ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবের মালিকানা পরিবর্তন যেন এখন খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এই তো কয়েকদিন আগের কথা, চেলসির মালিকানা কিনে নিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী টড বোয়েলির নেতৃত্বাধীন একটি ব্যবসায়িক গ্রুপ (ক্লিয়ারলেক ক্যাপিটাল, মার্ক ওয়াল্টার ও হ্যানসজর্গ ওয়েস কোম্পানি)। চেলসির মতো লিভারপুলও এখন সে পথেই হাঁটছে। সম্প্রতি ক্লাবটির মালিক ফেনওয়ে স্পোর্টস গ্রুপ (এফএসজি) তাদের শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে।

খেলাধুলাবিষয়ক ওয়েবসাইট দ্য অ্যাথলেটিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে প্রায় ৩০ কোটি পাউন্ডে লিভারপুল ফুটবল ক্লাব কিনেছিল এফএসজি। এক যুগ ধরে নিজেদের সেরা সময় পার করেছে ক্লাবটি। ২০১৯ সালে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগের শিরোপা ঘরে তোলে ‘অল রেড’রা। ২০২০ সালে ৩০ বছর পর প্রিমিয়ার লিগ শিরোপাও জিতে নেয় ইয়ুর্গেন ক্লোপের অধীনে। এ সময় এফএ কাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপ এসেছে অ্যানফিল্ডে। ধারণা করা হচ্ছে, সাফল্যের শীর্ষে থাকা জনপ্রিয় এ ক্লাবটির শেয়ারের দাম উঠতে পারে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি পাউন্ডেরও বেশি।

এদিকে ক্লাবটি বিক্রির জন্য নতুন শেয়ারহোল্ডার খোঁজা হচ্ছে, মালিকপক্ষের এমন বক্তব্য প্রকাশ্যে আসায় লিভারপুলের ভবিষ্যতের নেতৃত্ব কিছুটা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, এফএসজি ক্লাবটিতে নিজেদের খরচের ভার কমাতে চায়। এর পাশাপাশি বাইরে থেকে বড় বিনিয়োগ পাওয়ার আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

সম্প্রতি এফএসজি জানিয়েছে, তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে প্রস্তাব এসেছে, যারা লিভারপুলের মালিকানার অংশ কিনতে আগ্রহী। এফএসজি বিবৃতিতে আরো বলেছে, আমরা আগেও বলেছি, যদি সবকিছু সঠিকভাবে এগোয় ও নতুন শেয়ারহোল্ডাররা যদি শর্ত মেনে বিশেষ আগ্রহ দেখায়, তবে লিভারপুলের স্বার্থেই সেটা বিবেচনা করা হবে।

এফএসজির মালিকানাধীন কতটা সফল লিভারপুল: আমেরিকান কোম্পানি এফএসজি বলছে, তারা মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে লিভারপুলের জন্য সাফল্য নিয়ে আসতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইংলিশ ক্লাবটির দায়িত্ব নেয়ার পরে ১২ বছরে ৮টি ট্রফি জিতেছে তারা। এর মধ্যে জার্মান কোচ ইয়ুর্গেন ক্লোপের অধীনে জিতেছে ৬টি। ২০১৫ সালে কোচের দায়িত্ব নেন ক্লোপ। তার অধীনে ক্লাবের সার্বিক পরিবেশে পরিবর্তন আসে। প্রায় ৩০ বছর পর একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি ও তাদের প্রথম লিগ শিরোপা জিততে সক্ষম হয় ক্লাবটি। এ সময় সবচেয়ে দামি ডিফেন্ডার ভার্জিল ফন ডাইক ও গোলকিপার অ্যালিসন বেকারের মতো খেলোয়াড় দলে ভিড়িয়েছে লিভারপুল। একই সঙ্গে পেয়েছে মোহাম্মদ সালাহর মতো বিশ্বমানের খেলোয়াড়।

যে কারণে বিক্রি হচ্ছে লিভারপুল: ইউনিভার্সিটি অব লিভারপুলের ফুটবল অর্থনীতি বিষয়ের প্রভাষক কিয়েরান মাগুইরে বলেন, লিভারপুল দুই-তিন বছর ধরে কিছু অস্থায়ী প্রকল্প-পরিকল্পনা করে তাদের মার্কেট যাচাই করার চেষ্টা করেছে। এখন এর দায়িত্ব নেয়ার আগ্রহী কেউ কি আছে?

এর আগে চেলসি অর্থনৈতিকভাবে খুব সুবিধাজনক অবস্থানে না থাকলেও বিক্রির সময় প্রায় দুই শতাধিক আগ্রহী ক্রেতা ছিল। এফএসজি বলছে, লিভারপুল একটি খুব বড় ব্র্যান্ড, তারা প্রাথমিক ৩০ কোটি পাউন্ডের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুনাফা করার লক্ষ্য সম্পন্ন করবে। আমি মনে করি, এফএসজি হয়তো লিভারপুলের সম্পূর্ণ শেয়ার বিক্রির চেষ্টা করবে বা আগামী কয়েক বছরে ক্লাবটি থেকে আরো বেশি অর্থ ও আরো বেশি ভালো অবস্থানে যাওয়ার চেষ্টা করবে।

এফএসজি লিভারপুলকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছে এবং খেলোয়াড় নিয়োগ ও তাদের ধরে রাখার বিষয়ে ‘মানিবল’ ধারণা প্রবর্তন করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত চৌকস প্রমাণিত। ফলে ক্লাবটি গত সাত-আট বছরে ম্যানচেস্টার সিটি, ম্যানইউ ও চেলসির তুলনায় প্রায় হাফ বিলিয়ন পাউন্ড কম খরচ করেও সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখতে পেরেছে। সমর্থকদের জন্য চিন্তার বিষয় হলো ভবিষ্যতের লিভারপুল মালিকরা এফএসজির পরিকল্পনার পুনরাবৃত্তি করতে পারবেন তো?

লিভারপুল কিনবে কে: মাগুইরে মনে করেন, চলতি মৌসুম শেষ হওয়ার আগে লিভারপুল বিক্রির সম্ভাবনা সর্বোচ্চ ৬০ ভাগ। তিনি বলেন, খুব সম্ভবত আমেরিকান বিনিয়োগকারীরা ক্লাবটির দিকে নজর রাখছে। পাউন্ডের মূল্য বর্তমানে কম থাকায় চুক্তি আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে, যদি বিনিয়োগকারীরা বিদেশ থেকে আসে।

প্রিমিয়ার লিগের প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব চেলসি মে মাসে মার্কিন বিনিয়োগকারী টড বোয়েলি ও প্রাইভেট ইক্যুইটি ফার্ম ক্লিয়ারলেক ক্যাপিটালের নেতৃত্বে একটি কনসোর্টিয়ামের কাছে ৪২৫ কোটি পাউন্ডে বিক্রি হয়েছিল। মাগুইরে বলেন, লিভারপুরের দাম ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি পাউন্ডের মধ্যে হবে।

লিভারপুল সাপোর্টার্স ইউনিয়ন ‘স্পিরিট অব শ্যাঙ্কলি’ দাবি করছে, তাদের সঙ্গে পরামর্শ করেই যেন সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।