কাতারে চলছে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ-২০২২। আল বাইত স্টেডিয়ামে কাতার ও একুয়েডরের ম্যাচ দিয়ে পৃথিবীর সেরা ফুটবল প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বেশকিছু উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে, জন্ম হয়েছে বেশ ক’টি অঘটনের। এটা নিছক এক খেলা নয়, এক উন্মাদনা। যাকে বলা হয় ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’।
শুরুর আগের গল্প: বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ ফুটবলের আদি ভূমি বলে পরিচিত। প্রাচীন চীনে হান রাজাদের সুজু বা তাসুজু-চু নামের একটি খেলা প্রচলিত ছিল। একটি গোলাকার বলকে লাথি মারাই ছিল খেলা। আর এটি খেলা হতো শরীরচর্চা হিসেবে। চীন ছাড়াও কোরিয়া, জাপান, ভিয়েতনামেও ছোট-বড় সবাই এ খেলা খেলত। প্রাচীন গ্রিস ও রোমেও ফুটবলের মতো একটি খেলার প্রচলন ছিল। গ্রিসের এপিসকিউরোস বা ফাইনিডিয়া রোমে এসে হারপাতসুম নাম ধারণ করে।
কলম্বাসের পথ ধরে আসতে থাকা ইউরোপীয়রা নতুন দুনিয়া আমেরিকার আদিবাসীদের বল গেম নামের খেলা খেলতে দেখে। অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞ একে ফুটবলের আদি রূপ বলে মনে করেন। তবে ফুটবলের বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফা গ্রিক বল গেম এপিসকিউরোসকে ফুটবলের আদি রূপ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে।
তবে আধুনিক ফুটবলের জনক গ্রেট ব্রিটেন। মধ্যযুগে দেশটিতে ফুটবল খেলা শুরু হয়, যা দেশটির সাধারণ মানুষের মাঝে ক্রমেই জনপ্রিয় হতে শুরু করে। একই সময়ে খেলাটি ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ক্লাব ফুটবলের চর্চাও শুরু হয় সেখানে। এখান থেকে ফুটবলের নিয়মকানুনেরও উত্পত্তি। বিশ্বের একের পর এক রাষ্ট্র দখল করে উপনিবেশ বানানো ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় শক্তিগুলো ফুটবলকে ছড়িয়ে দেয় তাদের উপনিবেশগুলোয়। সেই সঙ্গে ফুটবল হয়ে ওঠে একটি আন্তর্জাতিক খেলা।
১৯০০ সালের অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় ফুটবলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আপটন পার্ক নামের ব্রিটিশ ফুটবল ক্লাব প্রথম অলিম্পিক ফুটবলের স্বর্ণ বিজয়ী দল। ১৯০৪ সালে অলিম্পিক ফুটবলে সোনা জিতেছিল কানাডার গাল্ট এফসি নামের ক্লাব। ১৯০৮ সাল থেকে অলিম্পিক ফুটবলে জাতীয় ফুটবল দলগুলো অংশ নেয়া শুরু করে। এতে ডেনমার্ককে হারিয়ে গ্রেট ব্রিটেন দ্বিতীয়বারের মতো অলিম্পিক ফুটবলে সোনা জয় করে।
ফিফা ও বিশ্বকাপ: ফিফার জন্ম ১৯০৪ সালে। ১৯১৪ সালে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে অলিম্পিক ফুটবলকে অপেশাদার আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টের মর্যাদা প্রদান করা হয়। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯১৬ সালে অলিম্পিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি।
ফুটবল বিশ্বকাপের বীজ রোপণ: বেলজিয়ামের অ্যান্টিয়ার্পে ১৯২০ অলিম্পিকের ইউরোপ থেকে ১২টি ও ইউরোপের বাইরের একটি দেশ ফুটবলে অংশ নেয়। আফ্রিকা থেকে মিসর অলিম্পিক ফুটবলে প্রথম অংশগ্রহণ করে, এর মধ্য দিয়ে ফুটবল বিশ্বের একটি বৈশ্বিক খেলায় রূপ নেয়। এদিকে সারা বিশ্বে ফুটবলের গণজোয়ার দেখা দেয়, ফলে সেটি এর নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে বিকল্প এক প্রতিযোগিতার কথা ভাবাতে বাধ্য করে। এ অলিম্পিক ছিল ইউরোপের শেষ একচ্ছত্র আধিপত্যের অলিম্পিক। এর পরের দুটি অলিম্পিক ফুটবলে স্বর্ণপদক বিজয়ী দেশের নামটি হচ্ছে উরুগুয়ে।
১৯২০ সালের অলিম্পিকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, ফুটবলের জন্য একটি আলাদা প্রতিযোগিতার দরকার, বিশেষ করে পেশাদার খেলোয়াড়দের সংখ্যাও বাড়তে থাকার কারণে এ ভাবনাটা জোরালো হয়। তবে এর চূড়ান্ত ঘোষণা আসে ২৮ মে ১৯২৮ সালে, আমস্টারডামের ফিফা কংগ্রেসে। প্রথম ফিফা ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপের আয়োজক রাষ্ট্রের গৌরবের দাবিদার হতে চেয়েছিল হাঙ্গেরি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, স্পেন ও সুইডেন। তবে ইউরোপের বাইরে উরুগুয়েও এতে তার দাবি পেশ করে। সবাই আশা করেছিল যে প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজক রাষ্ট্র হবে তারাই। তবে শেষ পর্যন্ত বাজিমাত করে উরুগুয়ে।
এর পেছনে ফিফার যুক্তি ছিল, উরুগুয়ে পরপর দুটি অলিম্পিক ফুটবল বিজেতা রাষ্ট্র। সেই সঙ্গে ১৯৩০ সালে হতে যাচ্ছিল দেশটির স্বাধীনতার একশ বছর পূর্তি। কিন্তু যে যুক্তিতে উরুগুয়ে বাকিদের পরাস্ত করে তার পেছনে ছিল এক অর্থনৈতিক বাস্তবতা। টুর্নামেন্টে আগত সব দলের আসা-যাওয়া এবং থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি উরুগুয়ের ফুটবল ফেডারেশন ঘোষণা প্রদান করে, ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের ফলে যদি উরুগুয়ে কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তাহলে তার সব দায়ভার দেশটি বহন করবে। শুধু তাই নয়, এতে যদি দেশটি লাভের মুখ দেখে, তাহলে সে লভ্যাংশের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ সে ফিফার সঙ্গে শেয়ার করবে।
এ ঘোষণার পর ১৯২৯ সালে বার্সেলোনার ফিফা কংগ্রেসে ঘোষণা দেয়া হয় প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছে আর কেউ নয়, স্বয়ং উরুগুয়ে। সেই শুরু। ১৯৩০ সালে ঘরের মাঠে উরুগুয়েই শিরোপা রেখে দেয়। এরপর মাঠে গড়ায় আরো ২০টি আসর, কাতারে চলছে ফিফার ২২তম বিশ্বকাপ আসর।










