ফুটবল বিধাতা সেদিন মঞ্চটা সাজিয়েই রেখেছিলেন। ভক্ত ছিল, সমর্থক ছিল, ফর্ম ছিল; সবকিছু পড়ে ছিল। কিন্তু কিছুতেই যেন শেষ হাসিটা তার হাসার কথা ছিল না।
দুর্ভাগ্যের নব্বইটা মিনিট শেষ হলো। পাশে কৃত্রিম আলোয় চকচক করছে সোনালি ট্রফিটা। সোয়া ছয় কেজি ওজনের বিশ্বের সবচেয়ে লোভনীয়, লাস্যময়ী সেই ট্রফি যেন তার দিকে ফিরেই হাসছিল। কিন্তু তিনি?
তিনি মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে হাতের ব্যান্ডটা খুলতে খুলতে এগিয়ে যাচ্ছেন ডাগ আউটের দিকে। একবার কি একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল? কে জানে! ফুটবল বিশ্বকাপ আরো একবার সাক্ষী হলো ফুটবল দেবদূতের কান্নার। আরো একবার হাহাকার মিশে রইল ফুটবল দুনিয়ার আকাশে-বাতাসে। বিশ্বকাপ জেতা হলো না লিওনেল আন্দ্রেস মেসির।
অবশেষে দেখতে দেখতে আরেকটা বিশ্বকাপ এসে গেল
দুয়ারে। এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপের ময়দানে নামবেন মেসি। অনেকের জন্যই এটা হয়তো
স্রেফ আরেকটা বিশ্বকাপ। কিন্তু মেসির জন্য আরেকটা বারের জন্য চেষ্টা করা। শেষবারের
জন্য ওই সোনালি গোলকটা হাতে নেয়ার চেষ্টা করবেন তিনি। লাস্ট ফ্রন্টিয়ারে এবার লিওনেল
মেসি।
মেসির বিশ্বাস অভিযান শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে।
বার্সেলোনার ক্ষুদে তারকার বয়স তখন সবে ১৯ বছর। বয়সে কিশোর হলেও মেসি ততদিনে নিজের জাত চিনিয়ে ফেলেছেন বার্সেলোনায়। আর্জেন্টিনার নীতিনির্ধারকদেরও ততদিনে বুঝতে বাকি নেই, তারা আরেকজন ম্যারাডোনার মতো জাদুকর পেয়ে গিয়েছে। এ কথা আর্জেন্টাইনদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো জানতেন কোচ হোসে পেকারম্যান। আর তিনিই কিনা মেসির ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেললেন!
পেকারম্যানের চেয়ে ভালো করে মেসিকে আর্জেন্টিনার কারো চেনার কথা নয়। ২০০৫ সালে, জার্মান বিশ্বকাপের আগের বছর মেসি যুব বিশ্বকাপ জিতেছিলেন, সে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় ও সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন। তখন ওই দলের কোচ ছিলেন পেকারম্যান। মূলত ওই দলটারই বেশ কয়েকজন তারকা ২০০৬ সালের আর্জেন্টিনা সিনিয়র দলে চলে এলেন। ফলে আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশন যুব দলের কোচ পেকারম্যানকেই সিনিয়র দলে নিয়ে এল। কারণ তিনি মেসিদের সবচেয়ে ভালো চেনেন।
দুর্ভাগ্যের বিষয়—পেকারম্যানই মেসিকে
সবচেয়ে কম চেনেন বলে প্রমাণ করতে থাকলেন।
মেসির একটু ইনজুরি সমস্যা ছিল। তবে সেটা না খেলার মতো নয়। তার পরও পেকারম্যান তাকে নিয়মিত খেলাচ্ছিলেন না। সার্বিয়া মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে জাদুকরি সে ম্যাচে মেসিকে মাঠে নামালেও তিনি প্রমাণ করে দেন, কেন তাকে ম্যারাডোনার উত্তরসূরি বলা হচ্ছে।
আর্জেন্টিনা সেবার তারকাখচিত দল হলেও আগে তেমন হাইপ ছিল না দলটাকে নিয়ে। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্সের পর ম্যাক্সি রদ্রিগেজ, হুয়ান রোমান রিকেলমে, হুয়ান সেবাস্টিয়ান সোরিন থেকে শুরু করে মেসির এ দলকে নিয়ে বাজির দর বাড়তে থাকল।
জার্মানির বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের আগ পর্যন্ত তরতর করে চলছিল আর্জেন্টিনা। জার্মানি ফেবারিট ছিল। কিন্তু ম্যাচ শুরুর আগে তাদের আরো ফেবারিট করে দিলেন পেকারম্যান। তিনি মেসিকে শুরুর একাদশে রাখলেনই না। এরপর আয়লার গোলে আর্জেন্টিনা যখন এগিয়ে গেল, পেকারম্যান আরো অবিশ্বাস্যভাবে আরো রক্ষণাত্মক হয়ে গেলেন। তুলে নিলেন রিকেলমে ও ক্রেসপোকে!
ফলে জার্মানি আক্রমণের পর আক্রমণ করে খেলায় সমতা আনল এবং পেনাল্টি শুটআউটে ম্যাচ জিতল। মেসি অভিষেকেই বিশ্বকাপ জয়ের সুবর্ণ সুযোগটা পেলেন না কোচের কারণে।
তবে সব পক্ষপাত এক পাশে সরিয়ে রেখে বললেও মানতে
হবে মেসির বিশ্বকাপ জয়ের সেরা সম্ভাবনা ছিল ২০১০ সালে। মেসি তখন বিশ্বের অবিসংবাদিত
সেরা। কেবল মেসি সেরা, তা নন। বিশ্বের সেরা লিগগুলোর সেরা খেলোয়াড়রাও তখন আর্জেন্টিনার।
স্রেফ দলের সম্ভাবনাটা একবার ভেবে দেখুন—ব্যালন ডি’অর ও ট্রেবলজয়ী মেসি, ইতালীয় ট্রেবলজয়ী হ্যাভিয়ের জানেত্তি,
মাঝমাঠের জাদুকর রিকেলমে, ইংল্যান্ডের সর্বজয়ী আগুয়েরো, ফ্রান্স থেকে আসছেন হিগুয়েইন
এবং এক ঝাঁক তারকা। এই দল নিয়ে মাঠে নামলেই তো আপনি চ্যাম্পিয়ন।
কিন্তু দলটাকে ডোবালেন স্বয়ং ডিয়েগো ম্যারাডোনা।
সর্বকালের সেরা এ ফুটবলারকে আর্জেন্টিনা তখন কোচ করে এনেছে। এ তারকাখচিত দল নিয়ে বাছাই পর্বে টানাটানি করে এলেন বিশ্বকাপে এবং সেখানে দল ঘোষণায় দেখালেন ‘ম্যাজিক’। দলে রাখলেন না সে সময়ের বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্যাপ্টেন ও ফুটবলার হ্যাভিয়ের জানেত্তিকে। ইন্টার মিলানের এ রক্ষণ সেনানী কিছুদিন আগে স্বয়ং মেসিকে আটকে রেখে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন। ম্যারাডোনা বললেন, ‘জানেত্তি তো মেসিকে আটকানো ছাড়া কিছু পারে না। এখানে ওর সে কাজ দরকার হবে না। তাই তাকে দলে রাখিনি।’
এরপর দল থেকে বাদ দিলেন রিকেলমেকে। ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের ফলে ইনফর্ম এই মিডফিল্ড মার্শালকে বাইরে রাখলেন। তার বদলে বহু আগে বুড়িয়ে যাওয়া ভেরনকে এনে বললেন—ও আমার জাভি!
এর পরও আর্জেন্টিনা অসাধারণ ফুটবল খেলছিল। মেসি নিজে তার সেরা প্রদর্শনী করেছিলেন এ আসরে। কোনো গোল না পেলেও অবিশ্বাস্য ফুটবল খেলেছিলেন তিনি। কিন্তু ম্যারাডোনার হাতে সর্বাত্মক আক্রমণের বিকল্প কোনো প্ল্যান বি ছিল না। ফলে ওই অলআউট অ্যাটাক করে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত এলেন। কিন্তু জার্মানি যখন ভয়ানক গতিশীল কাউন্টার অ্যাটাকের ফুটবল খেলল, তার জবাবে ম্যারাডোনার না ছিল জানেত্তি, না ছিল অন্য কোনো কৌশল।
মেসির দুটো সম্ভাবনাময় বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেল। ২০১৪ সালে মেসি সম্ভবত তার ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল দলটি নিয়ে ব্রাজিলে বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েছিলেন। কিন্তু দলটা ছিল সত্যিকারের একটা ‘টিম’। আর এ দলের দায়িত্বে ছিলেন সত্যিকারের কুশলী কোচ আলেহান্দ্রো সাবেইয়া। মানুষটি আর্জেন্টিনার গত কয়েকটি আসরের অতি আক্রমণাত্মক ফুটবল থেকে সরে এসে কার্যকর ফুটবল খেলালেন। আর এর ফল মিলল।
হয়তো ২০১৪ সালের আর্জেন্টিনা চোখের জন্য মারাত্মক সুখকর ছিল না। কিন্তু তারাই চলে এল ফাইনালে এবং সেমিফাইনালেই ব্রাজিলকে সাত গোল দেয়া জার্মানিকে আটকেও রেখেছিল। কিন্তু একটি গোল শেষ করে দিল চূড়ান্ত স্বপ্ন। বিশ্বকাপের সবচেয়ে কাছ থেকে ফিরে এলেন মেসি।
২০১৮ সালে মেসিদের নিয়ে তেমন কোনো স্বপ্ন কারো ছিল না। দল অনেকটাই তখন বুড়িয়ে গিয়েছে। সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে কয়েকজন ইনজুরিতে। কোচের কথা ড্রেসিং রুম শুনছে না। এ রকম একটা দল নিয়ে বাজি ধরা কঠিন। তার পরও কীভাবে যেন বিশ্বকাপে মাঝারি একটা খেলা খেলল আর্জেন্টিনা।
আলটিমেটলি বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্সের বিপক্ষে হারল তারা কোয়ার্টার ফাইনালে। একটা সময় পর্যন্ত এগিয়েও ছিল। এটাই আর্জেন্টিনার সান্ত্বনা হয়ে রইল। সেবার কেউ আশাও করেনি, ম্যাজিকও কিছু ঘটেনি।
কিন্তু এবারের অবস্থা আবার অন্য রকম। ২০১৮ বিশ্বকাপের পর থেকেই নিজেদের গুছিয়ে নিতে শুরু করেছে আর্জেন্টিনা। লিওনেল স্কালোনির অধীনে কমপ্যাক্ট ফুটবল খেলা একটা দল হয়ে উঠেছে দলটা। সর্বশেষ ৩৪ ম্যাচে হারের মুখ দেখেনি এ দল। এ দলের সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, তারা মেসিসর্বস্ব একটা দল নয়।
মেসি আছেন। খুব ভালোমতোই আছেন। তিনি তার সেরাটাই দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এ দল মেসিকে ছাড়াই এগিয়ে যাওয়ার যোগ্যতা রাখে। মেসিকে ছাড়াই তারা জমাট আক্রমণ করতে পারে, তারা পারে নিশ্ছিদ্র রক্ষণ তৈরি করতে। এ দলের সেরা ভরসা এমি মার্টিনেজ নামে এক সেরা গোলরক্ষক।
এরই মধ্যে আর্জেন্টিনার এ নতুন দলটি একটি কোপা
আমেরিকা জিতে ফেলেছে। তারা এখন যেটা খেলছে, সেটাকেও আমরা টোটাল ফুটবল বলতে পারি। এ
ফুটবলের জয় আবার আর্জেন্টিনাকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। আর স্বপ্ন বুনছেন খোদ মেসি।
বয়স বলছে, এটা মেসির শেষ সুযোগ। বিশ্বকাপ আর খেলাটা প্রায় অসম্ভব। ফলে কাতারে তিনি আসবেন শেষবারের মতো ওই ট্রফিটাকে ছোঁয়ার স্বপ্ন নিয়ে। এই শেষ স্বপ্ন নিয়ে আরো অনেকেই আসবেন। খোদ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোরও এটা শেষ বিশ্বকাপ। কিন্তু মেসির মতো এত দারুণ সম্ভাবনা আর কারো সামনে নেই। মেসির এবার শেষ হাসিটা হাসার পালা।
মেসি কি পারবেন? পারবেন শেষ মিনিটের জাদুকর
হয়ে উঠতে? পারবেন জীবনটাকে পূর্ণ করতে? নাকি একটা ট্র্যাজেডি গল্পের নায়ক হয়েই রয়ে
যাবেন এ দেবদূত?
সব প্রশ্নের উত্তর রইল কাতারের অপেক্ষায়।










