শুরুর একাদশ থেকে ছিটকে পড়া পেদ্রির ভেতরের মানসিক লড়াই যেমন সত্যি, তেমনি ফাবিয়ান রুইজের ক্ষিপ্রতা কিংবা তরুণ কুবারসির বুক চিতিয়ে লড়াইও সমভাবে অনবদ্য। দলটির প্রতিটি স্পন্দন যেন অলিখিত মন্ত্রে দীক্ষিত, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই মিলে এক হয়ে যায়। আর তাই যখন বেলজিয়ামের দুর্ভেদ্য প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে বারবার স্পেনের শৈল্পিক আক্রমণগুলো মিলিয়ে যাচ্ছিল, তখন শেষ মুহূর্তের ত্রাতা হিসেবে মিকেল মেরিনোর আবির্ভাব কোনো অলৌকিকতা নয়। ওটা ছিল মাঠে স্প্যানিশদের টানা নিখুঁত বিল্ডআপ ও শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত হাল না ছাড়া রণকৌশলের অনিবার্য পরিণতি, যা লা রোজাকে দাপটের সঙ্গেই পৌঁছে দিল সেমিফাইনালের মঞ্চে।

আর্জেন্টিনার আছে লিওনেল মেসি, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে, নরওয়ের আর্লিং হালান্ড, ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন। স্পেনের আছে একটি দল। আর সেই দলটির ভেতর কখনো মিকেল মেরিনো নায়ক হন, কখনো দানি ওলমো, কখনো ফাবিয়ান রুইজ, কখনো পাও কুবারসিও। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-১ গোলে জয় পাওয়া ম্যাচের শেষ দিকে যখন মনে হচ্ছিল অতিরিক্ত সময়ই বুঝি অপেক্ষা করছে, তখন আবারো উপস্থিত মেরিনো। যেভাবে তিনি পর্তুগালের বিপক্ষে এসেছিলেন, সেভাবেই এবার বেলজিয়ামের বিপক্ষেও। যেন নকআউট ম্যাচের শেষ প্রহর তার একান্ত ব্যক্তিগত। মেরিনোর এ কীর্তি এখন প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। বদলি হিসেবে নেমে ম্যাচ জেতানোর কাজটা তিনি বারবার করছেন। তিনি এতটাই কার্যকর বদলি খেলোয়াড় যে নিজের মূল একাদশে জায়গা করে নেয়ার সম্ভাবনাকেই যেন নষ্ট করে দিচ্ছেন। কোচ তাকে বেঞ্চেই রাখতে চাইবেন, কারণ শেষ মুহূর্তের এ জাদু বারবার প্রয়োজন পড়ে।

দে লা ফুয়েন্তের সিদ্ধান্তগুলো স্পেনে সবসময় আলোচনার জন্ম দেয়। সে অর্থে বেলজিয়ামের বিপক্ষে পেদ্রিকে বেঞ্চে রাখা বেশ অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তই বলা যায়। পেদ্রি প্রতিভার অন্য নাম, বলের ভাষা যার কাছে সহজাত। কিন্তু বিশ্বকাপের শুরু থেকে তিনি নিজের সেরা ছন্দে ছিলেন না। পর্তুগালের বিপক্ষে তার পারফরম্যান্সও কোচকে ভাবিয়েছিল। তাই ফাবিয়ানকে ফেরানো ছিল ঝুঁকি, আবার প্রয়োজনও। কিন্তু ফাবিয়ান কী দারুণ প্রতিদান দিলেন। রদ্রির সঙ্গে তার বোঝাপড়া, ওলমোর সঙ্গে অগ্রসর হওয়ার ছন্দ এবং আক্রমণের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাওয়ার প্রবণতা স্পেনকে আরো ধারালো করল। পেদ্রিকে বাদ দেয়া যতটা বিস্ময়কর ছিল, ফাবিয়ানের গোল যেন ততটাই অনিবার্য।

বেলজিয়াম অবশ্য নিছক দর্শক ছিল না। রুডি গার্সিয়া দলটিকে এমনভাবে সাজিয়েছিলেন, যেখানে অভিজ্ঞতা ও রূপান্তরের মাঝামাঝি একটি রূপ দেখা গেছে। কেভিন ডি ব্রুইনা ফিরেছিলেন, জেরেমি ডোকু ছিলেন সবচেয়ে বড় হুমকি, চার্লস ডি কেটেলারেকে সামনে রেখে তারা পাল্টা আক্রমণের অপেক্ষা করছিল। কিন্তু ম্যাচের আগে ইউরি টিলেমান্সের চোট তাদের ভারসাম্যে বড় ধাক্কা দেয়। টুর্নামেন্টে বেলজিয়ামের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। এরপর কোর্তোয়ার চোট যেন দুর্ভাগ্যের দ্বিতীয় ঢেউ।

তবু বেলজিয়ামের সমস্যা কেবল চোটের ছিল না। মাঝমাঠ ও রক্ষণের মাঝের জায়গা, দুই পিভটের পাশে ফাঁক এবং উইংয়ে সময়মতো চাপ দিতে না পারা স্পেনকে আক্রমণ শুরুর সহজ পথ করে দেয়। ট্রসার্ড ও ডোকু প্রায়ই দেরিতে প্রেস করেছেন, কখনো আবার করেনইনি। ফলে কুবারসি ও লাপোর্ত সময় পেয়েছেন মাথা তুলে বল বাড়ানোর। স্পেন তখন মাঠকে প্রশস্ত করেছে, এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে খেলা সরিয়েছে। বেলজিয়ামের রক্ষণকে বারবার নতুন করে অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে।

কুবারসির ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। তাকে শুধু সেন্টারব্যাক বললে তার অর্ধেক পরিচয়ই বলা হয়। বল পায়ে তার সাহস, লাইন ভাঙা পাসের মান এবং আক্রমণে দায়িত্ব নেয়ার প্রবণতা স্পেনের বিল্ডআপের মূল স্তম্ভ। লাপোর্তের সঙ্গে মিলে তিনি প্রতিপক্ষের প্রথম প্রেসকে এমন সহজে ভেঙেছেন, যেন তা কোনো বাধাই নয়। আধুনিক ফুটবলে রক্ষণভাগ থেকে আক্রমণ নির্মাণের যে শিল্প, এ ম্যাচে তার দুই নিখুঁত কারিগর ছিলেন তারা।

ডান পাশে ইয়ামাল ও পোরো জুটি ছিল আরেকটি বড় অস্ত্র। তিনি বল পেলেই দুই কিংবা তিনজন ডিফেন্ডার তার দিকে সরে আসে। এতে ভেতরের চ্যানেলে জায়গা তৈরি হয়, পোরো বাইরে উঠে যেতে পারেন, ওলমো পকেটে বল নিতে পারেন। ইয়ামাল হয়তো নিজের সেরা রাত কাটাননি, তবু বেলজিয়ামের রক্ষণকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে তার উপস্থিতিই। পোরোর সঙ্গে তার বোঝাপড়াও স্পেনকে বৈচিত্র্য দিয়েছে। কখনো ইয়ামাল বাইরে থেকেছেন, পোরো ভেতরে ঢুকেছেন। কখনো পোরো ওভারল্যাপ করেছেন, ইয়ামাল বল নিয়ে হাফ স্পেসে ঢুকেছেন। এ অদলবদল বেলজিয়ামকে বারবার সিদ্ধান্তহীন করেছে। ডোকুর মতো আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়কে নিচে নেমে রক্ষণে কাজ করতে বাধ্য করাও স্পেনের পরিকল্পনার অংশ ছিল।

তার পরও প্রথমার্ধের শেষে স্কোর সমতায় থাকা ছিল বিস্ময়কর। কারণ ম্যাচের বেশির ভাগ সময় স্পেনই নিয়ন্ত্রণ করেছে। বেলজিয়ামকে তারা যতটা দুর্বল দেখিয়েছে, দলটি আসলে ততটা দুর্বল নয়। বেলজিয়ামের সমতাসূচক গোলটি সেই সতর্কবার্তাই ছিল। ডি ব্রুইনা ডান প্রান্তে কাস্তানিয়েকে খুঁজে পেলেন, তার ক্রসে ডি কেটেলারেকে আগেভাগে উঠে কুবারসিকে হারিয়ে হেড করলেন। স্পেনের রক্ষণ তখন এক সেকেন্ডের জন্য পিছিয়ে পড়েছিল, আর সেই এক সেকেন্ডই উনাই সিমনের ক্লিন শিট ভেঙে দিল।

দ্বিতীয়ার্ধে স্পেন আবার দীর্ঘ আক্রমণে ফিরে যায়। ফাবিয়ানের জায়গায় পেদ্রি, বায়েনার জায়গায় ফেরান তোরেস—পরিবর্তনগুলো স্পেনের আক্রমণে নতুন গতি আনে। ফাবিয়ান বদলি হয়ে কিছুটা বিস্মিত ছিলেন, কারণ তিনি গোল করেছেন, ভালো খেলেছেন। কিন্তু এ দলটির দর্শনই এমন—কেউ বড় নয়, প্রয়োজনটাই বড়। একজনের কাজ শেষ হলে অন্যজন আসে। পেদ্রি মাঠে এসে সৃজনশীলতা বাড়ালেন, ফেরান আক্রমণে সরাসরি দৌড় দিলেন। ওলমো ও ইয়ামালের সঙ্গে মিলে তারা বেলজিয়ামের রক্ষণকে আরো পেছনে ঠেলে দিলেন।

এ জায়গাতেই স্পেনের একটি পুরনো রোগ আবার দেখা দিল। তারা অনেক সময় আক্রমণকে এত নিখুঁত করতে চায় যে সরল সমাধানটি ভুলে যায়। বেলজিয়ামের বক্সের চারপাশে পাসের পর পাস, কিন্তু দূর থেকে শট প্রায় নেই। ইয়ামালের দিকে অতিরিক্ত নির্ভরতার লক্ষণও দেখা যাচ্ছিল। ডান পাশ দিয়ে আক্রমণ বারবার তৈরি হচ্ছিল, কিন্তু তাতে স্পেন কিছুটা অনুমানযোগ্য হয়ে উঠছিল। বেলজিয়ামও বুঝে গিয়েছিল, বল শেষ পর্যন্ত ইয়ামালের দিকেই যাবে। দে লা ফুয়েন্তে তখন নিকো উইলিয়ামসকে এনে বাঁ প্রান্তে গতি বাড়ালেন, ফেরানকে কেন্দ্রে নিলেন, ওয়ারজাবালকে তুলে নিলেন। এর পরের পরিবর্তনটি ছিল যেন আগে থেকেই লেখা—ওলমোর জায়গায় মেরিনো।

কোর্তোয়ার চোটও ম্যাচের গতিপথে বড় প্রভাব ফেলে। তিনি কিছুক্ষণ চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত মাঠ ছাড়েন। বদলি হিসেবে নামেন সেন্নে লামেন্স। শেষ পর্যন্ত স্পেনের জট খুলল এমন একটি পথে, যা তারা এতক্ষণ প্রায় চেষ্টা করেনি। কুবারসি দূর থেকে শট নিলেন। লামেন্স বলটি ধরতে পারলেন না। ফিরতি বল যেখানে পড়ল, সেখানে সবার আগে পৌঁছে গেলেন মেরিনো। গোল।

বেলজিয়ামের গল্প আবারো পুরনো জায়গাতেই এসে থামল। এক পাশে কেভিন ডি ব্রুইনের ক্লান্ত দৃষ্টি, অন্য পাশে চোটে ভেঙে পড়া থিবো কোর্তোয়া; সামনে লড়ছেন লুকাকু, আর দূরে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি হয়ে ছুটছেন ডোকু ও ডি কেটেলারে। যেন দুটি যুগ একই জার্সিতে পাশাপাশি হাঁটছে, কিন্তু একই গন্তব্যে পৌঁছতে পারছে না। একসময় যে সোনালি প্রজন্মকে ঘিরে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বুনেছিল বেলজিয়াম, সেই স্বপ্নের রং অনেক আগেই ফিকে হতে শুরু করেছে। তাই স্পেনের বিপক্ষে এ হার কেবল একটি ম্যাচের পরাজয় নয়; বহু বছরের অপূর্ণতার আরেকটি শোকগাথা।

বিপরীতে ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেন। সামনে ফ্রান্স, যাদের অনেকেই এ টুর্নামেন্টের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ দল মনে করেন। তবু এ স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত দলীয় সংহতিতে। ইয়ামাল থেমে গেলে পোরো এগিয়ে যান, পেদ্রি না থাকলে ফাবিয়ান গোল করেন, স্ট্রাইকার জবাব না দিলে মেরিনো আসেন, আক্রমণ আটকে গেলে কুবারসি দূর থেকে শট নেন। এ কারণেই এ দলকে শুধু প্রতিভাবান বললে কম বলা হয়। তারা আসলে সমষ্টিগত বিশ্বাসে গড়া এক দল। তার সঙ্গে কখনো কখনো ভাগ্যও যেন স্পেনের পক্ষেই দাঁড়িয়েছে। টিলেমান্সের চোটে বেলজিয়ামের মাঝমাঠের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, কোর্তোয়ার মাঠ ছাড়তে বাধ্য হওয়ায় শেষ প্রহরে গোলবারের নিচে এসেছে অনভিজ্ঞ হাত। কিন্তু ভাগ্য কেবল সেই দলের পাশে দাঁড়ায়, যারা সুযোগ এলে তা চিনতে পারে।