বাংলাদেশের ক্রিকেটে চট্টগ্রামের রয়েছে দীঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। স্বাধীনতার আগে ও পরের সময়ের শফিকুল হক হীরা থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশকের তারকা মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, আকরাম খান। এরপর খান পরিবারের আরো দুই সদস্য নাফীস ইকবাল, তামিম ইকবাল খেলেন জাতীয় দলে। তামিম এখনো অবসর নেননি। বর্তমান তরুণদের মধ্যে নাঈম হাসান ও শাহাদাত হোসেন দিপু খেলেছেন বাংলদেশ জাতীয় দলে। আরো অনেকেই আশেপাশে রয়েছেন। নাঈম তো বর্তমান টেস্ট স্কোয়াডেই রয়েছেন। কিন্তু চট্টগ্রামে চলমান দ্বিতীয় টেস্টের একাদশে জায়গা হয়নি তার। ফলে চট্টগ্রামে খেলছে চট্টগ্রামবিহীন একাদশ!
চট্টগ্রামবাসীর জন্য নিদারুণ আক্ষেপ আর হতাশারই। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে গ্যালারিগুলো প্রায় পুরোটাই ফাঁকা। দল ভালো না করায় র্দর্শক মাঠে আসছে না। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ফ্রি প্রবেশের সুযোগও বন্ধ। এরসঙ্গে যোগ হয়েছে চট্টগ্রামের কেউ না থাকার বিষয়। সব মিলে এই টেস্টটি চট্টগ্রাম বাসীকে খুব একটা টানছেও না।
ক্রিকেট ঐতিহ্যের শহর চট্টগ্রামে ক্রিকেটের এই হাহাকার কেন? জাতীয় দলে প্রতিনিধি নেই কী কারণে? এই প্রশ্ন রাখা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেট দলের অধিনায়ক শফিকুল হক হীরাকে। তিনি এ নিয়ে বণিক বার্তাকে বলেছেন, ‘অবশ্যই দুঃখজনক ঘটনা। তামিম তো একবার বলে খেলবে, আরেকবার বলে কমেন্ট্রি করবে। ভাবসাব তো কিছু বুঝা যায় না ভাই। এখন খেলোয়াড় বের করে আনতে হলে চট্টগ্রামে বিসিবির যে অফিস আছে সেটি পুনর্গঠন করতে হবে। চট্টগ্রাম তো দ্বিতীয় বড় শহর, এখানে সবকিছু থাকা দরকার। চট্টগ্রাম, রংপুর, সিলেট সবখানেই কার্যক্রম থাকবে হবে। দুঃখজনক। চট্টগ্রাম থেকে খেলোয়াড় আসছে না। বোলারও নাই।
ফাস্ট বোলার একটা নিতে গিয়ে স্পিনারকে বাদ দিয়েছে। তবে এবার নাঈমকে (স্পিনার নাঈম হাসান) নিলে লাভ হতো।’
খেলোয়াড় তুলে আনতে হলে প্রত্যেক জেলাকে পুনর্গঠন করে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন সত্তরের দশকের এই ক্রিকেটার। তিনি বলেন, ‘যেমন, চট্টগ্রামে স্টেডিয়াম আছে, সবকিছু আছে কিন্তু বস (আ জ ম নাসির) তো পালিয়ে আছে। সে নাই। কাল তো আকরামকেও (আকরাম খান) দেখলাম না। এখানে একটা অফিস থাকতে হবে এবং যে দায়িত্বে থাকবে তাকে তো কাজ করতে হবে।’
ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক পরিচালক ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীরও স্বীকার করলেন, চট্টগ্রাম টেস্টে চট্টগ্রামের খেলোয়াড় না থাকা দুঃখজনক। তিনি বলেন, ‘আসলে এটা তো দুঃখজনক। এখানে যে প্রোগ্রামগুলো হওয়া দরকার তা হচ্ছে না। যে নজরদারি করা দরকার তা হচ্ছে না, রিজিওনাল ক্রিকেট এসোসিয়েশন সক্রিয় করা হয় নাই। ক্রিকেট একাডেমি করার দাবি ছিল, তা-ও হয় নাই। ভালো ও মানসম্মত ক্রিকেটার তৈরির জন্য রাজশাহীতে যেমন বিভিন্ন একাডেমি আছে তেমনি চট্টগ্রামেও কিছু করা প্রয়োজন। ওরা এগিয়ে গেছে। আমাদের এদিকে ক্রিকেটের কাঠামোগত কোনো উন্নয়ন হয় নাই। এটা আসলেই দুঃখজনক। ক্রিকেট বোর্ডে যারা আছেন তাদের যদি তেমন নজরদারি না থাকে, কোনো প্রোগ্রাম না থাকে তাহলে এখান থেকে খেলোয়াড় বের হওয়া কঠিন।’

চট্টগ্রাম টেস্টে খেলানো হয়নি বন্দরনগরীর ছেলে নাঈম হাসানকে। ছবি: বিসিবি
‘আরেকটি সমস্যা হলো রাজশাহী, খুলনা, রংপুরের খেলোয়াড়রা খেলায় সময় দিতে পারছে। এখানের ছেলেরা একটা টিউশিনি করলে ৫-১০ হাজার টাকা পায়। তাই তাদের ফোকাস ওদিকে হয়ে গেছে আরকি। এ কারণে খেলোয়াড় বের হয়ে আসছে না’-বলেন তিনি।
চট্টগ্রামে সংগঠক বেশি, ধনী মানুষজনও বেশি। এরপরও ক্রিকেট নিয়ে কাজ না হওয়াটা দুঃখজনক বলে মনে করেন তিনি। তার কথায়, ‘এটা দুঃখজনক। তবে এটা ঠিক, চট্টগ্রাম জেলায় না হলেও বিভাগ থেকে কিন্তু এখন ৫-৬ জন খেলোয়াড় জাতীয় দলে কিংবা আশেপাশে আছেন। বিভাগ হিসাব করলে খারাপ নয়, তবে চট্টগ্রাম জেলা থেকে খেলোয়াড় বের হয়ে আসছে না।’
তিনি এখানে কক্সবাজারের মুমিনুল হক সৌরভ, ফেনীর মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের কথা বলেছেন।
সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর মনে করেন, টোটাল কাঠামোয় ও মন মানসিকতায় পরিবর্তন আসতে হবে। তার কথায়, ‘চিন্তা চেতনায় পরিবর্তন না এলে শুধু চেয়ারের পরিবর্তন এলেই হবে না। বোর্ডে যারা আছেন তারা যদি প্রোগ্রামগুলোকে কার্যকর না করেন কিংবা কীভাবে অঞ্চলে আরো কাজ করা যায়, তা নিয়ে না ভাবেন, তাহলে বাইরে থেকে ক্রিকেটার উঠে আসা কঠিন। এইসব নিয়ে বোর্ড যদি না ভাবে, তাহলে ক্রিকেটার পাওয়া মুশকিল হবে।’
জাতীয় দলের বিবর্ণ পারফরম্যান্স নিয়েও তিনি হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেটটা সেই অবস্থায় নেই। আমরা পঞ্চপান্ডবের কথা বলি। সেখান থেকে এখন কোথায় নেমেছে। আমরা মানসম্মত খেলোয়াড় তৈরি করতে পারি নাই। শুধু বলি ক্রিকেট বোর্ডে হাজার কোটি টাকা আছে। এটা বলে আত্মতুষ্টিতে ভুগি। কিন্তু এই টাকা কী কাজে ব্যয় হচ্ছে কিংবা ক্রিকেটের উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে কিনা? কিংবা ক্রিকেটের পাইপলাইন তৈরিতে কীভাবে এই টাকা খরচ হবে, তা ভাবা হচ্ছে কি?’
তিনি অভিযাগ করে বলেন, ‘যারা বোর্ড পরিচালক ছিলেন তারা বেশিরভাগই মাফিয়া ছিলেন, সংগঠন কোথায় বলেন না। মাহবুব (মাহবুব আনাম) ভাইদের মতো হাতেগোনা দু-একজন আছেন। এছাড়া যারা বোর্ডে যায় রাজনৈতিক পরিচয়ে যায়। জেলা ও বিভাগে যারা কাজ করে তাদের সাথে এদের কোনো সম্পৃক্ততা আছে? এরা রিজিওনাল স্বার্থ বুঝতে কী করে? রিজিওনাল স্বার্থে কী কাজ করছে বলেন? দুর্জয় (নাইমুর রহমান) বলেন, সোহেল (শেখ সোহেল) বলে তারা ঢাকার জন্য, খুলনার জন্য কী কাজ করছে বলেন। তারা তো ঢাকায় বসে থাকতো। তারা কী কোনো জেলায় গেছে। জেলার সাথে সম্পর্ক তাদের নেই। কোন জেলায় সুযোগ সুবিধা কী আছে, কী নাই সেটা তারা জানে না। উইকেটের সমস্যা আছে কিনা, লিগ হচ্ছে কিনা, আথিক সমস্যা আছে কিনা, তা কে দেখবে।’
সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘খেলোয়াড়ের সমস্যা কী, ক্রিকেটের অবকাঠামো কোথায় সমস্যা আছে এটা দেখার দায়িত্ব যাদের তারা কী দেখছে? এগুলো দেখার মতো সংগঠক কি তারা? পরিবর্তন হলেই আর কী। আগের যারা ছিল তাদের বদলে যারা আসবে তারা তো এটাই করবে। কারণ যোগ্য সংগঠকের অভাব। ক্রিকেট বোর্ড এখন সোসাল স্ট্যাটাসের জায়গা। সাংগঠনিক কাজ এখন কম নয়। আমরা যখন বোর্ডে পরিচালক ছিলাম তখন এমন শকুনের নজর ছিল না, এখন সেখানে শকুনের নজর পড়ছে আরকি। এখন সংগঠকের দরকারও নেই, এগুলোর কোনো মূল্যায়নও নাই।’
তিনি মনে করেন, ক্রিকেটে আমাদের আরো ভালো জায়গায় যাওয়ার কথা ছিল। এই ক্রিকেট সংগঠক বলেন, ‘অবশ্যই আমাদের আরো ভালো জায়গায় যাওয়ার কথা ছিল। আমাদের জাতীয় দল যে সুবিধা পায় এটা এখন জেলা পর্যায়ে চলে আসা উচিত ছিল। ১৫ হাজার টাকা বেতনের একজন কোচ দিয়ে আপনি ৩০ বছর ধরে চালাচ্ছেন। কোন জেলায় লিগ হচ্ছে, কোথায় হচ্ছে না, তা জানেন না। কোথায় নজর দিতে হবে, কোথায় খেলোয়াড় তৈরি হতে পারে, কোথাও কোনো নজরদারি নেই।’










