সম্প্রতি একশরও বেশি পেশাদার নারী ফুটবলারের সই করা খোলা চিঠি দেয়া হয়েছে ফুটবলের গভর্নিং বডি ফিফার কাছে। তারা ফিফাকে আহ্বান জানিয়েছেন, যেন সৌদি আরবের তেল ও গ্যাস কোম্পানি আরামকোর সঙ্গে ফিফার স্পন্সর চুক্তি বাতিল করা হয়। ফুটবলাররা কেন আরামকোর চুক্তি বাতিল চান?

গত এপ্রিলে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি আরামকোর সঙ্গে স্পন্সর করে ফিফা। চুক্তির মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ২০২৬ সালের ছেলেদের বিশ্বকাপ ও পরের বছরের মেয়েদের বিশ্বকাপ। ফুটবলাররা কেন আরামকোর চুক্তি বাতিল চাইছেন সেটি নিয়ে অনেকের কৌতূহল থাকতেই পারে। সৌদিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিশেষ করে নারীর অধিকার লঙ্ঘিত হয় বলে নারী ফুটবলাররা দেশটির সঙ্গে ফিফার সম্পৃক্ততা চান না। তবে এই প্রথম নয়। ২০২৩ সালে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মাঠে ফিফা নারী বিশ্বকাপ শুরুর আগেও নারী ফুটবলাররা সৌদি পর্যটন বিভাগের (ভিজিট সৌদি) সঙ্গে ফিফার চুক্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং চাপের মুখে ফিফা সেই চুক্তি থেকে সরেও আসে।

সৌদিতে ‘মারাত্মকভাবে’ মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় বলে অভিযোগ খেলোয়াড়দের। পাশাপাশি পরিবেশগত ইস্যু নিয়েও কথা বলেছেন নারী খেলোয়াড়রা।

এ বছরের একটি ঘটনার উল্লেখ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান। ৩০ বছর বয়সী মানাহেল আল-ওতাইবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, বিয়ে করা কিংবা বিদেশে ঘুরতে যেতে পরিবারের পুরুষ সদস্যের অনুমতির যে প্রয়োজন পড়ে সেই আইনের অবসান চান তিনি। এ ‘অপরাধে’ তাকে ১১ বছরের জেল দেয়া হয়েছে! এছাড়া নারী অধিকার নিয়ে টুইট করায় ৩৪ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয় লিডস ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করা সালমা আল-শিহাবকে।

নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলের তারকা ভিভিয়ানে মিয়েদেমা খেলছেন ম্যানচেস্টার সিটিতে। ফিফার কাছে পাঠানো চিঠিতে তিনিও সই করেছেন। এই স্ট্রাইকার বিবিসিকে বলেছেন, ‘আমি মনে করি, ফুটবলার হিসেবে, বিশেষ করে নারী ফুটবলার হিসেবে আমরা বিশ্বকে দেখাতে চাই যে পরের প্রজন্মের জন্য কী করা উচিত। এ চুক্তি ফিফার আদর্শের সঙ্গে মানানসই নয়, আবার নারী ফুটবলার হিসেবে আমাদের জন্যও নয়। ফিফা সবসময়ই বলে যে এ খেলা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দৃষ্টান্ত স্থাপন করার মতো। আচ্ছা তাহলে আপনি স্পন্সর চুক্তি দিয়েই বুঝিয়ে দেন যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করার মতো অবস্থানে রয়েছেন।’

ফিফা অবশ্য নিজেদের অবস্থানে অনড় এবং জানিয়েছে, আরামকোর সঙ্গে চুক্তিকে তারা মূল্যায়ন করছে, একই সঙ্গে এ চুক্তির অর্থ তারা নারী ফুটবলের বিভিন্ন স্তরে বিনিয়োগও করছে।

সমালোচনা রয়েছে যে ‘স্পোর্টসওয়াশিং’-এর মাধ্যমে সৌদি আরব বড় ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজন করে তাদের নানা বিতর্ককে ঢাকতে তৎপর। কেন তারা ‘স্পোর্টসওয়াশিং’-এ মরিয়া? উপসাগরীয় দেশটির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর সব অভিযোগ রয়েছে। সেই সঙ্গে নারীরা তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত, আর সমকামিতাকেও কঠোরভাবে দমন করা হয় দেশটিতে।

স্বাধীন থিংক ট্যাংক ‘কার্বন ট্র্যাকার’ বলছে, বিশ্বের সর্ববৃহৎ কার্বন নির্গমনকারী করপোরেট প্রতিষ্ঠান হলো আরামকো। নারী ফুটবলারদের চিঠি নিয়ে আরামকো কোনো মন্তব্য করেনি। তবে অতীতে তারা বলেছে, এ ইন্ডাস্ট্রিতে অপেক্ষাকৃত কম কার্বন নির্গমনকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে তারা। আরামকো এরই মধ্যে স্পন্সরশিপ চুক্তি করেছে ফর্মুলা ওয়ান ও নারী গলফের ইউরোপিয়ান ট্যুরের সঙ্গে। এছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সঙ্গেও তাদের স্পন্সর চুক্তি রয়েছে।

চিঠিতে ফুটবলাররা লিখেছেন, ‘সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের নিষ্ঠুর মানবাধিকারের বিষয়টি থেকে বিশ্বকে আড়াল করার প্রচেষ্টা হিসেবেই ক্রীড়ায় স্পন্সরশিপ হিসেবে বিলিয়ন ডলার খরচ করছে। নারীদের প্রতি তাদের আচরণ সবকিছু বলে দেয়। আমরা সৌদি আরবের সেই সব মানুষের পক্ষে কথা বলছি যাদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। আমরা তো এসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের অংশ হতে পারি না। যারা জলবায়ু সংকটের দায় এড়াতে পারে না, যারা সমকামিতাকে দমন করে ও যাদের হাতে নারীর অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে তারা আমাদের সুন্দর এই খেলাটির স্পন্সর হতে পারে না।’

যেসব ফুটবলার চিঠিতে সই করেছেন তারা সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ হাজার ৩০০ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। এদের মধ্যে অন্যতম ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার নিয়াম চার্লস এবং কানাডা ও ইতালির অধিনায়ক। এ দলের অন্যতম নেতা ডেনিশ ফুটবলার সোফি জুঙ্গে পেদেরসন স্পন্সরশিপটিকে বলেছেন ‘আত্মঘাতী গোলের চেয়েও নিকৃষ্ট’। তিনি যোগ করেন, বিশ্ব গভর্নিং বডির কাছ থেকে আরো বেশি কিছু প্রত্যাশা করে নারী ফুটবল। পেদেরসন বলেন, ‘আমরা আশা করব সৌদি আরামকোর জায়গায় ফিফা এমন কোনো কোম্পানির সঙ্গে স্পন্সরশিপ চুক্তি করুক যারা লিঙ্গসমতা ও মানবাধিকার এবং সবার জন্য নিরাপদ বিশ্ব নিয়ে বেশি সচেতন। এক্ষেত্রে তারা একটি কমিটি গঠন করতে পারে, যাতে খেলোয়াড়দের প্রতিনিধিও থাকবেন এবং তারা স্পন্সর বাছাই করার ক্ষেত্রে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করতে পারবেন।’

ফুটবলারদের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেছে শীর্ষ অ্যাথলিটদের সংগঠন ‘অ্যাথলেটস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। এ সংগঠন জলবায়ু ও দারিদ্র্য নিয়ে কাজ করে।

মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সৌদি সংগঠন এএলকিউএসটির মনিটরিং ও অ্যাডভোকেসির প্রধান লিনা আল-হাথলুল বলেন, ‘যতদিন না সৌদি আরবের কর্তৃপক্ষ প্রকৃতপক্ষে নারীর অধিকার ও স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখাবে ততদিন তারা যত বড় ও উচ্চাভিলাষী প্রকল্পই নিয়ে আসুক না কেন তা বাধাগ্রস্ত হবেই। সৌদি আরবের সাহসী নারীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নারী ফুটবলারদের ধন্যবাদ জানাই।’

নারী ফুটবলাররা একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠনের দাবি তুলেছে ফিফার কাছে। জবাবে ফিফা গত মে মাসে মেয়েদের সব স্তরে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে নারী খেলোয়াড়দের একটি কমিটিও থাকবে। যদিও কমিটি গঠন এখনো প্রক্রিয়াধীন এবং আরামকো চুক্তি নিয়ে কথা বলার মতো প্লাটফর্ম হিসেবে এখনো প্রস্তুত হয়নি। ফিফা বলেছে, ‘আরামকো ও অন্য সব কমার্শিয়াল সহযোগীর সঙ্গে করা চুক্তিকে ফিফা সম্মান করে।’

ফিফা আরো জানায়, বিভিন্ন ধরনের কমার্শিয়াল সহযোগীকে নিয়ে ফিফা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংগঠন, যারা ফুটবল ও অন্য সব খেলার সংস্থাগুলোকেও সমর্থন করে।

কমার্শিয়াল চুক্তির গুরুত্ব নিয়ে ফিফার কথা, ‘স্পন্সরশিপ চুক্তি থেকে ফিফা যে রাজস্ব আহরণ করে তা ফুটবলের সব স্তরে বিনিয়োগ করা হয় এবং নারী ফুটবলের প্রসারের জন্য এ অর্থ ব্যয় করা হয়, যার মধ্যে অন্যতম ২০২৩ সালের ফিফা বিশ্বকাপ। সেই থেকে সাড়া জাগানো নতুন বণ্টন মডেলে সংস্থাগুলোকে রাজস্বের ভাগ দেয়া হচ্ছে।’ গার্ডিয়ান ও বিবিসি