ড্যান্স পার্টির কেন্দ্রে দেখা গেল মোহাম্মদ সালাহকে। তিনি কেন্দ্রেই থাকেন সবসময়। বর্তমান মিসর দলের প্রাণভোমরা, দেশটির ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তারকা। লিভারপুলের হয়ে ইউরোপ মাতানো এ খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপের নাম ছিল মিসরের হয়ে বড় কিছু অর্জন করতে না পারা। সাতবারের আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন মিসর, অথচ সালাহর নামের পাশে একটিও শিরোপা নেই। বিশ্বকাপে ৯৪ বছরে দেশটি কোনো জয় পায়নি। অবশেষে সালাহর হাত ধরে বিশ্বকাপে প্রথম জয়ের স্বাদ পেল মিসর।

বাংলাদেশ সময় গতকাল সকালে ভ্যাঙ্কুভারে নিউজিল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়েছে মিসর। এটা বিশ্বকাপে চারবারের অংশগ্রহণে তাদের প্রথম জয়। এ জয়ে সালাহ গোল করে অবদান রাখেন, করিয়েছেন আরেকটি। অবশেষে তার বুকের ওপর থেকে চেপে বসা একটা পাথর যেন নেমে গেল। এ জয়ে ‘জি’ গ্রুপের শীর্ষে উঠে গেছে মিসর এবং তাদের নকআউট পর্বে ওঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে।

ম্যাচের শুরুর দিকেই পিছিয়ে পড়ে মিসর। ১৫তম মিনিটে ফিন সারম্যান গোল করে নিউজিল্যান্ডকে এগিয়ে দেন। এরপর দ্বিতীয়ার্ধের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে নিউজিল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে দেয় আফ্রিকান আরব দেশটি।

প্রথমার্ধে নিউজিল্যান্ডের পরিকল্পনা ছিল সহজ কিন্তু কার্যকর। প্রয়োজন হলে তারা লম্বা পাস খেলেছে, আবার সুযোগ পেলে বলের দখলও ধরে রেখেছে। এরই ফল হিসেবে কর্নার থেকে ডিফেন্ডার সারম্যান গোল করে এগিয়ে দেন ‘অল হোয়াইট’দের। নিজের মার্কার আহমেদ ফাতুহকে ফাঁকি দিয়ে শক্তিশালী হেডে বল জালে পাঠান সারম্যান।

ম্যাচের শুরুর দিকে ক্যালাম ম্যাককাওয়াটের হেড কোনোমতে বারের ওপর দিয়ে ঠেলে দেন মিসরের গোলরক্ষক। তবে বিরতির পর মিসর আক্রমণের ধার বাড়াতে থাকে এবং এ ধারাবাহিকতায় ৫৮তম মিনিটে সমতায় ফেরে। ডান দিক থেকে মোহাম্মদ হানির ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে গোল করেন মোস্তাফা জিকো।

সমতায় ফেরার পর মিসরকে এগিয়ে দেন সালাহ। ৬৭তম মিনিটে দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করেন লিভারপুল মাতানো এ ফরওয়ার্ড। ডান দিক দিয়ে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে জিকোর সঙ্গে ওয়ান-টু পাস খেলে তিনি বল জড়িয়ে দেন দূরের কোনা দিয়ে (২-১)।

৮১তম মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোলের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন সালাহ। ডান দিক থেকে তার নেয়া শট আরেক খেলোয়াড়ের গায়ে লেগে ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। তবে সেই কর্নার থেকেই মিসর পেয়ে যায় তৃতীয় গোলের দেখা, যাতে অ্যাসিস্ট করেন সালাহ। তার নেয়া কর্নার থেকে বদলি খেলোয়াড় মাহমুদ ত্রেজেগে ডাইভিং হেডে কাছের পোস্ট দিয়ে বল জালে পাঠিয়ে ব্যবধান ৩-১ করেন।

প্রথমার্ধে তুলনামূলকভাবে নিষ্প্রভ থাকা মিসর দ্বিতীয়ার্ধে সম্পূর্ণ বদলে যায়। ৩৪ বছর বয়সী উইঙ্গার সালাহ দেখিয়ে দেন, তার জাদুকরী ফুটবল এখনো ফুরিয়ে যায়নি। দলের জয়ের পর সতীর্থদের অভিনন্দনে সিক্ত সালাহ বলেন, ‘এটা যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই দারুণ একটি অর্জন। এটি একটি বড় জয়। দলের পরিবেশও চমৎকার। পরের ম্যাচটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এ জয় সবাই মনে রাখবে।’

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই স্টেডিয়ামজুড়ে উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে। সালাহ ও তার সতীর্থরা দেশের ইতিহাসে বিশ্বকাপে প্রথম জয় নিশ্চিত করেন, আর কোচ হোসাম হাসান মিসরের পতাকা হাতে নিয়ে পুরো স্টেডিয়াম প্রদক্ষিণ করে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত উদযাপন করেন।

প্রথম ম্যাচে বেলজিয়ামের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করা মিসর দুই ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের শীর্ষে উঠে গেছে। অন্যদিকে প্রথম ম্যাচে ইরানের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করা নিউজিল্যান্ড এক পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের তলানিতে রয়েছে। গতকাল গ্রুপের আরেক ম্যাচে গোলশূন্য ড্র করে বেলজিয়াম ও ইরান।

এদিকে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা কেপ ভার্দের রূপকথা চলছেই। গত সপ্তাহে ২০১০ আসরের চ্যাম্পিয়ন ও এবারের অন্যতম ফেভারিট স্পেনকে গোলশূন্য রুখে দেয়ার পর গতকাল ভোরে দুবারের সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিপক্ষেও ২-২ গোলে ড্র করেছে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের ছোট দ্বীপরাষ্ট্রটি।

ম্যাচ শেষে কেপ ভার্দের কোচ পেদ্রো লেইতাঁও ব্রিতো বলেন, ‘বিশ্বের ছোট ছোট জাতীয় দলের জন্য একটি বার্তা দিতে চাই আমরা। কোনো দেশ ছোট হতে পারে, অর্থনৈতিকভাবে সংগ্রামে থাকতে পারে, কিন্তু দৃঢ়তা থাকলে বড় দলগুলোর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করা সম্ভব।’

গ্রুপ ‘এইচ’-এ কেপ ভার্দে ও উরুগুয়ে দুই দলেরই এখন ২ পয়েন্ট। শেষ ম্যাচে কেপ ভার্দের প্রতিপক্ষ সৌদি আরব।

বাংলাদেশ সময় আজ ভোরের ম্যাচে মায়ামি স্টেডিয়ামে অধিকাংশ দর্শকই ছিল উরুগুয়ের সমর্থক। ম্যাচের ২১তম মিনিটে ফ্রি কিক থেকে কেপ ভার্দের ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ গোলটি করেন কেভিন পিনা। ৪৪ মিনিটে ম্যাক্সি আরাউহো গোল পরিশোধ করেন। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে উরুগুয়েকে এগিয়ে দেন অগাস্টিন কানোব্বিও। পরে বদলি হিসেবে নেমে হেলিও ভারেলা সমতাসূচক গোল করে কেপ ভার্দের এক পয়েন্ট নিশ্চিত করেন।

দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমেই ম্যাচে প্রভাব ফেলেন ভারেলা। মাথিয়াস অলিভেরার ভুল পাসের সুযোগ নিয়ে অনেকটা ফাঁকা পোস্টে গোল করেন তিনি। জাতীয় দলের হয়ে প্রথম গোলটি বিশ্বকাপ অভিষেকে করায় আবেগাপ্লুত ভারেলা বলেন, ‘আমি এমন মুহূর্তের স্বপ্ন দেখেছিলাম, কিন্তু এভাবে ঘটবে ভাবিনি। ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।’

উরুগুয়ের অভিজ্ঞ আর্জেন্টাইন কোচ মার্সেলো বিয়েলসা ছোট্ট কেপ ভার্দের সঙ্গে ড্রয়ের পর বলেন, ‘দলের ভুলগুলোর দায় প্রধান কোচ হিসেবে আমারই। সেই ভুলের জন্য আমাদের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।’

কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়া আবারো দুর্দান্ত পারফর্ম করে সবার হৃদয় জয় করেন। এবার গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন তার মা, যিনি স্পেনের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ড্রয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ত্বরিত পদক্ষেপে মাঠে এসে ছেলের খেলা দেখতে সমর্থ হয়েছেন।

শেষ বাঁশি বাজার পর কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা সমর্থকদের দিকে ছুটে যান। বিজয় না পেলেও তাদের উচ্ছ্বাস ছিল জয়ের উদযাপনের মতোই। স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দুটি বড় দলকে আটকে দেয়ার পর সৌদি আরবকে হারিয়ে এখন নকআউটে খেলার স্বপ্ন দেখছে দলটি। কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার স্তোপিরা বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, কঠোর পরিশ্রম করি এবং ভালো ফুটবল খেলি। এখন লক্ষ্য একটাই—নকআউট পর্বে ওঠা।’