বার্সেলোনায় চুক্তি নিয়ে জটিলতার কারণে অনেকটা বাধ্য হয়েই ২১ বছরের মায়া কাটিয়ে ২০২১ সালের আগস্টে প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি) ক্লাবে নাম লিখিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। তার সেই দলবদলে অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। অবশ্য তাকে নিয়ে স্বপ্নপূরণ হয়নি ফরাসি ক্লাবটির। মেসি, নেইমার ও এমবাপ্পে মিলেও পিএসজিকে চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা এনে দিতে পারেননি। পারবেন কী করে? পিএসজির দুই বছরের অধ্যায়টা মোটেও উপভোগ করেননি মেসি, তিনি সেখানে সুখী ছিলেন না বলে দাবি করেছেন। প্যারিস জায়ান্টদের হয়ে দুই বছরের অধ্যায়ে ৭৬ ম্যাচ খেলে ৩২ গোল করেছেন মেসি, অ্যাসিস্ট করেন ৩৫ গোলে।

পিএসজি ছাড়ার পর মেসি বহুবার বলেছেন, তার সময়টা ভালো কাটেনি প্যারিসে। শুক্রবার অ্যাপল মিউজিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সে কথারই পুনরাবৃত্তি করলেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) দল ইন্টার মায়ামিতে খেলা ৩৭ বছর বয়সী মেসি বলেছেন, ‘প্যারিসে আমার সময় যেমন কেটেছে, এরপর ইন্টার মায়ামির সঙ্গে চুক্তি করাটা আমার জন্য ছিল একটি সুযোগ। এ সিদ্ধান্ত আমাকে নিতেই হতো, কারণ বার্সেলোনা ছাড়তে হয়েছে আমাকে, এরপর ওই দুটি বছর (পিএসজিতে) আমি উপভোগ করতে পারিনি। প্রতিদিনের নানা কিছু, ট্রেনিং সেশন, ম্যাচ, কিছুতেই খুশি ছিলাম না। সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেয়া আমার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল। তখনই আমি ইন্টার মায়ামিতে যাওয়ার কথা ভাবি, কারণ ক্লাবটি বেড়ে উঠছিল। ক্লাবটিও ছিল নতুন, মাত্রই কিছু বছর হলো।’

ডেভিড বেকহ্যামদের ইন্টার মায়ামিতে গিয়ে মুখে হাসি ফিরেছে আটবারের ব্যালন ডি’অর চ্যাম্পিয়নের। সেখানে তিনি সতীর্থ হিসেবে পেয়েছেন বার্সেলোনার সাবেক সতীর্থ লুই সুয়ারেজ, সার্জিও বুসকেটস ও জর্ডি আলবাকে। আর হেড কোচ হিসেবে আছেন বার্সেলোনা ও আর্জেন্টিনায় তার সাবেক সতীর্থ হাভিয়ের মাশচেরানো। মেসির জীবন সহজ করে দেয়ার জন্য আর কী চাই!

বার্সেলোনার হয়ে ১০টি লা লিগা, চারটি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ, তিনটি ক্লাব বিশ্বকাপ, সাতটি কোপা ডেল রেসহ অনেক শিরোপা জয়ের পর কাতালানদের ছেড়ে নাম লেখান পিএসজিতে। আর্থিক নানা জটিলতার কারণেই মেসিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় বার্সেলোনা। মেসিও বিদায় নিতে চাননি। ফলে বিদায়বেলায় অঝরে কেঁদেছেন বার্সার ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ এ খেলোয়াড়। দুই পক্ষ না চাইলেও বিচ্ছেদ হয়েই যায়। দুই বছরের চুক্তিতে তিনি পাড়ি জমান পিএসজিতে।

ফরাসি ক্লাবের হয়ে দুবার লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন, একবার জিতেছেন ফ্রেঞ্চ কাপ। তবে মেসিকে নিয়ে পিএসজির চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জয়ের স্বপ্ন পূরণ হয়নি।

পিএসজিতে থাকাকালেই ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ শিরোপা জয় করেন মেসি। ১৮ ডিসেম্বর রোমাঞ্চকর ফাইনালে আর্জেন্টিনা হারিয়ে দেয় মেসির পিএসজি সতীর্থ কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্সকে। মেসির অসাধারণ পারফরম্যান্সে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতে নেয়। এতে পিএসজি সমর্থকদের আক্ষেপ যেন আরো বেড়ে যায়। সমর্থকদের একটি অংশ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিততে না পারায় তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। ক্লাবের অনুমতি না নিয়ে অনুশীলন সেশন বাদ দিয়ে সৌদি আরবে ব্যক্তিগত সফরে যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞাও পেতে হয়। সম্পর্ক তলানিতে পড়ে যায়, যা আর জোড়া লাগেনি। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি তিনি পিএসজি ছেড়ে নাম লেখান ইন্টার মায়ামিতে।

মেসি বলছিলেন, পিএসজির উল্লেখযোগ্য সমর্থকের সঙ্গে তার সম্পর্কে ভাঙন ধরে এবং তাকে নিয়ে তাদের ভাবনায়ও পরিবর্তন আসে। মেসি চলে যাওয়ার পর অবশ্য পিএসজির প্রতি যথাযথ সম্মান না দেখানোর অভিযোগ তুলে তার সমালোচনা করেন ফরাসি ক্লাবটির চেয়ারম্যান নাসের আল-খেলাইফি।

পিএসজি মেসির কাছে এখন ইতিহাস। নতুন ক্লাবে তিনি যেমন পাচ্ছেন ভালোবাসা, তেমনি সাফল্যও আসছে। গত মৌসুমে প্রথমবারের মতো সাপোর্টার্স শিল্ড জিতেছে মায়ামি, মেসি হয়েছেন মৌসুমের সেরা ফুটবলার। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এ খেলোয়াড় যোগ দেয়ায় ইন্টার মায়ামির আয় বেড়ে গেছে রেকর্ড পরিমাণে। মেসি আছেন বলেই স্পন্সর প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ইন্টারের সঙ্গে চুক্তি করতে মরিয়া। মেসি যে ম্যাচে খেলেন সেই ম্যাচে প্রতিপক্ষের মাঠেও গ্যালারি থাকে কানায় কানায় পূর্ণ। লাভবান হয়েছে মেজর লিগ সকারও (এমএলএস)। একসময়ের অখ্যাত এই লিগের এখন খোঁজখবর রাখছেন সারা বিশ্বের ফুটবল অনুরাগীরা।

এ লিগকে জমজমাট করার আশা মেসির। তিনি বলেন, ‘এমএলএস এখন অনেকটা পরিণত হয়েছে এবং আরো বেড়ে উঠছে। আশা করি, এ অগ্রগতি থেমে যাবে না এবং ইন্টার মায়ামিকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে অন্য ক্লাবগুলোও এ আসরকে সমৃদ্ধ করে তুলবে।’

ইন্টার মায়ামিতে নাম লেখানোর পরপরই এ ক্লাব ও লিগটিকে বেড়ে ওঠায় সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন মেসি। এখন পর্যন্ত ইন্টারের হয়ে ৪২ ম্যাচ খেলে ৩৬ গোল করেছেন মেসি, অ্যাসিস্ট করেছেন আরো ২০ গোলে। এখন তিনি তাকিয়ে আছেন ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের দিকে, যেটি আয়োজন করবে যুক্তরাষ্ট্র, মায়ামি অন্যতম ভেন্যু শহর। এ আসরে অংশ নেবে তার সাবেক ক্লাব পিএসজি ছাড়াও ম্যানসিটি ও চেলসি। আগামী ১৪ জুন থেকে ১৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে আসরটি অনুষ্ঠিত হবে।

ক্লাব বিশ্বকাপের গুরুত্ব তুলে ধরে মেসি বলেন, ‘এটা ক্লাবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে প্রথমবারের মতো এ আসর বসছে এবং এটিতে অংশ নেয়া অত্যন্ত গৌরবের। মেজর লিগ সকারের দুটি দলের এতে অংশ নেয়াও দারুণ ব্যাপার। এর মধ্য দিয়ে একটি লিগ হিসেবে এমএলএস বেড়ে উঠবে। এখানে যেসব খেলোয়াড় আসবে তাদের জন্যও বেড়ে ওঠার ও অভিজ্ঞতা অর্জনের বিরাট এক সুযোগ।’

আরো একটি লক্ষ্য আছে মেসির। এখনো মুখে না বললেও তিনি ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেই গুঞ্জন। তাই তো সৌদি আরবের আল হিলাল ক্লাবের দেয়া বছরে ৪০ কোটি ডলারের ‘অবিশ্বাস্য’ প্রস্তাবেও তিনি ‘না’ বলে দেন। পরের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত হবে। আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মাঠে মাঠে খেলে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা মেসি আরেকবার আর্জেন্টিনার জন্য বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারেন।