বাস তো ইয়েমেনের, আর প্রজ্ঞা ইয়েমেনি।’

আহলে সুফফার অন্যতম সদস্য ছিলেন হজরত আবু হোরায়রা। তার পূর্বপুরুষের ভিটাও ছিল ইয়েমেনে। হজরত মুহাম্মদ (দ.) থেকে সবচেয়ে বেশি হাদিস তার মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে। রাসুলের বাণী অন্তরে ধারণ ও প্রচারের ক্ষেত্রে তার ক্ষমতা ছিল বিস্ময়কর। এ বিষয়ে অন্য সাহাবিরা তাকে প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি উত্তর দিলেন, ‘‌একদিন রাসুল কথা বলছিলেন। এক পর্যায়ে বললেন, যে ব্যক্তি আমার কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত তার জামা বিছিয়ে রাখবে, অতঃপর তা গুটিয়ে নেবে, সে আমার কাছ থেকে শোনা কোনো কথাই ভুলবে না। আমি জামা বিছিয়ে দিলাম। রাসুল আমাকে তার অমীয় বাণী শোনালেন। তারপর আমি জামা গুটিয়ে নিলাম।’ হজরত আবু হোরায়রার দাবি, এরপর রাসুলের কাছ থেকে শোনা কোনো বাণীই তিনি বিস্মৃত হননি।

স্বনামধন্য তাবেয়ি হজরত ওয়াইস করনি ইয়েমেনের অধিবাসী ছিলেন। ইসলামের প্রথম যুগের এ সুফি জীবনের অধিকাংশ সময় ইয়েমেনে অতিবাহিত করেছেন। তিনি রাসুলের সমসাময়িক ছিলেন৷ কিন্তু রাসুলের সঙ্গে তার কখনো সাক্ষাৎ হয়নি। তবে আত্মিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোনো কমতি ছিল না। তার আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের স্বীকৃতি স্বয়ং রাসুল দিয়েছেন। হজরত ওয়াইস করনি সম্পর্কে হজরত মুহাম্মদ (দ.) বলেন, ‘ইয়েমেন থেকে এক দয়ালু হৃদয়ের সুবাস পাচ্ছি আমি।’ রাসুলের জবানি অনুসারে, হজরত ওয়াইস করনির দোয়া আল্লাহ কখনো প্রত্যাখ্যান করেন না।৷তাই তিনি হজরত ওমরকে বলেছিলেন, ‘‌ওমর! সম্ভব হলে তুমি তার দোয়া নিও।’ ওয়াইস করনির সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে হজরত ওমর তার দোয়া নিয়েছিলেন। প্রশ্ন করেছিলেন, ‘‌আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’ ওয়াইস করনি বললেন, ‘‌কুফা’। তখন হজরত ওমর বললেন, ‘‌আমি কি কুফার প্রশাসকের কাছে আপনার ব্যাপারে চিঠি লিখব?’ ওয়াইস করনি উত্তর দিলেন, ‘আমি সাধারণ মানুষের মাঝে থাকতেই পছন্দ করি।’ হজরত ওয়াইস করনির অনুসরণে একটি স্বতন্ত্র সুফি সিলসিলা জারি আছে। তার নামানুসারে একে বলা হয় ‘‌ওয়াইসি সিলসিলা’।

৬৬০-৭৪৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইয়েমেন উমাইয়া খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ৭৪৯-১২৫৮ সাল পর্যন্ত ছিল আব্বাসীয় খলিফাদের শাসনাধীন। তবে এ শাসন একেবারে নিরুপদ্রব ও নিরবচ্ছিন্ন ছিল না। কেন্দ্রীয় শাসনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ার মতো বিদ্রোহী দল ও গোষ্ঠীর অস্তিত্ব ইয়েমেনে সবসময়ই ছিল। রাজধানী বাগদাদ থেকে ইয়েমেনের উল্লেখযোগ্য ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বিদ্রোহীরা অঞ্চলটিকে তাদের রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণের সুবর্ণভূমি হিসেবে বেছে নিয়েছিল। ইয়েমেনের প্রকৃতিও ছিল তাদের অনুকূলে। ভূখণ্ড বন্ধুর। তাই বিদ্রোহীরা গেরিলা কৌশলে কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনীকে বেশ নাকানিচুবানি খাওয়াতে পারত। আব্বাসীয় শাসনের ক্রান্তিলগ্নে এসব গোলযোগ চরমে পৌঁছে। ছোট ছোট একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয় ইয়েমেন। আট শতকের শুরুতে শিয়াদের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয় ইয়েমেন। তখন থেকে জনপদটিতে তিনটি গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। গোষ্ঠীগুলো হলো জায়েদি, ইসমায়েলি ও সুন্নি। তাদের মধ্যকার বিবাদ বহু শতাব্দী ধরে ইয়েমেনের ধর্মীয় পরিমণ্ডলের প্রকৃতি নির্ধারণ করেছিল। এ সহিংসতা ছিল মারাত্মক। সময়ে সময়ে তা নৃশংসতার পর্যায়ে পৌঁছে যেত। প্রতিটি মাজহাবের অনুসারীরা অন্যদের দমন করে নিজেদের ভৌগোলিক সীমানা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। একই সঙ্গে জ্ঞানতাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষও সাধিত হয়েছিল। এমন পরিবেশই ইয়েমেনের উত্তর যুগের সুফি ও তাত্ত্বিকদের আবির্ভাবের পথ সুগম করেছিল।

বিভিন্ন প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীর মধ্যে অবিরাম সংঘর্ষের কারণে ইয়েমেনের রাজনীতি ও অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়। এ অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে মিসরের আইয়ুবিরা ইয়েমেন আক্রমণ করে। তারা ছিল সুন্নি। ১১৭৩ সালে তারা ইয়েমেন দখল করে ১২২৮ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল। ইয়েমেনের রাজনীতি ও সংস্কৃতির উন্নয়নে আইয়ুবি শাসকরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। এক পর্যায়ে ইয়েমেনের আইয়ুবি সেনাপতিরা মিসরের আইয়ুবি শাসকদের থেকে নিজেদের স্বাধীন ঘোষণার মাধ্যমে৷স্থাপন করে নতুন রাজবংশ, যা রাসুলি রাজবংশ নামে পরিচিত। তখন সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবি বিদ্রোহী সেনাপতিদের দমন করার জন্য বাহিনী প্রেরণ করেন। এর নেতৃত্বে ছিলেন শফিউদ্দিন খিতিলবা। তিনি রাসুলিদের দমন করেন। এরপর অসুস্থ হয়ে মারা যান।৷তার মৃত্যুতে বিদ্রোহীরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সুলতান সালাউদ্দিন তখন তার ভাই তুঘতাকিন ইবনে আইয়ুবকে ইয়েমেনে শান্তি পুনরুদ্ধারের জন্য পাঠান। তুঘতাকিন ‘‌আল আজিজ’ নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি বিদ্রোহীদের কাছ থেকে ইয়েমেনের অধিকাংশ অঞ্চল দখল করে নিতে সক্ষম হন। তিনি একটি সুদৃঢ় করনীতি প্রতিষ্ঠা করেন। বার্ষিক রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে আর্থিকভাবে বেশ লাভবান হন। তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ শাসক। কূপ খনন ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে ইয়েমেনের কৃষি খাতে বিপ্লব এনেছিলেন তুঘতাকিন। দুর্নীতিগ্রস্ত সৈনিকদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করেছিলেন। 

তুঘতাকিনের মৃত্যুর পর ইয়েমেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবার উত্তাল রূপ ধারণ করে। তার পুত্র আল মুয়িয আততায়ীর হাতে নিহত হন। আরেক পুত্র আন নাসিরকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। মিসরের সিংহাসনে তখন আল মালিক আল কামিল। তিনি তার পুত্র আল মাসুদকে এক বিশাল সেনাবাহিনীসহ ইয়েমেনে প্রেরণ করেন। আল মাসুদ ১০ বছর ইয়েমেন শাসন করেছিলেন। তিনি ১২২৮ সালে ইয়েমেন থেকে মিসর ফেরার পথে মক্কায় মৃত্যুবরণ করেন। তখন ইয়েমেনে আইয়ুবি শাসকদের প্রতিনিধি হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন নুরউদ্দিন ওমর ইবনে আলী ইবনে রাসুল। ক্ষমতা সুসংহত করার পর মিসরের আইয়ুবি শাসকদের প্রতি আনুগত্য অস্বীকার করেন তিনি। নিজেকে স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করে উপাধি নেন আল মনসুর। তৎকালীন আব্বাসীয় খলিফা আল মুসতানসির তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

নুরউদ্দিনের মাধ্যমে ইয়েমেনে রাসুলি শাসনের যাত্রা হয়েছিল। এক ষড়যন্ত্রে তিনি নিহত হলে সিংহাসনে বসেন তার পুত্র আল মুজাফফর। তিনি প্রায় অর্ধশতক ইয়েমেন শাসন করেছিলেন। তার শাসনামলে ইয়েমেনের সমৃদ্ধি চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছিল। বাণিজ্য ও কৃষিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। রাসুলি সাম্রাজ্যের সর্বশেষ শাসক ছিলেন আল নাসির আহমদ। শাসক হিসেবে তিনি সফল ছিলেন না। তার সময়ে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাদের দমনে ব্যর্থ হওয়ায় রাসুলি শাসনের পতন ঘটে। রাসুলিদের পর ইয়েমেনে প্রতিষ্ঠিত হয় তাহিরি সাম্রাজ্য। ১৫৩৮ সালে অটোমানরা ইয়েমেন আক্রমণ করলে তাহিরি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

রাসুলি শাসনামলকে ইয়েমেনের ইতিহাসের অন্যতম স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাসুলি শাসকরা তাদের জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। ইতিহাস, জ্যোতিষশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র, সুফিবাদ, কৃষিবিজ্ঞানসহ জ্ঞানের নানা শাখায় তারা পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। তারা প্রত্যেকেই সমসাময়িক জগদ্বিখ্যাত পণ্ডিতদের শিষ্য ছিলেন। নানা বিষয়ে লেখালেখিও করেছেন। রাসুলি শাসকরা ইয়েমেনে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ইসলামী জ্ঞান কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেগুলোর খ্যাতি আন্তর্জাতিক মহলে ছড়িয়ে পড়েছিল। সুফি সাধকদের প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সুফিদের জন্য নিষ্কর জমির বন্দোবস্ত দিয়েছিলেন রাসুলি শাসকরা। তাদের দরবারে সুফি দর্শনের ব্যাপক চর্চা হতো। ইবনুল আরাবির লেখা বিখ্যাত দুটি কিতাব ‘‌ফুসুস আল হিকাম’ ও ‘‌আল ফুতুহাত আল মক্কিয়াহ’কে তারা খুব গুরুত্ব দিয়ে অধ্যয়ন করতেন। ইসলামী জগতের নানা প্রান্ত থেকে বিদ্বান ব্যক্তিরা রাসুলিদের আতিথেয়তা গ্রহণ করে ইয়েমেনে আসেন। তাদের মধ্যে মিসরের বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও জীবনীকার মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর আল ফারিসি, ইবনে হাজার আল আসকালানি, কিংবদন্তি অভিধানবিদ মজদউদ্দিন আল ফিরুজাবাদী, মক্কার প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আল ফাসি, স্বনামধন্য হাদিস সংগ্রাহক ইবনুল জাযারি, সুফি লেখক আবদুল করিম আল জিলির নাম উল্লেখযোগ্য। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতাও রাসুলি শাসনামলে ইয়েমেন ভ্রমণ করেছিলেন।

নয় শতকে ইয়েমেনের অধিকাংশ সুন্নিরা ছিলেন মালেকি ও হানাফি মাজহাবের অনুসারী। ৭৯০ সালে শাফেয়ি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা হজরত মুহাম্মদ ইবনে ইদ্রিস আশ শাফেয়ি ইয়েমেন ভ্রমণ করেছিলেন। রাসুলি শাসক আল মনসুর হানাফি মাজহাব ত্যাগ করে শাফেয়ি মাজহাব গ্রহণ করেছিলেন। তখন ইয়েমেনে শাফেয়ি মাজহাব ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বিখ্যাত মুহাদ্দিস হজরত আহমদ ইবনে হাম্বলও ইয়েমেন ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি হাম্বলি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ইয়েমেনের বিখ্যাত পণ্ডিত আবদুর রাজ্জাক আস সানানির কাছে অধ্যয়ন করেছিলেন। সানানি রচিত ‘‌আল মুসান্নাফ’ কিতাব ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। ইয়েমেনের আরেক বিখ্যাত মুহাদ্দিসের নাম হজরত মুহাম্মদ ইবনে আবু ওমর। তিনি এডেনের প্রধান কাজি ছিলেন। হাদিস সংকলন সহিহ মুসলিমের রচয়িতা হজরত মুসলিম ইবনে আল হাল্লাজ আল কুশাইরি ও সুনানে তিরমিযির রচয়িতা হজরত আবু ঈসা আত তিরমিযি তার কাছ থেকে হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন। হাদিস শাস্ত্রে তার পাণ্ডিত্যের ওপর তাদের অগাধ আস্থা ছিল। হজরত আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল বুহাইরির মাধ্যমে ইয়েমেনে হাম্বলি মাজহাব প্রসার লাভ করেছিল। তার উপাধি ছিল ‘‌সাইফুস সুন্নাহ’ তথা ‘‌সুন্নতের তরবারি’। তিনি তার আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। ফিকহ, ব্যাকরণ, উসুলে হাদিস ইত্যাদি বিষয়ে তার পাণ্ডিত্য ছিল সুপ্রসিদ্ধ। দূর-দূরান্ত থেকে জ্ঞানপিপাসুরা বিদ্যার্জনার্থে তার কাছে আসতেন। সে সময় শাফেয়ি মাজহাবের সঙ্গে হানাফি মাজহাবের এবং হাম্বলি মাজহাবের সঙ্গে আশআরিদের আকিদাগত দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছিল।

ইয়েমেনের বিখ্যাত সুফি ছিলেন হজরত আবু আব্দুল্লাহ আমর ইবনে মায়মুন আল আউদি। ৬৯৪ সালে এ তাবেয়ি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। সুফি তাউস ইবনে কায়সান পার্থিব সম্পদের প্রতি তার উদাসীনতার জন্য খ্যাতি লাভ করেছিলেন। খলিফা আল ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের শাসনামলে দুই রাজনীতিবিদ হজরত তাউসের কাছে ৫০০ দিনার পাঠিয়েছিলেন। তাকে তা গ্রহণ করতে রাজি করাতে পারলে দূতকে পুরস্কৃত করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। দূত নানাভাবে চেষ্টা করেও তাকে রাজি করাতে না পেরে তার ঘরের কোণে দিনারের থলেটি রেখে আসেন এবং রাজনীতিবিদদের বলেন যে হজরত তাউস দিনার গ্রহণ করেছেন। কিছুদিন পর কোনো এক কারণে রাজনীতিবিদদ্বয় সুফি তাউসের ওপর অসন্তুষ্ট হন।৷তারা দিনার ফেরত চান। হজরত তাউস ইবনে কায়সান জানান, তিনি কোনো দিনার নেননি। তখন দূতকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি প্রকৃত ঘটনা স্বীকার করেন। দূত যেমনটা রেখেছিল, হজরত তাউসের ঘরের কোণে দিনারের থলেটি ঠিক সেভাবেই পাওয়া গিয়েছিল। এ রকম বহু সুফির অবদানে ইয়েমেনের সুফিবাদ সমৃদ্ধ হয়েছিল। তবে তাদের মধ্যে তিনজনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা হলেন হজরত আহমদ ইবনে আলওয়ান (মৃত্যু ১২৬৬ খ্রিস্টাব্দ), হজরত আবুল গিয়াস ইবনে জামিল (মৃত্যু ১২৫৩ খ্রিস্টাব্দ) ও মুহাম্মদ ইবনে আলী আল আলাভি ওরফে ‘‌আল ফকিহ আল মুকাদ্দাম’। এ তিনজন সুফির সময়ে ইয়েমেনে তরিকা সুফিবাদ ব্যাপক প্রসার লাভ করেছিল। হজরত আহমদ ইবনে আলওয়ান আনুমানিক ১২০৩ সালে ইয়েমেনের ‘‌যুল জানান’ নামের একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এটি বর্তমানে ‘জাবাল হাবাশি’ নামে পরিচিত। তার রচিত বিখ্যাত কিতাবের নাম ‘আল ফুতুহ’। তার অন্যতম শিষ্য ছিলেন হজরত আহমদ ইবনে মুসা ইবনে উজাইল। তিনি ‘‌আল ফকিহ’ নামে সুপরিচিত ছিলেন। তার নামে ইয়েমেনের বিখ্যাত শহর ‘‌বায়তুল ফকিহ’-এর নামকরণ হয়েছে। হজরত আবুল গিয়াস ইবনে জামিল হজরত ইবনে আফলাহর দরবারে কিছুদিন খেদমত করেছিলেন। তারপর তিনি হজরত আল আহদালের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। শিক্ষা সমাপ্ত হলে নিজের খানকাহ স্থাপন করেন। এর নাম ছিল ‘‌বায়তে আতা’।

হাজার বছরের প্রাচীন ইয়েমেন। সংক্ষিপ্ত এ পরিসরে দেশটিতে ইসলাম ধর্মের প্রবেশ ও তৎপরবর্তী যুগের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক