কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনা ও কলম্বিয়ার ফাইনালের ১১৭তম মিনিট। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বিপুল করতালিতে মুখরিত মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়াম। না, আর্জেন্টিনা গোল করেনি। বরং সহকারী রেফারি বোর্ড উঁচুতে তুলে ধরে জানিয়ে দিলেন বদলি খেলোয়াড় নামবেন, আর তাকে জায়গা করে দিতে মাঠ ছাড়ছেন আর্জেন্টিনার ১১ নম্বর জার্সিধারী খেলোয়াড় অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া। ধীরে ধীরে টাচলাইনের দিকে এগোচ্ছেন ৩৬ বছর বয়সী এই উইঙ্গার। এ সময় হাত উঁচিয়ে সমর্থকদের অভিনন্দনের জবাব দিচ্ছেন তিনি। এটাই আর্জেন্টিনার জার্সিতে ‘এল ফিদেও’র শেষ কয়েক সেকেন্ড।

কলম্বিয়াকে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হারিয়ে কোপা আমেরিকা শিরোপা জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। এর চেয়ে গৌরবের বিদায় আর কীভাবে হতে পারে? ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে কোপা আমেরিকা শিরোপা জিতলেন এ নন্দিত ফুটবলার। 

২০০৮ সালে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের ম্যাচে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা সিনিয়র দলে অভিষেক ঘটে ডি মারিয়ার। ১৬ বছরে তিনি খেলেছেন ১৪৫ ম্যাচ। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন শুধু লিওনেল মেসি (১৮৬) ও হাভিয়ের মাশচেরানো (১৪৭)। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা পর্যন্ত মোট ৮টি বড় টুর্নামেন্টের মধ্যে ছয়টিতেই ফাইনাল খেলেছে আর্জেন্টিনা (ব্যতিক্রম শুধু ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ও ২০১৯ সালের কোপা)। ২০২১ সালের কোপা, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ, ২০২২ সালের ফিনালিসিমা ও ২০২৪ সালের কোপা জয় করে আলবিসেলেস্তেরা।  

হালকা-পাতলা গড়নের কারণে আর্জেন্টাইনরা আদর করে ‘ফিদেও’ বা ‘নুডলস’ নামে ডাকেন ডি মারিয়াকে। তবে শারীরিক গড়ন যা-ই হোক না কেন, আর্জেন্টিনার বড় ম্যাচের বড় মুহূর্তের নায়ক হয়েছেন বারবার। ২০২৪ কোপার আগে লিওনেল স্কালোনি যতগুলো শিরোপা জিতেছেন তার প্রতিটিতেই ফাইনালে গোল করেছেন ডি মারিয়া। ২০২১ সালে মারাকানা স্টেডিয়ামে ব্রাজিলকে হারানো ফাইনালের একমাত্র গোলটি করেন তিনি। ২০২২ সালে ইতালির বিপক্ষে ‘ফিনালিসিমা’য় ৩-০ গোলে জয়লাভ করে আর্জেন্টিনা, ওই ম্যাচেও গোল করেন ডি মারিয়া। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে গোল করে আর্জেন্টিনার জয়ের অন্যতম নায়ক তিনি। এবার যুক্তরাষ্ট্রে কোপার ফাইনালেও গোল করলে অবিশ্বাস্য এক কীর্তি গড়তেন। অর্থাৎ আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি যতগুলো বড় শিরোপা জিতেছেন তার মধ্যে সর্বশেষটিতেই শুধু ফাইনালে গোল করতে পারেননি। এবার ফাইনালে লাউতারো মার্টিনেজের গোলে জয় পায় আলবিসেলেস্তেরা। গোল না পেলেও ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় ডি মারিয়া!

কোপা আমেরিকায় দারুণ কিছু রেকর্ড আছে ডি মারিয়ার। বন্ধু মেসির (৩৮ ম্যাচ) পরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৮ ম্যাচ খেলেছেন তিনি। এছাড়া ২০০৭ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয় করেন ডি মারিয়া। ২০০৮ সালে হয়েছেন অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন। বেইজিংয়ে ফাইনালে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ফাইনালে তিনি গোল করেছিলেন। 

আর্জেন্টিনার হয়ে ১৬ বছরের যাত্রায় ৩০ গোল ও ২৯ অ্যাসিস্ট করেছেন ডি মারিয়া। অবশেষে ৪৮তম কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে বর্ণিল এক অধ্যায়ের ইতি টানলেন ‘ফিদেও’। ডি মারিয়ার সেই ‘পারফেক্ট’ এক বিদায় হলো। দেশের হয়ে লাতিনসেরা হলেন, সেই সঙ্গে তিনি হলেন ফাইনালের সেরা। 

ফাইনালে তিনি যে ১১৭ মিনিট খেলেছেন সেই সময়টায় ছিলেন দারুণ সক্রিয়। তিনটি সুযোগ সৃষ্টি করেছেন, শট নিয়েছেন দুটি, ফাউল আদায় করেছেন দুটি। আর্জেন্টিনার সম্মুখসারিতে যে তিন খেলোয়াড় ছিলেন তাদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশিবার (৬০) বল স্পর্শ করেছেন। এটাই বলে দেয়, আলবিসেলেস্তেদের হয়ে শেষ ম্যাচে তিনি কতটা কার্যকর এক খেলোয়াড় ছিলেন। 

আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলার পর কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছেন, ‘সে একজন কিংবদন্তি। তাকে থাকার অনুরোধ আর করা যায় না, তবে অন্তত সমর্থকদের সামনে একটি বিদায়ী ম্যাচ খেলা তো যায়ই। সে এর দাবিদার। আসলে সে যেভাবে শেষ করল তা একটি সিনেমার কাহিনীর মতোই।’

ফাইনাল শেষে স্কালোনি আরো বলেছেন, ‘ক্যারিয়ারজুড়ে দর্শনীয় ফুটবল খেলেছে ডি মারিয়া, তবে আজ সে সেরাটি খেলল। সে ভালো খেলার পাশাপাশি এমন সময়ে প্রেস করে খেলছিল যখন তার পা দুটো চলছিল না। সে যেভাবে দৌড়াচ্ছিল মনে হচ্ছিল তার বয়স ২৫ বছর।’

শিরোপা জিতে আর্জেন্টিনার জার্সিকে বিদায় জানানোর চেয়ে সেরা আর কী হতে পারে? শিরোপা জয় শেষে ডি মারিয়া বলেছেন, ‘আমি এমন স্বপ্ন দেখতাম। আমি এমনভাবে অবসর নেয়ার স্বপ্ন দেখতাম।’