১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকারের সঙ্গে জনগণের ন্যূনতম সম্পৃক্ততা ছিল না। জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও দমনপীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হয়েছিল সরকারকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সালে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
রোববার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজ’-এর পঞ্চম পর্বে তিনি এসব কথা বলেন। ‘চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ: স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট’ শীর্ষক এ সেমিনারে আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন তিনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের জনসংযোগ বিভাগের জুবায়ের ইবনে কামাল এসব তথ্য জানান।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, একটি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের সরকার তার কোনোটিই রক্ষা করেনি। জনগণের সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্কহীন একটি সরকার গঠন করা হয়েছিল। এ কারণে নাগরিকদের ওপর দমন-পীড়ন চালাতে প্যারামিলিটারি বাহিনী গঠন করা হয়েছিল।
তিনি জানান, ১৯৭২ সালে বিশ্ববাজারে প্রতি মেট্রিক টন চালের দাম ছিল ১৪৭ ডলার। অথচ বাংলাদেশে একই পরিমাণ চালের দাম ছিল ৩১৬ ডলার। এ থেকেই বোঝা যায়, তখন বাজার নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির কোনো ব্যবস্থা কার্যকর ছিল না। শুধু অর্থনীতি নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রায় সব ক্ষেত্রেই তৎকালীন সরকার ব্যর্থ হয়েছিল। তারা জনগণের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করতো না।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের শাসনামলের সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকারের তুলনা করে তিনি বলেন, ক্ষমতায় টিকে থাকতে উভয় সময়েই বিরোধী মতের মানুষের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে। সরকারের বিরোধিতা করলেই হত্যার শিকার হতে হয়েছে। শেখ হাসিনার ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের শাসনামলও মূলত ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের শাসনব্যবস্থারই সম্প্রসারণ ছিল।
তিনি আরও বলেন, কেউ কেউ বলছেন ডিসেম্বরে তারা দেশে ফিরে আসতে চান। কিন্তু এ দেশের মাটি, ঘাস, পানি ও মানুষের সঙ্গে তাদের কখনোই সম্পর্ক ছিল না। তারা আর কখনো এ দেশে ফিরে আসতে পারবেন না।
সেমিনারে লেখক ও পানাম ইনস্টিটিউটের ট্রেজারার আসিফ ইকবালের দাবি, স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকটে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। পৃথিবীর অন্য কোনো অর্থনৈতিক সংকটে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির নজির নেই। তাই এটিকে শুধু সংকট না বলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় বলা উচিত।
তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে সরকার পতনের পর জনগণের মধ্যে শোকের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। কারণ, এর মাত্র কয়েক মাস আগেই ক্ষুধার যন্ত্রণায় মানুষের মৃত্যুর দগদগে স্মৃতি ছিল। দুই মাসের মাথায় তারাই সিপাহিদের সঙ্গে রাস্তায় নেমে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। জনগণ আগের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আর ফিরে যেতে চায়নি।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে সরকারপ্রধানের সাধারণ মানুষের সঙ্গে র্যালিতে অংশ নেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে আসিফ ইকবাল বলেন, এটি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার একটি পদ্ধতি। নাগরিকরা সরকারের কাছে প্রত্যাশা করে। সেই প্রত্যাশা পূরণে সরকারপ্রধানকে জনগণের কাছে যেতে হবে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় এমন সম্পৃক্ততা দেখা যায়নি।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. নাহিয়ান বিন খালেদ বলেন, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের অন্যতম বড় কারণ ছিল খাদ্যনিরাপত্তা ও সম্পদ সুবিধাভোগী শ্রেণির হাতে কুক্ষিগত থাকা। সে সময়ের রেশন কার্ড একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের হাতে চলে গিয়েছিল। ফলে গ্রামের কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ রেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।
তিনি বলেন, মজুতদাররা চাল মজুত করে রেখেছিল। কিন্তু তাদের দৌরাত্ম্য ও বাজারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছিল। এর ফলে দুর্ভিক্ষ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে। সভাপতির বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহসান মাহমুদ বলেন, সে সময় বৈশ্বিক কিছু সংকট থাকলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনাই ছিল ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের মূল কারণ। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের শাসনামলে স্বজনপ্রীতি ও পরিবারতন্ত্রের কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। চাল-গম থেকে শুরু করে ত্রাণের কম্বল পর্যন্ত কারা পাবে, তা শাসকগোষ্ঠী নির্ধারণ করে দিতো।
দুর্ভিক্ষ নিয়ে শিল্প-সাহিত্যে পর্যাপ্ত আলোচনা না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, রফিক আজাদের ‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাব’ কবিতা ছাড়া ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য আলোচনা খুব একটা পাওয়া যায় না। এ নিয়ে গান, মঞ্চনাটক কিংবা শিল্পকলার অন্যান্য মাধ্যমেও কাজ হয়েছে খুব কম। এমনকি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষবিষয়ক চিত্রকর্মেরও পর্যাপ্ত প্রদর্শনী হয় না। এসব শিল্পকর্ম সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। লেখক ও গবেষক তুহিন খান সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন। এতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, আইনজীবী, শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।









