২০২২ সালে প্রথমবারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশের মেয়েরা। সাফের ইতিহাসে এটাই বাংলাদেশের মেয়েদের প্রথম মুকুট। নেপালের মাঠ থেকে সেবার সাফ শিরোপা জয়ের পথে সেমিফাইনালে ভুটানকে ৮-০ গোলে বিধ্বস্ত করেছিল সাবিনা খাতুনের দল। দশরথ স্টেডিয়ামে অধিনায়ক সাবিনা করেছিলেন হ্যাটট্রিক। এছাড়া লক্ষ্যভেদ করেছিলেন সিরাজ জাহান স্বপ্না, কৃষ্ণা রানী সরকার, ঋতুপর্ণা চাকমা, মাসুরা পারভীন ও তহুরা খাতুন। ২০২৪ সালের সাফ সেমিফাইনালে আজ সেই একই মাঠে একই প্রতিপক্ষের সামনে বাংলাদেশ।
এবার অবশ্য ভুটানিরা বেশ আত্মবিশ্বাসী। সেমিফাইনালে ওঠার পথে প্রতিপক্ষ দলগুলোকে ১৭ গোল দিয়েছে তারা। এর মধ্যে এক মালদ্বীপের জালেই ১৩ বার বল পাঠায় ভুটানি মেয়েরা। সৌদি আরবের লিগে খেলা দেকি লাজোম একাই করেন ৫ গোল। মালদ্বীপকে অবশ্য ১১ গোল দিয়েছিল স্বাগতিক নেপালও। এই দুই দলের মধ্যেই হয় গোলের লড়াই। দুই দলই তিন ম্যাচে প্রতিপক্ষকে মোট ১৭ গোল দিয়েছে। বলা উচিত দুই ম্যাচে। কারণ তারা নিজেরা মুখোমুখি হয়ে গোলশূন্য ড্র করে। ভুটান ও নেপাল ১৭ গোল দিয়েছে মালদ্বীপ ও শ্রীলংকার জালে। ভুটান ৪-১ গোলে হারায় শ্রীলংকাকে, আর নেপাল ৬-০ গোলে হারায় সিংহলিজদের। গোল ব্যবধানে সামান্য এগিয়ে থাকায় গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় নেপাল, আর গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে বাংলাদেশের সামনে পড়েছে ভুটান।
গোলবন্যায় জেতার পর এবার অগ্নিপরীক্ষার মুখে ভুটানিরা। তারা আজ চ্যাম্পিয়নদের সামনে। নারী ফুটবলে মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাসও বাংলাদেশেরই পক্ষে। সাফে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশকে হারাতে পারেনি ভুটান। এ বছর জুলাইয়ে ভুটানের মাঠে দুটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলে দুটিই জিতেছে সাবিনা খাতুনের দল। থিম্পুতে প্রথম ম্যাচে ৫-১ গোলে ও দ্বিতীয় ম্যাচে ৪-২ গোলের জয় তুলে নেয় লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। ওই দুটি ম্যাচ খেলেই মূলত সাফের প্রস্তুতি সেরেছে বাংলাদেশ দল।
২০১০ সালের সাফে ভুটানকে ৯-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছিলেন অংম্রাচিং মারমা। এছাড়া ফারহানা খাতুন, সাবিনা খাতুন ও সুইনু প্রু মারমা প্রত্যেকেই করেছিলেন জোড়া গোল।
পরের আসরে উন্নতি করে ভুটান। সেবার বাংলাদেশ তাদের ১-০ গোলে হারাতে পেরেছে। একমাত্র গোলটি করেন সুইনু প্রু মারমা। ২০১৯ সালের সাফে বিরাটনগরে ভুটানকে ২-০ গোলে হারায় বাংলাদেশ। গোল দুটি করেছিলেন মিশরাত জাহান মৌসুমী ও সাবিনা খাতুন।
গতবার সেমিতে ভুটানকে হারানো ম্যাচে খেলেন সিরাত জাহান স্বপ্না, মিশরাত জাহান মৌসুমী ও আঁখি খাতুন। সাফজয়ী এই তিন তারকা এবার বাংলাদেশ দলে নেই। তবে বেশকিছু প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড় তাদের জায়গা নিয়েছেন। তারা এরই মধ্যে নিজেদের প্রমাণ করেছেন।
সম্প্রতি ভুটানের রয়েল থিম্পু কলেজের হয়ে খেলে এসেছেন বাংলাদেশ দলের ফরওয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমা। ক্লাবটির অনেকে বর্তমান ভুটান দলের সদস্য। ক্লাব পর্যায়ের বন্ধুত্ব আজকের সেমিফাইনালে মনে রাখতে চাইছেন না ২০ বছর বয়সী ঋতুপর্ণা। ভুটানকে হারিয়ে শিরোপা লড়াইয়ের মঞ্চে উঠতে উন্মুখ লাল-সবুজরা। ঋতুপর্ণাও ভুটানের বন্ধুদের তাই এখন আর বন্ধু ভাবছেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ থেকে একটা লক্ষ্য নিয়ে এসেছি যে ম্যাচ বাই ম্যাচ জিতব। প্রথম লক্ষ্য ছিল গ্রুপসেরা হয়ে সেমিফাইনাল খেলব। যেই নামুক মাঠে আমরা সেরাটা দিয়েই খেলব। ভুটানের অনেকেই আমাকে চেনে, আমিও চিনি। ওরা অনেকটা উন্নতি করেছে। তারা আমাদের সম্পর্কে জানে, আমরাও জানি। চেষ্টা করব পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলার। শত্রু তো শত্রুই, মাঠের মধ্যে আবার কীসের বন্ধুত্ব?’
২০২২ সালের সেমিতে ভুটানের বিপক্ষে গোল করেছিলেন ঋতুপর্ণা। এই ফরওয়ার্ড এবার নিজে গোল করার চেয়ে সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোয় বেশি মনোযোগী। তিনি বলেন, ‘আমি অ্যাসিস্ট করতে বেশি পছন্দ করি। (ভারত ম্যাচে ক্রসগুলো) কাজে লাগাতে পারছে, এজন্য খুবই ভালো লাগছে। মাঠের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে গোল পাব কি পাব না। সেটা কেউ বলতে পারবে না। তবে এটা কোনো ব্যাপার না। আমি চেষ্টা করি গোল করার, কিন্তু গোল আমার কপালে জোটে না (হাসি)।’
গৌরবের একটা রেকর্ড বাংলাদেশের সঙ্গী। সাফে ভুটানের কাছে বাংলাদেশ কখনো হারেনি। তবে চলতি আসরে মালদ্বীপকে ১৩-০ গোলে হারানো ভুটানকে হালকাভাবে নিতে চান না ঋতুপর্ণা। তিনি বলেন, ‘চাপ বলতে এখানে প্রতিটা দলই ভালো। কাউকে ছোট করে নিচ্ছি না। কোচের পরিকল্পনা অনুযায়ী সেরা ফুটবল খেলতে চাই। ভুটান ম্যাচ কে খেলবে না খেলবে, জানি না। কোচ সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলছেন। আমরা প্রস্তুত। ইনশা আল্লাহ আমরা ভালো করব।’
এদিকে সেমিফাইনালের আগের দিন বাংলাদেশ শিবিরে অধিনায়ক সাবিনা খাতুনকে নিয়ে দুর্ভাবনা। অসুস্থ হয়ে দলের সঙ্গে অনুশীলন করতে পারেননি তিনি। গতকাল অনুশীলনে ছিলেন না সাবিনা। জানা গেছে তিনি জ্বরে ভুগছেন। আজ দুপুরে ম্যাচের আগে তিনি সেরে ওঠেন কিনা, এখন সেই অপেক্ষায় থাকবে বাংলাদেশ দল।
এর আগে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন ডিফেন্ডার আফিদা খাতুন, যিনি ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ৩-১ ব্যবধানে জয়ের পথে দলের প্রথম গোলটি করেছিলেন। জ্বর থেকে সেরে উঠে গতকাল দলের সঙ্গেই অনুশীলন করেছেন আফিদা। এখন অধিনায়ক সাবিনার ফেরার অপেক্ষা।
সাফের দ্বিতীয় সেমিতে আজ রাতে লড়বে স্বাগতিক নেপাল ও পরাশক্তি ভারত। নারী সাফ আগের ছয় আসরের মধ্যে পাঁচবারই শিরোপা জিতে নিয়েছে ভারত, বাকি একবার শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশ। গত সাফের সেমিফাইনালে ভারতকে ১-০ গোলে হারিয়েছিল নেপাল। আজ কি সেই হারের প্রতিশোধ নিতে পারবে বালা দেবীর দল? নাকি গতবারের পুনরাবৃত্তি?
নেপালি মেয়েরা এখন পর্যন্ত পাঁচবার ফাইনালে হেরেছে! এর মধ্যে চারবার ভারতের কাছে ও একবার বাংলাদেশের কাছে। আরেকবার ফাইনালের টিকিট পাবে কি হিমালয় কন্যারা?










