বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার টেস্ট দ্বৈরথের যাত্রা ২০০১ সালে এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ দিয়ে। এরপর আরো ২৩টি টেস্টে মুখোমুখি হয়েছে দুটি দেশ। মাঝের এ সময় মোট ১১টি সিরিজে মুখোমুখি হয়ে সিংহলিজদের কখনই হারাতে পারেনি টাইগাররা। সর্বশেষ নিজেদের মাঠে ১-০ ব্যবধানে সিরিজ হারল বাংলাদেশ। ২০ বছরের চেষ্টায় লংকানদের টেস্ট সিরিজে হারাতে পারেনি বাংলাদেশ। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সাফল্য ১-১-এ ড্র।

বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম ৫টি সিরিজে কোনো ম্যাচই হারেনি শ্রীলংকা। ২০০২ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত এই ৫ সিরিজে মোট ১১টি ম্যাচ খেলেছে দুই দেশ। অবশেষে ২০১৩ সালে গিয়ে লংকানদের বিপক্ষে প্রথম সফলতা পায় বাংলাদেশ। গল টেস্টে মুশফিকুর রহিমের ডাবল সেঞ্চুরি ও নাসির হোসেনের সেঞ্চুরিতে দাপট দেখিয়ে ড্র করে অতিথিরা। যদিও কলম্বোয় পরের টেস্ট ঠিকই জিতে ১-০তে সিরিজের ট্রফি রেখে দেয় সিংহলিজরা।

এরপর সিংহলিজদের কোনো সিরিজে হারাতে না পারলেও বাংলাদেশের উন্নতি ঘটতে থাকে। তার প্রমাণ, ২০১৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত খেলা ৬ সিরিজের কোনোটিতেই হোয়াইটওয়াশ হয়নি বাংলাদেশ। মাঝের এ সময় ৫টি সিরিজে একটি করে ম্যাচ ড্র করতে সমর্থ হয় বাংলাদেশ। আর ২০১৭ সালের মার্চে কলম্বোয় শ্রীলংকার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো কোনো টেস্ট জয়ের কৃতিত্ব দেখায় বাংলাদেশ। গলে শ্রীলংকা জেতায় সেবার সিরিজটা ড্র হয় ১-১-এ।

শ্রীলংকার কাছে এরপর আরো তিনটি সিরিজে ১-০তে হারে বাংলাদেশ। তবে ২০১৪ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ঘরের মাঠে তিনটি সিরিজে তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এ সময় প্রতিটি সিরিজেই চট্টগ্রাম টেস্ট ড্র করার পর ঢাকায় এসে হেরে যায় বাংলাদেশ।

এবার শ্রীলংকার বিপক্ষে সিরিজ জয়ের দারুণ সুযোগ ছিল বাংলাদেশের। শীর্ষ সারির পেস বোলাররা দলে না থাকলেও তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান ও মুমিনুল হকসহ দলের সেরা খেলোয়াড়রা ঠিকই ছিলেন। চট্টগ্রামে ড্রয়ের পর ঢাকায় প্রত্যাশা বাড়ে। তবে লংকানদের বিপক্ষে আগের দুই হোম সিরিজের ধারাবাহিকতায় এবারো ঢাকা টেস্টে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয় মুমিনুলের দল।

এবারের ঢাকা টেস্টে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স এতটাই হতশ্রী ছিল যে ক্রিকেট অনুরাগী ও ক্রিকেটাররা তা বহু দিনেও হয়তো ভুলতে পারবেন না। প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে ২৫ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বসে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে ২৩ রানে নেই ৪ উইকেট! প্রথম ইনিংসে মুশফিক ও লিটন দাসের কল্যাণে ভরাডুবি থেকে উঠে এসে শেষ পর্যন্ত বোর্ডে ৩৬৫ রান জড়ো করতে সমর্থ হয় স্বাগতিক দল। আর দ্বিতীয় ইনিংসে লিটন দাস ও সাকিবের হাফ সেঞ্চুরিতে ভর করে ১৬৯ রান তুলতে পারে স্বাগতিকরা। এতে মাত্র ২৯ রানের টার্গেট পায় শ্রীলংকা। মাত্র ৩ ওভারের মধ্যে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় সিংহলিজরা।

বাংলাদেশের জন্য বিভীষিকাময় এই টেস্টে হয়েছে অসংখ্য রেকর্ড। দ্বিতীয় দিন সকালে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে ৫১৩ বল মোকাবেলা করেন মুশফিক ও লিটন। রান ও বল উভয় দিক থেকেই এটা বাংলাদেশের তৃতীয় সেরা জুটি। ২০১৪ সালে গল টেস্টে মোহাম্মদ আশরাফুল ও মুশফিক ২৬৭ রান করেছিলেন ৫১৮ বল খেলে, আর গত বছর পাল্লেকেলেতে নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুমিনুল হক ২৪২ রান করেছিলেন ৫১৪ বল খেলে।

২০১৭ সালে ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পঞ্চম উইকেটে ৩৫৯ রান করেছিলেন মুশফিক ও সাকিব। আর ২০১৫ সালে খুলনায় পাকিস্তানের বিপক্ষে উদ্বোধনী জুটিতে ৩১২ রান তুলেছিলেন তামিম ও ইমরুল কায়েস। এরপরই মুশফিক ও লিটন।

ষষ্ঠ উইকেটে এটা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আর বিশ্বে ১৫তম সর্বোচ্চ সংগ্রহ। ষষ্ঠ উইকেটে ৩৯৯ রান করে রেকর্ডের অধিকারী ইংল্যান্ডের বেন স্টোকস ও জনি বেয়ারস্টো। ২০১৬ সালে কেপটাউনে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে বিশাল রানের এ জুটি গড়েছিলেন তারা।

বাংলাদেশ ইনিংসে শূন্য রানে আউট হয়েছেন তামিম ইকবাল, মাহমুদুল হাসান জয়, সাকিব আল হাসান, মোসাদ্দেক, খালেদ ও এবাদত। এর মধ্য দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি শূন্য রানে আউট হওয়ার রেকর্ড স্পর্শ করে বাংলাদেশ। টেস্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে ৬ ব্যাটারের শূন্য রানে আউট হওয়ার এটি ষষ্ঠ নজির। এর আগে ৬ ব্যাটার শূন্য রানে আউট হয়েছেন, এমন নজির আছে ৫টি এবং এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের নামও। ২০০২ সালে ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের ৬ ব্যাটার আউট হন শূন্য রানে। এছাড়া লজ্জার এই রেকর্ড আছে পাকিস্তান (১৯৮০, প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ), দক্ষিণ আফ্রিকা (১৯৯৬, প্রতিপক্ষ ভারত), ভারত (২০১৪, প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড) ও নিউজিল্যান্ডের (২০১৮, প্রতিপক্ষ পাকিস্তান)।

লজ্জার রেকর্ডের ইনিংসেই কিনা গৌরবও আছে বাংলাদেশের। সর্বোচ্চ ৬ ব্যাটারের শূন্য রানে আউট হওয়ার যত কীর্তি আছে তার মধ্যে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহটা এখন বাংলাদেশের দখলে। ২০১৪ সালে ম্যানচেস্টারে আগের সর্বোচ্চ ১৫২ রান করেছিল ভারত।