স্টিফেন ইউস্তাকিওর জন্য রোববারের রাতটি ছিল ঠিক তেমনই। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মা ও বাবাকে হারানো কানাডার এ মিডফিল্ডার যেন সব শোককে এক মুহূর্তে রূপ দিলেন আনন্দে। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে তার দুর্দান্ত হাফ-ভলি গোলেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে কানাডা। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশ রাউন্ড পেরিয়ে শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিয়েছে তারা।
লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে ম্যাচজুড়ে গোলের দেখা মিলছিল না। দক্ষিণ আফ্রিকা শুরু থেকেই অতিরিক্ত সময়ের লক্ষ্য নিয়ে রক্ষণে দেয়াল তুলে দাঁড়ায়। কানাডা একের পর এক আক্রমণ চালিয়েও সেই দেয়াল ভাঙতে পারছিল না। কিন্তু ৯২ মিনিটে বক্সের বাইরে বল পেয়ে ইউস্তাকিও যেভাবে জোরালো শটে বল জালে পাঠান, তাতে ডাইভ দিয়েও গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামসের কিছুই করার ছিল না। সেই এক গোলেই ফেটে পড়ে পুরো স্টেডিয়াম।
গোলের পর আবেগ লুকাতে পারেননি ইউস্তাকিও। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস হারাইনি। লড়াই চালিয়ে গেছি। আমি যখন শট নিয়েছিলাম, মনে হয়েছিল পুরো কানাডা আমার সঙ্গে শটটি নিয়েছে। সবাই যেন একটু একটু করে শক্তি দিয়েছে, আর বলটা জালে চলে গেছে।’
কানাডার কোচ জেসি মার্শ অবশ্য ম্যাচ শেষে সবচেয়ে বেশি কথা বলেছেন এ মিডফিল্ডারের জীবনসংগ্রাম নিয়ে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে মাকে এবং ২০২৪ সালের মে মাসে বাবাকে হারান ইউস্তাকিও। সেই কঠিন সময় পেরিয়ে জাতীয় দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় হয়ে ওঠা এ ফুটবলারের জন্য গোলটি বিশেষ অর্থ বহন করে বলেই মনে করেন কোচ।
মার্শ বলেন, ‘আমাদের দলে অনেক অসাধারণ মানুষ আছে। কিন্তু এমন মুহূর্তের সবচেয়ে বেশি প্রাপ্য যদি কেউ হয়, সেটা স্তেফান। আমি বিশ্বাস করি, কোথাও না কোথাও থেকে তার মা-বাবা এ গোলটি দেখেছেন। তারা নিশ্চয়ই গর্বিত হয়েছেন।’
কোচের ভাষায়, ইউস্তাকিওই দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফুটবলারদের একজন। শান্ত থাকা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া এবং নেতৃত্ব দেয়ার যে দর্শন কানাডা গড়ে তুলতে চেয়েছে, তার প্রতিচ্ছবি এ মিডফিল্ডার। যোগ করা সময়ের চাপের মধ্যেও ঠাণ্ডা মাথায় শট নেয়াটাই তার প্রমাণ।
গোলের আগে অবশ্য হতাশাই ছিল কানাডার সঙ্গী। প্রথমার্ধের শেষ দিকে কর্নার থেকে মোয়িজ বোম্বিতোর হেড গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন অব্রি মোদিবা। ফিরতি বলে তাজন বুচানানের শট বুক দিয়ে ঠেকান উইলিয়ামস। কিছুক্ষণ পর রিচি লারিয়া পেনাল্টি এলাকার ভেতরে পড়ে গেলেও ভিডিও সহকারী রেফারির (ভিএআর) পর্যালোচনার পরও পেনাল্টি মেলেনি। দ্বিতীয়ার্ধেও তানি ওলুওয়াসেয়ির শট এবং জনাথন ডেভিডের ফিরতি প্রচেষ্টা অসাধারণ রক্ষণে ঠেকিয়ে দেয় দক্ষিণ আফ্রিকা।
অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা পুরো ম্যাচেই খুব কম ঝুঁকি নেয়। মনে হচ্ছিল তারা অতিরিক্ত সময় কিংবা টাইব্রেকারের অপেক্ষাতেই আছে। কিন্তু ইউস্তাকিওর বজ্রকঠিন শট সেই পরিকল্পনা ভেঙে দেয়। শেষ বাঁশি বাজার আগে কয়েকটি মরিয়া আক্রমণ করলেও সমতায় ফিরতে পারেনি আফ্রিকার প্রতিনিধিরা।
গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে প্রথমবার নকআউটে ওঠার পর মাত্র তিনদিনের বিশ্রামে এ ম্যাচ খেলতে নেমেছিল কানাডা। ইনজুরি কাটিয়ে শুরুর একাদশে ফেরেন বোম্বিতো। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচ খেলেন অধিনায়ক আলফোনসো ডেভিস, যিনি কানাডার আক্রমণে নতুন গতি যোগ করেন।
এখন কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আগামী ৪ জুলাই হিউস্টনে নেদারল্যান্ডস অথবা মরক্কোর মুখোমুখি হবে কানাডা। মার্শের ভাষায়, ‘আমরা এবার এক দৈত্যের বিপক্ষে খেলব। তবে ভয় নয়, জয়ের পথ খুঁজতেই মাঠে নামব।’ চারবারের চেষ্টায় প্রথমবার নকআউটে ওঠা দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হলো হতাশায়। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোল ঠেকাতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে মিডফিল্ডার তেবোহো মোকোয়েনা বলেন, ‘আর তিনটি পদক্ষেপ এগোতে পারলে হয়তো শটটা আটকাতে পারতাম।’
এ ম্যাচই সম্ভবত দক্ষিণ আফ্রিকার ৭৪ বছর বয়সী কোচ হুগো ব্রুসের শেষ বিশ্বকাপ। পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের কোচিং ক্যারিয়ারের ইতি টানার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক দিনে ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব। তবে নিশ্চিতভাবেই এটাই আমার শেষ বিশ্বকাপ।’









