১১ জুন রাতে শুরু হওয়া এ ফুটবল মহাযজ্ঞে প্রায় প্রতিদিনই নিত্যনতুন রেকর্ডের জন্ম হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল ভোরের ছয়টি ম্যাচও বেশকিছু রেকর্ড আর মাইলফলক দেখেছে।

ফ্রান্স ৪-১ গোলে হারিয়েছে নরওয়েকে। এ ম্যাচে বিরল কীর্তিতে রেকর্ডবুকে নাম লিখিয়েছেন ওসমান দেম্বেলে। আফ্রিকার ইতিহাস গড়ে ইরাককে ৫-০ গোলে হারিয়েছে সেনেগাল। স্পেন ১-০ গোলে হারিয়ে বিদায় করে দিয়েছে উরুগুয়েকে। এছাড়া সৌদি আরবের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে নকআউট পর্বে উঠে গেছে অভিষিক্ত দল কেপ ভার্দে। নিউজিল্যান্ডকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ‘জি’ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বেলজিয়াম, আর মিসর ও ইরানের ম্যাচটি শেষ হয় রোমাঞ্চকর ড্রয়ে। এ ড্রয়ে মিসর নকআউট পর্বে খেলা নিশ্চিত করলেও ঝুলে ছিল ইরানের ভাগ্য।

নরওয়ের বিপক্ষে মাত্র ৩২ মিনিটের মধ্যে হ্যাটট্রিক করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বর্তমান ব্যালন ডি’অরজয়ী খেলোয়াড় ওসমান দেম্বেলে। মাত্র ০.১৯ এক্সপেক্টেড গোল (এক্সজি) নিয়েও তিনি এমন হ্যাটট্রিক করলেন। ১৯৬৬ সালের পর ছেলেদের বিশ্বকাপে এর চেয়ে কম এক্সজি নিয়ে মাত্র একবারই হ্যাটট্রিক হয়েছে (১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির লাজলো কিস, ০.১৭)।

এক্সপেক্টেড গোল (এক্সজি) হলো এমন একটি ফুটবল মেট্রিক, যা কোনো খেলোয়াড়ের গোল করার সম্ভাবনা নির্ধারণ করতে এবং একটি ম্যাচে কোনো দলের সম্ভাব্য গোলের সংখ্যা গণনা করতে ব্যবহৃত হয়।

প্রথমার্ধে নরওয়ে রক্ষণের সামনে ভয়ংকর ছিলেন পিএসজির হয়ে টানা দুবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপাজয়ী ওসমান দেম্বেলে। বোস্টনে অনুষ্ঠিত এ ম্যাচে তিনি ৭, ২০ ও ৩২ মিনিটে তিনটি গোল করেন। বিশ্বকাপে সর্বশেষ ৭২ বছরের ইতিহাসে দ্রুততম হ্যাটট্রিক এটি। ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে সাবেক চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ২৪ মিনিটের মধ্যে হ্যাটট্রিক করেছিলেন অস্ট্রিয়ার এরিখ প্রোবস্ট। ফরাসি তারকা বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমার্ধে হ্যাটট্রিক করা মাত্র ষষ্ঠ খেলোয়াড়। তার আগে সর্বশেষ এ কীর্তি আছে ১৯৯৪ বিশ্বকাপে রাশিয়ার ওলেগ সালেঙ্কোর। স্ট্যানফোর্ড স্টেডিয়ামে ক্যামেরুনের বিপক্ষে সেই ম্যাচে সালেঙ্কো একাই করেছিলেন মোট পাঁচ গোল, রজার মিলার দলের বিপক্ষে রাশিয়া জিতেছিল ৫-১ গোলে।

যোগ করা সময়ে ফ্রান্সের চতুর্থ গোলটি করেন দেজিরে দুয়ে। চমকপ্রদ তথ্য হলো, দেম্বেলের হ্যাটট্রিকের গোলটিতে ছিল দলের ১১ খেলোয়াড়ের ছোঁয়া!

নরওয়ের বিপক্ষে গোল না করেও কিলিয়ান এমবাপ্পে গড়েছেন রেকর্ড। কীভাবে? জোড়া গোলে অ্যাসিস্ট করে তিনি যোগ দিয়েছেন লিওনেল মেসি ও মিরোস্লাভ ক্লোসার মতো গ্রেটদের কাতারে। মোট ২৬টি গোলে অবদান রেখেছেন মেসি, যিনি ১৮ গোল করেছেন, আর অ্যাসিস্ট করেন ৮টি গোলে। ক্লোসা ১৬ গোল করেছেন, অ্যাসিস্ট করেন চারটি গোলে। এমবাপ্পেও ১৬ গোল করেছেন, অ্যাসিস্ট করেন চার গোলে। আগের ১৬টি বিশ্বকাপ ম্যাচে মাত্র দুটি অ্যাসিস্ট করেন ফরাসি অধিনায়ক। ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপে অ্যাসিস্টের হিসাব রাখা হচ্ছে।

তৃতীয় ফরাসি খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করার কৃতিত্ব দেখালেন দেম্বেলে। তার আগে জাস্ট ফন্টেইন দুটি ও এমবাপ্পে একটি হ্যাটট্রিক করেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর বর্তমান ব্যালন ডি’অরজয়ী হিসেবে হ্যাটট্রিক করলেন দেম্বেলে। সর্বশেষ ১৯৯৮ সালে এ কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন রোনালদো। আর সব মিলিয়ে বর্তমান ব্যালন ডি’অরজয়ী হিসেবে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা চতুর্থ খেলোয়াড় তিনি। এ কীর্তি আছে জার্মানির কার্ল-হেইঞ্জ রুমেনিগে (১৯৮২) ও ইউসেবিওর (১৯৬৬)।

ওসমান দেম্বেলে প্রথম দুই ম্যাচের নিষ্প্রভতায় ফরাসি মিডিয়ার তোপের মুখে পড়েন। দলটির সহকারী কোচ গাই স্তেফান মনে করেন, সমালোচনার বিষয়টি ওসমানকে উদ্দীপ্ত করেছে। তার ভাষায়, ‘ওসমান একজন মানুষ, অন্য যে কারো মতোই সে-ও সমালোচনা শুনে থাকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তার ইনজুরির সমস্যা ছিল, কিন্তু প্রতিবার সে শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। বিশ্বকাপে তিন গোল অসাধারণ ঘটনা।’

গতবার ফাইনালে রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের পর আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায় ফ্রান্স। মায়ের মৃত্যুর কারণে দেশে ফিরে যাওয়া দিদিয়ের দেশমের জায়গায় ভারপ্রাপ্ত কোচের দায়িত্ব সামলানো স্তেফান মনে করেন, এখনই ফাইনাল নিয়ে চিন্তা করার সময় আসেনি। তিনি বলেন, ‘এ দলটি ২০২২ সালের দলটির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড়ই আগে কখনো বিশ্বকাপ খেলেনি। আমরা শুধু এটা ভাবছি, বিশ্বকাপ যত সামনে এগোবে আমাদের সামনে ততই কঠিন পথ, কেননা তখন শক্ত দলের বিপক্ষে খেলতে হবে। এখানে আক্রমণাত্মক ও রক্ষণাত্মক দল আছে, কাজেই আমাদের তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে এবং সেজন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’

এ ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে নরওয়ের ইয়োর্গেন স্ট্র্যান্ড লারসেনের পেনাল্টি শট ঠেকিয়ে দেন ফরাসি গোলকিপার মাইক মিগনান। বামদিকে ঝাঁপিয়ে পেনাল্টি রুখে দেন তিনি। ফ্রান্সের মাত্র তৃতীয় গোলকিপার হিসেবে বিশ্বকাপে পেনাল্টি ঠেকানোর কৃতিত্ব দেখান মিগনান। ১৯৩০ বিশ্বকাপে চিলির বিপক্ষে অ্যালেক্স থিপট ও ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে জোয়ের ব্যাটস পেনাল্টি ঠেকিয়েছেন।

এবারের আসরে সেনেগালের বিপক্ষে ৩-১, ইরাকের বিপক্ষে ৩-০ ও নরওয়ের বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয় তুলে নিয়েছে ফ্রান্স। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে সর্বশেষ চার ম্যাচে তিন কিংবা ততোধিক গোল করল ফরাসিরা। সর্বশেষ এমন কীর্তি আছে স্পেনের (১৯৯৮ থেকে ২০০২)।

বিশ্বকাপ ম্যাচে ফরাসি খেলোয়াড়দের একাধিক গোলের ২০তম নজির এটা। এ তালিকায় ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা ৩৯ বার, জার্মানি ৩৫ বার ও আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা ২৭ বার দুই বা ততোধিক গোল করেছেন।

এদিকে ইরাককে হারানো ম্যাচে ইতিহাস গড়েছে সেনেগাল। এ প্রথম আফ্রিকার কোনো দল বিশ্বকাপ ম্যাচে পাঁচটি গোল করল এবং বিশ্বকাপে আফ্রিকার কোনো দলের সবচেয়ে বড় জয় এটি। সেনেগালের পাপে গাইয়ে করেন জোড়া গোল। বিশ্বকাপে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে জোড়া গোল করা দ্বিতীয় আফ্রিকান খেলোয়াড় তিনি। ১৯৯০ সালে এ কীর্তি গড়েছিলেন ক্যামেরুনের রজার মিলা।

সেনেগালের ইসমাইলা সার, পাপে গাইয়ে ও ইলিমান এনদিয়াকে প্রত্যেকেই গোল করেছেন এবং একটি করে গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের পর এ প্রথম এমনটি দেখা গেল। ব্রাজিলের বিপক্ষে ৭-১ গোলের জয়ের ম্যাচে জার্মানির টনি ক্রুস, সামি খেদিরা ও টমাস মুলার গোল করার পাশাপাশি অ্যাসিস্টও করেছিলেন।

ইলিমান এনদিয়াকে হচ্ছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় যিনি বদলি হিসেবে নেমে এক গোল করেছেন, গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন, প্রতিপক্ষের বক্সের মধ্যে পাঁচবার বলে টাচ করেছেন এবং পাঁচবার ড্রিবল করেছেন। ইসমাইলা সার বিশ্বকাপে চার গোল করেছেন, যা দেশের হয়ে সর্বোচ্চ। তিনি টপকে গেছেন পাপা বুবা দিউপকে (তিন গোল)।

ইরাক বিশ্বকাপে ছয়টি ম্যাচ খেলে জয়হীন। এমন রেকর্ড আছে আর তিনটি দলের।

উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে নকআউট পর্বে উঠেছে স্পেন। এ নিয়ে টানা তৃতীয়বার ও সব মিলিয়ে সর্বশেষ সাতবারের মধ্যে ছয়বার তারা নকআউট পর্বে উঠল। ২০১৪ সালে নকআউট পর্বে উঠতে ব্যর্থ হয়েছিল সেবারের ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন স্পেন। এ প্রথম বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে একটিও গোল হজম করেনি ‘লা রোজা’রা। এছাড়া ৩৩ ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে বর্তমান ইউরোপসেরা দলটি, যা তাদের দ্বিতীয় দীর্ঘতম অপরাজিত থাকার রেকর্ড। ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত তারা ৩৫ ম্যাচে অপরাজিত থাকার রেকর্ড গড়েছিল।

স্পেনের কাছে ০-১ গোলে হেরে এবারের আসর থেকে বিদায় নিয়েছে দুইবারের সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে। এ প্রথম টানা দুই আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিল লাতিন জায়ান্টরা। উরুগুয়ের ফার্নান্দো মুসলেরা ১৯৬৬ সালের পর প্রথম গোলকিপার হিসেবে এক আসরে তিনটি ভুল করে গোল হজম করেন। এছাড়া উরুগুয়ের দশম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে লাল কার্ড দেখেছেন অগাস্টিন কনোব্বিও। ব্রাজিলের ১১ জন ও আর্জেন্টিনার ১০ জন খেলোয়াড় বিশ্বকাপে লাল কার্ড দেখেছেন।

জনসংখ্যায় সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে নকআউট পর্বে উঠেছে কেপ ভার্দে। তাদের জনসংখ্যা ৫ লাখ ২৫ হাজার। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের প্রতিটিতেই কেপ ভার্দের চেয়ে জনসংখ্যা কম। ২০১০ আসরের পর এ প্রথম অভিষেকে নকআউটে উঠল কেপ ভার্দে। দক্ষিণ আফ্রিকা আসরে এ কীর্তি গড়েছিল স্লোভাকিয়া। গ্রুপ পর্বে কোনো ম্যাচ না জিতেও নকআউট পর্বে ওঠা সপ্তম এবং ১৯৯৮ সালের পর প্রথম দল হলো কেপ ভার্দে। এছাড়া ২০০৬ সালের পর প্রথম নবাগত দেশ হিসেবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন দলের মুখোমুখি হবে কেপ ভার্দে। সর্বশেষ ২০০৬ আসরে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়ে ৩-০ গোলে হেরেছিল সেবারের অভিষিক্ত ঘানা।