চিরাচরিতভাবেই টেস্টে শ্রীলংকার সামনে অসহায় বাংলাদেশ। লংকানদের বিপক্ষে ২৬ টেস্টে মাত্র একটি জয় নিয়ে এ মাসে দুই ম্যাচের সিরিজ খেলতে নামে বাংলাদেশ। গল টেস্টে দারুণ খেলে ড্র করলেও কলম্বোয় দেখা গেল পুরনো বাংলাদেশকে! লংকানদের কাছে ইনিংস ও ৭৮ রানের বিশাল ব্যবধানে হারল অতিথিরা। এ নিয়ে নবমবার শ্রীলংকার কাছে ইনিংস ব্যবধানে হারল বাংলাদেশ। এ পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে টেস্টে বাংলাদেশের ওপর কতটা আধিপত্য করে এসেছে লংকানরা।
বাংলাদেশকে প্রথম ইনিংসে ২৪৭ রানে অলআউট করার পর লংকানরা তাদের প্রথম ইনিংসে ৪৫৮ রান তোলে। পাথুম নিশাঙ্কা ১৫৮ রানের রাজসিক ইনিংস খেলেন। এছাড়া দিনেশ চান্দিমাল ৯৩ ও কুশল মেন্ডিস ৮৪ রান করেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে ধসিয়ে দেন বামহাতি স্পিনার প্রবথ জয়সুরিয়া। ৫৬ রানে ৫ উইকেট নেন তিনি। এ ইনিংসে বাংলাদেশের কেউই ফিফটি পাননি। সর্বোচ্চ ২৬ রান করেন মুশফিকুর রহিম। গল টেস্টে উভয় ইনিংসে সেঞ্চুরি করা নাজমুল হোসেন শান্তও ব্যর্থ। ৬ উইকেটে ১১৫ রান নিয়ে গতকাল চতুর্থ দিন ব্যাটিংয়ে নেমে ৩০ মিনিটের মধ্যে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। এ চার উইকেটের মধ্যে তিনটিই নেন প্রবথ জয়সুরিয়া।
বাংলাদেশকে আরেকবার ইনিংস ব্যবধানে হারানোর কৃতিত্ব দেখাল শ্রীলংকা। এছাড়া জিম্বাবুয়েকে পাঁচবার ইনিংস ব্যবধানে হারের লজ্জা দিয়েছে সিংহলিজরা। এর আগে গত বছর সেপ্টেম্বরে নিউজিল্যান্ডকে ইনিংস ব্যবধানে হারিয়েছিল তারা।
২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে কলম্বোয় প্রথমবার টেস্টে দেখা হয় দুই দলের। শ্রীলংকা তখন সব ফরম্যাটে ক্রিকেটের এক পরাশক্তি, আর বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক শিক্ষানবিশ। আগের বছরই টেস্ট মর্যাদা পায় টাইগাররা। কলম্বোর সেই দেখায় বাংলাদেশকে ইনিংস ব্যবধানে হারিয়ে দেয় সিংহলিজরা। সেটা ছিল এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচ। লংকান কিংবদন্তি স্পিনার মুত্তিয়া মুরালিধরন উভয় ইনিংসেই শিকার করেছিলেন ৫ উইকেট। তরুণ মোহাম্মদ আশরাফুল সেঞ্চুরি করেও দলকে বড় হার থেকে বাঁচাতে পারেননি।
পরের বছর শ্রীলংকা সফরে গিয়ে দুটি টেস্ট খেলে বাংলাদেশ। আবারো টাইগাররা পড়ে স্পিন জাদুকর মুরালিধরনের সামনে। তিনি ৯৮ রানের খরচায় ১০ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে ইনিংস ও ১৯৬ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে দিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। এছাড়া লংকান ব্যাটিং গ্রেট অরবিন্দ ডি সিলভা ২০৬ ও সনাথ জয়সুরিয়া ১৪৫ রানের ইনিংস খেলেন। ওই সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশকে ২৮৮ রানে হারায় শ্রীলংকা।
২০০৫ সালে শ্রীলংকা সফরে গিয়ে আবারো টানা দুই টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে পরাজিত হয় বাংলাদেশ। প্রথম টেস্টে মুরালিধরন ম্যাচে ৯ উইকেট নেন। বাংলাদেশ দুই ইনিংসে যথাক্রমে ১৮৮ ও ৮৬ রানে গুটিয়ে যায়। মুরালিধরন দ্বিতীয় ইনিংসে ১৮ রানে ৬ উইকেট নিয়ে মৃত্যুপুরিতে পরিণত করেন বাংলাদেশ দলকে। সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশকে ইনিংস ও ৯৬ রানে হারায় দ্বীপদেশটি। লংকানরা ৯ উইকেটে ৪৫৭ রান তুলে প্রথম ইনিংস ঘোষণার পর ১৯১ রানে গুটিয়ে গিয়ে ফলোঅনে পড়ে বাংলাদেশ, যারা দ্বিতীয় ইনিংসে গুটিয়ে যায় ১৯৭ রানে।
মুখোমুখিতে প্রথম পাঁচ টেস্টের চারটিতেই বাংলাদেশকে ইনিংস ব্যবধানে হারায় শ্রীলংকা। ২০০৭ সালে শ্রীলংকা সফরে আরো বিপর্যস্ত বাংলাদেশ। সেবার সিরিজের তিন ম্যাচেই ইনিংস ব্যবধানে পরাজিত হয় বাংলাদেশ। কলম্বোয় প্রথম ম্যাচে ইনিংস ও ২৩৪ রানে, দ্বিতীয় ম্যাচে ইনিংস ও ৯০ রানে এবং ক্যান্ডিতে তৃতীয় ম্যাচে ইনিংস ও ১৯৩ রানের জয় পায় শ্রীলংকা। মোট ২৬ উইকেট নিয়ে সিরিজের সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন সেই মুরালিধরন।
২০১৪ সালে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে অষ্টমবারের মতো বাংলাদেশকে ইনিংস ব্যবধানে হারায় শ্রীলংকা। মাহেলা জয়াবর্ধনের ডাবল সেঞ্চুরি এবং কৌশল সিলভা ও কিথুরুয়ান ভিথানাগের সেঞ্চুরিতে ভর করে ৭৩০ রানের সৌধ গড়ে বাংলাদেশকে ইনিংস ও ২৪৮ রানের বিশাল ব্যবধানে হারায় সফরকারীরা। এরপর ১১ টেস্টে বাংলাদেশকে ইনিংস ব্যবধানে হারাতে পারেনি লংকানরা। এ সময় কিছুটা উন্নতি করে টাইগাররা। সাড়ে ১১ বছর পর আরেকবার বাংলাদেশকে ইনিংস ব্যবধানে হারাল তারা।
কলম্বোয় গতকাল ইনিংস ব্যবধানে হেরে সিরিজও খুইয়েছে বাংলাদেশ। হারের পর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ দলনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বলেন, ‘প্রথম টেস্টের পর এই টেস্ট যেভাবে গেল তাতে আমরা খুবই হতাশ। প্রথম ইনিংসে আমরা যেভাবে ব্যাট করেছি তা প্রত্যাশা থেকে অনেক দূরে। সুযোগ থাকলেও তা আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। হারলেও আমি মনে করি, আগে ব্যাট করাই ঠিক আছে। উইকেট ধীরগতির হলেও আমরা যেভাবে আউট হয়েছি তা দৃষ্টিকটু। ব্যাটিংয়ের সময় আমরা অনেক ভুল করেছি এবং সহজে উইকেট দিয়েছি। বোলিংয়ের কথা যদি বলি, এমন উইকেটে তৃতীয় দিন আমরা যেভাবে বোলিং করেছি তা ছিল সত্যিই দারুণ।’
অস্ট্রেলিয়ার কাছে হোম সিরিজ হারের পর প্রথমবারের মতো সাদা পোশাকে খেলতে নেমে সিরিজ জিতল শ্রীলংকা। স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত খুশি লংকান দলনায়ক ধনাঞ্জয়া ডি সিলভা। গতকাল জয় শেষে গল ও কলম্বো টেস্টের তফাত নিয়ে তিনি বলেন, ‘দুই ম্যাচের মধ্যে তফাত রয়েছে। এখানে বোলার ও ব্যাটাররা প্রথম ইনিংসে ভালো করেছেন। বোলাররা তাদের পরিকল্পনা সুন্দরভাবে কাজে লাগাতে পেরেছেন। টস হারের পরও প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার মতো বোলিং করতে পেরেছি আমরা, যা ছিল মনস্তাত্ত্বিকভাবে এক উদ্দীপনার বিষয়।’ নিশাঙ্কাকে নিয়ে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই সে তিন ফরম্যাটেই দারুণ পারফর্ম করে যাচ্ছে। আমি মনে করি, সে তার ফর্মটা ধরে রাখতে সমর্থ হবে।’
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ: ২৪৭ ও ১৩৩। শ্রীলংকা: ৪৫৮। ফল: শ্রীলংকা ইনিংস ও ৭৮ রানে জয়ী। সিরিজ: শ্রীলংকা ১-০তে জয়ী। প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ ও সিরিজ: পাথুম নিশাঙ্কা (শ্রীলংকা)।










